ততোটা সরকার ফ্রেন্ডলি হয়নি নীতিমালা

হাসিনা সরকার যে বেশ লাজুক সেই সন্দেহ গোড়া থেকেই ছিলো আমার; অগাস্টের শুরুতে ‘সম্প্রচার নীতিমালা’ পেশ করার মাধ্যমে সন্দেহটা পোক্ত বিশ্বাসে পরিণত হলো। লাজুক বলেই বেশ কিছু জিনিস একদমই ঝাপসা থেকে গেলো নীতিমালায়। এমনকি, নীতিমালাটি করতেই হলো সরকারের ওই লাজুকতার কারণে। 

-------------------------

বিভিন্ন মিডিয়া বন্ধ করে দিতে নীতিমালা লাগে নাই কোন, মানবাধিকার অ্যাডভোকেট বা সাংবাদিকদের বন্দি করতে কোন কমিশনের সুপারিশ দরকার হয় নাই; এগুলি করবার পরেও ৫ বছর গদিতে থাকতে পারলো সরকার, পরেরবার আবার সরকারও গঠন করলো; আমরা শুনতে পাই—একটা জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমেই এই সরকার নির্বাচিত হয়েছে। ফলে, মিডিয়ায় কী হবে না হবে–তা তো এমনিতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সরকার, অবাধ্য হলে বন্ধও করে দিতে পারে। তবু, একটি নীতিমালা এবং কমিশন বানাতে চাইলো সরকার! বিনয়ী সরকারের লাজুকতা এটি; ইচ্ছাপূরণের কোন বাধাই নেই, তবু নীতিমালার শাসনে আটক হলো সরকার; কী আশ্চর্য! সাধ-আহ্লাদ অবশ্য থাকতেই পারে।

লাজুকতার বাইরে একটা যুক্তি অবশ্য পাওয়া যেতে পারে; সরকারের নতুন কিছু আত্মীয়-স্বজন হয়েছে; তাদের জন্য উপযুক্ত সরকারি পদ পাওয়া যাচ্ছে না; একটা নীতিমালা আর কমিশন করা গেলে এই আত্মীয়-স্বজনদের ভালো কিছু চাকরি হয়। আত্মীয়-স্বজনদের হক আদায় করা খুবই সওয়াবের কাজ বটে।

যা হোক, সরকারের লাজুকতার বেশ কিছু পরিচয় পাওয়া যায় নীতিমালায়:

ক. জাতির জনকের পরিবারের মাত্র একজনেরই জন্মদিন পালন করতে বলা হয়েছে এখানে; অন্য সদস্যদেরও যথাযথ জন্মদিন থাকলেও সেগুলি পালনের কোন হুকুম, এমনকি আলগা তাগিদও দেওয়া হয়নি। (৩.৩.২)

খ. শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের বেলায় ঘুমিয়ে পড়তে নিষেধ করা হয়েছে, মানে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে; তবে শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ কাকে বলা হচ্ছে তা ঝাপসা রাখা হচ্ছে; হতে পারে, জাতির জনকের বাংলা উচ্চারণকে রেফার করা হচ্ছে; জাতির জনকের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাণ্ডুলিপি এডিট করে ভাষাভঙ্গি পাল্টে দেয়া হয়েছে। তবে কি সরকারপ্রধানের উচ্চারণটাই শুদ্ধ, নাকি বাংলা একাডেমী সেটি ঠিক করে দেবে? বাংলা ডিকশনারিতে কি গানের মতো করে স্বরলিপি জুড়ে দেয়া হবে? শুদ্ধ উচ্চারণের কোন অডিও প্রকাশ করা হবে কি? আপনারা জানেন, অডিও স্পিকারের ব্রান্ড বা বেস-লেভেল অনুযায়ী উচ্চারণ কিভাবে পাল্টে যেতে পারে। কি ধরনের টেকনিক্যাল সিস্টেমে সেই অডিও শুনলে শুদ্ধ উচ্চারণটি বোঝা যাবে? এগুলি কিছুই স্পষ্ট করা হয়নি। তাহলে এই নীতিমালা মানা যাবে কিভাবে? কেউ যদি দাবি করে, ড্যান মজিনার বাংলা উচ্চারণই শুদ্ধ, তাকে ভুল প্রমাণ করা যাবে কিভাবে? (৩.৪.৪)

গ. জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভয়াবহতা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। ভয়াবহতা যে কী তা বলা হয়নি একেবারেই! তাহলে ভয়াবহতা দেখাবে/বোঝাবে কী করে? গরিবের বেশি বাচ্চা হলে তাঁরা মাদ্রাসার এতিমখানায় যায়; সেখানে ইসলামিস্ট পয়দা হতে থাকে; ভয়াবহতা বলতে এ রকম কিছু বোঝালো সরকার? লাজুক বলেই কি স্পষ্ট করে বললো না সেটি? (৩.৫.৫)

ঘ. নৈতিকতা উন্নয়ন এবং সমাজবিরোধী কাজে বিরত রাখায় উৎসাহ দিতে বলা হয়েছে; এই নীতিমালাসহ সরকারের বিভিন্ন গণমুখী কাজের সমালোচনা নিশ্চয়ই নৈতিকতা বিরোধী তৎপরতা; বা গার্মেন্টস শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন চাওয়া বা মিছিল করা বা অনশন করা নিশ্চয়ই সমাজবিরোধী কাজ; কেননা, এতে সমাজে/রাষ্ট্রে অযথা উত্তেজনা তৈরি হয়, বিদেশি কোম্পানিরা বাংলাদেশের পণ্য বয়কট করতে পারে। এগুলি স্পষ্ট করে না বললে, লজ্জায় ইঙ্গিতমূলক নির্দেশ দিলে মিডিয়া বুঝবে কী করে? কতিপয় বেয়াদপ মিডিয়া যদি এসব ঝাপসাভাবের ফাকফোকড় দিয়ে গার্মেন্টস-এ যদি স্যাবোটাজ করে ফেলে খবর লাইভ প্রচার করে? (৩.৫.৭)

ঙ. বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে তেমন কিছু প্রচারে বিরত থাকতে বলা হয়েছে; কিন্তু বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের নাম বলা হয় নাই। ফলে কেউ যদি ভাবে ওই রাষ্ট্র আসলে পাকিস্তান; একাত্তরের বিরোধ ১৯৭৪ সালেই মিটিয়ে ফেলেছেন জাতির জনক—ভুট্টোর বাংলাদেশ সফরের সময় বা ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিয়ে; শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র আসলে ভারত; কেননা, বিএসএফ বাংলাদেমি খুন করে, ফেলানির লাশ কাঁটাতারে ঝুলাইয়া রাখে, নদীর পানি দেয় না বা নূর হোসেনরে দেয় না। শত্রুভাবাপন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে যেহেতু কিছুই বলা নেই তাই কোন এক মিডিয়া ট্রানজিট নেওয়া ভারতীয় ট্রাকে হামলায় উস্কানি দিলে কী বলবে সরকার? সরকার কিভাবে প্রমাণ করবে বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বলতে ভারতকেই বুঝানো হয়েছিলো? ফলে, লজ্জার মাথা খেয়ে বন্ধু রাষ্ট্রের নাম বলে ফেলা ভালো। (৫.১.৭)

চ. নীতিমালা লংঘনের বেলায় গঠিত কমিশনের সুপারিশ পেলে শাস্তির ব্যবস্থা করবে সরকার—এমনটাই বলা আছে। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং লংঘনের শাস্তি বিধানে দেশের আদালতের কোন ভূমিকা যে থাকছে না সেটি খুবই বুদ্ধি খাটাইয়া বুঝতে হচ্ছে আমাদের। শাস্তি দেবার বেলায় সরকারকে আদালতে যেতে হবে না একেবারে, এমনি এমনিই শাস্তি দিতে পারে সরকার—এটিও স্পষ্ট করা হয় নাই। একই সাথে সরকার কী কী শাস্তি দিতে পারে সেটিও বলা হয় নাই; কারাদণ্ড তো সরকার ঘোষণা করতে পারে না, তাহলে? হতে পারে গুম করে ফেলা, জেলখানায় না নিয়ে থানায় বন্দি করে রাখা এবং স্বীকার না করা—বলেনি সরকার এই নীতিমালায়। এদিকে, শাস্তি যদি সরকারই দিতে পারে তাহলে আদালতের কাজটি যে কী দেশে সেই প্রশ্নও তৈরি হচ্ছে এই নীতিমালার মাধ্যমে। (৬.২.৩)

লাজুকতার কারণেই নিশ্চয়ই গুম বা ক্রসফায়ার যে সরকারি শাস্তির একটি ফর্ম, গণস্বার্থে আইন যে সরকারের হাতে তুলে নিতে হচ্ছে, সেটি আর বলছে না সরকার। বা এগুলি সরকারি শাস্তির একেকটা ফর্ম না হলে সরকার কিভাবে শাস্তি দিতে পারে সেটি তো পরিষ্কার থাকতে হবে নীতিমালায়!

এদিকে, তবুও একটা সংবিধান থেকে যাচ্ছে দেশে! সেইখানে যেহেতু বিচারের দায়িত্ব আদালতকে দেওয়া হয়েছে, সরকারও যেখানে আসামী হতে পারে, সেই সংবিধান তো পড়ে ফেলতে পারে কেউ কেউ! এদের কেউ আবার সরকারের আইন হাতে তুলে নেওয়াটাকে চ্যালেঞ্জ করে ফেলতে পারে, বিএনপি’র সময়কালে নিয়োগ পাওয়া কোন জজও থাকতে পারেন আদালতে; তিনি সরকারের শুভ উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করে ফেলতে পারেন। এগুলি একদমই দুর্ঘটনা; তবু ঘটতে তো পারেই; লজ্জা পরিহার করার মাধ্যমে সরকার যদি স্পষ্ট করে বলে দিতো বিষয়গুলি, তাহলে দুষ্ট লোকেরা একদমই সাহস পেতো না।

২১ জুলাই ২০১৪

নোটিশ:: কতগুলি এডিটের পরে ‘ততটা সরকারবান্ধব হয়নি’ নামে এইটা বণিকবার্তা ছাপলো ২৫ জুলাই ২০১৪ তারিখে।