রক মনু

রাজনীতি যেন নীতির পাহারাদার না হয়

নীতির পাহারায় চলা বা নীতির পাহারাদার হওয়া রাজনীতিবিদের কাজ না। নীতিবান হওয়াকে বলা যেতে পারে সততা। নীতি অনমনীয় জিনিস, ফলে সততাও। অনমনীয় বলেই রক্ষণশীল; নীতিবান, এক কথার মানুষ আপনার পছন্দ হতে পারে, কিন্তু এমন কেউ যখন সমাজের নেতা হয়, সমাজ তখন থেমে যায়। কিছু উদাহরণ দিয়া বলি বরং।

গণতন্ত্রের কিছু ধরন সেই গ্রীক ‘সিটি স্টেট’ থেকেই চালু আছে; আধুনিক গণতন্ত্রের বয়সও কয়েক’শ বছর। কিন্তু নারীরা ভোট দিতে পারেন এই সেদিন থেকে। ১৯০০ সালের আশপাশের ঘটনা সেইটা। ইউরোপে প্রথম ১৯১৩ সালে নারীর পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকার দেয়; ফ্রান্সে ১৯৪৪ সালে, সর্বশেষ সুইজারল্যান্ড ১৯৭১ সালে। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গরা (পুরুষ) পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকার পায় ১৮৭০ সালে। বিষয়টা এমন না যে সমাজে প্রচলিত ‘নৈতিকতা’ কৃষ্ণাঙ্গ বা নারীর ভোটাধিকার অনুমোদন করতো সবসময়; কোন একদিন, সৎ, নীতিবান রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় এসে তার পক্ষে আইন করলেন। বিষয়টা এমনকি আরো দূরবর্তী: কৃষ্ণাঙ্গ ও নারীকে পর্যাপ্ত মানুষ-ই ভাবতে পারে নাই সমাজ। বড়ো কোন ধর্মও (ছোট-বড়ো, সবগুলির কথা জানি না) নারীকে ‘পূর্ণ মানুষ’ হিসাবে অনুমোদন দেয় নাই।

-------------------------

এইটা একটা ভোটের হিসাব; কৃষ্ণাঙ্গ/নারীকে ভোটাধিকার দিলে কী পরিমাণ ভোট বাড়বে নতুন করে, আর আগের ভোটারদের কী পরিমাণ ভোট যাবে—দুইটার যোগ-বিয়োগ মাত্র। যেই রাজনৈতিক দল অনুমোদন দিলো, এমনকি সেটাও আসলে ভাবতে থাকতে পারে যে, নারী বা কৃষ্ণাঙ্গ ‘পূর্ণ মানুষ’ না। ‘মনে এক, মুখে আরেক’—হইতে পারে। এইটা বরং ‘হিপোক্রিসি’ বা ‘অসততা’ বলা হবে নৈতিকভাবে। রাজনীতিতে ‘অসততা’-ই সমাজকে আগাইয়া দেয়।

সমাজে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাকে অ্যাকোমোডেট করতে হয় রাষ্ট্র বা রাজনীতির। একই লিঙ্গের মানুষদের বিয়ে (সমকামী) যেমন। বিশ্বে দুয়েকটা রাষ্ট্র সমকামী বিয়ে অনুমোদন দিয়েছে। বারাক ওবামা সমকামী বিয়ের পক্ষে বলেছেন দুয়েকবার। আমাদের দেশে এই আলাপ/দাবি এখনো ওঠে নাই। বারাক ওবামার দল একে অনুমোদন দেবার জন্য কোন ‘বিল’ আনে নাই। পুরনো নৈতিকতা বা ধর্ম সমকামী বিয়ে অনুমোদন করে না। এই নৈতিকতা বা ধর্মের বিপরীতে আছে ‘নাগরিক অধিকার’-এর যুক্তি। ‘নাগরিক অধিকার’-এর যুক্তি ক্রমে শক্তিশালী হবে, আরো আরো দেশে সমকামী বিয়ে অনুমোদন পাবে; কিন্তু ঐ নৈতিকতা অনুমোদন দেবে কি কখনো?

কিন্তু, ‘নাগরিক অধিকার’ কি অনৈতিক? এখানে আরেকটা সমস্যা দেখা দেবে। কোন একটা সময়ে সমাজে প্রচলিত ‘নৈতিকতা’ অনেকগুলি। তাদের একটা হয়তো ‘নাগরিক অধিকার’-কে নৈতিক অনুমোদন দেয়, কোনটা দিলো না। রাজনীতিবিদ যদি কোন একটা ‘নৈতিকতা’র আনুগত্য মেনে রাজনীতি করেন তবে অন্য ‘নৈতিকতা’ মানা মানুষজনের কী অবস্থা হবে? নীতিবান রাজনীতিবিদদের সেরা উদাহরণ একজন হলেন অ্যাডলফ হিটলার। তিনি জার্মান বিশুদ্ধতার বিষয়ে খুবই এক কথার মানুষ ছিলেন। জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠতা বিষয়ে তাঁর কোন সন্দেহ ছিলো না কখনো। পৃথিবীকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব জার্মান জাতির—এমনই মহৎ উদ্দেশ্য তাঁর ছিলো। কিন্তু এই ‘সততা’ কী দিলো পৃথিবীকে? পৃথিবীর প্লেগ বা একটা বড়ো রোগ হিসাবে ইহুদীদের দেখলো এই নৈতিকতা; ফলে গণহত্যা করলো। শিক্ষক হবার জন্য অন্য রাষ্ট্রকে আক্রমণ করলো। জার্মানিতে ভিন্ন নৈতিকতা নিষিদ্ধ করলো।

কোন এক নৈতিকতা অন্য নৈতিকতাকে পারমিট করে না; কিন্তু, রাষ্ট্র বা রাজনীতি ধরে নিতে পারে না যে, নৈতিকতা একটাই বা অন্য নৈতিকতা উৎখাত করা দরকার। বহু নৈতিকতাকে স্পেস দিতে হয় রাজনীতির, রাজনীতিবিদের।

কনসেপ্ট হিসাবে ‘আইন’কে বলা যেতে পারে বিরুদ্ধ নৈতিকতাগুলির একটা চুক্তি হিসাবে। ফলে নৈতিকতা আর আইন দুই জিনিস। গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতির কাজ হলো নৈতিকতাগুলির শালিসি করা, নিজেই কোন এক ‘নৈতিকতা’ হয়ে পড়া নয়।

আরো পরিচিত কিছু উদাহরণ দিয়েও বলা যেতে পারে। ফয়েজ আহমেদের মৃত্যুর কিছুদিন আগে ওনার সাথে আমার বেশ কতটা সময় কেটেছে। তিনি একবার বলছিলেন ১৯৫০-৬০ সালের পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকারের এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে পরে দুর্নীতির মামলা হয়; নিম্ন আদালতে তাঁর সাজাও হয়েছিলো; পরে আপীলে নির্দোষ প্রমাণিত হন।

ফয়েজ আহমেদ আমারে কইছেন, দুর্নীতি যাকে বলা হয়—১৯৫৪ সালের আওয়ামী লীগের শিল্পমন্ত্রী তা করেছিলেন ঠিকই;  সেই মন্ত্রী তাঁর দলের বিরাট সংখ্যক সদস্যকে লাইসেন্স দেন; লাইসেন্সগুলি ছিলো পাটকল বা অন্যান্য শিল্প-কারখানায় সাপ্লায়ার হিসাবে; এর আগে প্রায় সকল সাপ্লায়ার ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের। নতুন লাইসেন্স পাওয়া সবাই ছিলো পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালি।

আমার বিশ্লেষণে, এই ঘটনার (দুর্নীতি) বিরাট অবদান আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টিতে। পরের দশ/পনের বছর আওয়ামী লীগের রাজনীতি’র আর্থিক ভিত্তি তৈরি করে দেয় এই দুর্নীতি। আওয়ামী লীগের প্রতি দলীয় আনুগত্য নিশ্চিত করে এই দুর্নীতি; সারা পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপক সংখ্যক বাঙালি আইউব খানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গ  ছাড়েন নাই, মুসলীম লীগে যোগ দেয় নাই বা ফেরত যায় নাই। ভাসানী জীবিত থাকতেই বাঙালির প্রধান নেতা হিসাবে আওয়ামী লীগ সভাপতির উত্থানেও সম্ভবতঃ এই দুর্নীতির বিরাট অবদান আছে। ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারে ভাসানী যোগ দিয়া এমন কোন দুর্নীতি করলে আমরা কতক ভিন্নভাবে বাংলাদেশ পাইতে পারতাম।

মওলানা ভাসানীর ‘রাজনৈতিক বোকামী’র বিপরীতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীর ঐ দুর্নীতিকে দেখতে হবে, ইংরেজি টার্মে বলতে ভালো লাগে এইটা—‘পলিটিক্যাল উইজডম’। রাজনীতিবিদের দায়িত্ব আছে তাঁর দলের লোকজনের আর্থিক সুবিধা-অসুবিধা দেখা। বিএনপিও যে এরশাদের বিরুদ্ধে দশ বছর আন্দোলন করে টিকে থাকলো, তার পিছনেও আছে জিয়াউর রহমানের দলে যোগ দিয়ে আর্থিক-সামাজিকভাবে ভালো থাকতে পারা। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি’র মধ্যে এই রকম ঘটনা আছে বলে দল দুটি প্রত্যাখ্যান করতে হবে, তা নয়। বরং এর বাইরে যারা রাজনীতি করার স্বপ্ন দ্যাখেন তাঁরা ‘রাজনৈতিক বোকা’। এরা ঝুঁকিপূর্ণও খুব। এরা ক্ষমতা পেলে ভিন্ন নৈতিকতা প্রাকটিস করা লোকদের উৎখাত/খুন করে। পৃথিবীতে এমন কোন স্বৈরাচারী শাসক আসে নাই যিনি দুর্নীতি উচ্ছেদের কথা বলেন নাই। ফলে ‘দুর্নীতি’র অভিযোগে যাঁরা বিএনপি-আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরুদ্ধে রাজনীতি দাঁড় করাতে চান তাদের সন্দেহ করতে হবে। তাঁরা বরং বিএনপি-আওয়ামী লীগের শাসনের সময়ে যারা বেশি সুবিধায় থাকেন, আইনের বাইরে ক্ষমতা ভোগ করেন তাদেরকে দেখতে দিতে চান না। জনগণের উপরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর অত্যাচার দ্যাখেন না এরা, সংখ্যালঘুর সম্পত্তি দখল দ্যাখেন না; পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী দ্যাখেন না; বরং এইগুলি আরো বাড়াইতে চান এরা; যখন বাড়ে তখন সমর্থন দেন। ২০০৭ সালে বিএনপি-আওয়ামী লীগের উপর বিরাট সংখ্যক মানুষকে বিরক্ত করতে পেরেছিলেন বলেই দুই বছরের ছদ্মশাসন এবং জরুরী অবস্থা বা অনানুষ্ঠানিক জরুরী অবস্থা টিকে ছিলো।

বিএনপি-আওয়ামী লীগের মারামারির কথাও আছে এই আলোচনায়; যেমনটা বলে থাকে ‘সুজন’ তথা ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’। ‘সুজন’ দুর্নীতি ও দুই দলের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির সমালোচনা করেন। সুশীল সমাজও গত জরুরী অবস্থার দায় দিয়ে থাকেন বিএনপি-আওয়ামী লীগকে। মনে করাইয়া দেয়া যেতে পারে মঈন ইউ আহমেদের স্বীকারোক্তি; মঈন ইউ আহমেদের নিজের স্মৃতিকথায় জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারির ফোনের কথা বলেছেন; জানিয়েছেন যে, সেই ফোনের পরেই নৌ ও বিমান বাহিনীর সাথে আলাপ করেন; তারপর অ্যাকশনে যান। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘাত, দেশ, জনগণ, রাষ্ট্র—এগুলি কিছুই নয়, তাদের চালিত করেছিলো আন্ডার সেক্রেটারির ফোন।

১৭ জানুয়ারি ২০১৩

পাবলিশড:: অষ্টপ্রহর, দৈনিক বণিকবার্তা, ১৯ জানুয়ারি ২০১৩।