চলেন মেয়েলি হয়ে উঠি

১০ বিহারী মুসলিম খুনে পরিষ্কার হলো যে, মুসলিম পরিচয় বাংলাদেশে জাতিগত রক্ষাতাবিজ হিসাবে কাজ করে না। হ্যাঁ, জমি ছিনতাইয়ের স্থানীয় উদ্দেশ্য থাকতে পারে; কিন্তু এ আক্রমণ সফল হয়ে উঠেছে জাতিগত শত্রুতার মধ্য দিয়েই।

বাংলাদেশের পলিটিক্যাল থিংকারদের মাঝে আরো কিছু জাতিগত রক্ষাতাবিজের ধারনা আছে; যেমন বাঙালি পরিচয় বা বাংলাদেশী পরিচয়। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা এমন কোন ধারনাকেই অনুমোদন দিতে পারে না।

-------------------------

আমরা দেখেছি, হিন্দু বাঙালি আক্রান্ত হয়েছে; বাঙালি পরিচয় তাদের রক্ষা করতে পারেনি। আমরা দেখেছি, সমতলের মান্দি, সাঁওতাল বা পাহাড়ের চাকমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি আক্রান্ত হয়েছে; বাংলাদেশী পরিচয় তাদের রক্ষা করেনি।

ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠী হিন্দুপ্রধান; কোন হিন্দু বাঙালি তাদের রক্ষায় এগিয়ে গিয়েছিলো—তেমনটাও কখনো শুনিনি আমরা। এ সব আক্রমণের ইতিহাসে ধর্ম-শ্রেণী-রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে হামলাকারীদের ঐক্য দেখেছি আমরা।

তবু বিশেষভাবে মেয়েদের প্রশংসা করতে হবে আমাদের। কারণ, হামলাকারীদের মাঝে কখনো মেয়েদের পাইনি আমরা। এ সব হামলা নিতান্তই পৌরুষের মামলা; নিতান্তই পৌরুষের তার লক্ষণ আরো আছে; আমরা দেখেছি, আক্রান্তরা মেয়ে হলে হামলার ধরন কিভাবে বিবিধ হয়ে ওঠে।

হামলাকারীদের বিবিধ ঐক্য খেয়াল করলে আমরা দেখবো, বাঙালি বা বাংলাদেশী বা মুসলিম বা পুরুষ—কোনটাই রক্ষাতাবিজ নয়; বরং এসব পরিচয়ে মিলিত হয়েই আক্রমণ করছে হামলাকারীরা; এ সব পরিচয় নিজেই অফেনসিভ অন্যের প্রতি।

ফলে রাজনীতির এ পক্ষ-ও পক্ষ, যাঁরা এসব পরিচয় দিয়ে আক্রান্তকে রক্ষা করতে চান, তাঁরাই আসলে হামলাকারী; রক্ষার নামে তাঁরা এ সব পরিচয় প্রচার করেন, শিক্ষা দেন এবং সংগঠিত করেন মানুষকে/পুরুষকে; এ সব পরিচয়ের মাঝে আবার এমবেডেড থাকছে শত্রুর ধারনা। পরিচয় দিয়ে সংগঠিত এঁরাই আক্রমণ করছে সেই সেই পরিচয়ের অনুমিত শত্রুদের।

অন্যকে আক্রমণকারী এসব পরিচয়ে বুঁদ হয়ে থাকা যাবে না; নিজের পরিচয় কিভাবে তৈরি করা যায় তা মেয়েদের কাছে শিখতে পারি আমরা। এই সমাজে মেয়েদের বাস করাই এক ধরনের শিক্ষকতা। মেয়েরা মুসলিম বা বাঙালি বা বাংলাদেশী; কিন্তু হামলাকারী নয়। এবং মেয়ে, পুরুষ নয়; ফলে হামলাকারী নয়। আমরা ছাগল পালি, গরু পালি; আমাদের মাঝের মেয়েরা আরো বেশি পালে কালচারালি; তাঁরা হাঁস-মুরগী-মানুষে বাচ্চাও বেশি বেশি পালে। অন্যকে আক্রমণ না করা যদি আদমতার একটা লক্ষণ হয় তাহলে আরো বেশি ‘পালন’ শিখতে হবে আমাদের; পৌরুষ থেকে আদমতার দিকে যাইতে আরো বেশি ‘মেয়েলি’ হয়ে উঠতে হবে আমাদের।

মেয়েদের যাঁরা ‘ঝগড়াটে’ বলে নিন্দা করেন তাঁরাও একটু ভাবলেই বুঝবেন—ঝগড়া নিতান্তই এক সমঝোতার চেষ্টা; ভাবনার মধ্যে ‘খুন করা’ না থাকলে ঝগড়াই করবেন আপনি, সমঝোতার জন্য।

১৮ জুন ২০১৪