ইতিহাস-২: বিদ্যাসাগর বিচার

ওয়াকিবহাল বাংলাভাষীর কাছে বিদ্যাসাগর শ্রদ্ধেয়। এই শ্রদ্ধার তিনটা দিক পরিষ্কারভাবে বলা যায়: বাংলাভাষী মানুষের শিক্ষা,বাংলা ভাষা এবং সমাজ সংস্কার।  ভারতবর্ষের নারীর জন্য কাজ করা সমাজ সংস্কারের মধ্যেই পড়ে। এছাড়া ওনার মাতৃভক্তি এবং দান-খয়রাত এখনো উদাহরণ হইয়া আছে। মাতৃভক্তি এবং দান-খয়রাত আমার আগ্রহ এবং আলোচনার মধ্যে নাই। আমি শুরুর তিনটা ক্ষেত্র নিয়া বিচার শুরু করলাম।

সত্যজিৎ রায়ের ‘হিরক রাজার দেশে’ সিনেমায় ছিলো মনে হয়— ‘যত বেশি জানে, তত কম মানে।’ বা ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।’ ইত্যাদি। প্রজাদের শিক্ষার বিপক্ষে ছিলেন হিরক রাজা। এই সিনেমা জনপ্রিয়, সিনেমার মরালটাও। মরালটা হইলো, শাসিতের শিক্ষার বিপক্ষে থাকে শাসক। বাংলাভাষীদের মধ্যে এইটা ডমিন্যান্ট ভাবনা। ডমিন্যান্ট হোক বা না হোক, এই ভাবনার ভিতর থাইকা ‘বাংলাভাষীর শিক্ষায় বিদ্যাসাগরের অবদান’ বিচার করলে গলদের মধ্যে পড়তে হয়। দেখতে পাই, এই গলদের মধ্যে পইড়া থাকছেন অনেকেই। যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মাথার বদলে রবীন্দ্রনাথ দিয়া চিন্তা করার লোকের অভাব নাই বাংলায়; অধিকন্তু, মাঝে মাঝে নিজ নিজ মাথা ব্যবহার করেন বা রবীন্দ্র সমালোচকরাও রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাসাগর মূল্যায়নটা গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ কইলেন,

তখন সংস্কৃতকলেজে কেবল ব্রাহ্মণেরই প্রবেশ ছিল, সেখানে শূদ্রেরা সংস্কৃত পড়িতে পাইত না। বিদ্যাসাগর সকল বাধা অতিক্রম করিয়া শূদ্রদিগকে সংস্কৃতকলেজে বিদ্যাশিক্ষার অধিকার দান করেন।

–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্যাসাগরচরিত

তো, বিদ্যাসাগরের সামনে কী কী বাধা আছিলো? আসলে কোন বাধাই আছিলো না। বরং তিনি নিজেই শূদ্রের শিক্ষার বাধা ছিলেন! এইখানেই শাসিতের শিক্ষায় শাসকের অবস্থানের প্রসঙ্গ।  শাসক ইংরেজ শাসিত ভারতীয়দের শিক্ষার বিপক্ষে তো ছিলোই না, বরং শাসিত ভারতীয়দের শিক্ষায় বিশেষ আগ্রহী ছিলো। (আগ্রহের কারণ ছিলো; এই শিক্ষিতরাই তো ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের সময় এবং পরে ভারতে ইংরেজ শাসনের প্রয়োজনীয়তা প্রতিপন্ন করতে থাকেন।)

বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। এছাড়াও তিনি শাসক ইংরেজের শিক্ষা প্রকল্পে দীর্ঘদিন দক্ষিণ বাংলার স্কুলের সহকারী পরিদর্শক হিসাবে চাকরি করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের কর্ম ঐ চাকরির দায়িত্ব পালন মাত্র।  এবং উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ভারতীয়দের শিক্ষার ব্যাপ্তিকে ছোট রাখার পরামর্শ দেন সরকারকে।

ফলে ওইটা রবীন্দ্রনাথের মিথ্যাচার; ঘটনা আসলে উল্টা—বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে শূদ্র ভর্তি করার বিরোধিতা করেন। শিক্ষা কাউন্সিলের সেক্রেটারি সংস্কৃত কলেজে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য’র বাইরে অন্যান্য কাস্টকে (মুসলমান নাই এর মধ্যে) ভর্তি করার ব্যাপারে প্রিন্সিপাল বিদ্যাসাগরের মতামত জানতে চাইছিলেন। বিদ্যাসাগর তার জবাব দেন ১৮৫১ সালের ২৮ মার্চ। চিঠিতে বিদ্যাসাগর বেদ, উপনিষদ, মনুসংহিতার শ্লোক বিশ্লেষণ কইরা বিভিন্ন কাস্টের শিক্ষা সম্পর্কে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা দেখান। বিদ্যাসাগর দেখান অন্যান্য কাস্টের শিক্ষার ব্যাপারে মনু’র সরাসরি নিষেধ নাই। কিছু ক্ষেত্রে নিষেধ থাকলেও সেগুলি শূদ্রের জন্য, কায়স্থ’র ব্যাপারে পুরোপুরি খাটে না। যদিও মনু কায়স্থকেও শূদ্র বলছেন, কিন্তু বর্তমানে কায়স্থরা কোলকাতার উচ্চশ্রেণীর বিভিন্ন দায়িত্বশীল কাজ করছে, কেবল তাই না, বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের প্রধানও কায়স্থরা। বিদ্যাসাগর তাই কায়স্থ ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে মত দেন। কিন্তু শূদ্র ছাত্র ভর্তির বিরোধিতা করেন। শূদ্রের ব্যাপারে বিদ্যাসাগর বলেন—

‘The reason why I recommend the exclusion  of the other orders of Shudras at present, is that they as a body, are wanting in respectability and stand lower in the scale of social considerations’, their admission, therefore, would I fear, prejudice the interests of the institution.’ (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১৪১৩ )

দেখা গেল, বিদ্যাসাগর আসলে শূদ্র ছাত্র ভর্তি করা হইলে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ক্ষূণ্ন হবে বলে ভয় পাইতেছেন। উপরন্তু আলাপটা আদৌ বিদ্যাসাগর তোলেন নাই, তাঁর কাছে মতামত চাওয়া হলে তিনি বরং শূদ্র ভর্তির বিরুদ্ধে মত দেন।

এদিকে, প্রশ্নটার সমাধান বিদ্যাসাগর করছেন শাস্ত্রের মাধ্যমে। দেখা যাইতেছে, শাস্ত্রে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও তিনি শূদ্র ছাত্র ভর্তির বিরোধিতা করছেন, তাইলে শাস্ত্রে অব্রাহ্মণের শিক্ষা পুরাই নিষিদ্ধ থাকলে বিদ্যাসাগর কী মত দিতেন? জানি না বটে। কিন্তু আরো একটা গুরু প্রশ্ন আছে এই জায়গায়। বিদ্যাসাগর আগাগোড়াই এই রকম শাস্ত্রগত আছিলেন, কেন? এইটার বিষয়ে কিছু কথা আছে। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের আগে থেকেই ইংরেজ শাসনের মূলনীতির একটা– ভারতের ধর্মীয় নেতাদের সাথে আপোষে চলা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীতি ছিলো– ধর্মীয় হস্তক্ষেপ না করাই ভারতের ক্ষমতায় টিকে থাকার উপায়; ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছড়াইয়া পড়ার অনেক কারণের মধ্যে একটা ছিলো ইসলাম ও হিন্দু ধর্মে ইংরেজের নাক গলাবার কিছু গুজব। সতর্ক থাকার জন্য ইংরেজরা ভারতের ধর্ম বোঝার চেষ্টা করতো, ফার্সি, সংস্কৃত, বাংলা ভাষা শিখতো। এর বাইরে গুরুতর বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য ভারতীয় মিত্রদের পরামর্শ নিতো; হিন্দুধর্মের ব্যাপারে বিদ্যাসাগর আগাগোড়াই সবচে বিশ্বস্ত ভারতীয় মিত্র আছিলেন।

বিশ্বস্ততার ভালো প্রমাণ আছে আরেকটা ঘটনায়। এ প্রসঙ্গে ভারতীয়দের শিক্ষার ব্যাপারে ইংরেজ সরকারের আগ্রহ ও প্রণোদনার খোঁজও পাওয়া যাবে।  ঘটনা ১৮৬৫ সালের, ফিমেল নর্মাল স্কুল সম্পর্কে গঠিত কমিটি থেকে বিদ্যাসাগরের পদত্যাগ করার ঘটনা এটি। বিদ্যাসাগর পদত্যাগ পত্র দেন কেশবচন্দ্র সেন, এম. এম. ঘোষ এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর বরাবর। ফিমেল নর্মাল স্কুল মানে ভারতীয় নারী শিক্ষকদের ট্রেনিং স্কুল। এর আগে বেথুন স্কুলের সাথে নারী শিক্ষকদের জন্য এমন একটা ট্রেনিং স্কুল করার প্রস্তাব দেয় ইংরেজ সরকার বেথুন স্কুল কমিটির কাছে। বিদ্যাসাগর তখন এই কমিটির অনারারি সেক্রেটারি। সরকারী এই প্রস্তাবের জবাবে ১৮৬৩ সালের ১৩ জুন কমিটির পক্ষে বিদ্যাসাগর বেঙ্গল সরকারের জুনিয়র সেক্রেটারিকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়। চিঠিতে লেখা হয়—

‘…the formation of such a class is scarcely practicable. In order to get admission into respectable families as teachers, it is necessary that the female Teachers should be respectable by birth as well as character. But unfortunately there is little or no chance of securing such females to enter the proposed Normal class.’ (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১৪৪৩ )

এইটা কমিটির মত; বিদ্যাসাগরের মত কী– আমরা এখনো জানি না। চিঠির বক্তব্য দাঁড়াইয়া আছে বর্ণহিন্দুত্বের (respectable) উপর। শিক্ষা যে বর্ণহিন্দুদের বাইরের বিষয় হইতে পারে—সেই সম্ভাবনা হিসাবে রাখলে এই চিঠি লেখা যায় না। ইংরেজরা নিশ্চই সবচে অগ্রসর এবং প্রগতিশীল নেটিভদের এই দশা নিয়া হাসাহাসি করছিলো!  কমিটির সদস্য হিসাবে এই মত ওউন করতে বিদ্যাসাগরের সমস্যা হয় নাই। তিনি পদত্যাগ করেন নাই তখন।

বিদ্যাসাগর পদত্যাগ করেন পরে, অন্য এক কমিটি থেকে। এই কমিটি তৈরি হইছিলো নারী শিক্ষকদের ট্রেনিং-এর জন্য সেই একই ফিমেল নরম্যাল স্কুল তৈরির পক্ষে। সরকারের যেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হইছিলো ১৮৬৩ সালে, সেই প্রস্তাবই এইবার সরকারকে মনে করাইয়া দেবার জন্য। ব্রাহ্ম সমাজের দপ্তরে মিস কার্পেন্টার নাম্নী এক ইংরেজ ভদ্রমহিলার সাথে মিটিং করা হইছিলো। কেশবচন্দ্রদের প্ল্যান ছিলো সম্ভবতঃ মিস কার্পেন্টারের মাধ্যমে সরকারের কাছে এই বার্তা পৌঁছানো যে, ‘হিন্দুসমাজ (নেটিভরা) এখন অমন একটা নরম্যাল স্কুল খোলায় আগ্রহী।’ এই মিটিং-এ নেটিভদের একটা প্রতিনিধি কমিটি নির্বাচন করা হয়। কমিটিতে বিদ্যাসাগরকে রাখা হয়। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের ঘটনায় পরিষ্কার হয়, ১৮৬৩ সালের প্রত্যাখ্যান পত্র আসলে বিদ্যাসাগরের মত অনুযায়ী-ই আছিলো। পদত্যাগ পত্রে তিনি লেখেন—

‘Before any action was taken, it was, in my opinion, necessary to ascertain the views of such of the leading members of our community as are known to take an interest in the cause of female education. But as they were neither invited to the meeting, nor was their co-operation sought, I do not think it advisable for me to join in the proposed representation to Government.’ (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১৪৪৫ )

দেখা যাইতেছে, হিন্দু সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মতকে প্রতিনিধিত্ব করে না তেমন কোন পরামর্শ বা আবেদন সরকারকে দিতে অস্বীকৃতি জানাইছেন বিদ্যাসাগর। এই বিশেষ ক্ষেত্রে (নারী শিক্ষা) বিদ্যাসাগর অবশ্য ধর্মশাস্ত্রের কোন ব্যাখ্যা দেন নাই; তবে প্রত্যাখ্যানবাহী চিঠিতে দেশের রীতির (Custom) বিষয়ে বলছিলেন,

‘…according to the custom of the country, it can hardly be expected that a respectable woman who has passed the age of twelve can be prevailed upon to attend a school for instruction.’ (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১৪৪৩।

এখন, হিন্দু সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মত কী হইতে পারে এ ব্যাপারে? নিশ্চই দেশীয় রীতি আর শাস্ত্রেই আছে সেই জবাব। রীতি অথবা শাস্ত্রের আনুগত্য বিদ্যাসাগর আগাগোড়াই দেখাইছেন। হিন্দু সমাজের ঐ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিদ্যাসাগরের শিষ্য হওয়াও বিচিত্র না। ইন ফ্যাক্ট, চিন্তা ও রাষ্ট্রকর্ম যে ধর্মশাস্ত্র দ্বারা অনুমোদিত হওয়া দরকার এই ব্যাপারে হিন্দু-মুসলমান সবার শিক্ষক হইলেন বিদ্যাসাগর। অবশ্য রামমোহনকেও কিছু ভাগ দেওয়া দরকার। রাজা রামমোহন রায় বেদাদি শাস্ত্রবিচার কইরা একেশ্বরবাদ হিন্দুধর্মে অনুমোদিত বলে দেখাইছিলেন। সতীদাহ নিরোধ বিষয়েও শাস্ত্রের আলোচনা হইছিলো রামমোহনের সময়ে—রামমোহন এবং অন্যরা করছিলেন। তবে ১৮৩৫ সালের শিক্ষানীতি প্রণীত হবার পর থেকে ইংরাজি শিক্ষিত বাঙালির বৃদ্ধি, ছাপাখানার ব্যাপক প্রসার, বহুসংখ্যক সংবাদপত্র ইত্যাদি কারণে  বিদ্যাসাগরের শিক্ষকতাই ব্যাপক হইছিলো। বিধবাবিবাহ যে শাস্ত্রসম্মত এবং বহুবিবাহ যে শাস্ত্রবিরুদ্ধ—দুইটাই প্রমাণ করছিলেন বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রগততায় নিশ্চিত হইয়া ইংরাজ বিধবাবিবাহের আইন প্রণয়ন করে, কিন্তু বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে নাই ইংরাজ।

বিধবাবিবাহ ও বহুবিবাহ—দুই ক্ষেত্রেই বিদ্যাসাগরের চিন্তা হিন্দুদের নিয়াই মাত্র, মুসলমানদের নিয়া চিন্তা করেন নাই তিনি। বিধবাবিবাহ মুসলমানদের ইস্যু আছিলো না কোনদিন, কিন্তু পুরুষের বহুবিবাহ হিন্দু-ইসলাম—উভয় ধর্মেই প্রচলিত আছিলো। বিদ্যাসাগর কেবল হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ঘাইটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বহুবিবাহ শাস্ত্রবিরুদ্ধ। বিদ্যাসাগর তাঁর নারীদরদ দিয়া বহু শ্রদ্ধা অর্জন করছেন এখনো; তাঁর এই নারীদরদ হিন্দু নারীতেই সীমিত, মুসলমান নারী এই দরদের ভাগ পায় নাই।

বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহনিরোধ আন্দোলন নিয়া বঙ্কিমচন্দ্র লিখছিলেন বঙ্গদর্শনে। বঙ্কিম শাস্ত্রগততার সমস্যা এবং মুসলমান—দুই বিষয়ই আলোচনায় আনেন।

“যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত বহুবিবাহ শাস্ত্রনিষিদ্ধ, সেই কারণেই বহুবিবাহ হইতে নিবৃত্ত হইতে বলিলে একটি দোষ ঘটে। বহুবিবাহপরায়ণ পক্ষেরা বলিতে পারেন, “যদি আপনি আমাদের শাস্ত্রানুসারে কার্য্য করিতে বলেন, তবে আমরা সম্মত আছি। কিন্তু যদি শাস্ত্র মানিতে হয়, তবে আপনার ইচ্ছামত, তাহার একটি বিধি গ্রহণ করা, অপরগুলি ত্যাগ করা যাইতে পারে না। আপনি কতকগুলিন বচন উদ্ধৃত করিয়া বলিতেছেন, এই এই বচনানুসারে তোমরা যদৃচ্ছাক্রমে বহুবিবাহ করিতে পারিবে না। ভাল, আমরা করিব না। কিন্তু সেই সেই বিধিতে যে যে অবস্থায় (স্ত্রী বন্ধ্যা, মৃতপ্রজা হইলে, পুত্র জন্ম না হইলে বা স্ত্রী অপ্রিয়বাদিনী হইলে—বঙ্কিমের উল্লেখ অনুসারে বর্তমান লেখক) অধিবেদনের অনুমতি আছে, আমরা এই দুই কোটি হিন্দু সকলেই সেই সেই বিধানানুসারে প্রয়োজনমত অধিবেদনে প্রবৃত্ত হইব—কেন না, সকলেরই শাস্ত্রানুমত আচরণ করা কর্ত্তব্য।…”—বহুবিবাহ, ব.চ.

‘বঙ্গসুন্দরীগণ বোধ হয় ধর্ম্মশাস্ত্রপ্রচারের এই নবোদ্যম দেখিয়া তত সন্তুষ্ট হইবেন না।’ —বহুবিবাহ, ব.চ.

মুসলমানদের বিষয় নিয়া বঙ্কিম বলেন,

‘আর একটি কথা এই যে, এ দেশে অর্দ্ধেক লোক হিন্দু, অর্দ্ধেক মুসলমান। যদি বহুবিবাহ নিবারণ জন্য আইন হওয়া উচিত হয়, তবে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্বন্ধেই সে আইন হওয়া উচিত। হিন্দুর পক্ষে বহুবিবাহ মন্দ, মুসলমানের পক্ষে ভাল, এমত নহে। কিন্তু বহুবিবাহ হিন্দুশাস্ত্রবিরুদ্ধ বলিয়া , মুসলমানের পক্ষেও তাহা কি প্রকারে দণ্ডবিধি দ্বারা নিষিদ্ধ হইবে?’ —বহুবিবাহ, ব.চ.

বহুবিবাহ বিষয়ে বঙ্কিমের শেষ মত হইলো—

‘আমাদিগের বিবেচনায় বহুবিবাহ নিবারণের জন্য আইনের প্রয়োজন নাই। কিন্তু যদি প্রজার হিতার্থ আইনের আবশ্যকতা আছে, ইহা স্থির হয়, তবে ধর্ম্মশাস্ত্রের মুখ চাহিবার আবশ্যক নাই।’ —বহুবিবাহ, ব.চ.

বহুবিবাহ হিন্দুশাস্ত্রবিরুদ্ধ—এইটা প্রমাণের জন্য বিদ্যাসাগর দুইটা বই লেখেন, বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধ পক্ষ শাস্ত্র দিয়াই বিদ্যাসাগরের মোকাবিলা করছিলেন প্রধানতঃ। বঙ্কিম একমাত্র ব্যক্তি যিনি শাস্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করছেন এবং নিজ সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষকে চিন্তায় স্থান দিছেন। কিন্তু ইতিহাসে বিদ্যাসাগর ধর্মমুক্ত সমাজসংস্কারক হিসাবে চিহ্নিত হইছেন আর বঙ্কিম ধর্মান্ধ। বঙ্কিমের ধর্মান্ধতা ভিন্ন আলোচনা, যথাস্থানে হবে বাইচা থাকলে।

এদিকে বহুবিবাহ রহিতকরণ আন্দোলনে বিদ্যাসাগরকে কৃতিত্ব দিতে চাইলেও দেওয়াটা ভুল; কেননা, এই বিষয়টা সরকারের কাছে প্রথম পেশকারী আদৌ বিদ্যাসাগর নন। ১৮৭১ সালে প্রকাশিত ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’-এর ভূমিকায় বিদ্যাসাগর নিজেই জানাইছেন যে, কোলকাতার ‘সনাতনধর্ম্মরক্ষিণী সভা বহুবিবাহ নিবারণ বিষয়ে বিলক্ষণ উদ্যোগী হইয়াছেন;…সে বিষয়ে তাঁহাদের কিছু আনুকূল্য হইতে পারিবেক, এই ভাবিয়া, আমি পুস্তক মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলাম।’

এই ভূমিকায় বিদ্যাসাগর আরো জানাইছেন, ১৮৫৫ থেকে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার বহুবিবাহ রহিত করার জন্য রাজদরবারে আবেদন করা হইছে বা আবেদন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হইছে। আবেদন অন্যরা করছিলো, আর বিদ্যাসাগর জনমত তৈরি করছিলেন। আমি জানতে পারি নাই যে, সেইসব আবেদনে কেবল হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ রহিত করার প্রস্তাব আছিলো কিনা। থাকুক আর না থাকুক, বিদ্যাসাগর জনমত গঠনের বেলায় কেবল হিন্দু পুরুষে সীমিত কইরা ফেলেন বহুবিবাহ ইস্যুটা। বিদ্যাসাগরের এই কর্মের অন্তত দুইটা ফল পরবর্তি বাংলায় ধারাবাহিক হইতে দেখা যাইতেছে:

এক.    বিভিন্ন আন্দোলনের আবশ্যিক সাম্প্রদায়িক চেহারা,

দুই.    রাষ্ট্রীয় আইনের সমর্থন করা বা না করায় ধর্মশাস্ত্রের অনুমোদন দরকারি হইয়া ওঠা।

অব্রাহ্মণের পড়ালেখা, বিধবাবিবাহ বা বহুবিবাহ—বিদ্যাসাগর তাঁর সারাজীবনই শাস্ত্রবাদী এবং সাম্প্রদায়িক আন্দোলন কইরা গেছেন এবং শিক্ষা দিয়া গেছেন। কিন্তু বাংলাভাষী মানুষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিদ্যাসাগরের কাছে ঋণস্বীকার করে নাই বা সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনীতিবিরুদ্ধরাও বিদ্যাসাগরের কাছে সম্প্রদায়ভিত্তিক জনকল্যাণ বা নারীকল্যাণ বা রাজনীতির দায় বা ঋণ দেখাইয়া দেন নাই। অথচ এইটাই বিদ্যাসাগরের অব্যর্থ ও স্থায়ী শিক্ষা হিসাবে টিকে আছে।

বিধবাবিবাহ প্রবর্তন এবং বহুবিবাহ নিরোধ নিয়ে সেকালের সামাজিক আন্দোলনে ‘উপযুক্ত ভাইপোস্য’ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ইনি একজন লেখক; ‘অতি অল্প হইল’, ‘আবার অতি অল্প হইল’, ‘ব্রজবিলাস’—এই তিনটা বই কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য-এর রচনা। এছাড়া ‘উপযুক্তভাইপোসহচরস্য’ লেখক নামে ‘রত্নপরীক্ষা’ বইটি পাওয়া যায়। এই চারটি বই পরে বিদ্যাসাগর রচনাবলীতে পাওয়া যায়। কিন্তু এই চারটি বই বিদ্যাসাগর স্বীকার কইরা মরেন নাই। বিদ্যাসাগর রচনাবলীও প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯৫ সালে, বিদ্যাসাগর মরার চার বছর পরে। সেখানেও এই চারটা বই পাওয়া যায় না। পরে কে বা কারা এই দুই লেখক নামকে বিদ্যাসাগরের ছদ্মনাম বলে স্থির করে। কিন্তু ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ‘ব্রজবিলাস’-এর দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপনে (সেকালে ‘ভূমিকা’কে বিজ্ঞাপন বলা হইতো; অনুমান করি, বঙ্কিমচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ ‘বিজ্ঞাপন’ শব্দে ‘অশ্লীলতা’ বা ‘গর্হিত রুচি’ পাইয়া থাকবেন বলে ‘ভূমিকা’ প্রবর্তন করেন।) পাওয়া যাচ্ছে যে,

“…ফাজিলচালাকেরা রটাইতে আরম্ভ করিয়াছেন, ইহা বিদ্যাসাগরের লিখিত। যাঁহারা সেরূপ বলেন, তাঁহারা যে নিরবচ্ছিন্ন আনাড়ি, তাহা, এক কথায়, সাব্যস্ত করিয়া দিতেছি।

এক গণ্ডা এক মাস অতীত হইল, বিদ্যাসাগর বাবুজি, অতি বিদকুটে পেটের পীড়ায় বেয়াড়া জড়ীভূত হইয়া, পড়িয়া লেজ নাড়িতেছেন, উঠিয়া পথ্য করিবার তাকত নাই। এ অবস্থায়, তিনি এই মজাদার মহাকাব্য লিখিয়াছেন, এক কথা যিনি রটাইবেন, অথবা, এ কথায় যিনি বিশ্বাস করিবেন,…” (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১১৯৯ )

এগুলি বিদ্যাসাগরের রচনা বলে মাইনা নিলে বিদ্যাসাগর চরিত্র নিয়ে কিছু গুরুতর দুশ্চিন্তা করতে হয়। বিদ্যাসাগর কারে কিভাবে উপকার করেছিলেন তার কিছু ফিরিস্তি আছে এ বইগুলিতে, বিশেষতঃ বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধাচরণকারীদের। বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহ নিবারণ বিষয়ক শাস্ত্রান্দোলনের বিরুদ্ধে তারানাথ তর্কবাচস্পতি বই লেখেন; সেখানে বহুবিবাহ হিন্দু শাস্ত্রসম্মত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন তর্কবাচস্পতি মহাশয়। তর্কবাচস্পতির জবাবে ‘অতি অল্প হইল’ ও ‘আবার অতি অল্প হইল’ লেখা হয়। বিদ্যাসাগর স্বনামেও জবাব দিছিলেন। কিন্তু ‘অতি অল্প হইল’ ও ‘আবার অতি অল্প হইল’ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হেয় করা, মানহানিকর ব্যক্তি-আক্রমণের চূড়ান্ত ছিলো। বর্তমানে এই দুইটা বই ঐ আন্দোলনের দলিল হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু এ দুটি বহুবিবাহ বিষয়ে লেখা নয়, এ দুটি বই তর্কবাচস্পতির সংস্কৃতজ্ঞানে ভুল ধরা, তর্কবাচস্পতির সামাজিক প্রতিষ্ঠায় বিদ্যাসাগরের অবদান ইত্যাদির মাধ্যমে তর্কবাচস্পতিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়। বিদ্যাসাগর স্বনামে যেগুলি করতে পারেননি, উপযুক্ত ভাইপোস্য সেগুলি করে দেন। কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া যাইতে পারে।

“বিদ্যাসাগরের সহায়তা ব্যতিরেকে, খুড়র কালেজে প্রবিষ্ট হইবার, কস্মিন্ কালেও, সম্ভাবনা ছিল না। বিদ্যাসাগর, যেরূপ অদ্ভুত চেষ্টা ও কষ্টস্বীকার করিয়া, খুড়কে কালেজে অধ্যাপকের তক্তে বসাইয়াছিলেন, তাহা কাহারও সাধ্য নহে।” (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১১৭৬ )

 

“এক্ষণে দেখিতেছি, খুড় যখন যে সংস্কৃত লিখিয়াছেন, তাহাতেই ভুল আছে। আজকাল, যে বৃহৎকায় বাচস্পত্য অভিধান লিখিতেছেন, কৌতূহলাবিষ্ট হইয়া, তাহা মধ্যে মধ্যে পাঠ করিতেছি; দেখিতেছি, তাহাতে রকম রকমের অনেক ভুল হইতেছে। আমার ইচ্ছা আছে, অবসর পাইলেই, খুড়র এই বড় অভিধানের দোষ গুণ বিচার করিতে বসিব।” (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১১৯৩ )

 

“আমার ইচ্ছা ছিলো, সকল ভুলগুলি তুলিয়া, চোখে আঙ্গুল দিয়া, খুড়কে দেখাইয়া দিব।…আমার ইচ্ছা ও অনুরোধ এই, খুড় আর যেন, সংস্কৃত লিখিয়া বিদ্যা খরচ না করেন। খুড়র লজ্জা সরম কম বটে। কিন্তু, লোকের কাছে, আমাদের মাথা হেঁট হয়।” (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১১৯৩ )

 

“…খুড় ও বিদ্যাসাগরে কত তফাৎ দেখুন। খুড়র ভুল দেখাইয়া দিলে, তিনি মর্মান্তিক চটেন; বিদ্যাসাগরের ভুল দেখাইয়া দিলে তিনি, আহ্লাদিত চিত্তে, সেই ভুলের সংশোধন করেন;…” (ঈশ্বরচন্দ্র  বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনাবলী-২, প্রথম প্রকাশ, কোলকাতা, সাহিত্যম্, এপ্রিল ২০০৬, পৃ. ১১৯৩ )

এই চারটা বই বিদ্যাসাগরের রচনা হোক বা না হোক, বইগুলির আরেকটা বিশেষ গুরুত্বের জায়গা আছে ইতিহাসে। সেকালের লেখকরা স্বনামে যে ভাষায় লিখতেন এই চারটি বই তার থেকে আলাদা। চারটি বইয়েরই প্রধান উদ্দেশ্য লোকসমাজে চলিত হওয়া; সেই জন্যে বই চারটি সেকালের সরল ও বোধগম্য প্রচলিত ভাষায় লেখা, আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য হইলো লেখাগুলি রস ভরা।

বই চারটির এই দিকগুলি উল্টাইয়া দিলেই বিদ্যাসাগরের অন্য অন্য বইয়ের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাইতে পারে। মনে হতে পারে, এই ফারাক নিতান্তই ভাষাবোধগত, নিরীহ ব্যক্তিক সাহিত্যরুচি। বাস্তবে এর একটা সাম্প্রদায়িক দিক আছে। চারটি বইতেই বহু ফারসি শব্দ আছে, যেগুলি বিদ্যাসাগরের স্বনামের বইতে পাওয়া যায় না। ফলে জনসমাজে প্রচলিত হবার জন্য তৎকালে চলতি বাংলায় লেখা এই বইগুলি ‘বাংলা ভাষা’র ভিন্ন সংজ্ঞা তৈরি করে দেয়। কতগুলি শব্দ দেওয়া যেতে পারে—খোসামোদি, জেদ, নিখরচায়, রফা, ফয়তা, খাতির, নাছোড়বন্দা, তুআক্কা ইত্যাদি [এগুলা ফার্সি কিনা জানি না নিশ্চিত, অনুমান করলাম; ভুল হইলে সেটা ধরবার লোক আছেন ভাইবা নিলাম। আরেকটা গর্হিত উদ্দেশ্য আছে– বিদ্যাসাগরপ্রেমিকদের জন্য একটা ফাঁদ পাতলাম; আমারে মোকাবেলার রাস্তা হিসাবে ওনারা যেন আমার ভুলগুলি ধরারেই বাইছা নিতে পারেন। ]।

‘বাংলা ভাষা’র ভিন্ন সংজ্ঞা বলবার কারণ আছে; এই বইগুলা প্রমাণ করে যে, অন্য বইগুলি বিদ্যাসাগর তাঁর ‘আবিষ্কৃত’ বাংলায় লিখছেন; সমাজে ‘বাংলা’ বলে চালু থাকা ‘বাংলা’রে তিনি ‘বাংলা’ বইলা মানেন নাই। বিদ্যাসাগরের স্বনামী চেষ্টায় আছিলো—‘বাংলা’রে কতটা ‘সংস্কৃত’ ঘনিষ্ট প্রমাণ করা যায়। ওনার এই চেষ্টায় দোষ নাই; দোষ পরের ‘বাংলা’ চিন্তুকদের, বিদ্যাসাগরের ‘সংস্কৃত’প্রেমকে  ‘বাংলা’প্রেম হিসাবে দেখায় আর দেখানোয়। বিদ্যাসাগর সমাজে দেখছেন—‘বাংলা’ ভাষা ‘সংস্কৃত’ থেকে ক্রমেই দূরে সইরা গেছে আর যাইতেছে; কিন্তু তাঁর স্বনামী লেখায় তিনি ‘বাংলা’রে ক্রমেই সংস্কৃত’র দিকে নিয়া গেছেন।

বিদ্যাসাগর সংস্কৃত’রে প্রেম করতেন; সংস্কৃত ব্যাকরণ লিখছেন একখান। ওনার প্রেমে নিন্দা নাই আমার, কিন্তু যা সংস্কৃতপ্রেম—তারে বাংলাপ্রেম বলবার উপায় নাই। ‘ভালো বাংলা’ জানবার শর্ত হিসাবে সংস্কৃত ভালো জানার কথা বলছেন তিনি। বলছেন,

“সংস্কৃত ভালো না জানিলে, হিন্দী বাঙ্গালা প্রভৃতি ভাষাতে উত্তম বুৎপত্তি জন্মে না।”—বোধোদয়, ১৮৫১ খ্রী.

“ইহা একপ্রকার বিধিনির্বন্ধস্বরূপ হইয়া উঠিয়াছে যে, ভুরি পরিমাণে সংস্কৃত কথা লইয়া ঐ সকল ভাষায় (হিন্দী, বাংলা ইত্যাদি) সন্নিবেশিত না করিলে তাহাদের সমৃদ্ধি ও শ্রীবৃদ্ধি সম্পাদন করা যাইবেক না।”—সংস্কৃতভাষা ও সংস্কৃতসাহিত্যশাস্ত্র বিষয়ক প্রস্তাব, ১৮৫৩ মার্চ

দেখা গেল, বিদ্যাসাগর বাংলা’র ‘শ্রীবৃদ্ধি’ করতে চাইতেছেন, কিন্তু এই ‘শ্রী’ তিনি বাংলাভাষী সমাজে প্রচলিত শব্দগুলায় খুঁইজা পান নাই, পাইছেন মৃত সংস্কৃত বইতে—রঘুবংশ, শকুন্তলা, মুগ্ধবোধে। সংস্কৃত কলেজের কারিকুলামে সংস্কৃত বই-শাস্ত্র দিয়া ভরাইয়া ফেলছেন বিদ্যাসাগর। হায়, বিদ্যাসাগরে নাইতে যাইয়া বাংলা স্নান কইরা ফেলছে! হায়, সবগুলা বই বিদ্যাসাগর যদি ভাইপোস্য ছদ্মনামে লিখতেন! হিন্দী ভাষাটা মনে হয় বাইচা যাইতে পারছে একজন বিদ্যাসাগরের অভাবে, বা গালিবের গজলে, বা মোগল ঐতিহ্যের মুসলমান সঙ্গীতজ্ঞ আর বাঈজিদের জন্য। [pullquote][AWD_comments][/pullquote]

অন্তত ‘বর্ণপরিচয়’ ভাইপোস্য নামে লিখলে বাংলার কিছু উপকার হইতে পারতো। বিদ্যাসাগর নামে লেখায় যা হইছে তারে উপকার বলা কঠিন—বর্ণপরিচয় আসলে সম্প্রদায় পরিচয়, ধর্মের আর লিঙ্গের সম্প্রদায়। ভাইপোস্য নামে লিখলে গিরিশ, গোপাল, নবীন, রাখাল, রাম, যাদব, মাধব, সুরেন্দ্র, ভুবনের সাথে দুই একজন করিম, রহিম পাওয়া যাইতে পারতো। হয়তো জয়নব আর সুরবালারেও পাইতে পারতাম আমরা।

বর্ণপরিচয় দুইখণ্ডেই বিজ্ঞাপনে বিদ্যাসাগর জানাইছেন এইগুলা ‘বালক’দের জন্য; বালিকাদের কথা ভুইলা গেছিলেন হয়তোবা। পরে জানা যায়, এই বালকরা সবাই হিন্দু। ছোট ছোট অনেকগুলা নীতি উপাখ্যান আছে বর্ণপরিচয়-এ, গিরিশ, গোপাল, নবীন, রাখাল, রাম, যাদব, মাধব, সুরেন্দ্র, ভুবন—এরা সবাই সেই উপাখ্যানগুলির চরিত্র। রহিম-করিম নাই একজন, বা জয়নব-সুরবালা।

১৮৫৫ থেকে পরের একশো বছর বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়াই বাংলা ভাষার শিশুশিক্ষা শুরু হইছে। এই শিশুরা কী শিখলো? রাম ওইটা করে, সুরেন্দ্র সেইটা করে, গোপাল সুবোধ ছেলে, যাদব মায়ের আদেশ মানে; করিম তো ছিলো না! ফলে রাস্তায় যেই করিমের সাথে দেখা হইলো, সেই করিম উটকো। সুরবালারে তবু ঘরেই দ্যাখে গিরিশ, কিন্তু রহিমের বোন জয়নবের আসল নাম নিশ্চই বীণা! এই বর্ণপরিচয়ে শিক্ষিত রবীন্দ্রনাথের গল্পের অপূর্বকৃষ্ণ কি আলী হইতে পারে কোনদিন?

আগের পর্ব– ইতিহাস এক: বাঙালি মুসলমানের ভুলগুলি