হিন্দু বাঙালির উপর হামলা ঠেকাবো কেমনে?

১. অবাঙালি হিন্দু আছে বাংলাদেশে; যেমন ত্রিপুরা হিন্দুরা। ত্রিপুরা জাতি আক্রান্ত হয় বাংলাদেশে, সেনাক্যাম্পের শাসনেই আছে ত্রিপুরা জাতি। কিন্তু হিন্দু হিসাবে ত্রিপুরারা কি আক্রান্ত হন? জানি না ঠিক। আমার মনে পড়া আক্রান্ত বাংলাদেশী হিন্দুরা বাঙালি সবাই।

ঘটনা তেমন হলে আক্রমণ করার বেলায় অবাঙালি হিন্দুরা ছাড় পাচ্ছেন কেন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে দেখি নাই কাউকে! এর জবাব খোঁজা দরকার।

-------------------------

২. আওয়ামী লীগ শাসনে বাংলাদেশী হিন্দুরা নিরাপদ–এমন একটা পাওয়ারফুল ভাবনা আছে দেশে; অন্যান্য ধর্মের মানুষও নিরাপদ থাকবেন, ভাবনাটা ওই পর্যন্ত বিস্তৃত। কথাটা পুরাই মিথ্যা বলে প্রমাণিত ধরা যায়। বাংলাদেশী হিন্দু বাঙালিরা নিয়মিতই আক্রান্ত হচ্ছেন আওয়ামী শাসনে; মরছেন, পুড়ছেন, ঘর-জমি হারাচ্ছেন তাঁরা, ভিটা ছাড়তে হচ্ছে তাদের! আওয়ামী শাসনামলে বৌদ্ধরাও পুড়ছেন, মরছেন।

৩. প্রায় প্রতিটা আক্রমণেই ছাত্র শিবিরের নাম আসছে মিডিয়ায়, আক্রমণকারী হিসাবে। সরকারের প্রতিনিধিরাও জামাত-শিবিরের নাম বলেন প্রায়ই; আদালতে কারো শাস্তিও হতে পারে ওইসব ঘটনায়, জানি না ঠিক। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার জামাত-শিবির নামের সংগঠনের বিরুদ্ধে কোন মামলা করে নাই; এ রকম আক্রমণে যদি সাংগঠনিক উৎসাহ থাকে, যদি আক্রমণ শেখানো হবার ব্যবস্থা থাকে, আক্রমণ করতে সংগঠনের নির্দেশ থাকে যদি, তাইলে কয়েকজনকে মাত্র আসামী করে মামলা করাটা অর্থময় হতে পারে না বিশেষ; সেই সংগঠনও তখন আসামী হবার কথা–সংগঠন হিসাবেই; এমন কিছু আদৌ করছে না আওয়ামী লীগ; কেন? এমন কি হতে পারে যে, জামাত-শিবির সংগঠন হিসাবে অ্যাকটিভ থাকলে হিন্দু বাঙালি বাংলাদেশীদের ভোট নিয়া আওয়ামী লীগরে আর চিন্তা বা সময় খরচ করতে হচ্ছে না!

এমন কি হতে পারে যে, জামাত-শিবির সংগঠন হিসাবে অ্যাকটিভ থাকলে হিন্দু বাঙালি বাংলাদেশীদের ভোট নিয়া আওয়ামী লীগরে আর চিন্তা বা সময় খরচ করতে হচ্ছে না!

জামাত-শিবিরের প্রতি এই অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করাটা কি এতোই শক্ত যে মামলা করাটা ঠিক হচ্ছে না? এতো শক্ত হলে প্রতিটা রিপোর্টে মিডিয়াগুলি অভিযোগ তোলে কেমনে?

৪. বাংলাদেশে ভারতের বহুবিধ নাক গলাবার ইস্যুটার কোন প্রভাব আছে কি এই আক্রমণগুলিতে? ধরেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর আক্রমণ করে ভারতের উপর প্রতিশোধ নেবার তৃপ্তি পাইছে নাকি আক্রমণকারী? এই রকম কোন প্রভাব থাকলে করণীয় কী? ভারতকে প্রতিরোধ বা ভারতের উপর প্রতিশোধ নেবার একটা ফর্ম হিসাবেও এই হামলা কোনভাবেই জাস্টিফাই করা যায় না; কিন্তু ভারত নাক গলাইয়াও বা ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ থাকলেও যেহেতু আক্রমণ থামে না, তাহলে হিন্দু সেক্যুলার ভারতের নাক গলানো থামানো গেলে কি এই আক্রমণ থামতে পারে?

এই সম্ভাবনার কথা ভাবতে বলার কারণ– খ্রিস্টান বাংলাদেশীদের আক্রমণের ঘটনা দেশে পাওয়া যায় না প্রায়!

৫. জামাত-শিবিরের মতো একটা মধ্যপন্থি ইসলামী দল থাকলে বাংলাদেশে ‘ইসলামী এক্সট্রিমিজম’ ডেভলাপ করতে পারবে না–এই রকম একটা ভাবনা আছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের। আওয়ামী লীগসহ বাংলাদেশী চিন্তামণ্ডলগুলিতেও এই রকম ভাবনা পাওয়া যায়। এইটা কি ঠিক আদৌ? একাধিকবার ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপির ইসলামিস্ট তৎপরতা নাই কোন, ইসলামিস্ট আইনী বিধি-বিধান একটাও তৈরি করে নাই বিএনপি; সংবিধানের শুরুতে কেবল ‘বিসমিল্লাহ্…’ যোগ করার মাধ্যমেই মোসলমানদের ভিতর বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছে; বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় মধ্যযুগের ফ্যানাটিক ক্রুসেডার খ্রিস্টানদের আদলে তৈরি হওয়া এক ধরনের ‘ঈমানী দায়িত্ব’র বোধ তৈরি হইছে কতিপয় মুসলমানের মাঝে; গত কয়েক দশকের ঘটনা এইটা; এই ধরনের ‘ঈমানী দায়িত্ব’ বোধসম্পন্ন মোসলমানরাও বিএনপিকে বিশেষ সম্মান দিয়ে থাকে; এই রকম একটা সম্মান বিএনপির আছে বলে বিএনপিকে সমর্থন দেবার মাধ্যমেই ঐ ‘ঈমানী দায়িত্ব’ পালন করার তৃপ্তি পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিপরীতে দেশের অন্যান্য ইসলামী দলগুলির কাছে জামাতের খুব গ্রহণযোগ্যতা নাই; মাওলানা মওদুদীকে পছন্দ করেন না বহু আলেম-ওলামা; এনারা বরং বিএনপিকে পছন্দ করেন। বিএনপির কৃতিত্ব হলো—সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ্…’ যোগ করছিলো মাত্র বিএনপি, প্রাত্যহিক প্রয়োগে ইসলামী বিধিবিধান মোতাবেক আর কোন আইন-কানুন প্রচলিত না করেই আলেম-ওলামাদের ওই পছন্দ অর্জন করতে পারছে। তাহলে বাংলাদেশে ‘ইসলামী এক্সট্রিমিজম’ ডেভলাপ করাটা ঠেকাচ্ছে কে—জামাত শিবির নাকি বিএনপি? আমার ধারনা, মার্কিন সমাজবিজ্ঞান বা পররাষ্ট্র দপ্তরের পলিটিক্যাল স্টাডিস অন্যন্য দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে অতি প্রয়োগ করছে; অতি প্রয়োগের কারণে বাংলাদেশ নামের স্বতন্ত্র দেশের পলিটিক্স ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না তাঁরা! এবং মার্কিন ও মার্কিন শিষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় এমফিল ও পিএইচডি—ইত্যকার বাংলাদেশী জ্ঞানতাত্ত্বিক অধঃস্তনেরা বোঝাবুঝির সকল দায়িত্ব মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে দিয়া নিজেরা প্রায়োগিক বিদ্যাচর্চা করছেন একেকটা এনজিও বানাইয়া।

মার্কিন ও মার্কিন শিষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় এমফিল ও পিএইচডি—ইত্যকার বাংলাদেশী জ্ঞানতাত্ত্বিক অধঃস্তনেরা বোঝাবুঝির সকল দায়িত্ব মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে দিয়া নিজেরা প্রায়োগিক বিদ্যাচর্চা করছেন একেকটা এনজিও বানাইয়া।

৬. সম্পর্ক তৈরি করে বাংলাদেশের মোসলমানদের কিভাবে সামলে রাখতে হয় সেই উদাহরণ হিসাবে এমনকি এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার কথাও ভাবা যায়; মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং দেশী জ্ঞানতাত্ত্বিক অধঃস্তনেরা—এরশাদের সেই স্ট্রাটেজিও ঠিক বোঝেন বলা যাচ্ছে না!

এই সম্মিলিত না বোঝাই সম্ভবতঃ জামাত-শিবিরকে বেশি বেশি লাই দেবার কারণ। দেশের হিন্দু বাঙালি নাগরিকদের উপর ধারাবাহিক হামলা বন্ধ করতে এই প্রশ্নগুলি নিয়া ভাবেন আপনারা।