পিপলে আ.আ. সায়ীদের শ্রদ্ধা নাই, ভালোবাসা আছে

আমার মায়ের কয়েকটা ছাগল ছিলো। ভালো ছাগল। বিশেষ কইরা ছাগীরা। মাঝে মাঝেই এরা দুইটা কইরা বাচ্চা দিতো। এদেরই এক ছাগী দুইটা বাচ্চা দেবার পরে আমি ভাবলাম, আমার একটা দায়িত্ব আছে। আমি কাস্তে লইয়া ঘাস কাটতে গেলাম। এখনকার থেকেও আমি অনেক ছোট তখন। এমনিতে এই ছাগলেরা ঘাস কাটার কাজটা মাঠে হাঁটতে হাঁটতে নিজেরাই করতো। কিন্তু আমার বিবেচনায় তখন জরুরী অবস্থা। সাংবিধানিক জরুরী অবস্থা বুঝতাম না তখন, ফলে বুঝি নাই যে ওই জরুরী অবস্থাটা অসাংবিধানিক। যাই হোক, ছাগলের জন্য ঘাস কাটতে যাইয়া আমার বাম হাতের তিনটা আঙুল কাইটা ফেললাম আমি। আমার আর ঘাস কাইটা খাওয়ানো হয় নাই। আমার কিছু রক্ত পইড়া গেলো, কিন্তু ভালোবাসা পড়ে নাই; আমি এই ছাগলদের ভালোবাসতাম। বলতে কি, পশুদের আমি ভালোবাসি; একবার এক অনুমিত এতিম বিড়ালছানা নিয়া গেলাম বাসায়, শ্যাওড়াপাড়ায় আমার বাসায় বিড়ালটা মারা গেলো। আব্বা আর এই বিড়াল—দুই মৃতদেহই আমারে কষ্ট দিছে। আব্বারটা একটু বেশি দিছে মনে হয়; কিছু বেশি দিনের সম্পর্ক ছিলো, তাই হয়তো বা। কি জানি…

-------------------------

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের প্রতি আমার ঈর্ষা আছে। উনি হাত না কাইটা ঘাস কাটতে পারেন। এই ঘাস মানে ‘আলো’ বলতে চাইছি। উনি বিশ্বসাহিত্যের ‘ঘাস মানে আলো’ কাইটা কাইটা আনছেন। বাংলাদেশের পশুদের মানে অন্ধকারের মানুষ ভিতর বিতরণ করছেন। ধর্মগুলিও মোটামুটি আলো’র কথাই বলে, তবে অধ্যাপক সায়ীদের আলো ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট দিয়া বোঝাই হিস্ট্রিক্যালি জাস্টিফাইড হবে। তাও অবশ্য ধর্মই; এই ধর্মমতে বিজ্ঞানই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তো অধ্যাপক সায়ীদ ধার্মিক মানুষ চাইছেন, মানে, উনি আলোকিত মানুষ চাইছেন, বানাচ্ছেন।

বাংলা ভাষায় অন্ধকারে থাকা মানুষের সাথে পশুর তফাৎ অল্প। শিক্ষাই আলো। ‘মানুষ হও’ মানে ‘শিক্ষিত হও’। শিক্ষা থেকে দূরে থাকা মানে পশু থাইকা যাওয়া। বাংলাদেশের শিক্ষকরা ছাত্রী-ছাত্রদের ‘মানুষ’ হবার উপদেশ দেন প্রায়ই। ছাত্রী-ছাত্রই মাত্র; হিজড়ারা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রত্ব পাইতে পারে না। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রোগ্রামে কি হিজড়ারা থাকতে পারে? জানি না ঠিক; পরিচিতদের মধ্যে আহমাদ মাযহার বলতে পারবেন ভালো।

তো, অশিক্ষিতের জ্ঞানে শ্রদ্ধা বা আস্থা নাই শিক্ষিতের। আসলে ‘জ্ঞান’-এর সংজ্ঞাই শিক্ষামূলক; ফলে অশিক্ষিতের জ্ঞান-ই তো নাই। অধ্যাপক সায়ীদের শ্রদ্ধা পাইতে হইলে মাত্র শিক্ষিত হইলেই হবে না, কিছু কিছু বিশ্বসাহিত্যও পড়তে হবে। ওইগুলার মধ্যেই আলো। তাতে আলোকিত না হইলে শ্রদ্ধা পাইবেন না অধ্যাপক সায়ীদের। তাইলে বিশ্বসাহিত্যের আলো না খাওয়া বাংলাদেশের অশিক্ষিতের ভোটে কি শ্রদ্ধা আছে অধ্যাপক সায়ীদের? এই ভোটে নির্বাচিত এমপিদের প্রতি? সংসদের প্রতি? মন্ত্রীর প্রতি? নাই। কিন্তু এই অনালোকিতদের তিনি ভালোবাসেন। আমি যেমন মায়ের ছাগলদের। তাই তিনি আলোকিত কইরা যাইতেছেন।

সম্প্রতি অধ্যাপক সায়ীদ মন্ত্রীদের বিষয়ে কিছু একটা বলছেন। সংসদ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হইছে। অধ্যাপক সায়ীদ অভিযোগ অস্বীকার করছেন। ভালো। অধ্যাপক সায়ীদের বক্তব্য ইনকিলাবে ভুলভাবে হাজির করা হইছে নাকি। ভালো। অধ্যাপক সায়ীদকে প্রশ্ন করা যাইতে পারে যে তিনি সংসদ থেকে প্রতিক্রিয়া আসার পরেই কেন পত্রিকার বিকৃতির কথা বললেন? সংসদের প্রতিক্রিয়া না আসলে ঐ বিকৃত বক্তব্যকে পাবলিক অধ্যাপক সায়ীদের বক্তব্য হিসাবে জানলে তাতে অধ্যাপক সায়ীদের যে কোন আপত্তি ছিলো সেইটা ভাববার বিশেষ উপায় নাই। কিন্তু এই ধরনের প্রশ্নে আমার আগ্রহ নাই। বক্তব্য বিকৃত যে করা হইছে, তা বোধ করি সত্য। আমার আগ্রহ অন্যখানে।

একটা ক্রাইসিস তৈরি হইছিলো। এখনো কিছু আছে। অধ্যাপক সায়ীদকে অপমান করা হইছে বইলা বেশ কিছু মানুষজন ক্ষেপছে। আলগাভাবে এদের সুশীল সমাজ বইলা চেনা যাইতে পারে। আলোকিত বইলাও অনুমান করা যাইতে পারে।

অধ্যাপক সায়ীদ তাঁর কর্ম দিয়া অপমান কইরা যাইতেছেন বাংলাদেশের মানুষকে। এমপি/মন্ত্রী/সংসদকে কোন বাড়তি মান দেবার প্রতিশ্রুতি তাঁর কাজে নাই। বরং ‘আলোকিত মানুষ চাই’ শ্লোগানে ঘোষণা দিয়াই অপমান করা আছে। কিন্তু এইটা যতই অপমানের হোক, অধ্যাপক সায়ীদের হক আছে যাচ্ছেতাই ভাবার বা চাওয়ার। এইটা কোন ক্রাইম না।

বিপরীতে, তিনি যা বলছেন ধইরা সংসদ প্রতিক্রিয়া জানাইছে, সংসদকে তা করতেই হবে পিপলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। পিপলের নির্বাচনরে কেউ অপমান করলে তাঁর কাছে পিপল জবাবদিহিতা চাইবে– এইটাই হবার কথা। যদিও একজন এমপি বলছেন সংসদ ১৬ কোটি মানুষের প্রতিনিধি; এইটা আসলে ভুল। সংসদ কেবল ভোটারদের প্রতিনিধি। ৮ কোটির মতো হয়তো। যারা ভোটার না, তারা প্রতিনিধি নির্বাচন করবে কেমনে?

যাই হোক, ঘটনা মজার। অধ্যাপক সায়ীদকে মাফ চাইতে বলা পিপলের কাছে সংসদের দায় মাত্র। সংসদের এই বলা প্রো-পিপল। আরো মজা হইলো অধ্যাপক সায়ীদের ভীরুতা ও হিপোক্রিসি দেখার মজা। তিনি পলায়নের রাস্তা ধরছেন। মিডিয়ায় তাঁর বক্তব্যের বিকৃতি যতই হোক, বাংলাদেশের পিপল তথা সংসদের প্রতি তাঁর কোন শ্রদ্ধা তো আসলেই নাই! কিন্তু তিনি সেইটা স্বীকার করলেন না। সুশীল সমাজ হতাশ তাদের সম্ভাব্য হিরো এইভাবে পিছাইয়া যাওয়ায়। সুশীল সমাজেরো তো একই ভাবনা; বাংলাদেশের পিপলের প্রতি তাদেরো কোন শ্রদ্ধা নাই, নিতান্ত গরু-ছাগলই ভাবে। কিন্তু এইটার কোন প্রকাশ্য উচ্চারণ নাই। অধ্যাপক সায়ীদ পিছাইয়া না গেলে সুশীল সমাজ রিলিজের প্লেজার পাইতে পারতো এক রকম। আহা!

  • Nushaiba

    অসাধারণ ! আপনার দৃষ্টিকোণের সাথে পুরোপুরি একমত | অবশ্য, আপনার লেখাটা পরার আগে এভাবে ভাবিনি | সেজন্য আরো ধন্যবাদ |
     

  • আপনাকেও ধন্যবাদ।।