কেমন আছি, কী করবো আমরা?

গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিপরীতে হেফাজতের দাবিগুলিকে স্থাপন করে প্রথম আলোর বিজ্ঞাপন পাইলাম আমরা। ধরা যাক, এই দুইদল পরস্পরের শত্রু; হেফাজত পিছাইয়া যাবার পরেও আমরা কি অন্য পক্ষকে খেপাইয়া তুলতে থাকবো? হেফাজত দেখলেই যে গার্মেন্টস শ্রমিকরা আক্রমণ করে সেই লক্ষ্যে কাজ করবো? সমাজের একটা বড়ো দলের মাঝে প্যানিক তৈরি করবো অন্য দল সম্পর্কে? মারামারি থেকে যে পিছাইয়া গেলো তাঁরে মারামারিতে ফেরত আসতে বাধ্য করবো?

আমরা মনে করে দেখতে পারি এক সময়ের জনকণ্ঠ পত্রিকার কথা; ডেঙ্গু জ্বরের প্যানিক আর গ্লোব কয়েলের বিজ্ঞাপন ছাপার কথা। আপনারা ভাবলে প্রথম আলোর বিজ্ঞাপনে গ্লোব কয়েল পাইবেন; আমি কিছু হেল্প করতে পারি অবশ্য:

-------------------------

বিজ্ঞাপনে দেখবেন, গার্মেন্টসের মহিলা লেবার দেশের রপ্তানী নিয়া খুব চিন্তিত বা দেশের ইকোনমির উন্নয়ন। গার্মেন্টস-এ বিভিন্ন আন্দোলনের সময় মালিকদেরো রপ্তানী এবং ইকোনমি নিয়া চিন্তিত দেখা যায়; সরকার ও সিভিল সোসাইটির একাংশকে বেশ মিত্র হিসাবে পাওয়া যায় তখন; আগুন বা বিল্ডিং-এর সিকিউরিটি নিয়া মিডিয়ায় আলাপ উঠলে ভাবমূর্তি নষ্টের অভিযোগ করেন মালিকরা, তাতে নাকি রপ্তানী চুলায় যাবে। তো এই রপ্তানী এবং ইকোনমি নিয়া লেবারদেরো যদি বেশ চিন্তা করতে শিখানো যায় তাইলে তো তাঁরা দেশের জন্য শহিদ হবার প্লেজার নিয়া পুড়তে পারবে, আণ্ডার দাম বাড়লে তাঁরা ইনক্রিমেন্ট চাইয়া রাস্তা আটকাইয়া ভাবমূর্তি নষ্ট করবে না, বা প্রথম আলোর বিজ্ঞাপনেই তো এনাফ প্রোটিন পাইতে থাকবে তাঁরা। আমাদের কালচারাল শিক্ষার মাধ্যমে চুলার সাথে মহিলাদের ভালো পরিচয় আছে, বাচ্চার হাত যেন চুলায় না যায় সেইটুক টেক কেয়ার তো করবেই, শরীর অপুষ্ট হইলেই কি স্নেহ ভোলে? উই জাস্ট হ্যাভ টু মেক দেম লার্ন হাউ টু থিংক লাইক গার্ডিয়ান এঞ্জেলস্।

কিছু জিনিস পরিষ্কার ভাবতে পারতে হবে আমাদের। কতগুলি বাস্তবতা মানতে হবে। যেমন প্রতিবেশি বা সমাজের সদস্য বা নাগরিক আমরা অপছন্দ করি তেমন মানুষ থাকবে আমাদের কাছে, তাদের সাথে দেখা হবে, একসাথে চাকরি করতে হবে, নামাজ পড়তে হবে, পানাহার করতে হবে, বাসে চড়তে হবে, কখনো এক রুমে থাকতেও হবে হয়তো। আমাদের অপছন্দের মানুষকে খুন করে ফেলার হক নাই আমাদের। আমরা বড়োজোর পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম বা বন্ধুত্ব এড়াইয়া চলতে পারি তাদের সাথে। কী কী করতে পারি তাদের সাথে তার লিমিট আছে, মানতে হবে আমাদের।

না মানলে কী কী হতে পারে সেগুলি পরিষ্কার বোঝা দরকার। হেফাজতে ইসলাম দিয়েই শুরু করা গেলো। কতগুলি দাবি উত্থাপন করেন তাঁরা; সেই দাবিগুলির বিপক্ষে বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়—সমালোচনা করেন অনেকে, মিছিল-মিটিং করেন। একদল দাবি করবেন, আরেক দল বিপক্ষে দাঁড়াবেন; তর্ক হবে সমাজে, কোন নীতির ফলাফল কেমন হবে সেটি এই ধরনের তর্কাতর্কির মাধ্যমেই বুঝতে পারবো আমরা; নতুন কোন নীতিমালা আরোপ করার আগেই তার ফলাফল সম্পর্কে অনুমান করতে পারা ভালো; এই ধরনের তর্কের মাধ্যমেই তেমন অনুমান তৈরি হতে পারে। সমাজের জন্য এইসব তর্ক খুবই দরকারি।

তর্কের মাধ্যমে সম্ভবত পরিষ্কার অনুমান করা গেলো যে হেফাজতের দাবিগুলি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে অ্যাকোমোডেট করা যায় না। কিভাবে বুঝলাম এইটা? দ্যাখেন, হেফাজতের সাথে কতকটা রাজনৈতিক ঐক্য আছে তেমন দুইটা রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামাত। কিন্তু ওই দাবিগুলির ব্যাপারে বিএনপি বা জামাতের কোন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেখা যায় নাই। টিভিতে দেখছিলাম সেই সময়, বিএনপির একজন নেতার কাছে একবার দাবিগুলির ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান জানতে চাওয়া হইছিলো। তিনি বলছিলেন, বিএনপি ৩/৪ বার ক্ষমতায় থাকলেও ওই দাবিগুলির কাছাকাছি কিছুই করে নাই, করার কোন চেষ্টাও করে নাই। সমাজ/নাগরিকদের উপর ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপের ব্যাপারে দুই দলের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য আরো কিছু তথ্য মনে করে দেখতে পারি আমরা। আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাম ছিলো রেসকোর্স ময়দান; সেখানে ঘোড়দৌঁড় এবং তা নিয়ে বাজি ধরার রেওয়াজ ছিলো। ৭১-৭৫ আওয়ামী লীগ সরকার সেগুলি নিষিদ্ধ করে, একই সাথে মদ খাওয়াও নিষিদ্ধ করে। ‘সেক্যুলার’ সেই সরকার মনে রাখে নাই বাংলাদেশের খ্রীস্টানদের কথা—খ্রীস্টানদের ধর্মীয় উৎসবে ওয়াইন/মদের প্রয়োজনীয়তার কথা। বাঙালি বাদেও যে জাতিগুলি বাস করে বাংলাদেশে তাও মনে রাখে নাই; পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করা জাতিগুলির প্রধান উৎসব বিজুতে মদের প্রয়োজনীয়তার কথা। বিপরীতে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এই বিধিনিষেধ কতকটা শিথিল করেন, তিনি কতগুলি বারের লাইসেন্স দেবার ব্যবস্থা করেন। ইদানিং কালেও আমরা দেখছি শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে নামাজ পড়তে বাধ্য করতে চাইছেন নিজের ধর্মাচারের ঘোষণা দিয়া। খেয়াল করলেই দেখতে পাবো আমরা যে, খালেদা জিয়াও পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েন—তেমন কোন ঘোষণা বিএনপির কাছ থেকে আসে নাই। বিএনপি এভাবে রাজনীতিতে ব্যক্তিগত ধর্মাচার গুরুত্বপূর্ণ হইয়া ওঠা ঠেকাইয়া দিছেন; খালেদা জিয়াকে আমাদের ধন্যবাদ দেওয়া উচিত যে, তিনি শেখ হাসিনার সাথে ধর্মাচারের প্রতিযোগিতার প্রদর্শনীতে নামেন নাই।

অন্যদিকে,  বাস্তবতা হিসাব করলে দেখা যাবে, হেফাজতও মানছে যে দাবিগুলি বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিভাবে? আমরা কি দেখি নাই যে, কোন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়াই হেফাজত সিলেট এবং গাজীপুরের নির্বাচনে বিএনপি জামাতের পক্ষে কাজ করছিলো হেফাজত? কয়দিন আগে মাওলানা শফী কি বিএনপির দাবি নির্দলীয় সরকারের পক্ষে বিবৃতি দেয় নাই? এমনকি দাবিগুলির পক্ষে হেফাজতও এখন আর কথাবার্তা বলছে না। এই যে দাবি উত্থাপন এবং পিছাইয়া যাওয়া, কার সঙ্গে কার রাজনৈতিক মৈত্রী কদ্দূর বিস্তৃত—এগুলি বুঝতে হবে আমাদের।

প্যানিক তৈরির আরো প্রয়োজন আছে আসলে, আছে তৈরির উপায়ও। বিএনপিরে ‘বৃহত্তর জামাতে ইসলামী’ বলাটা দেখতে পাই বিভিন্ন জায়গায়; হেফাজতকেও জামাত বলছিলেন অনেকে। কওমী মাদ্রাসার সাথে জামাতের পুরানা বিরোধ আছে; আমরা কি সেই বিরোধ মিটাইয়া ফেলার ব্যবস্থা করবো হেফাজতকে জামাত হিসাবে দেখে? হেফাজতকে জামাতের দিকে ঠেলে দিয়ে কী কী লাভ করতে চাইছি আমরা? আবার বিএনপি-জামাত-হেফাজত একই হলে দেশের কত ভাগ নাগরিক জামাত হয়—অন্তত ৫০%? আরো বেশি নিশ্চই। এই ৫০% নাগরিক নিয়া কী করবেন আপনি? একাত্তরে জামাত কত ভাগ ছিলো—০.৫%? এই ৪২ বছরে জামাত যদি ১০০ গুণ হয় তাহলে কী রাজনীতি করলেন আপনি? এভাবে আমাদের সকল বিপক্ষকে জামাত হিসাবে দেখার ফলাফল ক্লিয়ার থাকা দরকার আমাদের কাছে।

প্রথম সমস্যা হলো—আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাচারের চূড়ান্ত লাইসেন্স পায় এভাবে ভাবলে। এরকম একটা প্যানিক গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা ভুলিয়ে দেয় আমাদের। বিএনপিরেও যদি জামাত হিসাবে দ্যাখেন তাহলে একাত্তরে  ব্যাড মেমোরি তৈরিতে জামাতের ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগের অল্টারনেটিভ হিসাবে বিএনপিরে একদমই ভাবতে রাজি হতে পারেন না আপনি; আওয়ামী লীগ কি সেইটা বোঝে না যে, আপনি নিরূপায়? আপনার মতামতকে আর কোন গুরুত্ব দেবার দরকার থাকে আওয়ামী লীগের? আপনাকে আসলে সমালোচনাই বন্ধ করে দিতে হয় আপনার, যদি কোন ক্ষতি হয় আওয়ামী লীগের! আওয়ামী লীগের লুটপাটের পক্ষে থাকতে হয় আপনার; অন্য দেশের সাথে আমাদের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করলেও চুপ থাকতে হয়; চূড়ান্ত রাজনৈতিক নির্যাতন করতে সাহসী হইতে পারে। বিচার ব্যবস্থা সরকারের ইচ্ছা মতো চলতে দেখলেও আপত্তি করতে পারেন না আপনি। ইভেন আপনি হয়তো আরো আগলি হইয়া উঠতে থাকেন; দেশের ওই ৫০% কে সরকার পাইকারি খুন করতে থাকলে আপনি সেইটাতে সায় দিয়ে ফেলতে পারেন।

স্বেচ্ছাচারের অভিজ্ঞতা আরো আছে আমাদের। কী লাভ হইছে আমাদের? নির্বাচিত প্রেসিডেন্টসহ আমাদের ফাইট ফর ফ্রিডমের নায়কদের খুন হবার খবরেও বিচলিত হয় নাই দেশের মানুষ। যেই জেনারেলদের বিরুদ্ধে ফাইট করতে করতে বাংলাদেশের পয়দা সেই রকম একজন জেনারেলকেই দেশের বহু মানুষ রাজনৈতিক ত্রাতা হিসাবে গ্রহণ করলো! সেই জেনারেল প্রেসিডেন্টও খুন হইতে দেখলাম আমরা; পরে আরেক জেনারেল পাইলাম, দেশের মানুষ তাঁরে খুব একটা গ্রহণ না করার পরেও দশ বছরের আগে তারে উৎখাত করতে পারি নাই আমরা। আরো জেনারেল পাইছি আমরা; বেসামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হাড়গোড় ভেঙে দেবারো স্মৃতি আছে আমাদের। নির্বাচন কমিশনার বানাইয়া জেনারেলদের কাছে গণতন্ত্র শিখতে হয় এখন আমাদের, রাষ্ট্রীয় বীমা কোম্পানি থেকে টেলিফোন বোর্ড পর্যন্ত জেনারেলদের ডিরেক্টর হিসাবে দেখতে পাই আমরা। পুলিশ নাগরিকদের তুই-তোকারি করে, আমলাদের মাথার সাদা চুল বেছে দিতে হয় আমাদের, আমাদের বিনয়ের হাসিতে নাইতে নাইতে লম্বা হতে থাকে আমলার যৌবন।

এর শুরু রাজনীতিকদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং অসহিষ্ণুতা থেকে; রাজনীতিকদের স্বেচ্ছাচারী এবং অসহিষ্ণু  হবার সুযোগ দিয়ে এই অবস্থা বানাইছি আমরা। ভোতা চিন্তা এবং অযথা প্যানিকে আমাদের দূরবস্থার পার্পেচুয়েশন ঘটতে থাকে।

কিন্তু আমাকে বেশি বিচলিত করে কতগুলি নতুন গুণ যেগুলি নতুন তৈরি হতে থাকছে আমাদের মাঝে। খেয়াল করলে দেখবো, এমন কতগুলি গুণ আছে যেগুলি অন্যদের মাঝে দেখতে চাইছি না আমরা—অথচ সেগুলি আমাদের মাঝেই আছে। কয়দিন আগে ফেসবুকে আমার একটা স্ট্যাটাসের পাঠকদের বেশিরভাগ আমারে পোড়াইয়া মারতে চান। কারণ কি, তাদের রিডিং হলো—আমার ওই স্ট্যাটাসে বর্তমানের আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলিকে সমর্থন দিচ্ছি আমি। গ্রামীণ ফোনে চাকরি করছে এমন একজন ছেলে কমেন্টার অভিশাপ দেন; বলেন– তাঁর সব অভিশাপ ফলে গেছে এ যাবত। তিনি অভিশাপ দিচ্ছেন যেন আমার দুইটা বাচ্চাই আমার সামনে আগুনে পুড়ে যায়, আর আমি যেন কিছুই না করতে পারি। দুই পক্ষের এসথেটিক ফারাক পাচ্ছেন কি? আগুনে পোড়ানোর আকাঙ্খা এবং বাস্তবায়নের এই কালচারাল ইনডিফরেন্স কিভাবে সামলাবো আমরা?

আরেকবার একটা দোকানে দাঁড়াইয়া ছিলাম; এমন সময় একজন লোক আসলো—ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে আর ঘামছে; বাম হাতটা ব্যান্ডেজ করা, গলায় ঝুলানো। দোকানদারের কাছে ঠাণ্ডা কিছু চাইলো মনে হয় আর হাসলো আর বললো—‘চোর ধরা পড়ছে, ইচ্ছামতো পিটাইলাম। ঘুষি দিয়া এই হাতেও ব্যথা পাইছি; তাই আইসা পড়লাম, অ’রা পিটাইতেছে এখন।’

পিটানো বা নির্যাতন সমাজে একটা এন্টারটেইনমেন্টের মর্যাদা পাচ্ছে; অন্যের যন্ত্রণা, মৃত্যু আমাদের আনন্দ দেয়। এই শিক্ষা কোথায় পাই আমরা? র‍্যাবের ক্রসফায়ারে আনন্দিত হতে হতে আমরা হয়তো অন্যের যন্ত্রণায় এন্টারটেইন্ড হওয়াটা ইন্টার্নালাইজ করে ফেলছি। পুলিশ রিমান্ডে দিলে থ্রিলড হই আমরা। ক্রিমিনাল দমনে বিচার-ব্যবস্থা অকেজো হয়ে গেলে ক্রসফায়ার জনপ্রিয় হতে থাকে, ক্রসফায়ারের ডিজায়্যার আমাদের খুনের বিউটি শিখাইতে থাকে। খুন করতে করতে র‍্যাব সবচে গ্লামারাস এখন সমাজে। সরকার যতো স্বেচ্ছাচারী হয়, বিচার ব্যবস্থা ততো অকেজো হতে থাকে। আমরা ততো খুন-নির্যাতনের নন্দনতত্ত্বের দিকে হাঁটতে থাকি। আমরা ক্রসফায়ার পারি না, আমরা পকেটমার খুঁজি; গণপিটুনি আমাদের অর্গাজমে পরিণত হয়। আমরা সিনেমা বানাতে থাকি যেখানে ভিলেনকে গণপিটুনি দিয়ে এন্টারটেইন্ড হয় জনগণ। গণপিটুনির ব্যবস্থা করে দিয়ে আমাদের নায়ক নায়ক হয়ে ওঠেন।

দেশের পরিস্থিতি খারাপ এখন। হরতাল-অবরোধ-আগুন-গুলিতে নাগরিকদের দুর্ভোগ অন্তহীন। কিন্তু কতটা খারাপ সেটি বুঝতে হবে আমাদের; এবং কী করবো এখন আমরা? প্যানিক কাটাইয়া উঠতে পারলে আমরা সহজেই প্রথম সিদ্ধান্তটা নিতে পারবো। সেইটা হলো—এই সরকার ব্যর্থ। রাস্তায় আমরা যাতে আগুনে না পুড়ি সেইটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের; আমরা যেন বাজারে, চাকরিতে, বাপ-মাকে-বাচ্চাকে দেখতে, ব্যবসা করতে যাইতে পারি—এগুলিও। এগুলি করতে না পারা মানে সরকার দেশকে সামলাতে পারে নাই। অনেকে বলবেন, আগুন তো দিলো বিএনপি-জামাত; হতে পারে। তো, বিরোধী দলকে সামলানোর দায়িত্ব কার? সরকারের। বিএনপি জামাত তো দুই বছর আগে এভাবে আগুন দেয় নাই; এই পরিস্থিতে দেশ যাতে আসতে না পারে সেইটা এনসিওর করার দায়িত্ব ছিলো সরকারের। প্যানিকের ভিতর না থাকলে সহজে বুঝবেন যে, এনসিওর করা বা সামলানোর অর্থ খুন করতে থাকা না। তাছাড়া সমাজে ক্রাইমের একটা নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য মাত্রা আছে। বিএনপি-জামাত-হেফাজত মিলে যদি ৫০% নাগরিক হয় এবং এই ৫০% নাগরিককে যদি একই ক্রাইমে দায়ী ভাবতে হয় তাহলে সেইটাকে অতি-ক্রাইমের একটা পরিস্থিতিও বলা যায় না; এইটা তখন একটা সিভিল ওয়ার আসলে। সিভিল ওয়ারে কেন যাবো আমরা? যুদ্ধ, খুনাখুনি অপছন্দ করতে পারলে নিশ্চই আমরা সিভিল ওয়ারে যাইতে চাইবো না। কিন্তু তারচে বড়ো প্রশ্ন, এই দুই দলের মাঝে সিভিল ওয়ার হবার মতো ডিফারেন্স কি আছে আদৌ?

দুইটা মোসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মারামারির ইতিহাস আছে। শিয়া এবং সূন্নী মোসলমানের মারামারি এখনো হচ্ছে বিভিন্ন দেশে—ইরাকে, পাকিস্তানে। আমাদের এই সমস্যা নাই; আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, হেফাজত—সবগুলি পক্ষই সূন্নী মোসলমান। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে বলতে হয় মডার্ন মোসলমান প্রধান দল। প্রাইমারি প্রমাণ হিসাবে মহিলা নেতৃত্বের কথা বলা যায়। পৃথিবীর কোথাও মহিলা নেতৃত্বে কোন ইসলামবাদী দল নাই। দুই দলের শাখাগুলি দ্যাখেন; যুবদল আছে যুবলীগ আছে, মহিলা দল, মহিলা লীগ পাইবেন; পুরুষ দল বা লীগ নাই। এতে বুঝবেন দুইটা মূল দলই পুরুষ দল, যেগুলির প্রধান একজন করে মহিলা। এই আলোচনায় আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হইলো ওলামা দল এবং লীগ। আপনি কিন্তু ওলামা ইসলামী পাচ্ছেন না, বা ধরেন জাকের পার্টি বা ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের ওলামা শাখা। এতে অনুমান করা যায়, লীগ ও দল—মূল দল ওলামা প্রধান হবে না। বিপরীতে ইসলামবাদী দলগুলি মূলত ওলামা প্রধান বলে ওলামা শাখা খোলা যাচ্ছে না; বরং ভবিষ্যতে আমরা ‘জামাতে ইংলিশ মিডিয়াম ইসলামী’ বা ‘আধুনিক জাকের পার্টি’ ধরনের কতগুলি শাখা পাইতে পারি।

কিন্তু এগুলিকে ততো গুরুত্ব নাও দিতে পারেন আপনারা। তাইলে আরো কিছু পলিটিক্যাল এবং কালচারাল দিক নিয়া ভাবাই আপনাদের।

সাঈদী বা নাস্তিকতা নিয়া আলোড়নের সময়ে আমরা ইসলামী ইস্যু নিয়া রাজনৈতিক আন্দোলন দেখছিলাম; সেই আন্দোলনে পলিটিক্যাল স্ট্রাটেজি হিসাবে বিএনপি কিছু কিছু সমর্থন দেবার পরেও আন্দোলনে সরাসরি বিএনপিরে পাই নাই আমরা। বরং অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আমরা দেখলাম দেশের প্রধান পলিটিক্যাল ইস্যু হিসেবে বিএনপি তারেক রহমান এবং নির্দলীয় সরকারকে সামনে আনলো। বিভিন্ন ইসলামী ইস্যু সামনে আনলে বিএনপির এখনকার আন্দোলন আরো তীব্র হইতে পারে বুঝবার পরেও সেদিকে যাচ্ছে না বিএনপি। আওয়ামী লীগের সমালোচনা করায় বিএনপির ভোকাবুলারিতে ইসলাম একেবারেই নেই এখন। লক্ষ্য করেন, ইনু-মেনন জাতীয় হাসিনার মিত্ররাই বরং ‘জঙ্গীবাদ’ ইত্যাদি বলে বলে ইসলাম ইস্যুকে রাজনীতিতে তাজা রাখছে। হইতে পারে যে, বিএনপি মজিনার কাছে ইসলাম বিষয়ক একটা মুসলেকা দিছে; যে, ইসলাম ইস্যুকে সামনে আনবে না সে। দ্যাখেন, বিএনপিরে বিশ্বাস করতে আদৌ সমস্যা নাই মজিনার। বিএনপির শাসনামলেই সারাদেশে বোমা-হামলা হইছিলো, বাংলা ভাই তৈরি হইছিলো; কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই মার্কিন পরামর্শে র‍্যাব তৈরি করে, ধরে ধরে খুন করে তাদের সমূলে উচ্ছেদ করছিলো বিএনপি।

কিন্তু বিএনপিকে কি বিশ্বাস করা যায়? কালচারাল প্যাটার্ন নিয়ে কিছু ভাবা যাক। প্রতিদিনকার কনজাম্পশনে লীগ ও দলের পার্থক্য পাইবেন না আপনি। দুই দলই দীপিকা পাডুকোনের সমান ভোক্তা; মানে, বলিউডের নাচ-গান-সিনেমা। কসমেটিকস্ থেকে ফাস্ট ফুড পর্যন্ত মিল পাইবেন, বিএনপির লোকদের বাচ্চারা একই হারে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে, কয়জনরে পাইছেন যাঁরা নিজের বাচ্চাদের মাদ্রাসায় পড়াচ্ছে? ওলামা দল বা লীগ ছাড়া দুই দলেই মাদ্রাসার ভোক্তা পাইবেন না। এই কনজাম্পশন প্যাটার্ন উল্টে ফেলতে হয় তেমন একটা ব্যবস্থায় বিএনপি যাইতে রাজি হবে কেন? ফলে স্বার্থ মোটামুটি অভিন্ন।

কোন কোন লেখক সেক্যুলারিজমকে ধর্মবিরোধী হিসাবে দেখাবার চেষ্টা করেন। ওগুলিরে পাত্তা দিয়েন না। মিথ্যা কথা। ধর্মের বিভিন্ন ডেফিনিশন আছে; সেক্যুলারদের ধর্মের ডেফিনিশন ভিন্ন মাত্র। অন্য কারো ধর্মাচার যদি আপনার খারাপ লাগে তাহলে বলা যায় না যে আপনি ধর্মবিরোধী। তবে ধর্মাচার বোঝায় আমাদের মাঝে বেশ কিছু রেসিস্ট উপাদান এবং পশ্চিম সম্পর্কে ভুল ধারনা আছে। হলিউডের ছবিতে সাদা ড্রেসের কনের সাথে বরের বিয়া দেন প্রিস্ট, ম্যান এন্ড ওয়াইফ হিসাবে প্রোনাউন্স করেন; আমরা ওইটারে ধর্মাচার হিসাবে প্রায়ই দেখতে পাই না; চার্চের নান বা প্রিস্টের ড্রেসকে আমাদের ধর্মীয় ড্রেস মনে হয় না, খ্রীস্টানদের গলায় ক্রস ঝুলাইয়া রাখাটার সাথে ধর্মের যোগাযোগ মনে পড়ে না। কিন্তু পাঞ্জাবি-টুপিরে খুবই ধর্মীয় লাগে। বাংলাদেশে সেক্যুলার এবং সেক্যুলার সমালোচক দুই দলেরই এই সমস্যা গভীর। এতে সেক্যুলারদের ভুল বোঝা হয় মাত্র, সেই ভুল ধারনা মারামারি পর্যন্তও নিয়া যাইতে পারে আমাদের। নিজেদের কাজে, চিন্তায়, ভোগে ধর্মাচার একটু খেয়াল করলেই পাবো আমরা। সমাজে বিভিন্ন ধর্মবোধ থাকবে, বিভিন্ন ধর্মবোধ রাখার হক মানতে হবে আমাদের। আপনারা যেমন টিভি, সিনেমা, গানের মাধ্যমে, এনজিওর মাধ্যমে আপনাদের ধর্মে যাওয়ার দাওয়াত দেবার হক রাখেন, তেমনি আরেক ‘আপনারা’ আছে, তাঁরা তাবলীগ, আজানের মাধ্যমে দাওয়াত দেবার হক রাখেন। সেক্যুলারদের ধর্মাচার বিভিন্ন নামে, ভঙ্গিতে চালু থাকে। আমাদের নৈতিকতার সাথে ধর্মের যোগাযোগ আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাঝে মাঝেই করুণা হয় আমার। কোন একটা পররাষ্ট্রনীতি এস্টাবলিশ করতে তারা অনেক সময়, অর্থ, শ্রম ব্যয় করে, হলিউডে মুভি, সিরিয়াল বানায়, সারা বিশ্বে এনজিও প্রজেক্টে টাকা দেয়, মিডিয়ায় টাকা দিয়া ইডিওলজি উৎপাদন করতে থাকে, স্কলারশিপ দিয়া নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দরকারি ট্রেইন্ড স্কলার/বুদ্ধিজীবী বানাইয়া ফেরত পাঠায়, পলিটিক্যাল অ্যাসাসিনেশন থেকে পলিটিক্যাল দল তৈরি পর্যন্ত করে। তারপর হঠাৎ-ই বুঝতে পারে সেই পররাষ্ট্রনীতি ভুল! কিন্তু ততদিনে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক মিত্ররা তো সাথে সাথে নিজেদের তাবৎ জীবনকে ভুল ভাবতে পারে না! যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির যা একটি অধ্যায় সেটি এইসব মিত্রদের যে সারা জীবন!

ফলে আগের পর্বকে ভুল বলে চিহ্নিত করা নতুন পররাষ্ট্রনীতি পুরানা মিত্রদের বাগে আনতে বেশ সমস্যায় পড়ে; আরো বেশি অর্থ-শ্রম খরচ করতে হয় নতুন মিত্র তৈরিতে, পুরানা মিত্রদের সাইজ করতে বা নতুন করে গড়তে বা ক্ষমতাহীন করে ফেলতে!

ধরেন, জয়, ইনু, বা মেননের বিষয়টা বা আওয়ামী লীগ; এরা আগের ইউএস পররাষ্ট্রনীতির মিত্র; এরা এখনো জঙ্গীবাদ নিয়া আছেন, এনাদের বিশ্বাসের গভীরে ঢুকে গেছে জঙ্গীবাদ। কিন্তু লক্ষ্য করেন, সাবেক জঙ্গি ইনুর এই জঙ্গিবাদ ইসলামী জঙ্গিবাদ। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এই সাবেক মিত্ররা  প্যানিক তৈরি করে রাজনৈতিক নির্যাতন, হত্যা, স্বেচ্ছাচারিতার ইনডেমনিটি নিতে চাচ্ছে জনগণের কাছ থেকে; দেয়া ঠিক হবে না আমাদের। পুরানা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে ম্যানুফ্যাকচার্ড প্যানিক থেকে মুক্ত হলে এঁরা সহজেই বুঝবেন, যে দেশের ৮০% মানুষ দুইজন মহিলার অনুগত সেই দেশে আপাতত ইসলামী জঙ্গিবাদ নিয়ে প্যানিকড হওয়া বেকুবি, বুঝবো আমরাও।

আমরা বুঝবো যে, এই সরকারকে পারমিট করলে দেশে ভায়োলেন্স বাড়তে থাকবে আরো; এমনকি, আওয়ামী লীগও বুঝবে যে, জঙ্গিবাদ নিয়ে সত্যি সে চিন্তিত হলে এই সরকারের কন্টিন্যুশন সেই জঙ্গিবাদকে আরো শক্তিশালীই করছে, কমাতে পারছে না কোনভাবে। বিরোধীদলের দাবিগুলি অ্যাকোমোডেট করায় আওয়ামী লীগেরই লাভ বেশি। ইভেন আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না জিতলেও।

৮ ডিসেম্বর ২০১৩