দেশেই সুইস ব্যাংকিং-এর সুযোগ দিলে লাভ বেশি

সুইজারল্যান্ড ধনী; বলা যায় নিরপেক্ষতার ব্যবসা করে ধনী। আর ব্যাংকিং-এর কথা তো বলতেই হবে; তবে সেটি ওই নিরপেক্ষতার ব্যবসারই পার্ট। বাংলাদেশও জোটনিরপেক্ষদের দলে; ‘নিরপেক্ষতা ব্যবসা’র সুইস মডেল দিয়ে ধনী হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশও।ফ্রান্স,  বৃটেন, পর্তুগাল, ডেনমার্ক—এসব দেশের মতো কলোনির কামাই দিয়ে ধনী হয় নাই সুইজারল্যান্ড; জার্মানীর মতো প্রতিবেশিরে দখলও করে নাই সে। তবু ইউরোপের অধিকাংশ দেশের চাইতেই ধনী সুইজারল্যান্ড; মাথাপিছু কামাই প্রায় সবার চাইতেই বেশি (৩ নম্বর)।সুইজারল্যান্ডের ধনের গোড়ায় আছে ‘ব্যাংকিং প্রাইভেসি’। সারা জগত থেকেই টাকা জমা হতে থাকে সে দেশের ব্যাংকে। লুক্সেমবার্গ আছে সুইসদেরও উপরে; তারও ধনের গোড়া ব্যাংকিং-এ।

-------------------------

জগতের কালা টাকা গিয়ে জমা হয় সুইজারল্যান্ডে; নাম্বার্ড একাউন্টের ব্যবস্থা আছে। সরকারের কাছে গ্রাহকদের নাম-ধাম-টাকা প্রকাশে বাধ্য নয় সুইজারল্যান্ড। তবে এখনকার কাস্টমারদের টাকা বাদেই সুইস ব্যাংকগুলি ধনী। কেননা, দুইটা বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কামাই হয়েছে সুইস ব্যাংকগুলিরই। কোনটাতেই পক্ষ নেয় নাই সুইসরা; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘হলোকাস্ট মানি’ জমা হয়েছে সুইস ব্যাংকে; যুদ্ধে জার্মানরা হারায় সেই টাকা ভোগ করতে পারে নাই নাৎসি জেনারেলরা; সেই টাকা এখন ব্যাংকের।

বিপুল আন্তর্জাতিক চাপে বহু টাকা ফেরত দিতে হলেও সুইস ব্যাংকে নাৎসি জেনারেলদের জমানো সোনা আর টাকাতেই সুইস ব্যাংক ধনী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও ভালো কামাই হইছিলো তাদের।

বিপরীতে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলি বান্ধা ছাগল। সুইস এক্সপেরিয়েন্স খেয়াল করলেই বুঝবেন ছাগল ছেড়ে দিলে হাতি হয়ে উঠতে পারে। বান্ধা ছাগল ছেড়ে দিতে হবে আমাদের।

দেশের টাকা মেরে আর গ্লোবাল ডাস্টবিন থেকে যে কয়টা কালা টাকা আছে বাংলাদেশের নাগরিকদের সেইটা খুব অল্পই; অল্প, যদি আপনি তুলনা করেন ভারতীয়দের কালা টাকা বা পাকিস্তানী জেনারেলদের কালা টাকা, এমনকি মায়ানমারের জেনারেলদের কালা টাকার সাথে; তুলনা করতে পারেন চীনা কালা টাকার সাথেও। বাংলাদেশের তো বটেই, এইসব প্রতিবেশিদের কালা টাকাও চলে যাচ্ছে সুইস ব্যাংকে; অথচ আমাদের বান্ধা ছাগল ব্যাংকগুলিরে ছেড়ে দিলে আমরাই হতে পারতাম এইসব প্রতিবেশির আমানতদার। বাংলাদেশে টাকা রাখা তাদের জন্যও সবচে কস্ট এফেক্টিভ।

এদিকে, ভারত, পাকিস্তান ও চীন—তিনটাই নিউক্লিয়ার পাওয়ার; সম্পর্কে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাবও আছে একটা। ওই রকম সম্ভাব্য একটা যুদ্ধে ‘নিরপেক্ষতার ব্যবসা’ ভালো হবার কথা বাংলাদেশের। যুদ্ধে মারা যাবে বহু কাস্টমার; তাদের টাকায় ধনী হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ব্যাংক। তারেক রহমান হোক আর হানিফ হোক—তারাও দেশেই টাকা রাখতে পারবে; দেশে টাকা থাকলে তার সুবিধা পাবেই দেশ, সে যত অল্পই হোক!

নিরপেক্ষতার ব্যবসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা আরো বাড়ছে; কারণ, খোদ সুইজারল্যান্ডেই কড়াকড়ি শুরু হয়েছে গত ২/১ বছরে। কড়াকড়ি আরো বাড়াবার প্লান আছে সুইস সরকারের। এমন একটা সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলি যদি একটা ‘এস্কেপ রুট’ অফার করতে পারে তাহলে সুইস ব্যাংকের কাস্টমাররাই তাদের টাকা সরিয়ে আনতে পারে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে জমা হওয়া টাকার ব্যবহারও হবে বাংলাদেশে, বিনিয়োগ হবে; ওই রকম সম্ভাব্য কোন যুদ্ধে বাংলাদেশকে রক্ষা করা নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে নিতে বাধ্য হবে যুদ্ধরত পক্ষগুলি। প্রত্যেকেরই স্বার্থ আছে বাংলাদেশে।

তবে, ট্রান্সপারেন্সি নিয়ে উঁচা গলা বিভিন্ন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান চাপ দেবে বাংলাদেশকে। এ ধরনের চাপের কারণেই সুইজারল্যান্ড ব্যাংকিং কড়াকড়ির দিকে যাচ্ছে। তবে সেই চাপের বড়ো কারণ সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কামানো সোনা আর টাকা, যার একটা বড়ো অংশই হলোকাস্ট মানি। বাংলাদেশের বেলায় সেই ঘটনা থাকছে না। ফলে বাংলাদেশের আর্গুমেন্ট হবে-সেই সেই দেশের এফিসিয়েন্সির উপর জোর দিতে বলা।

বাংলাদেশের সব সেক্টরেও দুর্নীতি বিষয়ে কড়াকড়ি তৈরি করতে হবে। কালা টাকা জমা হবার পেছনে জনগণের/দেশের টাকা মারার ঘটনা না থাকে সেটি নিশ্চিত করা দরকার। এ ক্ষেত্রেও সুইজারল্যান্ডকে স্টাডি করা যেতে পারে। হিউজ ব্যাংকিং প্রাইভেসি থাকার পরেও সে দেশ দুর্নীতির সূচকে ভালো অবস্থানে আছে। এর অর্থ হলো—প্রশাসন এবং লিগাল সেক্টরে ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিত করা হয়েছে সুইজারল্যান্ডে।

ব্যাংকিং কড়াকড়ির মধ্য দিয়ে দুর্নীতি উচ্ছেদের চেষ্টা সবচে দুর্বল নীতি। কারণ, এটি বিভিন্ন দুর্নীতি হবার পরের ঘটনা; ধরেন, রাস্তার কাজ বা ফ্লাইওভারের কাজ ঠিকঠাক না করে, জনগণকে জীবনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলার পর্যায়ে দুর্নীতি রোধ না করে ব্যাংকে টাকা রাখার সময়ে ধরাটা চূড়ান্ত প্রশাসনিক এবং আইনী ব্যর্থতার পরের ঘটনা। দুর্নীতি ঘটা ঠেকাতে হবে; রোগ হতে দিয়ে, এমনকি হতে সাহায্য করে রোগীকে হত্যা করাটা সাফল্য নয় কোন।

২ জুলাই ২০১৪