রক মনু

হাসিনা-খালেদার উপর ভরসা রাখছে সম্মিলিত পশ্চিম

সার্বভৌমত্বের পুরানা ধারনায় মনে হতে পারে যে বান কি মুনের ফোন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর হুমকি। কিন্তু যেকোন একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হবার অর্থই হলো—সেই সংস্থা সদস্য দেশের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলবে, ভূমিকা রাখবে, পরামর্শ দেবে। ওআইসি বা জাতিসংঘ বা সার্ক হাসিনা-খালেদার মধ্যস্ততা করতেই পারে, তাতে সমস্যার কিছু নাই। বান কি মুনের ফোনের গুরুত্ব সম্ভবত ভিন্ন জায়গায়। 

-------------------------

বাংলাদেশ নিশ্চয়ই অবাক করে পশ্চিমা বিশ্বকে; আদমশুমারি অনুযায়ী প্রায় ৮৫% মুসলমান, কিন্তু এই দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নারী। ইসলাম সম্পর্কে পশ্চিমের অনেকগুলি অনুমানের একটা হলো—পাবলিক স্পেসে নারীর জায়গা নাই ইসলামে; রাজনৈতিক নেতা হিসাবে নারীকে নিতে পারে না মুসলিমরা; আমেরিকায় এখনো কোন নারী প্রেসিডেন্ট হতে না পারলেও খ্রিস্টান অধ্যুষিত যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তেমন কোন অনুমান আমরা পাচ্ছি না। অবশ্য মুসলমান অধ্যুষিত খুব বেশি দেশে নারী নেতৃত্বের উদাহরণও পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে, ৮৫% মুসলমানের দেশে হাসিনা-খালেদার নেতৃত্বের ব্যাখ্যা কি? এ ব্যাপারে পশ্চিমের ব্যাখ্যা জানার উপায় বিশেষ নাই। কিন্তু অনুমান করি, হাসিনা-খালেদার জন্য বাংলাদেশের মুসলমানরা পশ্চিমের ‘গুডবুক’-এ থাকতে পারছে। এ ব্যাপারে দুই নেত্রীও পর্যাপ্ত আস্থার পরিচয় দিয়েছেন বলতে হবে। ডানপন্থী ট্যাগ নিয়েও খালেদা জিয়া বাংলা ভাই ও জেএমবি দমন করে দরকারি প্রমাণ দাখিল করতে পেরেছিলেন। ২০০৭/৮ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা-হাসিনা টিকে যাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে এ বিষয়টা; ৯/১১ পরবর্তী পশ্চিমের কাছে মুসলিমপ্রধান দেশগুলিতে দুর্নীতি জাতীয় ইস্যুগুলি গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে ইসলামপন্থীরা; দুর্নীতি এমনকি ইসলামপন্থী ঠেকাবার কাজে ভালো ভূমিকাও রাখছে বলে অনুমান তৈরি হতে পারে পশ্চিমে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে বাড়তি টাকা-পয়সা ইসলামপন্থা বেড়ে ওঠা ঠেকাতে কাজে দিতে পারে তো বটেই।

বিশ্বময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ইসরায়েলের প্রতি পশ্চিমের পক্ষপাত এবং ইসলামের উপর পশ্চিমা আক্রমণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলামপন্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলছে। ‘গুড মুসলিম’-এর বাংলাদেশেও সম্প্রতি ইসলামপন্থা ডেভেলপ করার সম্ভাবনা দেখা গেছে; সরকারের বাড়াবাড়ির বিশেষ ভূমিকা থাকলেও এই ঘটনায় বিএনপি সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। রাজনৈতিক মিত্র বা ভোটের কারণে ইসলামপন্থীদের ডাকে বিএনপিকে সাঁড়া দিতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক বক্তব্যে তারেক রহমান ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইস্যু জায়গা দখল করেছে।

বাংলাদেশে ইসলামপন্থার ইদানিংকার এই ডেভেলপমেন্টের জন্য খালেদা-হাসিনার অগণতান্ত্রিক ঝগড়াঝাটিকে দায়ী করতে পারে পশ্চিমা বিশ্ব। শেখ হাসিনার উপর কথিত ইসলামিস্টদের আক্রমণের অভিযোগকে পাত্তা দেয় নাই বিএনপি; আবার, প্রধান বিরোধী দল হিসাবে সংসদে ও বাইরে বিএনপির সাথে দুর্ব্যবহার করতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগকে; এভাবে ইসলামিস্টদের দিকে বিএনপিকে ঠেলে দিয়েছে হাসিনার আওয়ামী লীগ।

কিন্তু, এই পরিস্থিতিতে হাসিনাকে চাপ দিতে পশ্চিমা বিশ্বের হাতে খুব বেশি অপসন নাই। পদ্মাসেতু এবং ইউনূস ইস্যুতে হাসিনা বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রকে অমান্য করতে সাহস দেখিয়েছেন; সেজন্য অবশ্য হাসিনাকে নিয়মিত ভারতের আস্থা কিনতে হয়েছে। বা এন্টি-ইসলামিস্ট হিসেবে পশ্চিমা বিশ্ব এবং ভারতের কাছে নিজের গুরুত্ব হাসিনার বুঝতে পারারই কথা। পশ্চিমের কাছে শেষ অস্ত্র হলো সেনাবাহিনীকে মুভ করানো। কিন্তু ২০০৭/৮-এর সেনা-সার্জারি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য বিশেষ কিছু করতে পারে নাই; বরং উপজেলা চেয়ারম্যান জাতীয় কতগুলি সমস্যা রেখে গেছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক কালে পাওয়া কিছু শিক্ষার কারণে দীর্ঘমেয়াদে সেনাশাসনের দিকে বাংলাদেশকে যেতেও দিতে পারছে না পশ্চিম।

পশ্চিমের এই শিক্ষাটা ঘটেছে পাকিস্তানে; পারভেজ মোশাররফ যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ছিলেন; এই তথ্য সবাই জানেন। কিন্তু দুয়েকটা প্রশ্ন নিয়ে ভাবা যাক:  পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলে নেবার মাধ্যমেই কি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব অর্জন করেন পারভেজ মোশাররফ? নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বই পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করতে সাহায্য করে তাঁকে? পরিষ্কার জবাব দেবার উপায় নাই আসলে; কিছু জিনিস মিলিয়ে দেখা যায় বটে।

নওয়াজ শরীফের পাকিস্তান ১৯৯৭ সালের মে মাসে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়; ১৯৯৮ সালের মে মাসে নওয়াজ শরীফ সংবিধান সংশোধন করে পাকিস্তানে শরীয়া আইন চালু করেন; কিন্তু শরীয়া আইন কার্যকর হবার আগে আগে, ১৯৯৯ সালে পারভেজ মোশাররফ নওয়াজকে উৎখাত করেন। তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো মাত্র তিনটি দেশ; তার মধ্যেও পাকিস্তান প্রথম; এই পাকিস্তানই তালেবান আফগানিস্তানে ইঙ্গ-মার্কিন আক্রমণে প্রধান সহযোগী। পাকিস্তানের ভূমি, বিমানবন্দর ব্যবহার করছে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী; আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত আছে এমন দেশের সহযোগিতা ছাড়া এই আক্রমণ খুবই কঠিন হতো; ব্যয়ও বাড়তো বিপুল। পাকিস্তানে বন্ধু সরকার থাকাটা এই আক্রমণের প্রায় পূর্বশর্ত বলা যায়। ফলে, সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফের সাথে বন্ধুত্ব করা যুক্তরাষ্ট্রের খুবই দরকারি; কেননা, এই বন্ধুত্বের নগদ ফল হলো নওয়াজকে উৎখাত করা। আবার, নওয়াজের শরীয়া আইন প্রবর্তনও যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ হবার কারণ নাই; পারভেজ মোশাররফ সেটাও ঠেকিয়ে দিলো।

কিন্তু পারভেজ মোশাররফ কি সন্তোষজনক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য? মোশাররফ শাসনের সময়ের পাকিস্তান নিয়ে ভাবলে এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবেই ‘না’। তো, ভাবা যাক।

মোশাররফ শাসনের সময় পাকিস্তানে তালেবান শক্তি অর্জন করতে থাকে; এখনকার পাকিস্তানের বিরাট এলাকা বাস্তবে তালেবান নিয়ন্ত্রণে আছে। পাকিস্তানে আসলে দ্বৈত শাসন চলছে। মোশাররফের তালেবানবিরোধী শক্ত অবস্থান থাকার পরেও তালেবান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছিলো! লাদেন-এর নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে পাকিস্তান, ক্যান্টনমেন্টের কাছেই; পারমাণবিক বোমার কতটা দূরে ছিলেন লাদেন? তালেবানদের হাতে পরমাণু অস্ত্র যাওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তিত না হবার উপায় নাই। আইএসআই লাদেন বা তালেবানদের সাথে সম্পর্ক রাখছে—এমন সন্দেহ বরাবর আছে যুক্তরাষ্ট্রের। পাকিস্তানের জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যে একমাত্র সেক্যুলার দল পিপিপি’র প্রধান বেনজির ভুট্টো খুন হয়েছেন মোশাররফ শাসনামলে। মোশাররফ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন নাই আসলে।

শাসকের শতভাগ আনুগত্য থাকবার পরেও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শক্তি পাকিস্তানে আরো বিস্তৃত হতে পারলো; খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এটি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক শিক্ষার একটি মূল্যবান ক্ষেত্র পারভেজ মোশাররফ। এই শিক্ষার গোড়ার কথা অনুমান করি, জনগণের মাঝে শাসকের সম্পর্ক বহুবিস্তৃত না থাকলে সেই শাসকের সাথে সুসম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ লাভজনক হচ্ছে না।

এখনকার পাকিস্তান নিয়া ভাবি এবার; এই প্রথম একটা নির্বাচিত সরকার পুরো মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলো; একটা নির্বাচন হলো; এবারে ক্ষমতার হাতবদল হলো গণতান্ত্রিকভাবে। এই ঘটনায় পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলি প্রশংসা পাচ্ছে। বাংলাদেশের সুশীল সমাজও এই প্রশংসাকারীদের দলে আছে; বিশেষ করে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টি প্রশংসা পাচ্ছে। পাকিস্তানে ক্ষমতার সবগুলি পক্ষ এখন খুবই গণতান্ত্রিক হইয়া উঠলো! এইটা হঠাৎ ঘটনা, ঐতিহাসিক বিস্ময়।

বেসামরিক নওয়াজকে ক্ষমতার ভাগ দিতে হওয়াটা নিশ্চয়ই সামরিক বাহিনীর জন্য আরামের কথা নয়; অথচ সামরিক কর্তৃপক্ষকে বেশ গণতন্ত্রপন্থী দেখা যাচ্ছে; এদিকে, সেনাবাহিনী বা পারভেজ মোশাররফ যতোটা মার্কিন নিয়ন্ত্রণে, ততটা অনুগত নওয়াজ হবেন না; কিন্তু পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায় দেখতে চাইছেন ওবামা, তেমন কোন আলামত পাওয়া যাচ্ছে না। ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি বুঝবার জন্য এগুলি ভাবতে হবে।

পারভেজ মোশাররফ কেস থেকে যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে এডুকেটেড হয়েছে; পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছেও এই এডুকেশন ডিনাই করবার মতো পোক্ত যুক্তি নাই। এই এডুকেশন মতে সামরিক শাসন আবশ্যিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসকই যুক্তরাষ্ট্রের ভালো বন্ধু; ফলে ভারতেরও। হাসিনা-খালেদাকে বান কি মুনের ফোনের বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাইবো এসব কারণেই। বিশ্ব ইতিহাসের যেসব ঘটনা থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ শিক্ষা লাভ করেছে তার অনেকগুলি দেখলেও শিখতে পারেন নাই হাসিনা-খালেদা। প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে হাসিনা-খালেদার উপস্থিতি কী অর্থ বহন করে তা পশ্চিমা বিশ্ব ঐতিহাসিক শিক্ষার কারণে সহজে বুঝতে পারেন, হাসিনা-খালেদা অতোটা বোঝার কথা নয়। সম্মিলিত পশ্চিমের ভাবনা জানাবার জন্য বান কি মুনই ভালো অপসন; ড্যান মজিনার মাধ্যমে বললে সেটা ইউনূস বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিতে পারেন শেখ হাসিনা।

বান কি মুনের ফোন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা যেভাবে কাটাতে পারে তার একটা মডেল ভাবা যেতে পারে: হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে; ৩০০০ সদস্যের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল (প্রতি আসনে ১০ জন) পাঠাবে জাতিসংঘ; নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে এবং পর্যবেক্ষক দলের রিপোর্টে নির্বাচনে কারচুপির কথা বলা হলে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের খালেদা সরকারের মতো সরকার গঠন করে নির্দলীয় সরকারের বিল পাশ করেই পদত্যাগ করবে। এমন প্রস্তাব খালেদার মানতে সমস্যা হবার কথা নয়; ওদিকে নির্বাচনে না জিতলেও হাসিনার আওয়ামী লীগ সসম্মানেই পরাজিত হতে পারবে।

২৯ অগাস্ট ২০১৩

:: হাসিনা খালেদার উপর ভরসা রাখছে সম্মিলিত পশ্চিম, ৩১ আগস্ট ২০১৩, অষ্টপ্রহর, বণিকবার্তা।