বাঙালি জাতীয়তাদের একাধিক ভার্সন বা ইতিহাস ও রাজনীতি গবেষক এবং এইসব বিষয়ে পিএইচডি লিপ্সুদের জন্য

‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র একাধিক ভার্সন আছে; অন্তত দুইটারে পরিষ্কারভাবে লোকেট করা যায়। ১৯ শতক থেকে কোলকাতায় যেই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ডেভল্যপ করে তাঁর থেকে বাংলাদেশ বানাইছে যেই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ তা বহুমাত্রিকভাবে আলাদা। প্রধান পার্থক্য ‘আমার ধর্ম’ বলতে দুইটা আলাদা ধর্মকে বোঝায়; কোলকাতা কেন্দ্রীক ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ‘আমার ধর্ম’ হিসাবে ‘হিন্দু ধর্ম’কে বুঝছিলো এবং বোঝে এবং বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ‘আমার ধর্ম’ হিসাবে ‘ইসলাম ধর্ম’কে বোঝে। দুই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র মধ্যে বাংলাদেশের ভার্সনটা বেশি উদার; কেননা হিন্দু এবং হিন্দুত্বের অর্জনগুলিকেও নিজের অর্জন হিসাবে ভাবতে সমস্যা হয় নাই বাংলাদেশের ভার্সনটার। এই ভার্সনটার ঔদার্য এমনই বিস্তৃত যে অতি কন্ট্রাডিক্টরি দুইটা বিষয়কেও নিজ আইডেন্টিটির নেসেসারি উপাদান করতে পারে। এই ‘বাঙালি’ লক্ষণ সেন আর বখতিয়ার খিলজি—দুইজনরেই নিজ পূর্বপুরুষ হিসাবে অ্যাকসেপ্ট করতে পারে। অথচ কেউই বাংলাভাষী না! চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আর রসুলবিজয় কোনটারেই ফেলতে রাজি না; পাল আমল আর বাংলার সুলতানী আমল—দুইটাতেই প্রায় সমান গৌরব বোধ করতে পারে।

বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কখনো মুসলিম ‘ইয়ং বেঙ্গল’ হইতেই দেয় নাই। ইউরোপের বিজ্ঞানচেতনার লঘু রূপ হিসাবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নাস্তিক্য পয়দা হইছে; ফরহাদ মজহারের অনূদিত চিন্তা এই বিজ্ঞানচেতনা থেকে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে ডিফারেন্সিয়েট করতে পারে না। কিন্তু দ্যাখেন,  মুসলিম বাংলা সাহিত্য বা ইতিহাসে মুসলিম শাসন বা ইসলামের ইতিহাস মনোযোগ দিয়া পড়ে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। এমনকি বাংলার স্বাধীনতা হরণকারী সম্রাট আকবরকেও নিখিল ইসলামী শাসনের গৌরব মনে করে এই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। ইসলাম বিষয়ে কড়া সেন্টিমেন্ট দেখাইছে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। পশ্চিম পাকিস্তান যখন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানকে পর্যাপ্ত মুসলমান মনে করে নাই তখন বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ পাকিস্তান রাষ্ট্রেই থাকতে রাজি হয় নাই আর।

-------------------------

উনিশ শতকের কোলকাতায় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ডেভল্যপ করার আগে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বলে একদল হিন্দু যুবক পয়দা হয়। নাম দিয়া মনে হইতে পারে এরা আদি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’; কিন্তু বাস্তবে ঘটনা পুরাই উল্টা; এই নাম তাঁরা নিজেরা নেয় নাই আদৌ! এইটা ইংরাজদের দেওয়া নাম। এনারা ‘বাঙালি’ হওয়াটারেই ঘেন্না করতেন। যা কিছু বাঙালির তারেই তাচ্ছিল্য করতেন, ব্যঙ্গ করতেন, ব্যঙ্গের পাবলিক ডিসপ্লে করতেন, রেসিয়ালি তাঁরাও ‘বাঙালি’—এইটা বড়োই লজ্জার বিষয় ছিলো তাদের জন্য;  ‘বাঙালি’ কৃষকের খাজনার টাকা কম ঘেন্না করতেন অবশ্য। এবং এরা নাস্তিক ছিলেন; এদের বেশির ভাগ বয়স বাড়লে আর নাস্তিক থাকেন নাই; মধুসূদন খৃষ্টান হইছেন, বেশিরভাগই হিন্দুত্বেই ফিরছেন, অনেকে ব্রাহ্মধর্ম নিছেন। কিন্তু ‘ইয়ং বেঙ্গল’ থাকাকালে এরা রাস্তায় গরুর মাংস দিয়া মদ খাইয়া ‘হিন্দু ধর্ম’ লইয়া মশকরা করতেন। ব্রাহ্মণরা শূদ্র বা মুসলমান বা খৃস্টান বাছবিচার করে খাইতেন না; এইটা অন্য ধর্ম বা শূদ্রদের প্রতি তাদের দুর্বলতা না আসলে; বরং হিন্দু ধর্মরে আঘাত করার আরেকটা ওয়ে। এরা সবাই পুরুষ ছিলেন; নারী বেশ্যাদের সাথে শুইতেন; সমাজের নিষেধগুলিরে অমান্য করায় বিশেষ ঝোঁক ছিলো এদের। খৃস্টধর্মে এদের কিছু শ্রদ্ধা ছিলো সম্ভবতঃ, কিন্তু সেইটার কারণ– ইংরাজদের ধর্ম হইলো খৃস্টধর্ম। খৃস্টধর্মে শ্রদ্ধার কারণে এরা হিন্দুধর্মকে অবজ্ঞা করতো—বিষয়টা এমন না মোটেই; এইখানে গুরুত্বপূর্ণ হইলো ইউরোপের বিজ্ঞানের আমদানী। এই বিজ্ঞানচেতনা ধর্মগুলিরে ভূয়া হিসাবে প্রমাণ করতে তৎপর ছিলো; বাস্তবে এখনো আছে। পাশ্চাত্যে এখনো যিশু বা খৃস্টধর্ম নিয়া বিজ্ঞানচেতনার জায়গা থেকে তাচ্ছিল্য এবং বিদ্রুপ করা হয়; অন্য ধর্ম নিয়াও এইটা হয়। এই বিজ্ঞানচেতনার জায়গা থেকেই ইয়ং বেঙ্গলরা সমুদ্র পাড়ি দিতে হিন্দুধর্মের নিষেধাজ্ঞা নিয়া হাসাহাসি করতো।

কোলকাতার ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ‘ইয়ং বেঙ্গল’দের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেই ডেভল্যপ করা শুরু করে। একই সাথে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ আর যাতে হইতে না পারে সেজন্য এফেক্টিভ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করে। ফলে এই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ইউরোপরে বহুমাত্রিকভাবে হজম করার ট্রাই করতে থাকার পরেও এইটা আসলে একটা রক্ষণশীল প্রজেক্ট। ধর্ম রক্ষা এই প্রজেক্টের সবচে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হইয়া দাঁড়ায়। এজন্য হিন্দুধর্মকে এই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ সংস্কার করায় মন দেয় এবং খৃস্টধর্ম ও বিজ্ঞানের সাথে কম্প্যাটিবল হবার চেষ্টা করতে থাকে। হিন্দুধর্ম বিষয়ে রক্ষণশীলতার মরিয়া চেষ্টা হইলো ব্রাহ্মধর্মের প্রসার; রামমোহনের হাতে উদ্ভবকালে এইটারে মরিয়া চেষ্টা বলা যাবে না, কিন্তু রক্ষণশীল চেষ্টা বটে। একেশ্বরবাদ শেখার জন্য হিন্দুধর্মের পাশেই ইসলাম ছিলো এতোদিন কিন্তু ইংরাজ আমলের মতো এতো এসথেটিক ও পলিটিক্যাল চাপে পড়ে নাই হিন্দুধর্ম; একদিকে ইউরোপের বিজ্ঞান ও এনলাইটেনমেন্ট নতুন এসথেটিকস তৈরি করছে, অন্যদিকে সরাসরি ওপনিবেশিক প্রণোদনায় মিশনারির খৃস্টধর্ম বলপ্রয়োগ, প্রতারণা ও প্রলোভনের মধ্য দিয়া বিস্তার লাভ করছিলো। ফলে খৃস্টধর্মের একেশ্বরবাদের আদলে হিন্দুধর্মরে সাজাইয়া হিন্দুধর্ম রক্ষায় নামেন রামমোহন; ব্রাহ্মধর্ম প্রস্তাব করেন।

ব্রাহ্মধর্মের সবচে সফল প্রচারক রবীন্দ্রনাথ; রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে ব্রাহ্মধর্ম হিন্দুর মন দখল করে নেয়। ধর্মসংস্কারে রবীন্দ্রনাথের এই এসথেটিক সাফল্য পরে নোবেল পুরস্কার আইনা দেয়; গীতাঞ্জলি ধর্মসঙ্গীত; গীতাঞ্জলি দ্ব্যর্থক, মানবিকতার ছলে ঈশ্বরবন্দনা করায়; ঈশ্বরকে দেখতে না দিয়া যেই তুরীয় পদমূলে পাঠক, গায়ক, শ্রোতাকে নিয়া ফেলে গীতাঞ্জলি সেইটা স্বয়ং ঈশ্বরের পদমূল। কিন্তু এইটার মধ্যে এই মাত্রার খৃস্টধর্ম বইসা-শুইয়া আছে যে, আপনি যেনবা মাছ-দুধের অভাবে পইড়া আপনার বিলাইটারে ঘাস খাওয়ানো শিখাইয়া বিলাইটার জীবন রক্ষা করলেন। কিন্তু এই যে বিলাইটারে আপনার বইলা আপনি স্বীকার করলেন, বাঁচাইলেন এইটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কইরা আর ধর্মবিদ্বেষী নাস্তিক, অসামাজিক,  ‘ইয়ং বেঙ্গল’ হইলো না, শিক্ষিতরা খৃস্টধর্ম নেওয়া ছাইড়া দিলো। কিন্তু হিন্দুধর্মের অতো খারাপ দশা ছিলো না আসলে; রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্ম প্রচার না করলেও হিন্দুধর্ম টিকে যাইতে পারতো; কেননা ততদিনে ‘ইয়ং বেঙ্গল’দের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান কইরা বঙ্কিমদের হাতে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ পয়দা হইছে; হিন্দুধর্ম যে আমার ধর্ম সেইটা কোলকাতা মনে প্রাণে মাইনা নিছে। বিদ্যাসাগরের মাধ্যমে হিন্দুধর্ম আরো জোরদার হইয়া ওঠে; উনি সবকিছুরে হিন্দুধর্ম দিয়া অনুমোদিত করাইয়া নিতেন; সংস্কৃত ভাষার প্রতি প্রেমও হিন্দুধর্ম রক্ষার তাবিজ হিসাবে কাজ করছিলো। এমনকি এক সময়ের ‘ইয়ং বেঙ্গল’ মধুসূদন কপোতাক্ষ নদ আর বাংলা ভাষা নিয়া কবিতা লিখছে; সাবেক হিন্দু, বর্তমান খৃস্টান মধুসূদনের মাধ্যমে হিন্দুদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় বিপ্লবের নজির হইলো মেঘনাদবধ কাব্য; এইটা বড়োজোর রাবণের দুর্দশা আর মেঘনাদের মরণকে অন্যায্য মনে করে, হিন্দু ঈশ্বরের কাছে অভিযোগ করে, নাকিকান্না দেখায়, ডিনাই বা অস্বীকার করে না আদৌ।

‘ইয়ং বেঙ্গল’দের প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়া কোলকাতার ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কনফার্ম করলো যে সে ইউরোপ, বিজ্ঞান, সেক্যুলারিজম আপ্রাণ গ্রহণ করবে কিন্তু ধর্মবিদ্বেষী নাস্তিক হবে না; কেননা ‘আমার ধর্ম’ বলে কোলকাতার ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ‘হিন্দু ধর্ম’কে চিনতে পারছে এবং জাতীয় আইডেন্টিটির সেন্টারে জায়গা দিছে।

কোলকাতার ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র কাছে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ঋণী; এই ঋণের কারণেই বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ‘আমার ধর্ম’ হিসাবে প্রধানত ইসলামরে সেন্টারে রাখলেও অন্যান্য ধর্ম, বিশেষত হিন্দুধর্মরে জায়গা দিতে পারছে। বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কখনো মুসলিম ‘ইয়ং বেঙ্গল’ হইতেই দেয় নাই। ইউরোপের বিজ্ঞানচেতনার লঘু রূপ হিসাবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নাস্তিক্য পয়দা হইছে; ফরহাদ মজহারের অনূদিত চিন্তা এই বিজ্ঞানচেতনা থেকে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে ডিফারেন্সিয়েট করতে পারে না। কিন্তু দ্যাখেন,  মুসলিম বাংলা সাহিত্য বা ইতিহাসে মুসলিম শাসন বা ইসলামের ইতিহাস মনোযোগ দিয়া পড়ে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। এমনকি বাংলার স্বাধীনতা হরণকারী সম্রাট আকবরকেও নিখিল ইসলামী শাসনের গৌরব মনে করে এই ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। ইসলাম বিষয়ে কড়া সেন্টিমেন্ট দেখাইছে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। পশ্চিম পাকিস্তান যখন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানকে পর্যাপ্ত মুসলমান মনে করে নাই তখন বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ পাকিস্তান রাষ্ট্রেই থাকতে রাজি হয় নাই আর। আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক প্লাটফর্মের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান বাঙালিরা বা হইতে থাকা বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ পশ্চিম পাকিস্তানিদের ইসলামের ডেফিনিশন ডিনাই করছিলো। ভাষা এবং বর্ণমালার সাথে ধর্মের বিরোধ মানে নাই। বাংলা ভাষা ও হরফ ইসলামবিরোধী বলছিলো পাকিস্তানপন্থিরা, বাংলা স্ক্রিপ্ট আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব দিছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। এর অর্থ হইলো বাংলা ভাষায় অনূদিত কোরান শরীফকে কোরান শরীফ বলেই মানতে রাজি হন নাই ওনারা; কিন্তু বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ গিরীশ চন্দ্র সেনরে কোরান শরীফ বাংলায় অনুবাদ করায় ধন্যবাদ দিছে। আইউব খানের নির্দেশে রবীন্দ্রনাথরে ছাড়তে রাজি না হইয়া নজরুলের হামদ-নাত দিয়া ইসলাম পালন করছে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। পাকিস্তান আমলে বাংলায় আল্লা-রসুল নামে জিকির আর বন্দনা বিরাট রাজনৈতিক ঘটনা এবং পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমান বাঙালির পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভিন্ন ইসলাম ভাবনার স্টেটমেন্ট। ৭ মার্চের বক্তৃতায় শেখ মুজিবের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ইসলামে নিজের জায়গা আবার ক্লেইম করছিলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে মুজিব যখন বলেন ‘তোমরা আমাদের ভাই…’, কিসের ভাই সেইটা? দ্বীনের ভাই!

বলছিলাম, বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ গিরীশ চন্দ্র সেনরে কোরান শরীফ বাংলায় অনুবাদ করায় ধন্যবাদ দিছে। এইটা বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বৈশিষ্ট্য লোকেট করতে পারে। বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ সব সময় চাইছে সাধারণ মানুষ যেন সরাসরি ইসলামী টেক্সট পড়তে পারে। একই ধরনের ঘটনা ইউরোপে ঘটছিলো। বিভিন্ন দেশি ভাষায় হিব্রু বাইবেল অনূদিত ও প্রচার হইতে থাকে ইউরোপে ছাপাখানা চালু হবার পরে। এইটা মধ্যস্বত্বভোগী চার্চের গুরুত্ব কমাইতে থাকে। বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বাংলাদেশের এই রকম মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্ছেদ করে আল্লাহ-রাসুলের সাথে সাধারণ মানুষদের সরাসরি যোগাযোগ ঘটাইতে চাইছে। নজরুল-জসিম উদ্দীন যাদের মোল্লা-মৌলবী বলছিলেন, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্’র মজিদদের এই মধ্যস্বত্বভোগী হিসাবে চিহ্নিত করছে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। গ্রামে স্কুল করতে চাইয়া মজিদের কাছে নাজেহাল হয় যেই মুসলমান বাঙালি, সেই হইলো বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ মুসলমান বাঙালিরে শিক্ষিত করতে চায়; ‘শিক্ষিত’ হইয়া যাতে নিজেরাই কোরান-হাদীস পাঠ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে চায়। মাজারের বা মৌলবীর ইসলামের চাইতে কিতাবী ইসলামরেই আসল ইসলাম মনে করে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। সেইটা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই শেখ মুজিবের মাধ্যমে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশান’ বানাইছিলো বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’।

কিন্তু এইটা করতে যাইয়া অশিক্ষা’র প্রতি যেই অবজ্ঞা করে বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এবং বাংলাদেশের বাঙালি ভিন্ন অন্যান্য জাতিগুলিকে যেইভাবে অস্বীকৃতি জানায় তা শেষ পর্যন্ত এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মৌল প্রজেক্টকেই ব্যর্থ করে দেবে।

বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ও নাস্তিক্য বিষয়ে দুইটা উদাহরণ দেই। হুমায়ুন আজাদ এবং তসলিমা নাসরিন; দুইজনের মাঝেই নাস্তিক্যের লক্ষণ প্রবল, এই লক্ষণ ধর্মবিদ্বেষ পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু দুইজনের কেউই বাংলাদেশের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ থাকতে পারেন নাই আসলে। জাতীয় পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য বা প্রেম দেখাইতে পারেন নাই তসলিমা নাসরিন; হুমায়ুন আজাদ ইভেন বাঙালিকে রেসিয়ালি ঘেন্না করতেন।

বি.দ্র. ‘শিখা গোষ্ঠী’র ধর্ম চিন্তা নিয়া কিছু আলাপ দরকারি ছিলো এই লেখায়; কিন্তু আমি এই গোষ্ঠীর লেখাপত্র না পড়ায় কিছুই বলতে পারলাম না! শুধু বুঝতে পারি, এনারা শিক্ষার প্রসার চাইতেন, শিক্ষায় মানবতার মুক্তি সম্ভাবনা দেখতেন। ইসলাম ‘শিক্ষা’রে যেই গুরুত্ব দিয়া থাকে তাতে করে বলা যায় ওনারা ইসলামের একটা মৌল এজেন্ডার বাস্তবায়নে মনোযোগী ছিলেন। ওনাদের মাধ্যমে বিজ্ঞানচেতনার একটা ইসলামঘনিষ্ঠ বাংলাদেশি ভার্সন তৈরি হচ্ছিলো অনুমান করি।

২২ মার্চ ২০১৩

ফেসবুক নোটের লিংক: http://goo.gl/A4eHl

  • Qadaruddin Shishir

    পড়লাম। এবং ভাল লাগলো। কিছু নতুন চিন্তা পেলাম। আমি এই ইতিহাসগুলা পড়ার চেষ্টা করতেছি। আপনার আরো লেখা এই লাইনে যদি থাকে খুঁজে পড়বো।

  • আফম জাকারিয়া

    পড়ি, পড়া দরকারি-উপকারি