প্রাইভেসি দিয়া কী করবো আমি?

সেলিম রেজা নিউটন আজকে (২৬ আগস্ট ২০১৩) একটা ফেসবুক নোটে { http://goo.gl/571mTH :: সর্বগ্রাসী সেনা-রাষ্ট্র-কর্পোরেট নজরদারি ঠেকাবেন কীভাবে? (এনএসএ-এফবিআই-সিআইএ বনাম মানুষ)}ট্যাগ করলেন আমারে; গুগোল/জিমেইল, ফেসবুক ইত্যাদি অতি জনপ্রিয় সাইটগুলি যে ইউজারদের তথ্য জমায়, বেচে দেয়, সরকার/ সিআই/এফবিএ টাইপ বিভিন্ন নজরদারি প্রতিষ্ঠানরে দেয়—এ সব জানাইছেন নিউটন।

এই চোর সাইটগুলি যেসব সার্ভিস দেয় সেগুলি পাবার অল্টারনেটিভ বেশ কিছু ঠিকানাও দিছেন। ইনফর্মেটিভ। আমাদের জানার দরকার আছে—কে কিভাবে আমাদের দ্যাখে বা বিক্রি করে। নিউটন ভালো। এমন ভালো আরো আছেন বহু চিন্তক, তাত্ত্বিক, বামপন্থী, কর্পোরেট বিরোধীরা। বুদ্ধিবৃত্তিক বিবিধ স্পেসে একই ধরনের চিন্তা আছে বলে জানি; আমার এই লেখায় নিউটনরে সামনে রাখলেও তর্কটা সবার সাথেই।

-------------------------

তো, এ ব্যাপারে আমাদের করাকরি ঠিক করার আগে আরো কিছু জিনিস জানা দরকার; সেইগুলা নিউটনের নোটে নাই। পরে এগুলি নিয়া আরো লিখতে চাইছেন নিউটন; ভাবলাম, নিউটনের এ যাবত চিন্তা আউলাইয়া দিয়া আরো ভালো চিন্তা করার সুযোগ করে দেই ওনারে। কেননা, আমি নিউটনের চাইতে জানি কম, বুঝি বেশি। অবশ্য যাদের দুই চোখে ধরি না আমি, মানে আমারে দেখতে পারেন না দুই চক্ষে তাঁরা বলবেন, “অল্প জানাই আমার বেশি বোঝার কারণ।” ওনারা কান্টপন্থী, আমার অস্তিত্বের রিজন নিয়াই বরং থাকতে দেই ওনাদের।

শুরুতেই আইক্যান [ICANN: Internet Corporation for Assigned Names and Numbers] বিষয়ে জানা দরকার আপনাদের। এইটা ক্যালিফোর্নিয়ায় রেজিস্টার্ড মার্কিন কোম্পানি একটা। এই কোম্পানি নিজের ওয়েবসাইটে জানাচ্ছে:

“যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ক্যালিফোর্নিয়ার আইনে ইনকর্পোরেটেড একটা অর্গানাইজেশন আইক্যান। তার মানে হলো—যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনে চলতে হয় এবং আদালতে (যুক্তরাষ্ট্রের) জাবাবদিহি করতে বাধ্য আইক্যান।”

আইক্যান কী করে? আইক্যান ইন্টারনেটে যুক্ত সব দেশ ও ডিভাইজকে (ইউজার) আইপি অ্যাড্রেস ভাগাভাগি করে দেয় এবং সেগুলি কোঅর্ডিনেট করে; দুনিয়ার সব ডোমেইন নেম আইক্যানে মালিকের নামসহ লেখা আছে; সেই কারণেই একই নামে দুইটা ওয়েবসাইট থাকতে পারে না। বিভিন্ন ডোমেইন এক্সটেশান (.কম, .নেট, .অর্গ, .বিজ, .টিভি ইত্যাদি) আইক্যান ঠিক করে দেয়। আইক্যানের বাইরে কেউ থাকতে চাইলেও তাদের সাথে আমাদের অনলাইন যোগাযোগ ঘটতে পারে আইক্যানের মধ্যস্ততার মাধ্যমেই। শুনছিলাম, ইরান নিজেদের একটা ইন্টারনেট ব্যবস্থা তৈরি করছে; কিন্তু আমাদের সাথে ইরানের সেই নেটওয়ার্কের যোগাযোগ ঘটতে আইক্যানরে লাগবে। আইক্যানরে পাশ কাটাইতে চাইলে বর্তমান সাবমেরিন কেবলের প্যারালাল সিস্টেম তৈরি করতে হবে; সেইটা একটা প্যারালাল অনলাইন ব্যবস্থা হইতে হবে। এইটা বানাবার টাকা কই পাইবেন?

ফলে, আমাদের একটা সার্বভৌম অনলাইন লিভিং-এর সম্ভাবনা নিউটন দেখাইলেও তা আসলে একটা পারমিটেড লিভিং। পারমিটেড বাই হুম? বাই ক্যালিফোর্নিয়ার আইন। নিউটন গুগোলের বিকল্প হিসাবে duckduckgo.com সার্চ ইঞ্জিন ইউজ করতে বলছেন; যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যে কোন সময় এইটা বন্ধ করে দিতে পারে; আইক্যানের শর্ত মানবার পরেই এই সাইট তৈরি হইতে পারছে। ফলে, এইটা ব্যবহারে আপনার সার্বভৌমত্বের যেই ফিলিং হচ্ছে, তা যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদিত।

এইবার আরেক চিন্তায় যাই; এফবিআই আপনার ব্যাপারে জানতে চায়; কোথাও তথ্য দেবেন না আপনে; ভালো। প্রেম করার জন্যও তো আসল নাম ঠিকানা জানা দরকার; নকল ঠিকানায় নকল নামের কারো সাথে ডেটিং-এ যাওয়া কি ঠিক হবে? যোগাযোগটা হবে কেমনে আপনার? নিউটন আমারে ট্যাগ করবেন কেমনে? আপনে কি প্রেম করা বাদ দিয়া দেবেন? খালি আপন আর মামাতো-ফুপাতো ভাইবোনের লগে প্রেম করবেন? আপনের ছবি, আঙুলের ছাপ আছে ন্যাশনাল আইডি কার্ডে, মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট আরো দক্ষ এখন নজরদারিতে, ব্যাংকের এটিমএম বুথে সিসিক্যাম আছে, লিফটে, মার্কেটে আছে; ট্রেন স্টেশনে আছে; ফোন কোম্পানী তথ্য দেয়, কল রেকর্ড করে; কথা বলবেন না ফোনে? ব্যাংক? আইডি কার্ড? সেনাবাহিনীর লোকেরাই নির্বাচন কমিশনার, মিলিটারি গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল আইডির ডাটাবেজ পাবে না? জাতিসংঘের শান্তি বাহিনীতে সেনা-পুলিশ যাইয়া লাখ লাখ টাকা সঞ্চয় করতে পারে, জাতিসংঘ কি সেই ডাটাবেজ পাবে না? বাংলাদেশের বাচ্চাদের উপর মার্কিন আর্মির জন্য তৈরি ওষুধ টেস্ট করে দেয় আইসিডিডিআরবি, আর বাংলাদেশের তথ্য পাবে না যুক্তরাষ্ট্র—তাই ভাবেন আপনে? আপনে বরং স্মার্টফোনে লোকেশন রিপোর্টিং অন কইরা রাজশাহী রাইখা ঢাকায় আসেন, আইসা মার্কিন দূতাবাসের সামনে দুইটা চক্কর মাইরা তাদের সিসিক্যামে ওঠেন; বড়ো কুসুমের তিনটা আন্ডা খান, আপনের প্রাইভেসি খুইলা মার্কিন সিসিক্যামের সামনে পাদ মারেন দুইটা। গুগোল আর ফেসবুক আপনারে রাজশাহী বলে রিপোর্ট করুক; মার্কিন দূতাবাসের সামনে আসল নাকি নকল আপনে সেইটা যাচাই করুক মার্কিন কেরানিরা। ৫০০ কোটি মানুষের কয়েকশো বিলিয়ন তথ্য জমুক মার্কিন ডাটা সেন্টারে; ৫ কোটি কেরানি মনিটরিং করতে থাকুক সেই তথ্য; খরচ কইরা কইরা গ্রিসের মতো দেউলিয়া হইয়া যাক যুক্তরাষ্ট্র।

ওদিকে, আপনের তথ্য নাকি কর্পোরেটের কাছে বেচে ফেসবুক, গুগোল; সেই অনুযায়ী আপনেরে বিজ্ঞাপন দেখায়; কর্পোরেটগুলা প্রোডাক্ট তৈরি করে আপনের কাছে বেচার জন্য। বিজ্ঞাপনরে হেলা কইরেন না। বিজ্ঞাপনই প্রধান মিডিয়া এখন। আবার, আপনে যেইগুলা সাহিত্য, সিনেমা, নাটক হিসাবে দ্যাখেন সেইগুলা কি? এর প্রায় সবগুলিই কি একগামিতার বিজ্ঞাপন না? সার্টেইন নৈতিকতার বিজ্ঞাপন না? আপনে কি বাদ দিয়া দেবেন সবগুলা? কেনা-কাটা করবেন না? চাউল, সয়াবিন, কম্পিউটার, আন্ডারওয়্যার—সবই একলা একলা বানাইবেন? স্বয়ংসম্পূর্ণ হইয়া যাইবেন? পুঁজির ব্যবস্থার মধ্যে না ঢুইকা না খাইয়া মরবেন? আপনের যেহেতু খারাপ খারাপ জিনিস কিনতেই হবে তাই আপনের পছন্দ-অপছন্দ কোম্পানীগুলিরে জানানোই ভালো; আপনের পছন্দ মতো জিনিস বানাবে ওরা; কম খারাপ জিনিস কিনতে হবে আপনার। আপনের সবকিছু বইলা দেন কর্পোরেটরে, সেই বিপুল তথ্য অ্যানালাইজ কইরা উচ্চ মজুরি নেন ওদের কাছ থেকে; কর্পোরেটের কাছ থেকে টাকা নিয়া নিজেই নিজেরে নিয়া গবেষণা করেন।

ছদ্ম নাম দিয়া সামাজিক যোগাযোগের কিছু জায়গার হদিস জানাইছেন নিউটন; কেমন সামাজিক যোগাযোগ সেইটা? আমার ছদ্ম চোখ দিয়া নিউটনের ছদ্ম মুখটা দেখতে থাকলাম, আমাদের আসল দেখাদেখি এনএসআই আর এফবিআই দেইখা ফেলবে বইলা? আর ছদ্ম চোখে ছদ্ম মুখ দেখারেই বলতে থাকবো আসল ও নিরাপদ সামাজিক যোগাযোগ? তা বলবো না আমি।

বাছবিচারে পাবলিশড অন ২৫ আগস্ট ২০১৩

Series Navigationআপনার চাইতে আর্ট বেশি বোঝে ওরা >>