লেখক রয়্যালটি ও বাংলা একাডেমীর সালিশী

হঠাৎ করেই এক বন্ধুর কাছ থেকে জানলাম, রয়্যালটি সংক্রান্ত ব্যাপারে কয়েকজন লেখকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ‘ঐতিহ্য প্রকাশনী’কে একুশে বইমেলায় স্টল বরাদ্দ দেয়নি বাংলা একাডেমী। ১৮ জানুয়ারি দুপুর নাগাদ বাংলা একাডেমীতে গেলাম ঘটনা জানার জন্য। গিয়ে দেখলাম–গত ১৬ জানুয়ারি রবিবার, ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’য় অংশগ্রহণে অনুমোদিত প্রকাশনীগুলোর তালিকা বাংলা একাডেমীর নোটিশ বোর্ডে দেয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমীর ২১ সদস্যের কমিটি আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পরে এই তালিকা তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে ও বাইরের রাস্তায় প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে এই গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেলায় অংশ নিতে আগ্রহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ফি দিয়ে একাডেমীর নিকট আবেদন করে এবং বিধিমালা মোতাবেক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণে অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে। এবছরও এই পদ্ধতিতে অনুমোদিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহের তালিকা প্রকাশ করা হলো।

দেখলাম, প্রকাশিত তালিকায় আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ঐতিহ্য প্রকাশনী’র নাম নেই। একাডেমী ও ঐ প্রকাশনীসূত্রে (ঐতিহ্য প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারীর সাথে ফোনালাপ) জানলাম–নাম না থাকার কারণ জানতে চেয়ে ‘ঐতিহ্য প্রকাশনী’র পক্ষ থেকে বাংলা একাডেমীতে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের প্রেক্ষিতে একাডেমীর পক্ষ থেকে অলিখিতভাবে ‘ঐতিহ্য প্রকাশনী’কে জানানো হয়েছে যে, ‘রয়্যালটি’ দেওয়া হয়নি বলে আটজন লেখক (রাজু আলাউদ্দিন, রহমান হেনরী, টোকন ঠাকুর, কামরুজ্জামান কামু, আহমাদ মোস্তফা কামাল, প্রশান্ত মৃধা, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, আরেকজনের নাম বলেন নি, আটজনের একজন-রাজু আলাউদ্দিনের কাছে জানলাম অষ্টম জন আলফ্রেড খোকন) একটি আবেদন জমা দিয়েছে একাডেমীতে, তাই ‘ঐতিহ্য প্রকাশনী’কে একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণের অনুমতি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে একাডেমী। জানতে পারলাম, ঐ আবেদনে আটজন লেখকের নাম দেয়া আছে কিন্তু কারো দস্তখত নেই। একাডেমীর কাছে আবেদনের কপি চাইলে ‘বাংলা একাডেমীর বইমেলা কমিটির বিবেচনায় আছে’ কারণ দেখিয়ে কপি দেয়া হয়নি। তথ্য অধিকার আইনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগের উপপরিচালক জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘এখানে গোপনীয়তার কিছু নেই, আবেদনের কপি দেয়া হবে, কিন্তু এই মুহূর্তে নয়।’

-------------------------

একাডেমীর মহাপরিচালকের একান্ত সচিবের কাছে জানালাম–মহাপরিচালকের সাথে কথা বলতে চাই। একান্ত সচিব জানালেন, মহাপরিচালক ব্যস্ত। বললাম, অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাওয়ার প্রসিডিউর কী? প্রসিডিউর অনুযায়ী আগাতে চাই, যাতে করে বলতে পারি যে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছিলাম কিন্তু দেয়নি। মানে, ব্যস্ততার কথা শুনে চলে গেলে তো কোন প্রমাণ থাকলো না, যার উপর ভিত্তি করে সেটি বলতে পারি। তখন একান্ত সচিব বললেন, ‘অপেক্ষা করেন।’ দোতলা থেকে নিচে ঘুরে কতক্ষণ পরে যেতেই একান্ত সচিব বললেন, ‘কোথায় গেছিলেন?’ তারপর তিনি আমাকে মহাপরিচালকের কক্ষে নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখলাম, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে আছেন।  তাঁরা ‘রয়্যালটি’ ও ঐতিহ্য’র স্টল পাবার বিষয়ে আলোচনা করছেন। সেখানে একাডেমীর পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক জনাব শামসুজ্জামান খান ও সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ-এর উপপরিচালক জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ। মহাপরিচালকের মাথায় ক্যাপ দেখে ভালো লাগলো। কারণ, আমারও মাথায় ক্যাপ ছিল। আলোচনায় মহাপরিচালক  নিশ্চিত করলেন যে, লেখকদের সাথে ‘রয়্যালটি’ বিষয়টির মীমাংসা করলেই ‘ঐতিহ্য প্রকাশনী’ বইমেলায় অংশগ্রহণের অনুমতি পাবে।

বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে লেখকদের ‘রয়্যালটি’ পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এবং সাধারণভাবে লেখকরা বলে থাকেন যে, তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশকদের কাছ থেকে ‘রয়্যালটি’ পান না। আমার কোন বই প্রকাশিত হয়নি কিন্তু একজন লেখক হবার ইচ্ছা থাকায় এবং ‘রয়্যালটি’ একটি অর্থ সংক্রান্ত বিষয় হবার কারণে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। খোঁজ নিয়ে জানলাম–এই প্রথম লেখকদের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ বাংলা একাডেমীর কাছে এসেছে এবং একুশে গ্রন্থমেলাকে সামনে রেখে এবারই প্রথম ‘বাংলা একাডেমী ‘রয়্যালটি’ ইস্যুতে কোন ভূমিকা নিল।

‘রয়্যালটি’ ইস্যুতে বাংলা একাডেমী কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে সেটি বোঝার আগ্রহ হলো। উপপরিচালক জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ-এর নিকট থেকে পেলাম অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১১-এর নীতিমালা ও নিয়মাবলী নিয়ে বাংলা একাডেমীর একটি পুস্তিকা। ‘নীতিমালা ও নিয়মাবলী’ অধ্যয়ন করলাম। দেখলাম, এটি অনুযায়ী ‘রয়্যালটি’ না দেবার কারণে কোন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণে ‘অযোগ্য’ হয় না। ‘রয়্যালটি’ শব্দটিই এই পুস্তিকার কোথাও নেই। তাহলে ‘ঐতিহ্য প্রকাশনী’ কেন অযোগ্য হলো?

অন্যান্য সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক জানান—“ঐতিহ্য যদি শুধু এইটুকু বলে, ‘আমরা রয়্যালটি দিয়ে থাকি চৈত্র মাসের শেষে অথবা সরকারী অর্থবছরের শেষে, জুন মাসের শেষে দিয়ে থাকি। অতএব এখন ‘রয়্যালটি’ না দেওয়ার প্রশ্নটি আসে না।’ এটুকু লিখলেই আমরা ক্লিয়ার করে দিতে পারি।”

আমার যেহেতু ‘ঐতিহ্য’ থেকে কোন বই প্রকাশিত হয়নি তাই ‘ঐতিহ্য’র স্টল পাওয়া-না-পাওয়া নিয়ে খুব আগ্রহ ছিল না। আমি বুঝতে চাইছিলাম–বিধিমালা অনুযায়ী ‘রয়্যালটি’ ইস্যুতে বাংলা একাডেমী কী ভূমিকা রাখতে পারে বা আদৌ পারে কিনা। সে কারণেই কয়েকটি প্রশ্ন করলাম। বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষের সাথে আমার কথোপকথনের রেকর্ড অনুযায়ী আমাদের প্রশ্নোত্তর নিম্নরূপ:

প্রশ্ন:     ঐতিহ্য যদি বলে–আমরা রয়্যালটি দিবো না, আমরা স্টল চাই–কোন গ্রাউন্ডে বাংলা একাডেমী কোন একটা অ্যাকশন নেবে?

মহাপরিচালক:    ‘আমরা নীতিমালা সহজেই পরিবর্তন করে ফেলবো, মিটিং ডাকবো, ডেকে বলবো–এই রকম যারা বলবে তাদেরকে দেয়া হবে না, তাই না?

প্রশ্ন:     ‘বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ভবিষ্যতের আইন দিয়ে অতীতের অপরাধের বিচার করা যায় না।

মহাপরিচালক:        এটা কী কথা হইলো? এই কথা তো বুঝলাম না। তাহলে আপনি কি অন্যায়কে সমর্থন করছেন? যদি কোন প্রকাশক বলে, ‘আমি এক পয়সাও দেবো না।’, সেটা কি আইনসম্মত হবে? সংবিধানসম্মত হবে? সেটা কি ন্যায়সঙ্গত হবে?

প্রশ্ন:     লিগ্যালি সেটা অন্যায় কিন্তু সেটা মীমাংসার অথরিটি কার?

অন্যান্য সাংবাদিকের কথার মাঝে মহাপরিচালক এই প্রশ্নের জবাব আর দেন নি। পরে সেখানে উপস্থিত একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ-এর উপপরিচালক জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ এ বিষয়ে একাডেমীর বক্তব্য পেশ করলেন।

জনসংযোগ কর্মকর্তা:   বাংলা একাডেমীর বিধিবদ্ধ নীতিমালায় এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে নাই। কিন্তু বইমেলাটা যেহেতু লেখক এবং প্রকাশক–বই নিয়ে… স্যার (মহাপরিচালক) যেটা বলেছেন—এত কিছু আমাদের বিধিমালায় নাই, কিন্তু মর‌্যাল যে বিষয়গুলো আছে, সেই বিষয়টার দেখার কিছু দায়িত্ব বাংলা একাডেমীর আছে। যেহেতু বই, লেখক ও প্রকাশক নিয়েই বাংলা একাডেমী কাজ করে।

এই পর্যায়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘একটু নয়, পুরো দায়িত্বই আছে। আমরা শুধু একটু মর‌্যাল ধাক্কাটা দিয়ে রাখলাম। এইটা আপনারা দেখেন, আমরা শুধু একটু মরাল ধাক্কা দিয়েছি, আমরা বলি নাই যে তাদের স্টল দেবো না। তাদের স্টল একেবারে ঠিক করা আছে। শুধু তারা এটুকু বলুক, এটুকু বুঝুক যে, যদি রয়্যালটি না দেওয়া হয়, তাহলে কাজটি ঠিক নয়।’

লক্ষণীয়, গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণে আগ্রহীদের আবেদন যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন দেয়ার জন্য ২১ সদস্য বিশিষ্ট ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটি ২০১১’ রয়েছে যার সভাপতি একাডেমীর মহাপরিচালক। তিনি বলে দিচ্ছেন, ঐতিহ্যের পক্ষ থেকে কী করলে একাডেমী কী সিদ্ধান্ত নেবে। প্রশ্ন হলো, কমিটি কি সিদ্ধান্ত নেবে তা যদি মহাপরিচালক ইতিমধ্যে জানেন তবে কমিটির কাজ কী?

‘রয়্যালটি’ পাননি মর্মে আটজন লেখকের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলা একাডেমীর নীতিমালা বহির্ভূতভাবে ‘ঐতিহ্য’র অনুমোদন স্থগিত রেখেছে একাডেমী এবং ‘ঐতিহ্য’র কাছ থেকে মুচলেকা চাইছে। অথচ ‘রয়্যালটি’ নিশ্চিত করতে সহায়ক নীতিমালার কিছু ধারা একাডেমী আমলে রাখলে এই ঘটনা ঘটতেই পারে না। নীতিমালার ‘১১.’ ধারার ‘১১.১’(উপধারায়?)-এ ‘অংশগ্রহণের যোগ্যতা’ বিষয়ে বলা আছে:

লেখকের সঙ্গে চুক্তিপত্রের কপি এবং প্রকাশিত বইয়ের কপি জাতীয় গ্রন্থাগার-এ জমা দেয়ার প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে।

একাডেমী প্রাঙ্গণে থাকতে থাকতে এটি আমি দেখিনি। ১৯ তারিখ বুধবার তাই ফোন করলাম। একাডেমীর উপপরিচালক জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ আমাকে ফোনে বললেন যে, আবেদনকারী প্রকাশকরা লেখকদের সাথে চুক্তিপত্রের কপি জমা দিয়েছে। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আবার নিশ্চিত করলেন।

তাহলে, আটজন লেখক কী মর্মে আবেদন করলো, চুক্তিভঙ্গ? কিন্তু মহাপরিচালক ও উপপরিচালক পূর্বোক্ত আলোচনায় লেখকদের অভিযোগ হিসেবে ‘চুক্তি থাকা’ ও ‘চুক্তি না মানা’র বিষয়টি একবারও উল্লেখ করেননি। জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ জানিয়েছেন যে, লেখকদের অভিযোগ–তারা (ঐতিহ্য) রয়্যালটি পরিশোধ করে নাই এবং এ বিষয়ে বাংলা একাডেমীকে ব্যবস্থা নেবার অনুরোধ করেছে। লেখকদের সাথে চুক্তি থেকে থাকলে সেখানে ‘রয়্যালটি’ কখন, কীভাবে পরিশোধ করা হবে সেটি লিখিত থাকার কথা; সেক্ষেত্রে ‘চৈত্র মাসে’ বা ‘অর্থবছরের শেষে’ ইত্যাকার অনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি একাডেমীর চাইবার কোন কারণ নেই। অন্যদিকে, লেখকদের সাথে চুক্তি না করে থাকলে একাডেমীতে চুক্তির কপি জমা দিতে পারে না এবং বিধিমালা অনুযায়ী স্টল পায় না ‘ঐতিহ্য’। সেজন্যে লেখকদের আবেদনের উপর ভিত্তি করে ঐ অ্যাকশন নেবার দরকার পড়ে না। ‘ঐতিহ্য’ যদি চুক্তিপত্রের কপি জমা না দেয় এবং বাংলা একাডেমী সেটি বিবেচনায় না নেয় তবে অনুমোদিত অন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তির কপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হিসেবে ধরা হয় নি বলে প্রতীয়মান হয়।

আমি তখন খোঁজ নেবার চেষ্টা করলাম—লেখক-প্রকাশক চুক্তি কতটা হয়। ফোনবুক ও ফেসবুক থেকে ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করলাম। জানলাম, ২০০৯ সালে ‘পাঠসূত্র’ থেকে লেখক মুজিব মেহদী’র বই প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু কোন চুক্তি হয়নি। ‘পাঠসূত্র’ এবারের গ্রন্থমেলায় অনুমোদিত প্রকাশনীগুলোর একটি। আহমাদ মাযহারের বই প্রকাশ করে ‘সংবেদ’ গতবছর কোন চুক্তি ছাড়াই। ‘ভাষাচিত্র’ থেকে লেখক মাহবুব মোর্শেদের উপন্যাস ‘ফেস বাই ফেস’ প্রকাশিত হয় চুক্তি ছাড়াই এবং ‘ভাষাচিত্র’ এবারের গ্রন্থমেলায় স্টল পেয়েছে। ২০০৮ ও ২০১০ সালের বইমেলায় মানস চৌধুরীর গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করে যথাক্রমে ‘পাঠসূত্র’ ও ‘বাঙলায়ন’। কোন ক্ষেত্রেই চুক্তি হয় নি। ২০০৮ সালের মেলায় সুমন রহমানের বই প্রকাশ করেছে ‘মাওলা ব্রাদার্স’ ও ‘পাঠসূত্র’। কোন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। অথচ একাডেমী দাবি করল প্রকাশকরা চুক্তিপত্রের কপি জমা দিয়েছে। তাহলে, উপপরিচালক মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ ও লেখকদের অভিজ্ঞতা মিলে যা দাঁড়ায় তা হলো–‘না করা চুক্তির কপি এই প্রকাশনীগুলো বাংলা একাডেমীতে জমা দিয়েছে!’

এদিকে, বাংলা একাডেমীর নীতিমালার ‘১১.’ ধারার ‘১১.১’-এ ‘অংশগ্রহণের যোগ্যতা’ হিসেবে আরো বলা আছে:

‘যেসব পুস্তক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সর্বমোট একশতটি অথবা ০১ জানুয়ারি ২০১০ থেকে ৩১শে ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত কমপক্ষে বিশটি এবং নবীন প্রকাশকদের ক্ষেত্রে গত পাঁচ বছরে পঞ্চাশটি (তন্মধ্যে দশটি মানসম্মত বই থাকতে হবে) সৃজনশীল সাহিত্য, বিজ্ঞান ও গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করেছে তাদেরকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হবে।’

‘১১.২’-এ বলা হয়েছে:

‘মেলায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘চিরায়ত গ্রন্থ’ বিবেচিত হবে না।’

মহাপরিচালকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে উপপরিচালক জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ-এর কক্ষে এসে নীতিমালার ‘১১.১’ ও ‘১১.২’ (উপধারা?)-এর প্রতি জনাব উপপরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তিনি আমাকে বললেন যে, যোগ্যতা বিবেচনার ক্ষেত্রে গ্রন্থসংখ্যার বিষয়টি পুরোপুরি মানা হয়নি। যোগ্যতা বিচারের ক্ষেত্রে সংখ্যার চেয়ে লেখকদের নাম, গ্রন্থের মান ইত্যাদির উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং বিশেষ বিবেচনায় কিছু অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ‘(বিধিমালায়) বিশেষ ধারা তো নাই, বিশেষ বিবেচনা কোন ধারায় করলেন?’

আমার প্রশ্নের জবাবে জনাব মুর্শিদদ্দিন আহম্মদ বলেছেন যে, এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের বিশেষ এখতিয়ার আছে।

২. সরল গণিতে জটিল প্রস্তাব

পিতৃসূত্রে গণিতে আমার আগ্রহ আছে; আমি কিছু গণিত চর্চা করলাম। আমার গণিত সরল ছিল। দেখলাম–ঐ আটজন লেখক বিচার চেয়ে বাংলা একাডেমীর কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিলেন। নীতিমালার বাইরে যাবার এখতিয়ার না থাকলে লেখকদের স্বীকৃতিমূলক ওই আবেদন একাডেমী গ্রহণই করতে পারে না। একাডেমী আবেদনটি গ্রহণ করলো। কিন্তু নীতিমালা মানেই তো একাডেমীর এখতিয়ারের সীমানা।

নীতিমালায় চুক্তিপত্রের কপি জমা ও গ্রন্থসংখ্যার যে বিধান রয়েছে সে অনুযায়ী গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণের অনুমোদন দেয়া হলে একাধারে নতুন লেখকের গ্রন্থ প্রকাশ ও ‘রয়্যালটি’ বিষয়টির স্বয়ংক্রিয় সমাধান হওয়া সম্ভব। কারণ, প্রাথমিকভাবে যে ২১৪টি প্রকাশনী অনুমোদন পেয়েছে তারা সবাই ২০টি করে নতুন বই প্রকাশ করলে মোট ৪২৮০টি (বিকল্প যোগ্যতার বিধান অনুযায়ী এই সংখ্যা কিছু কমতে পারে।) বই প্রকাশিত হবার কথা। এই বিধি বাংলা একাডেমী মেনে চললে প্রকাশকদের বই চাইতেই হবে লেখকদের কাছে । সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় এমন যে আট-দশ (বড়জোর ২০ জন!) জন লেখক আছেন তাঁরা মিলে ৪০০০ বই লিখতে পারবেন না এক বছরে। অন্য লেখকদের (নতুন বা পুরনো) কাছে বই না চেয়ে প্রকাশকদের কোন উপায় থাকে না। কারণ, এটি কারো বই বিক্রি হওয়া না হওয়ার বিষয় নয়, যে লেখকের বই বিক্রি হয় না তাঁর বই প্রকাশ না করলে যে লেখকের বই বিক্রি হয় তাঁর বই বিক্রির সুযোগ পাবে না প্রকাশক। প্রকাশকরা ‘মন্দা’ লেখকের বই প্রকাশ করবে ‘চালু’ লেখকের বই বিক্রির জন্য; নবীন ও মন্দা লেখকের ঘাড়ে চড়েই বাজার চলতি চালু লেখকদের গ্রন্থমেলায় প্রবেশ করতে হবে।

উপরন্তু, সকল লেখকের সাথে চুক্তিপত্রের কপি বাংলা একাডেমীতে জমা দিলে ‘রয়্যালটি’ ইস্যুটিরও মীমাংসা হয়ে যেতে পারে। বাংলা একাডেমী তার নীতিমালার বাইরে গিয়ে লেখকদের যে উপকারটা করতে চাইলো সেটি নীতিমালা মানলে আরো ব্যাপকভাবে করতে পারে। ঐ আটজন লেখক বাদে যে লেখকগণ বাংলা একাডেমীর নীতিবহির্ভূত এখতিয়ার ও ক্ষমতা দেখতে পাননি, ফলে আবেদন করেননি, কিন্তু ‘রয়্যালটি’ও পাননি বা যে লেখকগণ উল্টো প্রকাশকদের টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করেন–তাঁরা সবাই নিজ নিজ পাওনা বুঝে পেতে পারতেন।
বই প্রকাশ ও ‘রয়্যালটি’ বিষয়ে লেখক ও প্রকাশকের চুক্তি হওয়া আইনীভাবে আবশ্যিক এবং বাংলা একাডেমীর চুক্তিপত্রের কপি নিয়ে পরোক্ষভাবে সেটি নিশ্চিত করার কথা আছে। আবার গ্রন্থসংখ্যার বিধানের মাধ্যমে নতুন লেখকদের গ্রন্থ প্রকাশ নিশ্চিত করা গেলেও বাংলা একাডেমী তা করেনি। বরং বাংলা একাডেমী নিজের বিধিবহির্ভূত কারণ দেখিয়ে ‘ঐতিহ্য’কে স্টল বরাদ্দ না দিয়ে ‘রয়্যালটি’ ইস্যু নিয়ে লেখক ও প্রকাশকদের বিরোধে এখতিয়ার বহির্ভূত সালিশী করেছে।

৩. সালিশীর ফল

‘ঐতিহ্য’র স্বত্ত্বাধিকারী জনাব আরিফুর রহমান নাঈম ফোনে জানালেন (২০ জানুয়ারি পূর্বাহ্ন), তিনি সাক্ষাৎ করেছেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালকের সাথে। মহাপরিচালক ‘ঐতিহ্য’কে স্টল দেবার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন (কমিটির মিটিং-এর পরে হলে তো চূড়ান্ত খবরটাই দিতে পারতেন!)। বাংলা একাডেমীতে ‘ঐতিহ্য’র লোক বসে আছে, কিছুক্ষণ পরে হয়ত জানা যেতে পারে। আজ অনুমোদন দেবার শেষ দিন।

উপপরিচালক জনাব মুর্শিদুদ্দিন আহম্মদ জানালেন—‘গতকাল (১৯ জানুয়ারি) ২১ সদস্যের কমিটির মিটিং হয়েছে, ‘ঐতিহ্য’কে গ্রন্থমেলায় স্টল দেবার অনুমোদন দেয়া হলো।

ঢাকা, ১৯-২০ জানুয়ারি ২০১১