টাকা মারার বলিউড স্টাইল

অনিল কাপুরের মতো ঘন গোঁফ নাই ওবায়দুল কাদেরের; তবু নায়কের গোঁফ থাকতে হয়; অন্তত বলিউডি নায়কের গোঁফ থাকা দরকার; গোঁফ-ই নায়কোচিত বলিউডে, অনিল কাপুরের অবদান এটা। আমাদের যোগাযোগমন্ত্রীর আছে অনিল কাপুর সিন্ড্রোম; পাতলা গোঁফ নিয়াই চ্যালেঞ্জটা নিছেন তিনি।

হাজি সেলিম এমপি কাদের সাহেবকে বলিউডের ‘নায়ক’-এর সাথে তুলনা করছিলেন। ‘নায়ক’ মানে শিবাজি রাও, মানে অনিল কাপুর, ২০০১ সালের বলিউডি সিনেমা এক।

-------------------------

শুরুতে বলিউডি ‘নায়ক’ বুঝে নেই আমরা। ‘মদ্দা’ মানুষ হতে হবে ‘নায়ক’কে। অ্যাপিয়ারেন্স-এ তার প্রমাণ রাখতে হবে; গোঁফ-ই সেই ব্যাটাত্ব বা পৌরুষ, আসল মদ্দাভাব। শিবাজি রাও অনিল কাপুরের সেই গোঁফ আছে। ইন্দোরের রাজা ঐতিহাসিক শিবাজি রাওয়ের পাকানো গোঁফ ছিলো। তাঁরও আগে মুঘলদের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা মারাঠা বীর ছত্রপতি শিবাজি’রও গোঁফ ছিলো, তলোয়ারের মতো বাঁকা; দাড়িও ছিলো তাঁর। তবে আশ্চর্য হবেন আদি শিবের ছবি/মূর্তি দেখলে। সেই পৌরাণিক দেবতা শিবের গোঁফ নাই, দাড়িও নাই; কোমল, নির্লোম, ভিতরে হালকা চর্বিতে টানটান চামড়া!

সেই পৌরাণিক যুগ আর নাই; মধ্যযুগের ভারতবর্ষের মদ্দা বীরদের বাহারি পাকানো গোঁফ পাওয়া যাচ্ছে। বলিউডের আসল ‘নায়ক’-এর সেই গোঁফ থাকে; ফলে এই ‘নায়ক’ মদ্দা; আর মদ্দার তো আরো পাকা পরিচয় আছে; বলিউডের ‘নায়ক’ নাগরিকরা তাই রেপ করে এখন; একা করে, কয়েকজন মিলে করে; সাদা চামড়ার ঔপনিবেশিক অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয় এই নায়কেরা; সাদা মেয়ে পর্যটক বা সাদা সাংবাদিক ধরে গণরেপ করে। গোঁফের বীরত্বের পরিচয় এই রেপ।
কাদের সাহেবের গোঁফ পাতলা; তবু তিনি মদ্দা, ঐ পাতলা গোঁফেই বলে দেন তিনি হাসিনা নন, নন খালেদা; তিনি শিবাজি রাও, তিনি অনিল কাপুর, তিনি নায়ক। ফলে কাদের সাহেবের পৌরুষ আপাতত রাস্তায় আছে; এই নায়ক তাঁর পৌরুষের স্টেটমেন্ট পরে আর কী কী ভাবে দেবেন জানি না আমরা; তবে এই পৌরুষ আপাতত রাস্তায় কী কী নায়কোচিত কামাই করছে তার হিসাব-নিকাশ করা যায় বটে।

ঈদে সরকারি কর্মকর্তারা বোনাস পান, অন্যান্য চাকরিজীবীরাও বোনাস পান; কিন্তু ঠিকাদাররা? অতীতের ধারাবাহিকতায় টেন্ডার সরকারি দলের ঠিকাদাররা পাচ্ছেন; নিজের দলের এই কর্মীদের প্রতি নেতার সবিশেষ দায়িত্ব আছে বটে; তাদেরকে পাইয়ে দিতে হবে ঈদের বোনাস! ‘নায়ক’ কাদের সাহেবের পাতলা গোঁফের দারুণ পৌরুষ সেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।
ঈদের আগেই সারাদেশের রাস্তা মেরামত করছেন যোগাযোগমন্ত্রী; এই হুলুস্থুলু কর্মে একটা দরকারি প্রশ্ন চাপা পড়ে গেল—রাস্তাগুলো ঠিক করার কয়েক মাসেই এমন কেন হচ্ছে? রাস্তার এক্সপেক্টেড আয়ু কি ৬ মাস? ঈদের আগে কোন রকমে ঠিক করায় আশা করা যায় কোরবানির বোনাসের ব্যবস্থাও করে দিতে পারবেন কাদের সাহেব।

রাস্তার কাজে কয়েকটা পর্ব থাকে; মাটি বা বালু দিয়ে ভরাট করার পর কয়েকদিন সময় দিতে হয়; পিচ ঢালাইয়ের পর্বগুলিও নির্দিষ্ট বিরতিতে করতে হয়; পর্যাপ্ত পাথর-ইটের টুকরা দিতে হবে; রোলার দিয়ে ঠিকভাবে মই দিতে হবে, পর্যাপ্ত চাপে সমান করতে হবে; এগুলি ঠিকভাবে বসে যেতে সময় লাগে। ঈদের আগে কি সেই সময় আছে? নেই। তাহলে? আসলে দুই মাসের জন্য ঠিক করা হচ্ছে রাস্তা; আড়াই মাস পরেই কোরবানি; তার আগেই আবার খানা-খন্দ হওয়া দরকার রাস্তায়, ভাঙ্গা দরকার; নইলে কোরবানি দেবে কিভাবে আওয়ামী লীগের কর্মী-ঠিকাদাররা? সারা দেশের রাস্তা কোরবানির আগেই ঠিকভাবে না ভাঙ্গলে কোরবানির বোনাস হবে না তো!

বছরে কর্মীদের দুইটা করে বোনাস দিতে হলে রাস্তা ভাঙ্গা দরকার, এইটা সরকারি দলের কর্মীদের মাঝে বোনাসের ব্যবস্থা করার জন্য দরকারি সিডিউল।
টাকা মারার বলিউডি স্টাইল এইটা। আপনি মারবেন টাকা, কিন্তু যেই জনগণের টাকা মারছেন তাঁরাই হাততালি দেবে আপনার নায়কোচিত কর্মে। হিন্দুধর্মে শিব দেবতা; দেবতার দায়িত্ব আছে উপাসকদের ভরণপোষণের। কাদের সাহেবের মতো একজন শিব নেতা থাকলে, দেবতা থাকলে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভালো মোটাতাজা হইতে পারবেন।