রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুইটা দুর্লভ ভিডিও

বিডিনিউজ২৪.কম-এর আর্টস বিভাগে কাজ করতাম। আমার বস ছিলেন ব্রাত্য রাইসু। ২০১১ সালের এপ্রিল-মে মাসে উনি ওয়েব থেকে রবীন্দ্রনাথের দুইটা না দেখা ভিডিও ফুটেজ বাইর করেন। পরে এই দুইটা আর্টস-এ প্রকাশ করি আমরা। ফুটেজ দুইটা নিয়া একটা করে ব্রিফ তৈরি করার দায়িত্ব দিছিলেন আমারে। আমি দায়িত্ব পালন করি।

ভিডিও এক

নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে রবীন্দ্রনাথ, ৯ অক্টোবর ১৯৩০

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরেকটি ভিডিও পাওয়া গেছে। উৎস সূত্রে জানা যায়, ৯ অক্টোবর ১৯৩০ নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিয়েছিলেন। আরো বলা আছে, ১৯২০ সালের পরে এটি তাঁর প্রথম সফর। অন্য সূত্রে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ১৯২০ সালের ২৪ অক্টোবর নিউ ইয়র্ক পৌঁছান এবং ১০ নভেম্বর ব্রুকলিনে বক্তৃতা দেন; বক্তৃতার বিষয় ছিল–’পূর্ব পশ্চিমের সাক্ষাৎ (The Meeting of the East and the West)’। রবীন্দ্রনাথ ভারত থেকে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ঘুরে নিউ ইয়র্ক যান। এই যাত্রাটি ছিল বিশ্বভারতী’র জন্য ফান্ড সংগ্রহের যাত্রা; যাত্রাকালে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে তিনি ফান্ড জোগার করেন।

-------------------------

brooklyn-tagore.jpg…….
ব্রুকলিনে রবীন্দ্রনাথ
…….
১৯৩০ সালের ব্রুকলিনে ৩৭ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে রবীন্দ্রনাথ একজন অফিসিয়ালের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটছেন। নির্বাক ভিডিও হবার কারণে বুঝবার উপায় নাই যে রবীন্দ্রনাথ কী বলছিলেন। লিপ-রিডিং এক্সপার্টের জন্যও বোঝা শক্ত হবে; কেননা, রবীন্দ্রনাথের গোঁফ-দাড়ির জন্য তাঁর ওষ্ঠাধর (লিপ) দেখবার উপায় নাই। এই ভিডিওটি ‘ইউনিভার্সাল নিউজপেপার’-এর নিউজরিল-এ পাওয়া গেছে। রবীন্দ্রনাথের পরিচয় এখানে ‘স্যার’ ও ‘বিখ্যাত হিন্দু কবি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিও দুই

১৯০৯ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত ফরাসি ব্যাংকার আলবার্ট কান (১৮৬০–১৯৪০) ‘আর্কাইভস্ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেন। ব্যয়বহুল এই প্রকল্পে ফটোগ্রাফার এবং সিনেমাটোগ্রাফার নিয়োগ করেন আলবার্ট কান। এই প্রকল্পে তিনি সারা বিশ্বকে ক্যামেরা দিয়ে রেকর্ড করার পরিকল্পনা নেন। ফ্রান্সের Boulogne-Billancourt-এ একটি বাগান তৈরি করে সেখানে রাখেন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান প্রধান স্মারক চিহ্ন আর গাছপালা। একই সাথে তৈরি করেন একটি স্টুডিও।

আলবার্ট কানের আমন্ত্রণে ফ্রান্সে রবীন্দ্রনাথ (১৯২১ ও ৩০)

১৯০৯ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত আলবার্ট কান ২৩ জন নোবেল বিজয়ীসহ বিশ্বের প্রায় ৪০০০ অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, আর্টিস্টকে তাঁর বাগানে আমন্ত্রণ করেন এবং তাঁর নিযুক্ত এই ফটোগ্রাফার এবং সিনেমাটোগ্রাফাররা এই বিশ্বখ্যাত অতিথিদের নিয়ে ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্রে ডকুমেন্টারি তৈরি করেন। নিউইয়র্ক টাইমসে JACQUELINE McGRATH-এর প্রবন্ধে এই প্রকল্প ও আলবার্ট কান বিষয়ে লিখেছেন, ”তিনি (আলবার্ট কান) বিশ্বাস করতেন–অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের বিশ্বনেতারা বিশ্বের সাংস্কৃতিক দেয়ালগুলো ভেঙে দেবার ক্ষমতা রাখেন।”

১৯২১ এবং ১৯৩০ সালে দুই দফায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আলবার্ট কানের আমন্ত্রণে ও আতিথ্যে ফ্রান্সে থাকেন। আলবার্ট কানের স্টুডিও, বাগান ও কেপ মার্টিন-এ স্টিল এবং ভিডিও ক্যামেরায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধারণ করেন কান নিয়োজিত ফটোগ্রাফার ও সিনেমাটোগ্রাফার। ৪ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে ৯ বছর আগে পরের সাল দেয়া আছে। ভিডিওর প্রথম অংশ ১৯২১ সালে ধারণ করা আর দ্বিতীয় অংশ ১৯৩০ সালে। তিনটি স্থানের নাম বলা আছে–Le Bourget, ১৬ এপ্রিল ১৯৩০, Boulonge, এপ্রিল ১৯২১ এবং Cap Martin, ১৯৩০। নির্বাক এই ভিডিওটির ক্যামেরা অপারেট করেছেন Camille Sauvageot এবং Roger Dumas, সম্ভবত ১৯২১ সালের অংশ ধারণ করেছেন Camille Sauvageot এবং Roger Dumas-এর ক্যামেরায় তৈরি হয়েছে ১৯৩০ সালের অংশ।

শুরুর সময়ে রঙিন ফটোগ্রাফি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। আলবার্ট কানের প্রকল্প শুরুর আগের বছরই মাত্র রঙিন ছবি তোলার জন্য ‘অটোক্রোম (Autochrome)’ ফ্রান্সে বাজারজাত করেন Auguste এবং Louis Lumière; আলবার্ট কানের নিযুক্ত ফটোগ্রাফাররা অন্তত বাহাত্তর হাজার রঙিন ছবি তোলেন বিশ্বব্যাপী এবং ১০০ঘন্টার ভিডিও ধারণ করেন। বিশ্বের ৫০টি দেশের মানুষজন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্কৃতির ধর্মীয় ও আচার অনুষ্ঠান, গাছপালা, ল্যান্ডস্কেপ—সবই তাদের ফটোগ্রাফির বিষয় ছিল। ছবিগুলোর বেশিরভাগই অপ্রকাশিত। রবীন্দ্রনাথের সবগুলি রঙিন ছবি সম্ভবত আলবার্ট কানের স্টুডিও ও বাগানে তোলা।

আরো দুইটা ভিডিও

সত্যজিৎ রায়ের ডকুমেন্টারি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১)

১৯৮৬ সালে কানের বাগানকে একটি মিউজিয়াম হিসেবে তৈরি করা হয় এবং মাঝে মাঝে ছবি ও ভিডিও’র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকে ভিজিটরদের জন্য। ২০০৬ সাল থেকে অনলাইনে ১৫০০ ছবি, ৮০টি স্লাইডশো এবং ছোট ছোট ১২৩টি ফিল্ম দেখবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভিডিওটি মিউজিয়ামের ওয়েবসাইটে আছে। ফরাসি ভাষার ওয়েবসাইট হবার কারণে বাংলাভাষীদের কাছে সম্ভবত এটার খোঁজ ছিল না।

রবীন্দ্রনাথের ভিডিও ফুটেজ বেশি নেই। গান্ধীসার্ভ ফাউন্ডেশন (http://www.gandhiserve.org)-এর ওয়েবসাইটে দাঁড়িয়ে কথা বলার একটি ফুটেজ (রবীন্দ্রনাথের ভিডিও) পাওয়া যায়। এই ফুটেজটি ১৯৩২ সালের। এছাড়া ১৯ আগস্ট ১৯৩৯-এ মহাজাতি সদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের একটি ফুটেজ (রবীন্দ্রনাথের ভিডিও) আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় ১৯৬১ সালে একটি ডকুমেন্টারি বানিয়েছিলেন। সেখানে ছবি এবং কিছু ভিডিও ফুটেজ আছে। সত্যজিৎ রায় ডকুমেন্টারির নাম দেন ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।

আমার আর্টস প্রোফাইল (বর্তমান আর্টস কর্তৃপক্ষ মুছে দিছেন): এস এম রেজাউল করিম