বেকুবমণ্ডলীর মাঝে খালেদা জিয়া

কিন্তু নিজের জন্মদিন নিজেই ঠিক করে নেয়া ভালো লাগে আমার। পরিকল্পিত পরিবারের এই যুগে আপনি ফাল্গুনে কোকিলের প্রথম ডাকের সময় বাচ্চা জন্ম দিতে পারেন; টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে বাচ্চার প্রথম ঘুম হোক—এই পরিকল্পনায় শ্রাবণ মাসে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে সিজার করে বাচ্চা বের করতে পারেন। বহু পরিকল্পনাই করা যায়; কিন্তু এ তো আপনার বাচ্চা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা; বাচ্চার চয়েস আছে তো, নাকি না? নিজের জন্মদিন ঠিক করে নেওয়া আশরাফুল মাকলুকাত হিসেবে আরেক ধাপ আগানো আমাদের। আই লাইক ইট।

-------------------------

জন্ম পরিকল্পনা অবশ্য বেশিদূর আগায় নাই এখনো; অন্তত ধানের সাথে তুলনা করলে মানুষ জন্মের ব্যাপারে অগ্রগতি বেশ কম। আমন ছয় মাসে, আউশ পাঁচ মাসে; কিন্তু ইরি হইয়া যাচ্ছে তিন মাসেই; ইরি মানুষ চাষ হচ্ছে না এখনো। ফলে বেশি আগাইনি আমরা। আর মরার পরিকল্পনা তো প্রায় করিই না আমরা; এ ব্যাপারে খালেদা জিয়াই আমাদের আশা হয়ে বেঁচে আছেন একমাত্র।

তিনি হয়তো ১৭ মার্চ মরার পরিকল্পনা করছেন; জাতির জনকের জন্মদিনে মরলে বিএনপি দরকারি শোকদিবসটা পাইয়া যাবে। তবে, জাতির জনককে তেমন পছন্দ করেন না তেমন লোক তো দেশে প্রচুর; ফলে আওয়ামী লীগ ও সমর্থক ছাড়া দুঃখ পাবার লোক বেশি নাই—তেমনটা মনে করতেই পারে বিএনপি। এ কারণে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টারা ১৬ ডিসেম্বর মরার অনুরোধ করতে পারেন; বাংলাদেশের বিজয় দিবস এটি; এদিন মরলে শোকদিবস পালন করে অনেক বেশি মানুষের মনে আঘাত দেওয়া যাবে।

উপদেষ্টারা খালেদা জিয়ারে সেই রাস্তায় যাইতেই বলছেন মনে হচ্ছে; অথচ খালেদা জিয়া একজন গুণী লোক ছিলেন। প্রথম গুণ হিসেবে ধরা যাক, জিয়া হত্যা পরিকল্পনায় অংশ না নেওয়া; তখন উপদেষ্টারা হয়তো বলছিলেন—জিয়াকে খুন করলেই আপনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন পরে; আর খুনটা করা উচিত হবে ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর ধরনের একটা দিনে। শোক দিবসের ব্যবস্থাটা তাহলে আগেই হতে পারতো!

মোটের উপর, আমার দুঃখ হয় খালেদা জিয়ার জন্য; কারণ একটা বেকুবমণ্ডলীর মাঝে তাঁকে থাকতে হয়। মানে বিএনপির উপদেষ্টাদের কথা বলছি; তবে এভাবে বলাটা ঠিক হচ্ছে না মোটেই। বললে আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁরা বেকুব। এ কাজটা অবশ্য অত কঠিন হবে না।

যুক্তি ভালো লাগে আমার; যুক্তি দিয়ে দিয়ে এই কঠোর সত্য আবিষ্কার করে ফেলা যাবে। আগাই তবে।

বিএনপির রাজনীতি খাড়া করাইতে হবে; চেয়ারপার্সন হিসেবে সেই দায়িত্ব খালেদার। খালেদা জিয়ারে বুদ্ধি দেবেন উপদেষ্টারা। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা তো করতেই হবে বিএনপির রাজনীতি খাড়া করতে। কিন্তু কিভাবে কিভাবে করা যাবে সেই বিরোধিতা? চলেন দেখি উপদেষ্টাদের বুদ্ধিগুলি কেমন।

শুরু করি খালেদা জিয়ার জন্মদিন নিয়া; ওনারা বুদ্ধি দিলেন—জন্মদিন করতে হবে ১৫ আগস্ট। ওকে; তাতে ফায়দা কী কী?

ক. জাতির জনক না মরলে খালেদা জিয়ার জন্ম হইতে পারে না! কারণ কি– বিএনপি কি জন্মান্তরবাদী? জাতির জনক কি খালেদা জিয়ার মাধ্যমে পুনর্জন্ম নিলেন! বিএনপি তো নিজেরে ইসলামপ্রিয় দল হিসাবেই দেখাইতে চায়! উপদেষ্টারা তাহলে কেন বিএনপিরে জন্মান্তরবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন? এমনকি টারসিয়ারি জন্মান্তরবাদের দিকে—এক জিয়া লোকান্তরে, লক্ষ জিয়া ঘরে ঘরে। জিয়ার খুনীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে কি বিএনপি? জিয়া খুন হওয়াতেই না লক্ষ জিয়া পাওয়া গেলো!

খ. এর মধ্য দিয়া যেনবা আওয়ামী লীগরে একহাত নেওয়া গেলো; এইটা অবশ্য একটু মানা যায়; কারণ, এতে আওয়ামী লীগের একটু জ্বলে বটে।

গ. ভারতের স্বাধীনতা দিবসে আনন্দ করলে বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতির উপকার হবে; ফলে ভারতের স্বাধীনতা দিবসে জন্মদিন পালন করতে হবে!

এই উপদেষ্টামণ্ডলীকে বেকুব বলবো আমি; তবে আরো কিছু বুদ্ধি বিচার করা যাক। জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক; বটেই তো। ধরেন, ছেলের খৎনা উপলক্ষে আপনি একটা ভোজের আয়োজন করবেন; আপনি মাইক নিয়ে এলাকায় নামিয়ে দিলেন একজন; ভোজের কথাটা সে ঘোষণা করে আসলো পুরো এলাকায়। তাহলে আপনার ছেলের খৎনা উপলক্ষে ভোজের ঘোষক কে? নিশ্চই আপনার নিয়োজিত লোকটি। ফলে ঘোষক কথাটি বিরাট কিছু মিন করে না। রেডিও টিভিতেও অনুষ্ঠানের ঘোষক থাকে তো, নাকি না?

এখন উপদেষ্টারা জিয়াকে দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করার বুদ্ধি দিচ্ছেন। তখনকার মেজর জিয়া তাহলে সামরিক অভ্যুত্থান করছিলেন? আইউব খানের মতো? পারভেজ মোশাররফের মতো? নাকি বিডিআর বিদ্রোহে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হেডকোয়ার্টার দখল করে হত্যা-নির্যাতনের মতো কিছু করছিলেন মেজর জিয়া? একই সাথে মেজর এবং প্রেসিডেন্ট?

অথচ, নিজের জীবনে জিয়াউর রহমান বেসামরিক হতে চাইছেন; রাষ্ট্রের বেসামরিক পদে ছিলেন বেসামরিক পোশাকেই! অভ্যুত্থান করেননি কোন, এড়াইছেন সব সময়; এমনকি আওয়ামী লীগ যে অভিযোগ করে ১৫ আগস্টের হত্যার ঘটনা জিয়া আগেই জানতেন, তাঁরাও একইসাথে জিয়া যে হত্যায় অংশ নেওয়া এড়াইছেন—সেইটাই বলতে হয়; কোনভাবেই খুনের সাথে সরাসরি জড়াতে পারে না জিয়াকে! আজীবন অর্ডার ফলো করা একজন আদর্শ সৈনিককে সামরিক অভ্যুত্থানকারী হিসেবে দেখাইতে চাইছে তাঁরই অনুসরণকারীরা, ছেলে এবং স্ত্রী! যেই মানুষটি নিজের জাতির প্রয়োজনে একবার মাত্র আনুগত্য পরিবর্তন করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন—তাঁকে কলঙ্কিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরই প্রতিষ্ঠা করা দলের লোকেরা, তারঁই বউকে, ছেলেকে!

এসব বুদ্ধি এঁনারা কেন দিচ্ছেন, আর খালেদা জিয়াই বা কেন নিচ্ছেন? কারণ, বিএনপির রাজনীতি খাড়া করাইতে হবে—আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। উদ্দেশ্য মহৎ নিশ্চই, কিন্তু সেজন্য আরো অনেক কম কুৎসিত রাস্তা কি নাই বিএনপিরর সামনে? বিএনপি পাচ্ছে না তার কারণ, এই উপদেষ্টারা বেকুব।

বরং আমি কিছু বুদ্ধি দিচ্ছি। সেজন্য এই উপদেষ্টাদের ইতিহাস পড়াবো একটু আমি। জাতির জনককে খুন করলো কারা? এই প্রশ্ন বিচার করার মাধ্যমে শুরু করি। হত্যার পরে ক্ষমতা নিলো কে? কেন আওয়ামী লীগ! ফলে বিএনপি দাবি করতে পারে যে, আজকের এই আওয়ামী লীগ জাতির জনকের খুনী। পরিবারের শিশু, গর্ভবতী নারীসহ জাতির জনককে খুন করেছে আওয়ামী লীগ! কারণ কি? জাতির জনক আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিলো, আওয়ামী লীগের সবাইকে চোর হিসেবে চিনতে পারছিলো জাতির জনক। এই আওয়ামী লীগের চুরির কারণেই দেশের গণতন্ত্র প্রথম উচ্ছেদ হইছিলো, একনায়কতন্ত্রী বাকশাল কায়েম হইছিলো! এই আওয়ামী লীগেরই আরেক অংশ জাতির জনককে দিয়ে বাকশাল করাইয়া তাঁকে কলঙ্কিত করছিলো! জাতির জনক হত্যার প্রধান বেনিফিশিয়ারি আজকের আওয়ামী লীগ; বেনিফিশিয়ারিদের একজন, শেখ হাসিনা আজ প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ প্রধান! শেখ হাসিনা সত্যিই পিতৃভক্ত হলে আজ তাঁর বাকশাল প্রধান থাকার কথা, আওয়ামী লীগ প্রধান নয়; কেননা, তাঁর বাবার স্বপ্ন বাকশাল, আর খুনী আওয়ামী লীগ!

বিএনপির প্রতি কতগুলি অভিযোগ করে আওয়ামী লীগ; যেমন, জাতির জনকের বিচারের উপর ইনডেমনিটি। বিএনপি ইতিহাস থেকেই দেখাইতে পারে যে, সেই ইনডেমনিটি দিছিলো তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার! অর্থাৎ এই আওয়ামী লীগ জাতির জনকের বিচার আটকাইয়া রাখছিলো!

বিএনপির রাজনীতি খাড়া করাবার আরো মোক্ষম যুক্তি আছে; আবার ইতিহাসে যাই। ১৯৭৬ সালের ৭ মার্চ, ঠিক একাত্তরের ৭ মার্চে জাতির জনকের ভাষণের ময়দানে, আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, জাতির জনকের সেই মঞ্চের জায়গাতেই আজকের জামাতের বুড়া নেতারাসহ পাকিস্তানপন্থীদের একটা জনসভা হইছিলো। ৮ মার্চ ১৯৭৬-এর ইত্তেফাকে সেই সভার রিপোর্ট পাওয়া যাবে। সেই সভায় বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের সাথে যোগ দেবার দাবি উঠছিলো! স্বাধীন বাংলাদেশে, দেশ প্রতিষ্ঠার সেই আইকনিক ভাষণের ময়দানে দেশবিরোধীরা কিভাবে এই দাবি করতে পারে? আওয়ামী লীগ তখন কোথায় ছিলো? পাকিস্তানপন্থীদের সেই তীব্র প্রেশারের সময়, যখন দেশ রক্ষায় কাউকে পাওয়া যায় নাই, সেই টালমাটাল সময়ে পাকিস্তানপন্থীদের বাগে আনেন জেনারেল জিয়াউর রহমান! জিয়াউর রহমানই সেই ব্যক্তি যাঁর কারণে দেশ আবার পাকিস্তান হয়ে যেতে পারে নাই!

ওই বেকুব উপদেষ্টাদের ছাঁটাই করে খালেদা জিয়া একটু ইতিহাস পড়লে বিএনপির রাজনীতির উপকার হবে।

২৮ মার্চ ২০১৪