কনটেক্চুয়াল এথিকস্: ইস্যু মৃত্যুদণ্ড

সাদারা এখন উর্বরতার সমস্যায় আছে। ২০০৭ সালের হিসাবে ইউরোপের ১৯ টা দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাইনাস বা শূন্য। যেমন, ইউক্রেন জটিল অবস্থায় আছে; ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা ২৮% নাই হইয়া যাবে, বুলগেরিয়ায় ৩৪%, রোমানিয়ায় ২৯%, জার্মানিতে ৯%। ভয়াবহ অবস্থা। এইসব দেশে একজন উর্বর শ্বেতাঙ্গের মৃত্যুতে করুণ রাষ্ট্রীয় বিলাপ হবার কথা, কিছুদিন পরে হয়তো দেখা যাবে শোক দিবস ঘোষণা করা হইছে; শোক দিবসে কনডম বা অন্য প্রটেকশান ছাড়া সেক্স করার প্রচার চালানো হচ্ছে সরকারিভাবে। আরো পরে মেয়েদের জন্ম দিতে বাধ্য করা হইতে পারে।

ইউরোপের প্রতি ঔপনিবেশিক আনুগত্যের কারণে ইউরোপের এই নতুন এথিকসরে শ্রেষ্ঠতর ভাবা সহজ হইয়া আছে বুদ্ধিজীবীদের জন্য। অন্যদিকে আছে জাস্টিস প্রশ্নে ধর্মীয় ইস্যু। হত্যার বদলে হত্যা, চোখের বদলে চোখ—এইগুলা ধর্ম অনুমোদন কইরা আছে হাজার হাজার বছর ধরে। বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী নিজেদের এথিকস্-এ ধর্মের প্রভাব গোপন করতে চান; এইখানেও ইউরোপের মানবতাবাদ আর সেক্যুলারিজমের প্রভাব আছে অনেকখানি। ধর্মরে এড়াবার জন্যও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা দরকারি হইয়া উঠছে।

-------------------------

বিবর্তনবাদের গোড়ার কথা হইলো ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’। মডার্ন হিস্ট্রিতে শ্বেতাঙ্গরা বহুভাবে দাবি করছেন যে তাঁরাই ‘ফিটেস্ট’। কালা মানুষেরা পশ্চিমের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতে ভোট দেওয়া শুরু করলে সেই সব দেশের পার্টগুলা আনুষ্ঠানিকভাবে রেসিজমরে ডিনাই করা শুরু করে। কালা মানুষের ভোটাধিকার আদায়েও কিছু পার্টির ভূমিকা আছে অবশ্য। রেসিজম ডিনাই করার একটা ফল হইলো—শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের ‘ফিটেস্ট’ বইলা আর দাবি করে না প্রকাশ্যে। এই কনটেক্সটে দরকারি নতুন এথিকসও বানাইতে থাকে এই রাষ্ট্রগুলা; এথিকস বানাবার এই প্রসেসে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা, মিডিয়া, সাহিত্য, বুদ্ধিজীবিতা—সবগুলিই কোন না কোন ভাবে রোল প্লে করে। সবাই কালা মানুষের কাছে প্রোমিজ করতে থাকে রেসিজমের বিপক্ষে।

এই প্রোমিজ পূরণের জন্য ‘শ্বেতাঙ্গরা ফিটেস্ট’ বইলা ভাবনাটা অনানুষ্ঠানিকভাবেও ছাড়ার দরকার নাই। কিন্তু ‘শ্বেতাঙ্গরা ফিটেস্ট’ বইলা ভাবা সম্প্রতি খুব কঠিন হইয়া গেছে। ‘ফিটেস্ট’ হইলে তাদের সংখ্যায় বাড়ার কথা ক্রমে; অথচ শ্বেতাঙ্গরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে দুই-তিনশো বছরের মধ্যে; ডেমোগ্রাফিক স্টাডিগুলা অন্তত তেমনটাই বলছে।

রেসিজমরে ডিনাই করা এথিকস্ শেখা শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের ‘ফিটেস্ট’ হিসাবে আর নাও ভাবতে পারে বটে। কিন্তু তাঁরাও শ্বেতাঙ্গদের এই বিলুপ্তির ঘটনায় মজা পাবেন না নিশ্চই। রেড ইন্ডিয়ানদের ইউএসএ যেমন রিজার্ভেশন ক্যাম্পে রাখছিলো তেমনি কইরা সাদাদেরো রাখতে হবে, সেইখানে মাছের ব্রিডিং-এর মতো ব্রিডিং কইরা মানুষের চাষবাস করতে হবে। এইটার মধ্যে ভালো লাগার কিছু নাই। ফলে এইটা আরেকটা নতুন কনটেক্সট; এই কনটেক্সটে আবার নতুন এথিকস্ বানানো দরকার হইয়া উঠছে।

বার্থ কন্ট্রোল করার পণ্যগুলির (কনডম, বড়ি ইত্যাদি) বাণিজ্যিক উৎপাদন বার্থ কন্ট্রোলরে এথিক্যল ও কাম্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা করছিলো, এখনো বার্থ কন্ট্রোলের এথিকস্ প্রচার জোরালোভাবেই চালু আছে। কিন্তু এইটার প্রচার মূলতঃ কালা আর বাদাম কালারের মানুষের ভিতরই বেশি। সাদাদের বরং এই এথিকস্ থেকে বের করার চেষ্টা করছে ইউরোপের এই দেশগুলি। যেমন, জার্মানিতে পোলাপান জন্ম দেবার জন্য বিশেষ উৎসাহ ভাতা দেওয়া হয়। এক সন্তানের জন্য যা, দুইটার জন্য তার দ্বিগুণের বেশি। এই সুযোগ তো খালি সাদাদের জন্য দেওয়া যায় না—তাইলে রেসিজমের অভিযোগ উঠবে। ফলে কালারাও এই সুবিধা নিতে পারে। কালাদের এই সুবিধা নেওয়া সীমিত রাখবার জন্যই সম্ভবতঃ জার্মানির অভিবাসন আইন খুব কড়া।

ইউরোপের রাষ্ট্রগুলি ওয়েলফেয়ার স্টেট; একেকজন নাগরিকের পিছে অনেক টাকা খরচ করে দেশগুলি। আরো খরচ কইরাও জন্ম দিতে রাজি করাইতে পারছে না পর্যাপ্ত। নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতার বোধ খুব কড়া। এই কনটেক্সটে জন্ম দেবার ব্যবস্থা করার ভালো জায়গা হইলো জেলখানা। ১০ বছরের শাস্তি পাওয়া কোন উর্বর মেয়েকে লোভ দেখানো হইতে পারে যে, ‘তুমি যদি একটা জন্ম দাও তাইলে ৩ বছর মওকুফ। দুইটা দিলে ৭ বছর।’ এসব দেশের জেলখানায় বউ বা স্বামী বা গার্ল/বয় ফ্রেন্ড যাইয়া সেক্স করতে পারে, সুন্দর ব্যবস্থা আছে। এগুলিরে হিউম্যান রাইটসের মধ্যে দেখানো হবে; কিন্তু গোপনে আছে জনসংখ্যা বাড়াবার মরিয়া চেষ্টা। ধনী ধনী দেশগুলার সাদারা যুদ্ধ-টুদ্ধ ছাড়াই বিলুপ্ত হইয়া যাচ্ছে, আহা।

এই রকম জটিল পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড কি থাকা সম্ভব? না, এই দেশগুলায় মৃত্যুদণ্ড নাই। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে সারা জীবন জেলে থাকলো সাদা জনসংখ্যা হইয়া। এইভাবে থাকতে থাকতেই হয়তো জন্ম দিয়া ফেলবে একটা সোনার চাঁন। এই সোনার চাঁনের বাপ-মা থাকার দরকার নাই, ইন ফ্যাক্ট না থাকাই ভালো—এতে বাচ্চা অপরাধী হইয়া উঠতে পারে; স্টেটের সকল প্রস্তুতি আছে বাচ্চা পালার।

কিন্তু মৃত্যুদণ্ড তো খালি সাদাদের উপর থেকে তুইলা নেওয়া যায় না; তাই কালাদেরো মৃত্যুদণ্ড নাই। এই মর্মে আইন করা হইছে। এই দেশগুলি কেবল সাদাদের মৃত্যু নিয়া চিন্তিত বলছি কারণ, এশিয়া আর আফ্রিকায় কালা মানুষের মৃত্যুর ব্যবস্থা রাখতে ভালো টাকা পয়সা খরচ করে এরা।

আরেকটা বিষয় শ্রম। ইউরোপে এমনিতেই শ্রমশক্তির অভাব আছে, তার উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাইনাস। জেলখানার কয়েদীরা শ্রম দেয়, লিগ্যালি এই শ্রম বৈধ এবং বাধ্যতামূলক। ফাঁসি দিলে সে তো আর মরিচ গাছে পানি দিতে পারবে না, সে মরাই। কালা মানুষের মৃত্যুদণ্ড না দেবারও ভালো যুক্তি এইটা। এই বিষয়গুলি ঢাইকা দেবার ভালো উপায় হইলো দরকারি নতুন এথিকস্ তৈরি করা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাই মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে নতুন এথিকস্ প্রচার করছে।

সমস্যা হচ্ছে, এই এথিকস্ কারা গ্রহণ করবে? এইটা তো ইউরোপের ‘শ্রেষ্ঠতা’র নতুন ঘোষণা; কলোনিয়ালিজমের নতুন ধরন ভাইবা আগের কলোনিগুলায় এক ধরনের প্রতিরোধ হচ্ছে এই এথিকস্-এর। কিন্তু তাতে ‘মানুষ কি মানুষকে খুন করার অধিকার রাখে?’—এই প্রশ্নের ভালো জবাব দেওয়া হয় না। আরো যুক্তি হইলো জাস্টিস প্রশ্ন। জাস্টিসের জন্য মৃত্যুদণ্ড বৈধ হবার দাবি আছে। কিন্তু তাতে বিচারক বা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের মতো ব্যক্তি যাঁরা মৃত্যুদণ্ডে হত্যা ঠেকাইতে পারেন তাদেরকে খুনী ভাবার কতক স্পেস তৈরি হয়। বুদ্ধিজীবীরাও বিপাকে পড়েন; ইউরোপের প্রতি ঔপনিবেশিক আনুগত্যের কারণে ইউরোপের এই নতুন এথিকসরে শ্রেষ্ঠতর ভাবা সহজ হইয়া আছে বুদ্ধিজীবীদের জন্য। অন্যদিকে আছে জাস্টিস প্রশ্নে ধর্মীয় ইস্যু। হত্যার বদলে হত্যা, চোখের বদলে চোখ—এইগুলা ধর্ম অনুমোদন কইরা আছে হাজার হাজার বছর ধরে। বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী নিজেদের এথিকস্-এ ধর্মের প্রভাব গোপন করতে চান; এইখানেও ইউরোপের মানবতাবাদ আর সেক্যুলারিজমের প্রভাব আছে অনেকখানি। ধর্মরে এড়াবার জন্যও মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা দরকারি হইয়া উঠছে।

কিন্তু আগের কলোনিগুলিতে এই নতুন এথিকস্ গ্রহণের সবচে বড়ো প্রতিবন্ধক জণগণের ভিতর জাস্টিস ধারনার মধ্যে ধর্মের প্রভাব এবং জনসংখ্যা ইস্যু। এই দেশগুলি জনসংখ্যা নিয়া হিসশিম খাইতেছে; তাতে গরিব মানুষ আবার বেশি উর্বর। জন্ম এখনো অনেক বেশি ‘হইয়া যায়’ ধরনের। শ্রমশক্তির বাড়াবাড়ি এমনিতেই। জেলখানাগুলিতে ১০ জনের জায়গায় ৫০ জন রাখতে হয়। কয়েদিদের পর্যাপ্ত টয়লেট নাই, বিছানা তো নাইই। মানুষ না খাইয়া মরে, শীতে মরে। এইসব দেশে যাঁর মৃত্যু প্রাপ্য বলে বিরাট সনাতন এথিকস্ আছে তাঁরে বাঁচাইয়া রাখার যুক্তি খুবই কম। অন্তত বাঁচাইয়া রাখার সামাজিক শর্তগুলি তৈরি হয় নাই এখনো। এইসব দেশে রাষ্ট্রের অতিমাত্রার নিয়ন্ত্রণ, অর্থাভাব, সামাজিক বিধিনিষেধ ব্যক্তি-স্বাধীনতারে এমনই লঘু কইরা রাখে যে জেলে রাইখা ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ’রে একটা খুব বড়ো শাস্তি ভাবা খুবই কঠিন। উপরন্তু মানুষ কমার সম্ভাবনায় সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা আর্থিক লাভের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

সমস্যা একটাই। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন যাঁরা বা ফাঁসি দেন যাঁরা—সেই জল্লাদের খুনী হিসাবে চাকরি করাটা মানতে হয়; আমার করের টাকা দিয়া খুনী পালন করি আমি। ভাবনাটা স্বস্তির না। ডিভিশন অব লেবারের মধ্যে ‘খুন করা’ও রাষ্ট্রীয়ভাবে থাকতে থাকে– ‘খুন করা’টা রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক একটা কর্মক্ষেত্র। জল্লাদের চাকরিতে অ্যাপ্লাই করা যায়। এই রকম কোন বিজ্ঞাপন অবশ্য দেখি নাই এ যাবত। এই পোস্টে কি প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন ছাড়াই অবৈধ নিয়োগ হচ্ছে? সাংবাদিকরা জানেন কিছু?

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ফেসবুক নোটের লিংক: http://goo.gl/AlOSq