অমিয় ঘোষের মুক্তি একটা খুশির ঘটনা

জনাবা ফেলানি বেগম খুনে অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দিছে বিএসএফ-এর নিজস্ব আদালত। ঐ আদালত এবং ঐ অমিয় ঘোষকে অভিনন্দন জানাই আমি; একটা কারণ– নির্দোষের খালাস, আর এক কারণ– স্টেট ইন্ডিয়াকে বাংলাদেশের শত্রু হিসাবে চিনাইয়া দিচ্ছে ইন্ডিয়ারই এক আদালত। এই রকম একটা খুশির ঘটনা বোঝা দরকার।

একরামুল হক শামীমকে ধন্যবাদ দিয়া শুরু করতে হচ্ছে আমার। শামীম তাঁর ফেসবুক নোটে (https://www.facebook.com/notes/akramul-hoque-samim/10153284820205657) এই বিচার ও রায় নিয়া আলোচনা করছেন। মেক্সিকো-ইউএসএ সীমান্ত এবং ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ সীমান্তে খুনের বিচারের তুলনা দেখাইছেন উনি, বিএসএফ যেই আইনের অধীনে কাজ করে–সেই আইনের দুয়েকটা ধারাও লিখে দিছেন নোটে। এমন তথ্যাদি অন্য অন্য মিডিয়া রিপোর্টে দেখি নাই; বেশ কামের তথ্য দিছেন শামীম।

-------------------------

অমিয় ঘোষের খালাসে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ক্ষুব্ধ; দেশের মিডিয়া এবং ফেসবুকে অনেক ক্ষোভ পাইলাম; এই খালাস শামীমও মানতে পারেন নাই; তিনি ইন্ডিয়ার আদালতে আপীলের আইনী সুযোগ দেখাইছেন; কয়েক শো লোক লাইক আর শেয়ারিং-এর মাধ্যমে শামীমের পাছ লইছেন।

শামীমসহ বাংলাদেশের মিডিয়া ও নাগরিক সমাজে অমিয় ঘোষের খালাসে ক্ষোভ এবং ফেলানীর প্রতি দরদ সহজেই বুঝতে পারলাম; কিন্তু এই রায়ের অর্থ করায় কেন যে সবাই খুবই ভুল জায়গায় থাকছেন–সেইটা বুঝি নাই একদম।

জেলখানায় মৃত্যুদণ্ড যিনি কার্যকর করছেন বা ফাঁসি দিচ্ছেন তিনি অবশ্যই হত্যা করছেন, কিন্তু তিনি খুনি নন, ওই হত্যাও তাঁর ক্রাইম হয় না। সেক্ষেত্রে খুনি আসলে স্টেট। স্টেটের কাছ থেকে হত্যার দায়িত্ব যিনি নিছেন হত্যা না করাই বরং তাঁর ক্রাইম। অমিয় ঘোষ স্টেট ইন্ডিয়ার হত্যার দায়িত্ব নিছেন; জনাবা ফেলানি খাতুনকে গুলি না করলেই বরং অমিয় ঘোষ দোষী সাব্যস্ত হইতেন।

অমিয় ঘোষের বেকসুর খালাসের মধ্য দিয়া আমরা আসল খুনিরে চিনলাম; সীমান্তে হত্যা, ধর্ষণ, হাত-পা ভাঙ্গা–এসব বিএসএফ-এর দায়িত্ব পালন মাত্র। এ ধরনের ইস্যুতে বিভিন্ন সময় আমরা বিএসএফ সদস্য ক্লোজ, প্রত্যাহার, ভৎর্সনা ইত্যাদি দেখছিলাম; যেনবা, এগুলি দুষ্ট কোন বিএসএফ সদস্যের আকাম মাত্র; ইন্ডিয়ার ঐ আদালতের রায়ে প্রমাণিত হইলো যে, এগুলি কেবল স্টেট-পারমিটেডই নয়, স্টেট অর্ডার। স্টেট ইন্ডিয়া খুন করে, বিএসএফ-এর কোন সদস্য নয়।

মেক্সিকো-ইউএসএ সীমান্তের একটা ঘটনা এবং তার বিচার বিষয়ে বলছিলেন শামীম:

“মেক্সিকোর একটি দরিদ্র পরিবারের দুই সন্তান রাতের আঁধারে রিওগ্রানদে নদী সাঁতরে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষীর গুলিতে নিহত হয়। তারা এমন এক স্থানে গুলিবিদ্ধ হয় যেখানে মেক্সিকো ওযুক্তরাষ্ট্রের আইনে নদী পারাপার নিষিদ্ধ ছিল। সীমান্তরক্ষী অফিসার চোরাচালানের উপর নজর রাখার জন্যই বিশেষভাবে নিযুক্ত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কোর্ট অব মার্শাল সীমান্তরক্ষী অফিসারকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং অফিসারকে চাকরি থেকে অব্যাহতির আদেশ দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সেই আদেশের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন এবং অফিসারকে পুনঃরায় চাকরিতে বহাল করেন। বিষয়টি মেক্সিকো-ইউএসএ জেনারেল ক্লেইমস কমিশনে বিবেচনার জন্য প্রেরণ করা হয়। আদালত সিদ্ধান্ত দেয়, অফিসারের কৃতকর্ম রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা যেভাবেই বৈধ করার চেষ্টা করা হোক না কেন এটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো কাজ নয়। শিশু দুটির অনানুমোদিত স্থান দিয়ে নদী পারাপারের চেষ্টা নিঃসন্দেহে বেআইনি কাজ। কিন্তু কেবল এই কারণে কেনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটানো আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত বা অনুমোদিত হতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইনে ব্যক্তির প্রতি আচরণের একটি ন্যুনতম গ্রহণযোগ্য মাত্রা রয়েছে। এমন কোনো আইন নেই যার মাধ্যমে ব্যক্তির প্রতি এমন অমানবিক আচরণ সামর্থিত হতে পারে। সুতরাং মেক্সিকান শিশু দুটির হত্যা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী হবে। সেই মামলায় যুক্তরাষ্ট্রকে নিহতের বাবা-মাকে ২ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়।”

এই ঘটনায় সীমান্তরক্ষী অফিসারকে সাজা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের ভুল ছিলো; দুইটা বাচ্চা মার্ডারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অতি শিশুদরদী আদালত ন্যায়বিচার করতে পারে নাই, বেআইনীভাবে ঐ অফিসারকে সাজা দিছেন। ভারতের আদালত অহেতু আবেগে ভাসেন নাই, আইন মোতাবেক রায় দিছেন; অমিয় ঘোষের খালাস একটি ন্যায়বিচার।

মেক্সিকো-ইউএসএ সীমান্তের ঘটনায় পরে আদালত যে অফিসারকে নয় বরং দোষী সাব্যস্ত করলো যুক্তরাষ্ট্রকে–কোন এক আশ্চর্য কারণে শামীম সেইটা খেয়াল করেন নাই মনে হচ্ছে; নোটের কোন পাঠকও খেয়াল করাটা প্রকাশ করেন নাই। এই ঘটনার এসেন্স থেকে বিচার করলে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ার বেলায় দোষী সাব্যস্ত হবে স্টেট ইন্ডিয়া, অমিয় ঘোষ নন; ফলে, অমিয় ঘোষের খালাসই তো হবার কথা। অথচ অমিয় ঘোষের খালাসে বাংলাদেশে হতবুদ্ধি হাহাকার চলছে। এইটা আসল অপরাধীরে খালাস দেবার পায়তারা; অমিয় ঘোষের সাজা হইলে স্টেট ইন্ডিয়া বেকসুর থাকতে পারে; কিন্তু ইন্ডিয়ারই এক আদালত অমিয় ঘোষরে খালাস দিয়া স্টেট ইন্ডিয়ারে দোষী সাব্যস্ত করবার সুবিধা করে দিলো; সেজন্য ওই আদালতকে ধন্যবাদ দিবো আমি।

কিন্তু এই খুনের দায় যদি স্টেট ইন্ডিয়ার হয় তাইলে কী করতে পারি আমরা? শামীম ইন্ডিয়ার “THE BORDER SECURITY FORCE ACT, 1968”-এর ১১৭ ধারা মোতাবেক কিছু সুযোগের কথা বলছিলেন। “…Any person subject to this Act who considers himself aggrieved by any order passed by any Security Force Court may present a petition to… (http://indiankanoon.org/doc/181955/, http://bsf.nic.in/doc/bsfActRules.pdf–দুই লিংক-এর দুইটা ডকুমেন্ট-এ মিল নাই পুরা)”–এই রকম কিছু কথা আছে এই ধারায়। শামীম বোঝেন নাই যে এই “Any person subject to this Act…” আসলে বিএসএফ সদস্যদের বোঝায়। বিএসএফ-এর কোর্টের কোন আদেশ/রায়ে কোন বিএসএফ সদস্য স্যাটিসফাইড না হলে তিনি পিটিশন দাখিল করতে পারেন, ফেলানী পক্ষের কারো পিটিশনের কথা বলা হচ্ছে না। বরং ভিন্ন আইন খোঁজা যেতে পারে যে, ইন্ডিয়ার কোন আদালতে বিএসএফ বা ইন্ডিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নাগরিকদের মামলা করার সুযোগ আছে কিনা, বা স্টেট বাংলাদেশ মামলা করতে পারে কিনা। এর বাইরে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া যায়। স্টেট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তেমন কিছু করার সম্ভাবনা দেখি না; হাসিনা সরকারের সাথে ইন্ডিয়ার গভীর সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাতে; ওদিকে, কয়েকমাস আগে মনমোহনের দাওয়াতে খালেদা জিয়ার দিল্লি সফরকে হিসাবে রাখলে সম্ভাব্য বিএনপি সরকারের কাছেও তেমন কিছু আশা করতে পারছি না। আমার ধারনা, কোন ব্যক্তি বা এনজিও ধরনের প্রতিষ্ঠানও কোন দেশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ দায়ের করতে পারে; তেমন কি কেউ আছেন? যদিও, স্টেট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে না করলে সেই অভিযোগ পাত্তা দেবার সম্ভাবনা প্রায় নাই।

৬-৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩

ফেসবুক নোটে আলোচনা পড়তে ক্লিক করেন