আপনার বাবাকে আরামে মরতে দিয়েন

১.

ডাক্তার বলছিলো ১৫ দিন; ১৩ দিন পর আব্বা মরেন। স্টোম্যাক ক্যান্সার হইছিলো আব্বার; প্রথমে বরিশাল, পরে ঢাকায় হসপিটালে ছিলো। রিপোর্ট নিয়া ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসতেই ভাইয়ার চেহারা দেইখা আব্বা বুঝতে পারছিলো মনে হয়। আব্বা জিগাইলো, কী অবস্থা? ভাইয়ার অস্বস্তি হচ্ছিলো নিশ্চই। পরে বললো, “ক্যান্সার। আনকিউরেবল অবস্থায় চইলা গেছে। ডাক্তার বলছে যে সিংগাপুর নিয়া দেখতে পারেন। কিন্তু কোন লাভ নাই; অলৌকিক কিছু না ঘটলে ১৫ দিনের মধ্যেই মারা যাবেন।” ভাইয়া জিগাইলো, সিংগাপুর নিয়া যাবো নাকি ঢাকার হসপিটালে থাকবেন? আব্বা বললো, “আমারে বাড়ি নিয়া যা।”

-------------------------

আব্বারে বাড়ি নিয়া যাওয়া হইলো। আমি মনে হয় পটুয়াখালী ছিলাম, জুবিলী স্কুলের হোস্টেলে। বাড়ি গেলাম। বহু লোক আসে আব্বারে দেখতে; তাঁর পুরানা কলিগরা, গ্রামের মানুষ, আত্মীয়রা। সবাই কিছু না কিছু নিয়া আসে; ফল, মিষ্টি ইত্যাদি। আব্বা খাইতে পারে না কিছুই। আমি খাই। একদিন আব্বা কাছে ডাকলো। শুইয়া আছেন, চামড়া আর হাড়ের মাঝে মাংস নাই কোন; চামড়া খুললেই ল্যাবরেটরির উপযোগী নগদ কংকাল পাওয়া যাবে একটা! ফ্যানের বাতাসে একটু শুকাইয়া নিতে হবে কেবল। আমার হাত ধরলো আব্বা; আমি বসলাম পাশে। বললো, ‘চিন্তা করিস না; আমি যা রাইখা গেছি তাতে তোরা মাস্টার্স পর্যন্ত ভালোভাবে পড়ালেখা করতে পারবি।’

আব্বা সত্যই কইছিলেন। আমি পড়ালেখা না কইরা, পরীক্ষা না দিয়া দুই বছর খুয়াইয়া ফেলি; ফলে মাস্টার্স করছিলাম লোন কইরা। নাইলে পাশ করার পরেও এক বছরের টাকা থাকতো চাকরি খোঁজার জন্য। তো, আমার আসলে কোন চিন্তা হয় নাই কখনো! বরং আব্বা মরার পরে আমার হাতে টাকা-পয়সা বাড়ছিলো। ১৯৯৩ সালের ২১ অক্টোবর রাত সাড়ে তিনটার দিকে আমারে কেউ একজন ঘুম থেকে তুললো। আমি ঘুম চোখে লইয়া পিছে পিছে গেলাম; দেখলাম আমাদের ঘরের মাটির ফ্লোরে তোশকের উপর আব্বা শুইয়া আছে; তাঁরে ঘিরে সবাই বসা। আমারে সবাই মাথার কাছে পাঠাইয়া দিলো। দশ ভাই-বোনের মধ্যে সবচে ছোট আমি; বিশেষ অগ্রাধিকার। মরার সময় অবশ্য এক বোন কাছে ছিলো না। যাই হোক, পায়ের দিক থেকে উপরের দিকে আইতেছিলো মরা; সবাই চামচে কইরা মুখে পানি দিলো একটু করে। শেষে আমার কাছে আসলো পানি আর চামচ। আমি মুখে পানি দিলাম একটু। আমার মুখের দিকে চাইলেন আব্বা। আমার মুখ ছিলো তাঁর মাথা বরাবর; তাই চোখ উপরের দিকে উঠাইতে হইছিলো তাঁর, মানে কপালের দিকে। আব্বার মুখের ভিতর তাঁর জিভ নড়তে দেখলাম একটু, মনে হইলো আল্লা বললো। এবং ওইভাবে উপরের দিকে আমার মুখ বরাবর চোখ রাইখাই মরলেন আব্বা। আমি অবশ্য বুঝতেই পারি নাই। কেউ একজন চোখ বুজাইয়া দিলো তাঁর।

২.

কয়দিন আগে আমার এক বন্ধুর বাবা মারা গেলো। সেম। স্টোম্যাক ক্যান্সার। কেম টেমো দিছিলো; অনেক কষ্ট পাইছে। ফুলে গেছিলো। মরার কিছুদিন আগে আমি দেখে আসছিলাম। এই বন্ধুর বাবা, মা, চাচা, বোন, খালা, মামা, খালু, মামী, ভাগ্নি—সবাই আমার পরিচিত। এরা সবাই আমার ওই ওই সম্পর্কের রোল প্লে করছিলো একবার। আক্ষরিক অর্থেই। ২০ বছরের বন্ধু আমার। ওর বাবারে খালু ডাকতাম।

তাঁর মরার সময়টার কাহিনী শুনে খুবই খারাপ লাগলো। মরার দিন হসপিটালে নিয়া গেছিলো। ভেইন খুঁজে পায় না; দুই হাতে দুই ঘন্টা বহুবার সুঁই ফুটাইছে ডাক্তাররা! আইসিইউতে নিয়া গেছিলো পরে। কী কী যেনো করবে। সিগনেচার নিয়া গেলো।

কাটাছেঁড়া করছে রাতের বেলা; কিছুই হয় নাই। অপারেশান ফেল করছে। মারা গেছে রাতেই। সকালে জানাইছে হসপিটাল থেকে! মরার আগে বাইরে থাকার সময় এরে খোঁজে, ওরে খোঁজে। কথা বলে, দেখতে চায়। ওভাবেই মরতে পারতো; কথা বলতে বলতে, দেখতে দেখতে সবাইরে। মরার সময় বুঝতে পারতো যে মরছে সে এখনি! মেয়ে, ছেলে, নাতি, বউ, ভাইদের মুখে ভালোবাসা দেখতে দেখতে মরতে পারতো হয়তো। কিন্তু হসপিটাল সিস্টেম তাঁরে নিজের মরার সময়টা জানতে দেয় নাই, আত্মীয়দেরো জানতে দেয় নাই, দেখতে দেয় নাই! হঠাৎ জানা গেলো যে সে মারা গেছে!

এই সময়টা হসপিটালে না নেওয়াটা বিরাট ঘটনা; নিজেদের সন্দেহ হইতে পারে যে বুঝিবা আরো বাঁচতো! আত্মীয়রা ছেলে-মেয়ের নিন্দা করতে পারে যে টাকা বাঁচাবার জন্যই আসলে হসপিটালে নেয় নাই! তোদের টাকা লাগবে আমারে বলতি!

এই নিন্দাগুলি নিতে পারতে হয়; নিন্দা নিতে পারা একটা গুণ; ইভেন গ্রেটনেসও! আপনারে নিন্দা করতে না পারলে পাশের লোকগুলির সুখ হবে কেমনে? তাঁরা যে আপনার চাইতে বেটার—এইটা ভাবতে দেবেন; তখন তো নিন্দা করবে মাত্র, কিন্তু আপনার যদি কোন দোষই দেখতে না পায় তাইলে সোজা ঘেন্না করবে! আমার পাশের লোকটা আমার চাইতে ভালো—এর চাইতে আনকমফোর্টেবল আর কী আছে জগতে?

  • সাঈদ ফেরদৌস

    আপনার এই লেখাটা আমার পছন্দের লেখা। ‍ফেসবুকে শেয়ার দিলাম মাত্র। তবে লোকনিন্দা এবং তারে জয় করার চাইতে সমস্যাটা আরেকটু জটিল হয়ে উঠতে পারে, উঠে সচরাচর। ধরেন, লোক, সমাজ, চিকিৎসা, মায়া-মহব্বত, চেষ্টা এই ধারণাগুলি তো ব্যক্তির সাপেক্ষে কেবল এক্সটারনাল না। ব্যক্তি এই ধারণাগুলি ইন্টারনালাইজ করে। ফলে যিনি চলে যাইতেসেন, তিনি আপনার আব্বার মতো করে ‘আমারে বাড়ি নিয়া যা’ কথাটা নাও বলতে পারেন। সেইভাবে নাও ভাবতে পারেন। ছেলেমেয়ে যখন দেখতেসে যে আর আশা নাই, তখনও তার মনে হইতে পারে যে, ’আমারে ভালো কোথাও দেখা’, বা ’এরা ঠিকঠাক চিকিৎসা করেনা’ ’টাকাপয়সার মায়া করে, আমার কোনো দাম নাই’; কখনো এইগুলা উচ্চারিত হয়. কখনো উচ্চারিত না হলেও তার চোখের দিকে তাকায়ে আত্মীয় পরিজনরে এমনটা মনে হয়। পরিস্থিতিটা ত্খন জটিল হয়।