আড়ং শাড়ির এই বিজ্ঞাপনের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরকে শ্রদ্ধা

বউ পিটানো একটা দেশীয় ঐতিহ্য; এই ঐতিহ্যের ফ্যান ছিলেন আমার নানা; তিনি বিকালে ঘুমাইতেন; নানাবাড়ির কিছু মোরগ এইটা একদম মনে রাখতো না; বিকালে নানা ঘুমাইলে মোরগগুলির মনে হয় যৌনাবেদন করার ইচ্ছা হইতো; ওরা বড়ো বড়ো ডাক দিতো; মুরগীদের ডাকতো হয়তো; কিন্তু বিকালবেলা মোরগদের এই সেক্স জাগায় নানারও ঘুম ভাইঙ্গা যাইতো। মোরগদের সেক্স বিষয়ে নানা খুব আপত্তি করতেন না; কিন্তু ডাকের ব্যাপারে কড়া আপত্তি ছিরো তাঁর; তবে এই আপত্তি মোরগদের বলতেন না তিনি; বলতেন নানীদেরকে; বলতেন মানে জবাব চাইতেন; মোরগদের প্রতি আমার নানীদের সেক্সুয়াল ডিজায়্যার একদমই ছিলো না; এ ব্যাপারে নানীদের ভরসা বলতে কেবল নানাই ছিলো মনে হয়। মোরগদের ডাকাডাকির বিষয়েও নানীরা বিশেষ কিছু জানতো না; ফলে নানার প্রশ্নের জবাব নানীরা দিতে পারতো না; তখন নানার তো আর উপায় থাকতো না! তিনি দেশীয় ট্রেডিশান মানতেন খুব; নানীদের পিটাইতেন। কিন্তু আমার নানীরা খুব সচেতন হইতে পারেন নাই কখনোই। দেশীয় ট্রেডিশান প্রায় প্রতিদিনই নানীদের বডিতে লম্বা লম্বা ট্যাটু আঁইকা দিতো। নানা মরলেন সেই কবেই; দেশীয় ঐতিহ্যের এই বিরাট লস নানাবাড়ি কখনোই কাটাইয়া উঠতে পারে নাই আর! আই কনডেম মাই মামাস। কিন্তু এই দেশীয় ঐতিহ্য মেয়েদের খুব একটা ভালো লাগার কারণ নাই। সত্যিই তো; দেশীয় ঐতিহ্য মুর্দাবাদ।

কিছু বিজ্ঞাপনে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মেয়েদের দেখানো হয়। কিন্তু সেইখানে সেক্স থাকে না কোন। যেনবা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হইলে মেয়েদের সেক্স থাকে না আর! তার অর্থ আসলে আগেরটাই। অর্থাৎ, সেক্স যেহেতু পুরুষরে সার্ভিস দেওয়া, মেয়েরা আসলে সেক্স করে না, তাই ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবার পরে মেয়েদের তো আর সেক্স থাকার কথা না!

-------------------------

আড়ং শাড়ির এই বিজ্ঞাপন দেশীয় ঐতিহ্যরে আবার আলোচনায় আনছে; শাড়ির দেশীয় ঐতিহ্য নাকি আড়ং ডেসট্রাক্ট কইরা ফেললো। এ ব্যাপারে গভীর চিন্তা করা দরকার।

এই বিজ্ঞাপন শাড়ি পরার নতুন সিস্টেম প্রোপোজ করে; শাড়ি পরার ওল্ড সিস্টেম সম্পর্কেও কিছু অ্যাজাম্পশান দেখাইয়া দেয়।

বিজ্ঞাপনের মডেল পেটিকোটের বদলে স্যালোয়ার পরছেন শাড়ির সাথে। ভালো প্রস্তাব। শাড়ির তুলনায় স্যালোয়ার-কামিজ পরায় মেয়েদের আগ্রহী হবার অনেক কারণ আছে; শহরে এই কারণ আরো বেশি মনে হয়। প্রতিদিন শহরে প্রচুর ঘুরতে হয় অনেক মেয়েরই; পেটিকোট দিয়া শাড়ি পরলে প্রায়ই সমস্যা হইতে পারে। নিজের গাড়ি আছে এমন মেয়েদের এই সমস্যা একটু কম। কিন্তু যাদের নাই, রিক্সা, সিএনজি বা বাসে বা মটর সাইকেলে, পায়ে চালানো সাইকেলে চলতে হয় পেটিকোট তাদের ভালোই ঝামেলায় ফেলার কথা। হাঁটার সময়ও ঝামেলা হয়। রাস্তার ম্যানহোলে ঢাকনা থাকে না, পানি জমে থাকে বিভিন্ন জায়গায়, গাড়ি-রিক্সা আসা যাওয়া করে রাস্তায়; যেকোন সময় লাফ দেওয়া লাগতে পারে। হাঁটার সময় পরের কদম বিষয়ে আমরা মনে মনে একটা হিসাব করি; শহরে চলার সময় প্রায়ই সেই হিসাব মানা যায় না; কদম ছোট, বড়ো করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে পেটিকোট অনেক ঝামেলা করতে পারে। লুঙ্গিও। কিন্তু কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বা গায়ক অরূপ রাহী হয়তো লুঙ্গি একটু উঁচা কইরা হাঁটতে পারেন, কিন্তু শাড়ি-পেটিকোট উঁচা করে হাঁটায় মিড্ল ক্লাসের অনেক মেয়েই অস্বস্তি বোধ করতে পারে; সমাজে পুরুষের কাছা দেওয়া বা লুঙ্গি উঁচা করে হাঁটার তুলনায় মেয়েদের শাড়ি উঁচা করার অর্থ ভিন্ন; ভিন্নতা এতোই যে অস্বস্তিকর।

এসব কারণেই মনে হয় মেয়েরা শাড়ির তুলনায় স্যালোয়ার-কামিজ প্রেফার করছে। স্যালোয়ার দিয়া শাড়ি পরতে আড়ং-এর প্রস্তাব শাড়ি পরায় মেয়েদের আগ্রহ আরো বাড়াইতে পারে। বাড়ুক বা না বাড়ুক, কেউ ওভাবে পরতে চাইলে তাঁরে ঐতিহ্য, বাংলার নারীত্ব, রুচি, শ্লীলতা ইত্যাদি বলে বাধা দেওয়া অন্যায্য। এইটা নারী নির্যাতনের আরেকটা ফর্ম; ব্যক্তি হিসাবে মেয়েদের নাগরিক অধিকারকে রিকগনাইজ না করা। ওদিকে ঐতিহ্য জিনিসটাও তো একটা সার্টেইন পয়েন্টে খাড়াইয়া থাকে না; সব ক্লাসের ঐতিহ্যও ডিফরেন্ট। আবার, শাড়ির নিচে ব্লাউজ পরাই বেশি দিনের ঐতিহ্য না; গ্রামের মেয়েরা এখনো অনেকেই পরে না, অনেকে পেটিকোটও পরে না; শহর-গ্রামের গরীবদের ভিতর এই হার আরো বেশি মনে হয়। ব্লাউজের নিচে ব্রাও পরার চল অল্প দিনের; এইটাও পরে না সবাই। আসল ঐতিহ্য তাইলে কোনটারে ধরবেন? রুচি কি সবার এক? অশ্লীলতা নিয়া কি সবাই একই কথা ভাবে? আপনার হাতে কলম আর কীবোর্ড আছে, টিভির মাইক্রোফোন আছে; আপনি আপনার রুচি, ঐতিহ্য চিন্তারেই বললেন ঐতিহ্য আর সুরুচি, বাকি সব কুরুচি; আমরা তো তাই মাইনা নিবো না।

কিন্তু এই বিজ্ঞাপনের বড়ো প্রস্তাব আসলে মেয়েদের সেক্সুয়ালিটি নিয়া। মেয়েরা সেক্সকে কিভাবে দেখবে? তাঁরা কি সেক্স করে নাকি তাদের সাথে পুরুষরা করে? বাংলার ভাবান্দোলনে সেক্স কেবল পুরুষরাই করে; সেক্সে মেয়েরা প্যাসিভ—এইটা ভাবাই বাংলার পাওয়ারফুর ঐতিহ্য। সেক্স বিষয়ে মেয়েদের উৎসাহ সমাজে খুবই নিন্দার মুখে পড়ে। কিন্তু বাস্তবে সেক্সে মেয়েদের অ্যাক্টিভ পার্টিসিপেশন আছে, মেয়েরা সেক্স করে, করাটা তাদের অধিকারও। কিন্তু সমাজের ইডিওলজি খুবই ম্যাচো, এথিকস ম্যাচো; মেয়েদের অ্যাক্টিভ হিসাবে ভাবতে রাজি হয় না এই এথিক-ইডিওলজি। এইটাই প্রায় সব সময় দেখা যায় বিজ্ঞাপনে মেয়ে মডেলদের ছবিতে। মায়া মায়া চোখে চাইয়া রইছে, নিজেরে তুইলা দিতে চাইছে যেন পুরুষের হাতে। বা উদাস চোখ—একটা প্রাণহীন ফুলের মতো মধু নিয়া ফুইটা রইছে যেন। বসে থাকা বা শুইয়া থাকারে লোভনীয় করে তুলতে চাইছেন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টররা। যেন বিজ্ঞাপনের মেয়েগুলি একেকটা চকলেট। বিজ্ঞাপনের মেয়েরা সাবজেক্ট থাকতে পারেন না, ফুল বা চকলেটের মতো অবজেক্ট হইয়া থাকেন। সাবজেক্ট কেবল পুরুষ। ইভেন মেয়েরা যেইখানে সাবজেক্ট তাও যেন পুরুষের জন্য ওয়েট করতে থাকা মাত্র, আর কিছু না। কিছু বিজ্ঞাপনে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মেয়েদের দেখানো হয়। কিন্তু সেইখানে সেক্স থাকে না কোন। যেনবা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হইলে মেয়েদের সেক্স থাকে না আর! তার অর্থ আসলে আগেরটাই। অর্থাৎ, সেক্স যেহেতু পুরুষরে সার্ভিস দেওয়া, মেয়েরা আসলে সেক্স করে না, তাই ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবার পরে মেয়েদের তো আর সেক্স থাকার কথা না!

আড়ং শাড়ির এই বিজ্ঞাপন মেয়েদের সেক্স অ্যাক্টর হিসাবে দেখায়। এই মেয়ে দেখছে কী করা যায়, যেনবা সামনের অপসনগুলি নাড়াচাড়া করছে চোখ দিয়া। এইটা যতো না শাড়ির বিজ্ঞাপন, তার চাইতে বেশি পার্সোনালিটির বিজ্ঞাপন, একই সাথে সেক্সি এবং অ্যাক্টিভ; ইভেন সেক্সই তাঁর অ্যাক্ট। একজন পার্সন, মেয়ে—পরনে শাড়ি, তাঁর সেক্সুয়াল আর্জ নিয়া খাড়াইয়া আছে।

সেক্স অ্যাক্টর হিসাবে মেয়েদের এই ইডিওলজির প্রতিষ্ঠা চাই আমি। ছেলেমেয়ের সেক্স যদি দুজনেরই অ্যাক্ট হিসাবে ইডিওলজিক্যলি প্রতিষ্ঠা করা যায় তার বিরাট সুফলও দেখি আমি। শুধুই পুরুষ তখন কোন মেয়ের সাথে/উপর সেক্স করতে পারে না, কারণ সেক্স তো একটা কালেকটিভ অ্যাক্ট। সেক্সে মেয়ের পার্ট প্লে না করলে সেক্স করতে পারবে না পুরুষ। ছেলেমেয়ে দুজনেরই অ্যাক্ট হিসাবে সেক্সকে প্রতিষ্ঠা করা গেলে রেপের মতো জোর করে সেক্সের ঘটনা ঘটতে পারবে না। কেননা, আপনি রেপ করতে পারেন তখনি যখন ভাবছেন যে, সেক্স কেবল আপনারই অ্যাক্ট, অন্য পক্ষের পার্ট প্লে করার দরকার নাই।

বাংলানিউজ২৪.কম রিপোর্ট: http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=64ad22d5349877a67487b222aed67352&nttl=28032013184800

ফেসবুক নোটের লিংক: http://goo.gl/hzvs7

  • mamun

    aggressive idea