ডোনেটিং মাই আইজ টু ফরহাদ মজহার

ফরহাদ মজহার উবাচ (মানে কইলেন), রাষ্ট্রে ইসলামকে স্বীকার করতে হবে; আরো উবাচ, রাষ্ট্রে ধর্মকে স্বীকার করতে হবে। কিন্তু ‘স্বীকার’ করা দিয়া তিনি ঠিক কী কইছেন, জানেন কেউ? আমি দেখি নাই; তার মানে, উনি কইতেও পারেন, আমি জানি না। কইয়া থাকলে কেউ জানাইয়েন।

রাষ্ট্রে ধর্মকে স্বীকার করতে ফরহাদ মজহারের দাবি’র অর্থ কী হইলো তাইলে? উত্তরাধিকারে পাওয়া কলোনিয়াল লিগ্যাল স্ট্রাকচার বাতিল করা যাবে না, তিনি কলোনিয়াল লিগ্যাল স্ট্রাকচারের পার্পেচুয়েশান বা চিরস্থায়িত্ব চাইছেন। পাঁচ বছরের সরকার ১০০ বছর পরের অবস্থা নিয়া তো কোন আগাম কথা দিতে পারেন না; কিন্তু এযাবত কোন সরকার ফরহাদ মজহারের এই চাওয়ার বিপরীতে কোন পদক্ষেপ ভুলেও নেন নাই। নিয়ার ফিউচারে তেমন কোন লক্ষণও দেখা যাইতেছে না। এ ব্যাপারে হাসিনা-খালেদা মজহারের কথা মতোই চলছেন অলরেডি; বরং উল্টাটাই বলতে হবে; মজহারই ওনাদের চলার মতো করে কথাবার্তা-দাবি তুলছেন।

-------------------------

কিন্তু একটা অর্থ নিশ্চই পাইতে পারি ওনার দাবির; যে, রাষ্ট্রে ইসলাম স্বীকার করা হয় নাই; এবং এক্সটেন্ডেড অর্থে পাই–রাষ্ট্রে ধর্মকে স্বীকার করা হয় নাই। এবং ঘুরাইয়া আরো অর্থ করতে পারি যে ইসলাম বা ধর্ম এই রাষ্ট্রে নিতান্তই প্রাইভেট, পাবলিক পরিসরে ধর্মকে অস্বীকার কইরা আছে এই রাষ্ট্র। প্রাইভেট এবং পাবলিক স্পেসের ডিভাইডিং লাইন নিয়া ডিবেট আছে; ধইরা নিলাম উনি এই ডিবেট থিওরির মার্কেটে আসার আগের অর্থে প্রাইভেট এবং পাবলিক টার্ম ইউজ করছেন। হইতেই পারে, এই থিওরির মার্কেট কর্পোরেট বা ইউএস ফার্টিলাইজার ও কীটনাশক থাকতে পারে এই থিওরিতে; তাই উনি এই মার্কেট এড়াইয়া আছেন। এই অনুমানে আমি প্রাইভেট এবং পাবলিক স্পেসের ডিবেট আনবো না এইখানে, আরো আনবো না রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মগ্রন্থ পড়ার ঘটনা। এইটুক স্নেহ আমি করবো ওনাকে।

তাইলে ওনার কথার অর্থ এইটুক করতে পারলাম আমি: এই রাষ্ট্র ইসলামকে (এবং অন্যান্য ধর্ম) পাবলিক স্পেসে স্বীকার করে নাই। লঘু তার্কিকরা বলবেন, কেন সংবিধানে জিয়া আর এরশাদ ইসলামরে প্রতিষ্ঠা দিয়া গেছেন! আমি এইটা বলবো না; ওই প্রতিষ্ঠা লিখিত হওয়া মাত্র, বাস্তবে ওতে কোন নতুন সুবিধা ইসলাম পায় নাই বিশেষ। এইটা না বলা ওনার উপর আমার নতুন স্নেহ নিক্ষেপ না, স্রেফ লঘু তার্কিক হইতে না চাওয়া। একটা বিষয় অবশ্য বলতে হচ্ছে; শুক্রবারের সাপ্তাহিক রাষ্ট্রীয় ছুটি পাবলিক স্পেসে ইসলামকে গুরুত্বপূর্ণভাবে স্বীকার করে নেওয়া; বৈদেশিক বাণিজ্য করেন এমন ব্যবসায়ীরা এইটা চেঞ্জ করার দাবি করে আসলেও রাষ্ট্র তা করে নাই। এখানে আরেকটা তথ্য দিতে চাই; ছুটির দিন নিয়া ভাবলে পাশ্চাত্যের সকল সেক্যুলার রাষ্ট্রই পাবলিক স্পেসে ধর্ম স্বীকার করে নিছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটা কয়েনে ইভেন লেখা দেখলাম, “IN GOD WE TRUST.” ছুটির দিন রবিবার চার্চে যাবার দিন; ক্রিসমাসকে খ্রিস্টান পাশ্চাত্যের দেশগুলি বিশেষ মর্যাদায় স্বীকার করে নিছে; বাংলাদেশও তাই। বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী, পুজা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা ইত্যাদির মাধ্যমে অন্যান্য প্রধান ধর্মরেও স্বীকার করে নিছে। সেক্যুলারিজম পাবলিক স্পেসে ধর্মকে স্বীকার করে না—এইটা অতি মিথ্যা কথা। মজহার এগুলিরে স্বীকার করা বলে নাও মানতে পারেন; তাইলে যুক্তি হাজির করতে হবে ওনার; করছেন বলে দেখি নাই।

এইবার গুরুতর দিকে যাই; দুইজন মুসলিম যদি শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে করে একগামী যৌনসম্পর্কে থাকতে চান, বিয়ের বাইরে যৌনতায় না যাইতে চান, বাংলাদেশ রাষ্ট্র কি তাদের বিয়ের বাইরে বহুগামী যৌনসম্পর্কে যাইতে বাধ্য করে? না। হিন্দুদের? খৃস্টানদের? বৌদ্ধদের? না। বরং বাংলাদেশ এইটারেই উৎসাহিত করে, এমনকি যাঁরা এমনটা করতে চান না তাদেরো বাধ্য করার চেষ্টা করে। কেমনে? বিয়ার বাইরে বাচ্চা হলে তাঁর বাপ থাকে না; কিন্তু রাষ্ট্র বারবার বাপের নাম জানতে চায়। স্কুলে, ন্যাশনাল আইডিতে, হসপিটালে, চাকরিতে—সব জায়গায়। বাপের সম্পত্তির হক দাবি করতে দেয় না রাষ্ট্র। ধর্ম জানতে চায়; বাপের ধর্মরেই ছেলে মেয়ের ডিফল্ট ধর্ম হিসাবে গণ্য করা হয়। ফ্যামিলির মালিক আইনত পুরুষ, কোত্থেকে আসলো এইটা? ধর্ম থেকেই। উত্তরাধিকার ভাগ করার আইন ধর্মীয়। এগুলি পাবলিক স্পেসে ধর্মকে স্বীকার করা বটে। সিটি কর্পোরেশন ঈদের জামাতের আয়োজন করে, কোরবানীর হাটের ব্যবস্থা করে, কোরবানী দেবার জায়গা করে দেয়। বায়তুল মোকাররমের ব্যয় রাষ্ট্রীয়ভাবে বহন করা হয়; হজ্বের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, পরিবহন আছে; হজ্ব ক্যাম্প আছে সরকারি; রাষ্ট্রে একটা ধর্ম মন্ত্রণালয় আছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন আছে; মসজিদ, মন্দিরে রাষ্ট্র অনুদান দেয়। পাবলিক স্পেসে ধর্মকে এইভাবে স্বীকার করা দেখছেন না কেন ফরহাদ মজহার?

আরো গুরুতর দিক আছে। ১৮৫৭ সালের পর ইংরাজ শাসক ভারতবর্ষে আইন করার ব্যাপারে খুবই সাবধানী হয়ে ওঠে। যেকোন আইন হিন্দু ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ নিয়া করতো ঔপনিবেশিক শাসক। হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রে এর বড়ো উদাহরণ বিদ্যাসাগর। ইন ফ্যাক্ট, ১৮৫৭ সালের আগে থেকেই বিদ্যাসাগরের পরামর্শ নিতো ইংরাজ। হিন্দু কলেজে অব্রাহ্মণ ছাত্র ভর্তি করা ঠিক হবে কিনা সেই ব্যাপারেও বিদ্যাসাগরের মত নেওয়া হইছিলো। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে বিধবা বিবাহ অনুমোদিত—এইটা বিদ্যাসাগর পাবলিক ডিবেটে প্রমাণ করার পরেই এই বিষয়ে আইন করছিলো ইংরাজ; ১৮৫৫ সালে। মুসলিম ধর্মবেত্তা, নেতা, বুদ্ধিজীবীর পরামর্শও নিতো রেগুলার। উদাহরণ দিলাম না; খোঁজার ধৈর্য ও সময় নাই এখন। বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. সলিমুল্লাহ খান কয়েকদিনের মধ্যেই উদাহরণ দিয়া আমারে প্রতিপাদন করবেন ধইরা নিচ্ছি!

তো, ইংরাজ চইলা গেলো সেই কবের ১৯৪৭ সালে; পাকিস্তান হইয়া বাংলাদেশ হইলো; কিন্তু রইয়া গেলো ইংরাজের আইন। পরিবর্তন বলতে নামগুলি প্রতিস্থাপন করা: ইন্ডিয়া বা বেঙ্গলের জায়গায় পাকিস্তান, পাকিস্তানের জায়গায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আইনের ভিতর ড. কামাল, ব্যা. আমীরুল ইসলামদের বিরাটাকায় অবদান এইগুলি, নো ডাউট; তাইলে কী খাড়াইলো? ঔপনিবেশিক আইনগুলিরে প্রায় অবিকল গ্রহণ কইরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র অলরেডি ধর্মকে স্বীকার করা একটা লিগ্যাল স্ট্রাকচার পাইয়া আছেই উত্তরাধিকারে। রাষ্ট্রে ধর্মকে স্বীকার করতে ফরহাদ মজহারের দাবি’র অর্থ কী হইলো তাইলে? উত্তরাধিকারে পাওয়া কলোনিয়াল লিগ্যাল স্ট্রাকচার বাতিল করা যাবে না, তিনি কলোনিয়াল লিগ্যাল স্ট্রাকচারের পার্পেচুয়েশান বা চিরস্থায়িত্ব চাইছেন। পাঁচ বছরের সরকার ১০০ বছর পরের অবস্থা নিয়া তো কোন আগাম কথা দিতে পারেন না; কিন্তু এযাবত কোন সরকার ফরহাদ মজহারের এই চাওয়ার বিপরীতে কোন পদক্ষেপ ভুলেও নেন নাই। নিয়ার ফিউচারে তেমন কোন লক্ষণও দেখা যাইতেছে না। এ ব্যাপারে হাসিনা-খালেদা মজহারের কথা মতোই চলছেন অলরেডি; বরং উল্টাটাই বলতে হবে; মজহারই ওনাদের চলার মতো করে কথাবার্তা-দাবি তুলছেন।

২৪ মার্চ ২০১৩

ফেসবুক নোটের লিংক: http://goo.gl/od15d