আরে! নিজেরা নিজেরা কী করতেছিলাম আমরা? আমরা তো সবাই ছফা!

তাইলে ‘লুঙ্গিপড়া কবি’ ফরহাদ মজহারের রূপক, আর ‘ঝুঁটিবাধা পুরুষ’ ড. সলিমুল্লাহ খানের। দুইজনার আরেকটা করে নাম, দিছেন সিদ্দিকুর রহমান খান। ‘ফরহাদ মজহার’ বা ‘সলিমুল্লাহ খান’ও রূপক, প্রাইমারি রূপক; কিন্তু সমাজ এদের দিছে অর্থের মর্যাদা। সিদ্দিকুর রহমান খান প্রাইমারি রূপক ব্যবহার না কইরা সেকেন্ডারি রূপক ইউজ করছেন, এই ক্ষেত্রে উনি রূপক দিয়া অর্থে পৌঁছাইছেন। তাতে সমস্যা নাই তো কোন। বা আমি একটু সমস্যা মনে করতেই পারি; কিন্তু ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, সাখাওয়াত টিপু, তৈমুর রেজা, ফারুক ওয়াসিফ বা সুমন রহমান নিশ্চয়ই দেশে রূপকের ব্যবহার বাড়তে থাকায় খুশি হইতে থাকবেন (ফারুক ওয়াসিফের ‘ট্রয়ের ঘোড়া’, টিপুর বিলাই বা মাস্টার মশাই, তৈমুরের ঘোড়া, রাম, রাবণ—এগুলির কথা মনে পড়লো; আর ড. খান তো অনুবাদও রূপকে ভরাইয়া তোলেন; বা ফরহাদ মজহার লিখলেন–…তীক্ষ্ন বল্লমের মতো চোখে বিঁধত রেললাইন। )। সিদ্দিকুর রহমান খানও নামের বদলে রূপক দিয়া ডাকলেন আর কি।

পাওয়ারফুল মানুষজনকে রূপক দিয়া বুঝাবার চেষ্টা আগে থেকেই আছে, এইটা ভয়েই বেশি হয়; এইবার মজহার বা ড. খানের মতো নিরীহ লোকদেরো রূপক দিয়া ডাকা শিখাইলেন আরেক খান। নাকি ওনারাও কম ভয় পাবার মতো লোক নন, কে জানে! সিদ্দিকুর রহমান খানের হিসাব-নিকাশ জানি না ঠিক।

-------------------------

কিন্তু এর বাইরেও সিদ্দিকুর রহমান খান কিছু ভুল কথা লিখছেন (http://new.ittefaq.com.bd/news/view/111014/2012-07-13/35); বিশেষতঃ ছফার ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’-কে ‘উপন্যাস’ বলাটাকে আমি ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যাচার হিসাবে দেখতে বলবো; কেননা এইটারে স্রেফ একটা তথ্য বিভ্রাট হিসাবে দেখলে লেখাটা নিয়া আলোড়ন অনেক কইমা যায়! আরো বড় ব্যাপার হইলো—‘ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যাচার’ হিসাবে দেখতে পারলে এখনকার বিবদমান কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ব্লক ছফাপ্রেম নামের এক অভিন্ন প্লাটফর্মে একসাথে খাড়াইতে পারেন আবার। প্রবল এবং সাধারণ বহিঃশত্রু দেইখা এক সাথে বইলা উঠতে পারেন—আরে! নিজেরা নিজেরা কী করতেছিলাম আমরা? আমরা তো সবাই ছফা!

কিন্তু, এমনকি তথ্য বিভ্রাট হিসাবেও এরে না দেখা যাইতে পারে! সমালোচক সিদ্দিকুর রহমান খান ছফার স্মৃতিকথারে ‘উপন্যাস’ হিসাবে দেখতেই তো পারেন, নাকি না? ছফা কি ‘স্মৃতিকথা’রে রূপকার্থে উপন্যাস হিসাবে লিখতে পারেন না? বা না লিখলেও সমালোচক তো তারে ‘উপন্যাস’ বলতে পারেন; তৈমুরের বিশ্লেষণেই তো স্মৃতিকথার মাঝে উপন্যাসের সম্ভাবনা দেখাইছেন তিনি (http://goo.gl/HUcxT )।  সিদ্দিকুর রহমান খানের কাছে যুক্তি চাওয়া যাইতে পারে অবশ্য– কেন তিনি ‘উপন্যাস’ বললেন।

সিদ্দিকুর রহমান খান আরো জানাইছেন ছফার স্কুল বন্ধ হইয়া যাবার কথা, তাতে ড. জাফর ইকবালের কষ্ট পাবার কথা। এবং অভিযোগ করছেন ‘লুঙ্গিপড়া কবি’ আর ‘ঝুঁটিবাধা পুরুষ’ সেইটার খোঁজ না রাইখা ছফারে ‘মহাত্মা’ বানাইতেছেন, আসল ছফাচর্চা করতেছেন না। এতে ভুল কী? ছফারে ‘মহাত্মা’ বানানো নিশ্চই ছফাচর্চা না, ছফা তো নিজেরে ‘মহাত্মা’ হিসাবে দেখতেন না! সিদ্দিকুর রহমান খান যে ভাষা বিষয়ক সমালোচনা করছেন সেই ভাষায় লেখাও তো ছফাচর্চা না! ছফা চলিত ভাষায় লিখতেন, ড. খান লেখেন সাধু ভাষায়। ড. খানের ভাষাকে নিশ্চই ছফা চর্চা বলবার উপায় নাই।

আবার স্কুলটা তো আসলেই ছফা! ছফার ভাইস্তা নূরুল আনোয়ার তাঁর লেখায় জানাইছেন ছফা তাঁর পরিবারের শিক্ষা নিয়া কেমনে ভাবতেন। বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসারে ছফার আগ্রহ তো ছিলোই! ছফার স্কুল বাঁচাইয়া রাখতে চাওয়া তো ছফাচর্চা বটেই। ব্র্যাক স্কুলকে ছফার শিক্ষাস্বপ্নের কতক বাস্তবায়ন বলা যাইতে পারে।

সিদ্দিকুর রহমান খান ছফার বই পড়াইতে চাইছেন, সরকারকে দিয়া কেনাবার কথা বলছেন ছফা চর্চার জন্য। ওনার এইটা ভালো প্রস্তাব ছফা চর্চার জন্য। ছফার বই না পইড়া ফরহাদ মজহার আর ড. খানের বিশ্লেষণ শোনা যাইতে পারে, বা সিদ্দিকুর রহমান খানের। কিন্তু মি. খান বরং ছফার বই পড়ার কথা বলছেন। এইটা নিশ্চই সবচে সহি ছফা চর্চা। ওনার এই প্রস্তাবের বিরোধিরা কী তাইলে ফরহাদ মজহার আর ড. খানের ছফা বিশ্লেষণ পড়তে বলেন মাত্র? ছফার বই পড়া শুরু করলে কি ওনাদের বিশ্লেষণ কোন সমস্যায় পড়ে? ছফার লেখা কি ওনাদের ছফা বিশ্লেষণের প্রতিপক্ষ?

এর বাইরে ইন্ডিয়া বিষয়ে ছফার অবস্থান নিয়া ফরহাদ মজহার আর ড. খানের বিশ্লেষণরে সমালোচনা করছেন সিদ্দিকুর রহমান খান। তা সিদ্দিকুর রহমান খান যেমন বলেন—অতটা ইন্ডিয়া অনুরাগ ছফার ছিলো না ঠিক, কিন্তু ইন্ডিয়ায় তো তিনি আসলেই ছিলেন, তখন তো কিছু অনুরাগ ছিলোই। এছাড়া ইন্ডিয়া বিরোধিতার চাইতে বাঙালি মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য নিয়াই ছফা চিন্তা করছেন বেশি, বাঙালি মুসলমানের হীনম্মন্যতা কাটাবার জন্য যতটা ইন্ডিয়া বিরোধ দরকার—ততটাই মাত্র করছেন ছফা। বা ধরা যাক, সিদ্দিকুর রহমান পুরাই ভুল বললো, আমিও—তাই বলে ওনারে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করবেন? ‘আবাল’ বলবেন? বা ‘রাম’? রাম হয়তো আবার ছাগলের আগের অংশ! ছফা যে ইন্ডিয়া বিরোধী—সেইটাই দেখাইয়া দেন বরং! লেখেন, লেখেন।

সিদ্দিকুর রহমান খানের বিশ্লেষণের বিপরীতে ছফা নিয়া লেখার পরিবর্তে সিদ্দিকুর রহমান খানরে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর গালাগালিই বাইছা নেওয়া দেখতে পাইতেছি। এমনকি তৈমুর একটা ‘গদ্য-কার্টুন’ও আঁইকা ফেলছেন সিদ্দিকুর রহমান খানের। এই কার্টুনে সিদ্দিকুর রহমান খান যা বলেন নাই তাও ওনার মুখে আঁইকা দিছেন তৈমুর। ‘… প্রকাশ্য সভায় লুঙ্গি পরেন’ বইলা ফরহাদ মজহারের প্রতি মি. খানের আক্রোশ আছে বইলা জানাইছেন তৈমুর। মি. খান তেমন কিছু বলেন নাই। তৈমুরও ‘সম্ভবত’ বলছেন। কিন্তু এই অনুমান জটিল এক ক্রিয়া ঘটাইতে পারে পাঠকের ভিতর। এতে ফরহাদ মজহার বিষয়ে ছফার যেই বক্তব্য জানাইছেন মি. খান, সেইটা মি. খানের মিথ্যাচার হিসাবে প্রতিপাদিত হইয়া যায় প্রায়। যেনবা মি. খান নিজের আক্রোশের কারণে নিজের ছফাস্মৃতির মাঝে নিজের আক্রোশটারেই ঢাইলা দিছেন। ওনার এই আক্রোশের কারণে ফরহাদ মজহার বিষয়ে ছফার স্মৃতিচারণ করার অধিকার হারাইছেন উনি।

কিন্তু এমনকি আক্রোশ থাকলেই স্মৃতি কি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মিথ্যা হইয়া যায়? হওয়াটা যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করা যায় না। আসলে উল্টাটাও ঘটতে পারে: ছফা সত্যই ওই কথা বলছেন বইলাই আক্রোশটা পয়দা হইছে পরে। স্মরণ করা যাক সেই স্মৃতি: (‘তিনি [লুঙ্গিপরা কবি] সব সময় অসৎ চিন্তা করেন, তাই লেখাগুলো সুপঠিত হয় না। উত্কৃষ্ট রচনা লেখা একজন লেখকের প্রধান কাজ। কিন্তু এ লেখকের লেখা পাঠককে কামড়াতে আসে বলে মনে হয়। এক লাইন পড়লে আরেক লাইন পড়তে আর ইচ্ছে হয় না। তাদের লেখায় তেমন সার পদার্থ থাকে না। গুটিকয় শিষ্য আছে যারা তার লেখা কষ্ট করে পাঠোদ্ধার করে মাত্র।’—মি. খানের স্মৃতিতে ছফা

১৮.৭.২০১২

ফেসবুক নোটের লিংক: http://goo.gl/603BN