আমরা ক্রুদ্ধ

অজৈব অপদার্থ হিসাবে এবং লিভিং এনটিটি নয় বলে মিডিয়ার ফিলিং থাকার উপায় নাই; কিন্তু মাঝে মাঝেই ফিলিং দেখায় মিডিয়া। যেমন, ‘আমরা শোকাহত’—লেখা একটা কালো ব্যানার দেখা যায় প্রায়ই।

আরো কিছু ফিলিং পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। ‘আমরা আনন্দিত’, ‘আমরা ব্যথিত’ ইত্যাদি। তাই রানা প্লাজা ধ্বসের এক বছর পূরণের দিনে কালো রং দিয়া মিডিয়ার শোক প্রকাশ করাটা স্বাভাবিক মনে হতে পারে।

-------------------------

তবে, ফিলিং হিসাবে শোক এবং শোকের প্রচার বেশ ইন্টারেস্টিং; শোক মানুষকে নিশ্চল করে দেয়, নড়াচড়া করবে না মানুষ, বসে পড়বে স্তব্ধ হয়ে। এমন একটা দিনে সরকার, পুলিশ, আদালত, কারখানা মালিক, বিজিএমইএ—যার যা দায়িত্ব ছিলো তা পালন করে নাই বলে যদি ভাবতে থাকে মানুষ তাহলে বিপদের কথা; অনাস্থা এবং না পাওয়ার ক্ষোভ ক্ষেপিয়ে দিতে পারে মানুষকে, মানুষ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ, খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে শোকের প্রচার করো, মানুষকে বসাইয়া দাও, বিহ্বল করে দাও, থামাইয়া রাখো।

‘আমরা শোকাহত’ বলছে মিডিয়া, ‘আমরা ক্রুদ্ধ’ বলে না, ক্রোধের প্রচার করে না, শোকের প্রচার করতে থাকে।
একে রাজনীতি বলে। কী প্রচার করে কী লাভ হয়, কার লাভ হয়, কোন পক্ষকে দুর্বল করা হয়, কাকে শক্তিশালী করা হয়—সে হিসাব গোপন খুবই। আপাত ভালোর তলেই আছে ঐ রাজনৈতিক লাভের হিসাব।

এই মিডিয়া কখনোই ক্রুদ্ধ হয় না, ক্রোধের প্রচারও করে না; ফলে এই শোক খুবই সাজানো, কেবল দেখানোর জন্য। ফলে, শোক একটি সাজগোজ আসলে; যেদিন যে সাজে সাজা উচিৎ তার সামাজিক ব্যাকরণ আছে; বিয়ের সাজ আছে, নববর্ষের সাজ আছে, ঈদের সাজ আছে; তেমনি আছে শোকের সাজ। এটি হবে কালো। আজ তাই একটি সাজগোজের দিন; মিডিয়া সাজলো, এনজিও সাজলো, সরকার সাজলো, বিজিএমইএ সাজলো।

বিজিএমইএ আরো চতুর সাজ নিলো আজ; মৃতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া-মাহফিলের আয়োজন করলো তাঁরা। খুবই শ্রমিক-প্রেম যেন! বিজিএমইএ’র দোয়া-মাহফিল একটি রাজনৈতিক অস্ত্র আসলে; ট্রিকি; বঞ্চিত, ক্রুদ্ধ শ্রমিকদের আজ সম্ভাব্য বিজিএমইএ ঘেরাও ঠেকানো গেলো এই মাহফিল দিয়ে। একই সাথে সাম্প্রদায়িক খুবই। যেনবা, হতাহত সবাই মুসলমান—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্ট্রান থাকবার কথা নয় কোন!

এই দোয়া-মাহফিলে মৃতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করা হলো; রানা প্লাজায় অমনভাবে যারা মারা গেলেন আল্লাহ্ তাদের নিশ্চয়ই শহিদের মর্যাদা দিয়েছেন; বিজিএমইএ মোসলমান হলে তাদের বরং পাপবোধে আক্রান্ত হবার কথা, নিজেদের রুহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া-মাহফিল আয়োজনের কথা! এটুকু ইসলামের বেসিক থেকেই অনুমান করা যায়।

পুলিশ পাহারায় মৃত শ্রমিকদের রুহের মাগফেরাত চাইয়া মাহফিল-দোয়া
পুলিশ পাহারায় মৃত শ্রমিকদের রুহের মাগফেরাত চাইয়া মাহফিল-দোয়া

নিজেদের রুহের মাগফেরাতের চিন্তা করছে না বিজিএমইএ, জীবিত-পঙ্গু শ্রমিকদের চিন্তাও করছে না তারা, কেবল মৃতদের নিয়ে ভাবনা আর শোক দেখাচ্ছে তারা। কারণ কি? আহতদের জন্য কালো রং-এ সাজা যায় না তো! সাজটাই প্রধান; বিজিএমইএ’র, সরকারেরও।

কেননা, সরকার বা বিজিএমইএ-এর আয়োজনে গত এক বছরে আমরা কি নিতান্ত একটা পরিদর্শন কর্মসূচী পেয়েছি? যে, অন্যান্য কারখানার বিল্ডিং-এর ফিটনেস সার্টিফিকেট ঠিকঠাক আছে কিনা, আগুনের জন্য দরকারি প্রস্তুতি আছে কিনা, কয়টা কারখানার গেটে তালা খোলা থাকে? মিডিয়ায় কি তেমন কোন ধারাবাহিক প্রতিবেদন পেয়েছি? পাই নাই তো!

২৪ এপ্রিল ২০১৪