রক মনু

শহীদ মিনার স্টেটের নয়, কম্যুনিটির স্পেস মাত্র

শহীদ মিনার একটা বাংলাবাদী স্পেস, বাঙালির স্পেস, বাঙালি মানে বাংলাভাষী কম্যুনিটি; বাংলাদেশে বাঙালি বাদে আরো আরো কম্যুনিটি আছে এবং থাকবে; তাই বলে বাংলাবাদী ওই স্পেসে স্টেটের সকল কম্যুনিটির নাগরিকের অভিন্ন হক আছে বলা যায় না। গীর্জায় যেমন খৃস্টান ছাড়া কারো হক নাই। বা মন্দিরে থাকতে পারে না মোসলমানের হক। তেমনি শহীদ মিনারে উর্দু কবি ইকবালের কবিতা উৎসব করা যায় না; তাতে স্টেটের কাছে কম্যুনিটির হক আদায় হয় না। ফলে, শহীদ মিনারে ইকবালের উর্দু কবিতা উৎসবের চেষ্টা ঠেকাবার মাঝে ফ্যাসিবাদ নাই। এটি স্রেফ কালচারাল ভিন্নতার ঘোষণা। 

-------------------------

স্টেটের কাছে কম্যুনিটির হক আছে, সেই হক নিজস্ব স্পেস পর্যন্ত লম্বা। মোসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা বাঙালি—বিভিন্ন কম্যুনিটি থাকবে স্টেটে; সকল কম্যুনিটির নিজস্বতা রক্ষার হক আছে স্টেটের কাছে; তবু কম্যুনিটি এবং স্টেটের ফারাক আছে।

বাংলাদেশ একটা স্টেট হিসাবে পয়দা হওয়ায় বাঙালি, মোসলমান বাঙালি, হিন্দু বাঙালি, বৌদ্ধ, বৌদ্ধ বাঙালি, মান্দি, চাকমা, রাখাইন—সবার, সব কম্যুনিটির অবদান আছে; এমনকি কারো কারো অবদান না থাকলেও স্টেটের বর্তমান বাসিন্দা এবং নাগরিক হিসাবে হক তৈরি হইছে এবং সেই হকের সাংবিধানিক ন্যায্যতাও ঘোষিত আছে।

বাঙালির স্পেসের স্টেটের কমন স্পেস হইয়া ওঠার চেষ্টা স্টেটের অন্যান্য কম্যুনিটির উপর বাঙালির আধিপত্য কায়েম হবার পরিবেশ তৈরি করে। স্টেট এবং বাঙালি কম্যুনিটি অভিন্ন হইয়া উঠতে থাকলে উর্দু-হিন্দি-ইংরাজি-চাকমা ইত্যাদি নির্মূলের বাস্তবতা তৈরি হয়। ইকবালের কবিতা উৎসব শহীদ মিনারে করার চেষ্টা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি ভিন্ন কোন স্পেসে—ভাড়া করে বা উর্দুভাষী কম্যুনিটির নিজস্ব স্পেসে বিনা বাধায়, আরামে করতে দিতে হবে। মসজিদে গীতা পড়ার আসর করা ঠিক হবে না, কিন্তু মন্দিরে গীতার আসর বানচালের যেকোন চেষ্টা ঠেকাতে হবে।

একইসাথে কম্যুনিটির স্টেট হইয়া ওঠার চেষ্টাও ঠেকাতে হবে; বাংলাদেশ স্টেটকে বাঙালি কম্যুনিটি সংখ্যা জোরে দখল করতে চায়; শহীদ মিনারে পিয়াস করিমের লাশ নেওয়াকে ঘিরে বাঙালির এই দখলের চেষ্টা আবারো দেখা যাইতেছে। দুই পক্ষই এই দখলের সৈনিক; কেননা, দুই পক্ষই আসলে শহীদ মিনার নামে বাঙালি কম্যুনিটির একটা স্পেসকে স্পেটের একটা কেন্দ্রীয় সিম্বল (জাতীয় স্মৃতিসৌধ যেমন) হিসাবে দাবি তুলছে এই ঘটনা দিয়া; এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামের একটা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্টেট নিজেই একটা পক্ষ নিয়ে বাঙালি কম্যুনিটির সেই দাবিকে এন্ডোর্স করে যাচ্ছে। অন্যান্য কম্যুনিটির বিরুদ্ধে স্টেটের ক্রাইম এইটা।

পিয়াস করিমের লাশ নিয়া এই ঘটনা বাঙালি কম্যুনিটির ছোট একটা ইন্টারনাল ঘটনা মাত্র; একদল দাবি করছে, শহীদ মিনারে পিয়াস করিমের লাশ রাখা অনুমোদন করে না বাঙালি কম্যুনিটি, এইটা নাকি এই কম্যুনিটির চেতনার বিরোধী। বাঙালি কম্যুনিটির মেম্বারদের সামগ্রিক গণরায় ছাড়াই কি এইটা বলা যায়? যায় না। ওদিকে, কম্যুনিটির মেম্বার হিসাবে কেউ একজন দাবি করতে থাকলে তারে কি কম্যুনিটি থেকে বের করে দেবার হক রাখে কম্যুনিটির অন্য কতিপয় মেম্বার? না।

পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে রাখতে চাইবার ঘটনার অর্থ পিয়াস এবং তাঁর সহচরদের বাঙালি কম্যুনিটির মেম্বার হিসাবে ক্লেইম করা; কেউ কি সেটা আনজাস্ট বলে অ্যাবসল্যুটলি প্রুভ করতে পারে? না। অন্য একটা উদাহরণ দিয়া বোঝা যাইতে পারে বিষয়টা। কোন কোন মোসলমানের পোলা-মাইয়া বা মোসলমান মরলে জানাজা হবে না বলে ঘোষণা দেবার কিছু লোক দেখা দেয়; কেউ যদি অমুসলিম হিসাবে দাবি করে না মরে বা মোসলমান হিসাবে মরে, বা মৃতের পরিবারবর্গ যদি মোসলমান হিসাবে ক্লেইম করে জানাজা দিতে চায় তাইলে ইসলাম অনুযায়ী আল্লাহ ছাড়া কেউ কি বলতে পারে সে মোসলমান নয়, তাঁর জানাজা হবে না? আমার ইসলাম বোঝাপড়া বা বিভিন্ন আলেমের মতে যদ্দূর বুঝি, কোন মানুষ বলতে পারে না সেইটা। ইসলামের কনফার্ম রেফারেন্স পয়েন্ট কোরান-সুন্নাহ থাকবার পরেও সেইটা বলা যাচ্ছে না; তাইলে বাঙালি কম্যুনিটির কোন রেফারেন্সই তো নাই, এই কম্যুনিটি থেকে বাইর করে দেবার সিস্টেম থাকবে কেমনে? নাই। রেফারেন্স পয়েন্ট হিসাবে বাংলাভাষী কিনা—এমন একটা আলগা ব্যাপার ভাবা যাইতে পারে মাত্র।

ফলে কম্যুনিটি থেকে পিয়াস করিমকে বাইর করে দেবার চেষ্টায় থাকা ওই লোকগুলি উটকো। মে বি, গণধোলাইয়ের মনঅলা এক দলা ডিজিটাল পিপল এরা—নাম গোপন করা কালচারের বাংলা ব্লগগুলিতে যাদের পয়দা, বড়োজোর আওয়ামী।

তবু, এই দলাদলি, রাজনৈতিক চাঙাভাব তৈরির এই পরিস্থিতি ভালো এবং অন্য অনেক কম্যুনাল মারামারির চাইতে কম খুনাখুনির সম্ভাবনা।

১৬ অক্টোবর ২০১৪