অল্প বুদ্ধি লইয়া ভাষায় রস উৎপাদন করবেন কেমনে?

আপনি হয়তো চান—আপনার লেখা হোক রসময়। কিন্তু আপনার বুদ্ধি অল্প। আপনি উইট বোঝেন না। বা বুঝলেও উৎপাদন করতে পারেন না। বা কাব্য, বা উইট উৎপাদন কইরা দ্যাখেন আপনার সেই বাচ্চা ইতিহাসে আরো চব্বিশ বার পয়দা হইছে, আপনি মান্ধাতার সমসাময়িক। প্রথম উৎপাদনের ঠিক পরে পরেই আগুনের আবিষ্কার ঘটে। আগুন আবিষ্কারের এই ৫৭ হাজার বছর পরে, এই পারমাণবিক যুগের পাঠকের জন্য আপনার প্রাচীন চিন্তা নিয়া কিভাবে পাঠ্য হবেন? আপনার ব-এর বা চ-এর বা ঠ-এর মাঝখানের শূন্যস্থান কী করে রসে ভরে দেবেন? আপনি কি তবে অধ্যাপক হয়ে যাবেন? সংবাদপত্রের ম্যানেজিং এডিটর? রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবেন? এনজিও দেবেন? লেখক আর থাকবেন না? না, লেখক থাকবার কিছু উপায় আপনার জন্যও আছে। আপনার বুদ্ধির অল্পতা কাভার করার জন্য দুইটা ছলা আমার কাছ থেকে নেন।

আপনি সাধু ভাষায় লেখা শুরু করেন। বাংলাভাষী সমাজে আপনি দেখবেন, ব্যঙ্গ করার জন্য এখন সাধু ভাষা ব্যবহার করেন অনেকেই। আগে সাধু ভাষার মর্যাদা ছিলো অন্য রকম।

-------------------------

ব্যঙ্গের সাথে রসের সম্পর্ক আছে। ব্যঙ্গে তীক্ষ্মতার অভাব কতকটা পূরণ করতে পারে সাধু ভাষা। সমাজে দেখবেন, বহু মানুষের ব্যঙ্গ করার সাধ আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত ব্যাপ্তি নাই চিন্তায়। ধরেন, আপনে না বইলা ২ ঘন্টা অফিসে নাই; আপনার বসের বস আপনার শ্যালকের শ্বাশুরী; তাই আপনার বস আপনারে কড়া কথা কইতে সাহস পাইতেছেন না। আপনার বোকা বস তখন ব্যঙ্গের কঠিন রাস্তায় নামতে পারেন। তিনি তখন বলতে পারেন—‘কী, খেজুর গাছের পিঁপড়ার পশ্চাদ্দেশ টিপিয়া গুড়ের ব্যবসায় করিতে গিয়াছিলেন?’ এই বাক্যে অবশ্য এমনিতেই রস আছে।

আমি বুদ্ধি স্থগিত রাখতে পারি না বইলা একটা ভালো বোকা বাক্য উৎপাদন করতে পারলাম না। যাই হোক, সাধু ভাষায় বলার কারণে আপনার পিত্তি জ্বলার সম্ভাবনা বাইড়া গেলো! বেশিক্ষণ ধরে বোকা বসের কথা শুনতে হলো আপনার! একটা সাংগীতিক, টেনে টেনে বলায় আপনার জ্বালা আরো বাইড়া গেলো, নাকি না? উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা বেশ মজা পাইলো! দাঁড়ান, একটা বোকা বাক্য এবং রিজনিং পাইছি! ধরেন, আপনার বোকা বস বললো—‘কী চুল্লিতে অণ্ড ভাজিতে গিয়াছিলেন?’ তিনি ভাবলেন, ‘ডিম ভাজার’ চাইতে ‘অণ্ড ভাজিতে’ নিশ্চই বেশি সময় লাগার কথা; ফলে আপনার না থাকা ২ ঘন্টার একটা ভালো ব্যঙ্গাত্মক রিজনিং করা গেলো! আবার ডিমের চাইতে অণ্ড বলায় কিছু আদি রসের ইঙ্গিত দেওয়া যাচ্ছে! দ্যাখেন, সাধু ভাষায় কেমন রস এবং ব্যঙ্গ উৎপাদন করা গেলো! আপনার বস বোকা, আর আপনি তো খালি অল্পবুদ্ধি; আপনি সাধু ভাষা ব্যবহার করে নিশ্চই রসের পরিমাণ আরো বাড়াইতে পারবেন। দ্যাখেন, ‘গাছ ফুল ফোটায়’-এর তুলনায় ‘বৃক্ষ-লতিকা পুষ্প ফুটাইতেছেন’ কতো রসের! কতকটা উইটও কি উঁকি দিলো?

অন্য একটা বুদ্ধি হইলো—শব্দ নিয়া কিছু খেলা করা। শব্দ ভাঙ্গবেন। মানে একটা স্পেস দিয়া দেবেন শব্দের মাঝে। দুয়েকটা অক্ষর পাল্টাইয়া দেবেন। শব্দ জোড়া লাগাইয়া দেবেন। দেখবেন রসময় হইয়া উঠছে আপনার লেখা! ধরেন, বরগুণা শব্দটা ভাইঙ্গা দিলেন।

 

‘বর গুণায় ঝোলে,

নামবে কনের কোলে।’

 

বা,

 

হেরি কেন যাও, তোমার পোলা ও

কোলে নাও, কোলে নাও।

 

এইখানে ‘হেরিকেন’ আর ‘পোলাও’ ভেঙে কেমন কবিতা হইয়া গেলো! অধিকন্তু অন্ত্যমিলও আছে!

 

বা,

 

শাম সুর তোলে বাঁশিতে,

রাধা গেছে কাশী তে।

 

বা,

আপনি ‘দুইশ তিন’ আর ‘দুই সতীন’ মিলাইয়া একটা উইটি জোক লিখে ফেললেন! বা ‘চন্দ্রাবতী’র বদলে লিখলেন ‘তন্দ্রাবতী’। বা ‘রবীন্দ্রনাথ’ না লিখে লিখলেন ‘সছিদ্রনাথ’। বা ‘আড়িয়াল খা’রে ‘রিয়াল খা’।  মোটের উপর, আপনি সাধু ভাষা, শব্দের ভাঙাগড়া দিয়া আপনার অল্প বুদ্ধির খবরটা গোপন রাখতে পারেন। আপনার জন্য শুভ কামনা থাকলো।।

ফেসবুক নোটে আলোচনা: অল্প বুদ্ধি লইয়া ভাষায় রস উৎপাদন করবেন কেমনে?