খলিফাকে যেভাবে দখল করলো গাজার বাচ্চারা

গাজায় ইসরায়েলী হামলার ঠিক আগে বিশ্ব মিডিয়া নিয়ে ভাবা যাক। গ্লোবাল ইস্যু তখন দুটি—বিশ্বকাপ ফুটবল এবং ইরাক পরিস্থিতি। এর বাইরে সকল ইস্যুই আঞ্চলিক। বাংলাদেশের মিডিয়ায় যেমন দেশীয় রাজনীতি, সুইস ব্যাংক বা ভারতের সাথে সম্পর্ক বা নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন বা যুদ্ধাপরাধের বিচার ইত্যাদি।

গ্লোবাল ইস্যু দুটির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশ্বকাপ ফুটবল পিছিয়ে পড়ছিলো সম্ভবতঃ। তাছাড়া ওটি নিতান্তই এন্টারটেইনমেন্ট; আসল টেনশন তৈরি করছিলো ইরাক পরিস্থিতি। নতুন নতুন এলাকা দখল করছিলো আইসিস, এক পর্যায়ে ইরাকে খিলাফত ঘোষণা করলো তাঁরা। ইরাকের সরকার কোণঠাসা, আমেরিকা নতুন করে সৈন্য পাঠাচ্ছে, ইরাকে আমেরিকান নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে ওবামা প্রশাসনকে। ইরাকের নূরি মালিকির সরকারকে সাহায্য করতে আগাচ্ছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে টেনশনের কেন্দ্র হয়ে উঠলো ইরাকের খিলাফত, নতুন খলিফা—আবু বকর আল বাগদাদী।

-------------------------

মুসলিমদের মাঝে খিলাফতের বিপুল মিনিং আছে; খলিফা দুনিয়ার সব মুসলিমের নেতা; বাগদাদী ক্লেইমও করলেন সেইটা, আনুগত্য চাইলেন বিশ্ব-মুসলিমের, মধ্যপ্রাচ্যের সব বাদশাহ-শেখদের উৎখাতের শপথ নিলেন।

দুনিয়ায় আলোচনা শুরু হলো—এ কি নতুন তালেবান? ইরাক কি টিকবে? ভাগ হয়ে যাচ্ছে, নাকি পুরা ইরাক দখল করে ফেলছে আইসিস? সাদ্দামকে ফাঁসি দেওয়া জজের মৃত্যুদণ্ড দিলেন খলিফা সরকার।

বিশ্ব-মিডিয়ায় হেডলাইন আর ছবিতে পরিচিত হয়ে উঠছেন খলিফা বাগদাদী; দুনিয়ার মোসলমানের মনেও কি ঢুকে যাচ্ছিলেন ক্রমেই?

উম্মাহ’র আইডিয়ায় বিশ্বাসী জেহাদি মুসলিমদের আনুগত্য পাইতে বেশ কিছু সমস্যা ছিলো বটে; খলিফা বাগদাদী সূন্নী, যুদ্ধ করছে ইরাকের শিয়াপ্রধান সরকারের বিরুদ্ধে; শিয়া ইরান খলিফাকে থামাতে চাচ্ছে; মধ্যপ্রাচ্যের সূন্নী সরকারগুলিও খলিফাকে স্বীকৃতি দেবেন না। তবু বাংলাদেশের মতো দূর দূর দেশের মোসলমানদের মাঝে অর্থ অন্যরকম আসলে। উম্মাহ’র আইডিয়ায় বিশ্বাসী বাংলাদেশের সূন্নী মোসলমানরা শিয়া ইরানের সাফল্যে আনন্দিত হয়, শিয়া-সূন্নীর ডিলেমা থাকে না মোটেই; এছাড়াও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শিয়া-সূন্নী বা ইসলামের অন্যান্য ভাগাভাগি আপাতত স্থগিত রাখতে চান রাজনৈতিক ইসলামের বক্তারা। ফলে মোসলমানের যেকোন শক্তিশালী রাজনৈতিক আবির্ভাব নতুন জেহাদি উদ্যম তৈরি করবে ইসলামপন্থিদের মাঝে।

খিলাফতকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থিদের সম্ভাব্য এই উদ্যম ঠেকানো দরকার বহু পক্ষের। পশ্চিমের ঠেকানো দরকার, আরব বাদশাহদের ঠেকানো দরকার, মিসরের সিসি’র ঠেকানো দরকার, বিশ্বব্যাপী সাম্প্রতিক মজহাব ‘বিজ্ঞানমনস্ক মুসলিম’দেরও দরকার। আল কায়েদা, তালেবান বা মুসলিম ব্রাদারহুড-ই সামলানো কঠিন হচ্ছে; এর মাঝে নতুন জ্বালাতনের উদ্ভব ঠেকানো দরকার।

গাজায় ইসরায়েলী আক্রমণের ফলে যা যা ঘটলো তাতে ঠিকভাবে হিসাব করলে এই আক্রমণকে একটি অ্যাসাইনমেন্ট মনে হতে পারে; এবং এই অ্যাসানমেন্ট সফলভাবেই সমাধা করে যাচ্ছে ইসরায়েল।

এই আক্রমণের পরে বিশ্ব-মিডিয়া আক্রান্ত গাজার ছবিতে ভরে উঠলো; গাজায় হামলা কিভাবে ইসরায়েলীরা পাহাড়ের মাথায় সোফা নিয়ে উপভোগ করছে সেই ছবিও প্রকাশ করছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। হতাহত শিশু-নারীর ছবি প্রকাশ করছে বিশ্ব-মিডিয়া। খলিফা বাগদাদীর ছবির জন্য বরাদ্দ জায়গায় কাঁদছে গাজার শিশু। ব্ল্যাক-আউটের নতুন সিস্টেম এটি। ঘটনার গুরুত্বের কারণে যাকে রাখতে হচ্ছে মিডিয়ার প্রাইম লোকেশনে অথচ রাখাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, ব্ল্যাক-আউট করা দরকার সেই ঘটনা।

কিন্তু ব্ল্যাক-আউট আর সোজা নেই আগের মতো; এখন সিটিজেন জার্নালিজমের এজ, সোস্যাল মিডিয়ায় দুলছে মানুষ, ব্ল্যাক-আউটের পরেও বড়ো ঘটনাকে বড়ো বলে বুঝে ফেলছে মানুষ। ব্ল্যাক-আউট করতে হলে এখন দরকার আরো বড়ো ঘটনা, আরো বেশি আবেগ উথলানো খবর-ছবি। গাজা-ই সেই ঘটনা, ইসরায়েল যার ম্যানুফ্যাকচারার।

এখানেই শেষ হয় নাই এই হামলার অর্থ; বিশ্ব-মুসলিমের কাছে খলিফার পরিচয়ও পরিষ্কার হলো এই ঘটনায়। ইরানসহ অন্যদেরও! গাজার পাশে দাঁড়াবার ঘোষণা দিলেন না বাগদাদী; গাজার পাশে দাঁড়াবার তাৎক্ষণিক জেহাদে না নেমেও বাগদাদী কি পর্যাপ্ত জেহাদি হিসেবে গ্রহণযোগ্য থাকতে পারবেন? অসম্ভব; আফ্রিকার আল-কায়েদা জানালো–বাগদাদীকে রিকগনাইজ করছে না তারা; গাজার সূন্নী মোসলমানের পক্ষে কিছুই বললো না ইরান; মিশরের সিসি-ই যেনবা গাজার আসল বন্ধু–ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করালো সিসি!

ফলে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় মরা শিশুর ছবি বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশ অতটা গাজাফেন্ডলি না আসলে; ওইটা বরং বাগদাদীর দখল হয়ে যাওয়া; মরা শিশুর ছবি খুন করে ফেলে বাগদাদীর জেহাদি ক্রেডিবিলিটি।

উল্টা দিকে, ইসরায়েলকে হামলা থামাতে বললো ওবামা, জাতিসংঘ; গাজার বন্ধু এনারা। আর ইসরায়েল? নতুন কোন ক্ষতি কি তার হলো এই অ্যাসাইনমেন্টে? নাহ্, ইসরায়েলকে ঘেন্না করতেন যাঁরা তাদের ঘেন্না অক্ষূণ্ন থাকলো বটে; কিন্তু খলিফার প্রভাবশালী হইয়া ওঠা তো আরো বেশি ঠেকানো দরকার খোদ ইসরায়েলেরই।

১৬ জুলাই ২০১৪