ইতিহাস এক: বাঙালি মুসলমানের ভুলগুলি

মনুষ্য চিত্রকর বলিয়াই চিত্রে সিংহ পরাজিতস্বরূপ লিখিত হয়।

–ভারত-কলঙ্ক, বিবিধ প্রবন্ধ, বঙ্কিম রচনাবলী।

চিত্রে লেখা আছে, মনুষ্য সিংহকে জুতা মারিতেছে। চিত্রকর মনুষ্য এক সিংহকে ডাকিয়া সেই চিত্র দেখাইল। সিংহ বলিল, সিংহেরা যদি চিত্র করিতে জানিত, তাহা হইলে চিত্র ভিন্নপ্রকার হইত।

–বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা, বঙ্গদর্শন, ১২৮৭, অগ্রহায়ণ (১৮৮০?); বঙ্কিম রচনাবলী।

‘The painting that depicts the overthrow of the lion by the man is of course a painting by man.’

–Abdur Razzaq, Bangladesh: State of the Nation (Dacca: University of Dacca, 1980), p. 15.

‘ছবিতে দেখা যাইতেছে মানুষ সিংহকে হারাইয়া দিয়াছে; ছবিটি কিন্তু মানুষই আঁকিয়াছে–এ কথা না বলিলেও চলিবে।’

–আবদুর রাজ্জাকের উক্তির অনুবাদ, বাংলাদেশের ‘মধ্যবিত্ত’ শ্রেণীর বৃত্তান্ত, ড. সলিমুল্লাহ খান, দৈনিক যুগান্তর, ১৬ ডিসেম্বর ২০১১

দুই-তিনজন বন্ধুকে বলছিলাম, প্রফেসর রাজ্জাকের ‘man’-এর অনুবাদ ড. খান করছেন ‘মানুষ’, প্রফেসর রাজ্জাক তো বলছেন পুরুষ (নর) মানুষ ও সিংহ বিষয়ে! যুক্তি দিতেছিলাম, হাজার বছর আগে থেকেই ইংরাজ নর-নারীর বিয়ার পরে চার্চের পাদ্রি তাদের ‘man’ এবং ‘wife’ হিসাবে ঘোষণা কইরা আসছে; ‘man’ অর্থ তো ‘নর’ হবার কথা! অন্তত প্রফেসর রাজ্জাকের ‘man’-বলতে ‘মানুষ’ কইছেন—এই ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হবার উপায় নাই। বন্ধুরা আমার কথা মানে নাই। এইবেলা গোপনে স্বীকার করি, ড. খান ঠিক অনুবাদই করছেন মনে হয়; প্রফেসর রাজ্জাক সম্ভবতঃ ‘মানুষ’-ই কইছেন, হিজড়া বা নারীদের বাদ দেবার অভিসন্ধি ছিলো না তাঁর।

সে যাই হোক, প্রফেসর রাজ্জাকের বাক্যটা ড. খানের লেখা থেকে নেবার কারণে জানি না, প্রফেসর রাজ্জাক এই বাক্যের কোন রেফারেন্স দিছিলেন কিনা; ড. খান কিছু জানান নাই এই ব্যাপারে, তিনি প্রফেসর রাজ্জাকের বক্তব্য হিসাবেই আনছেন তাঁর (খানের) লেখায়। বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় কোটেশনের জায়গায় বঙ্কিম জানাইছেন, এটি তাঁর বাল্যশিক্ষায় পড়া ছিলো।

-------------------------

প্রফেসর রাজ্জাকের নিজের কথাই হইতে পারে এটা; যোগাযোগ ছাড়াই একই আবিষ্কার দুইজনে করার নজির পৃথিবীতে আছে। রেডিও’র আবিষ্কার মার্কনি আর জগদীশ স্বতন্ত্রভাবে করেন, বা মাধ্যাকর্ষণ– নিউটনের সময়ে ফ্রান্সেও কে একজন আবিষ্কার করছিলেন শুনছি। আবার, রেফারেন্স না দেওয়া একটা বৈপ্লবিক কর্মও হইতে পারে; এদিকে বক্তৃতার বেলায় রেফারেন্স বক্তৃতাকে ভারাক্রান্ত কইরাও তোলে বটে।

যা হইতে পারে, তা হইছে বলা যায় না। প্রফেসর রাজ্জাক যদি বঙ্কিমে এইটা পড়ে থাকেন, বা তাঁর বাল্যশিক্ষায় পড়েন, বা বয়স্কশিক্ষায় পান, বা ড. খান যদি প্রফেসর রাজ্জাকের দেওয়া রেফারেন্স উল্লেখ না করেন—সেক্ষেত্রে বিষয়টা কিভাবে দেখা যাবে? ঘটনা কী—জানার অনেক উপায় নাই; ড. খান তাঁর অংশটা পরিষ্কার করতে পারেন মাত্র। তবে, কিছু ঘোলা ইতিহাস আছে বটে।

১৯৪৭-এর আগে পরে বেশ কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-খুনাখুনির পরে হিন্দু-মুসলমান দুই তরফেই কিছু বুদ্ধিজীবীর কাছে ঋণ স্বীকার কঠিন। হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রই প্রধান এক্ষেত্রে, মুসলমানদের মধ্যে মাওলানা আকরাম খাঁ’র নাম বলা যাইতে পারে। নিন্দা করার দরকারে বঙ্কিমচন্দ্রের নাম অবশ্য প্রায়ই আসে। বঙ্কিমচন্দ্রের নিন্দা করার চাইতে নিরাপদ জিনিস কমই আছে বাংলার বুদ্ধিজীবিতায়। বঙ্কিমনিন্দা কইরা হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা হিন্দুদের মধ্যে উদার ও সেক্যুলার হইতে পারেন, একইসাথে মুসলমানদের মধ্যেও আদরণীয় হইয়া ওঠেন। মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা বঙ্কিমনিন্দার মাধ্যমে সাচ্চা পূর্ববঙ্গীয় (বাঙালি মুসলমান, এইদলে প্রফেসর রাজ্জাক, আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহার এবং ড. খানকে রাখলাম) হন; হিন্দুদের মধ্যেও খুব সমস্যায় পড়েন না, কট্টর হিন্দুরা বাদে বঙ্কিমনিন্দা ন্যায্য হিসাবে আগেই মাইনা নেওয়া আছে। কট্টর হিন্দুদেরও বঙ্কিমনিন্দার কারণ ও ক্ষেত্র আছে; পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি প্রার্থী মুসলমানদের কাছে ভোট চাইতে গিয়া একটু বঙ্কিমনিন্দা করলে কিছু সুবিধাই পাইবেন।

এইসব কারণেই হয়তো হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বঙ্কিমের কাছে কিছু সাহিত্যিক ঋণ স্বীকার কইরাও কথা শেষ করেন বঙ্কিমনিন্দায়। আমার এই ‘নিন্দা’ শব্দের ব্যবহার ইচ্ছাকৃত। বঙ্কিম সম্পর্কে যেই কথাগুলি ন্যায্য সেগুলিরে আমি ‘নিন্দা’ হিসাবে ধরি নাই। অন্যদিকে, ন্যায্যত যেইখানে বঙ্কিমের কাছে ঋণস্বীকার করতে হয়, সেইখানে না করাকেও ‘নিন্দা’ হিসাবে ধইরা নিছি। ‘নিন্দা’র এই সংজ্ঞা নিতে কেউ রাজি হইবেন কিনা জানি না।

বঙ্কিম বিষয়ে আমার বক্তব্য আরো একভাবে বলা যাইতে পারে। আমি যেই চারজন বাঙালি মুসলমানের দল বানাইলাম তাঁরা সবাই ইতিহাসে আগ্রহী। আমার বিবেচনায় এই চারজন বঙ্কিমের বেলায় তাদের ইতিহাসজ্ঞান কিছু কম ব্যবহার করছেন বা বেশি ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ হয় তাঁরা ইতিহাস পড়েন নাই বা জাইনা-শুইনা চাইপা গেছেন। প্রথম উদাহরণ দিলাম আমি—‘বাঙালি মুসলমান’; এই কনসেপ্টের মা এবং আব্বাজান বঙ্কিমচন্দ্র। বাঙালি’কে বঙ্কিম চিনাইতেছেন–

‘বাস্তবিক এক্ষণে যাহাদিগকে আমরা বাঙ্গালী বলি, তাহাদিগের মধ্যে চারি প্রকার বাঙ্গালী পাই। এক আর্য্য, দ্বিতীয় অনার্য্য হিন্দু, তৃতীয় আর্য্যানার্য্য হিন্দু, আর তিনের বার এক চতুর্থ জাতি বাঙ্গালী মুসলমান।’

–বাঙ্গালীর উৎপত্তি, বঙ্গদর্শন, ১২৮৭, পৌষ; বিবিধ প্রবন্ধ, বঙ্কিম রচনাবলী

‘বাঙালি মুসলমান’-এর সামাজিক অবস্থানও বইলা গেছেন বঙ্কিম—

‘বাঙ্গালীসমাজের নিম্নস্তরেই বাঙ্গালী অনার্য্য বা মিশ্রিত আর্য্য ও বাঙ্গালী মুসলমান; উপরের স্তরে প্রায় কেবলই আর্য্য।’

–ঐ (পরিসংখ্যান জানাইছেন বঙ্কিম—৭১ [১৮৭১] সালের লোকসংখ্যাগণনায় স্থির হইয়াছে যে, বাঙ্গালার যে অংশে বাঙ্গালাভাষা প্রচলিত, তাহাতে ৩০৬০০০০০ লোক বসতি করে—তন্মধ্যে ১১ লক্ষ মাত্র ব্রাহ্মণ।)

উপরে বলা চারজন বাঙ্গালি মুসলমান যেই ‘গরিব’চিন্তা করছেন, সেই ‘গরিব’চিন্তা বাংলাভাষায় প্রথম করছেন বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের ‘সাম্য’ প্রবন্ধের কথা না বলা যায়; কেননা বঙ্কিম পরে বলছেন তাঁর ‘সাম্য’চিন্তা ভুল। আবার বলাই যায়; লেখক নিজে ‘ভুল’ বললেই তো লেখার ক্রিয়া থাইমা যায় না। ‘সাম্য’ এখন আমার নামে ছাপাইলে কি ওইটা আমার লেখা হবে? না হইলে বলতে হবে, ‘ভুল’ লেখাগুলিও সঠিকভাবেই থাইকা যায় ইতিহাসে। যাই হোক, ‘বঙ্গদেশের কৃষক’-এর কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। বঙ্কিমচন্দ্র লিখছেন—

‘আজি কালি বড় গোল শুনা যায় যে, আমাদের দেশের বড় শ্রীবৃদ্ধি হইতেছে।…দেশের বড় মঙ্গল—তোমরা একবার মঙ্গলের জন্য জয়ধ্বনি কর!

এই মঙ্গল ছড়াছড়ির মধ্যে আমার একটি কথা জিজ্ঞাসার আছে, কাহার এত মঙ্গল? হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্ত দুই প্রহরের রৌদ্রে, খালি মাথায়, খালি পায়ে, এক হাঁটু কাদার উপর দিয়া দুইটা অস্থিচর্ম্মবিশিষ্ট বলদে, ভোঁতা হাল ধার করিয়া আনিয়া চষিতেছে, উহাদের কি মঙ্গল হইয়াছে?…

আমি বলি, অণুমাত্র না, কণামাত্রও না।…দেশের মঙ্গল? দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয় জন?… হিসাব করিলে তাহারাই দেশ—দেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী।… যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই।’

হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত্ত’র মঙ্গল নাই কেন? বঙ্কিম বলছেন—

‘…লর্ড কর্ণওয়ালিস্ মহাভ্রমে পতিত হইয়া প্রজাদিগের আরও গুরুতর সর্বনাশ করিলেন।…তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সৃজন করিলেন। রাজস্বের কন্ট্রাকটরদিগকে ভূস্বামী করিলেন।…

প্রজারাই চিরকালের ভূস্বামী; জমীদারেরা কস্মিন্ কালে কেহ নহেন—কেবল সরকারী তহশীলদার। কর্ণওয়ালিস্ যথার্থ ভূস্বামীর নিকট হইতে ভূমি কাড়িয়া লইয়া তহশীলদারকে দিলেন।… এই “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত” বঙ্গদেশের অধঃপাতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মাত্র—কস্মিন্ কালে ফিরিবে না।’

–চতুর্থ পরিচ্ছদ, বঙ্গদেশের কৃষক, বিবিধ প্রবন্ধ, বঙ্কিম রচনাবলী।

‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’র এখনকার বিশ্লেষণ বঙ্কিম থেকে কতটা ভিন্ন? বঙ্কিমের সাথে যদি আদৌ মেলে কোথাও বা এখনকার বিশ্লেষণ বঙ্কিম থেকে খুব আলাদা না হইলে বঙ্কিমের কাছে ঋণ আছে। এই ঋণ কেবল মিলেই নাই, তার চাইতেও বড় ঋণ দেখবার ভঙ্গির উত্তরাধিকার পাওয়ায়। ভারতের ঔপনিবেশিকতারে স্বাগত জানাইছিলেন কার্ল মার্ক্স; ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ তার বড়ো কারণ, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ই ভারতীয় সমাজের মৌল আর্থনীতিক বদলে ইংরেজের প্রথম পদক্ষেপ—সাবেকি ব্যবস্থার উচ্ছেদ। বঙ্কিমের বিশ্লেষণ মার্ক্সের প্রায় সমসাময়িক। তখনো মার্ক্স আসেন নাই সম্ভবতঃ এই দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক দুনিয়ায়। মার্ক্স যখন আসেন, বাংলার বুদ্ধিজীবিতা বহুদিন মার্ক্সের ইউরোসেন্ট্রিজম ধরতে পারে নাই। পারে নাই কারণ, বঙ্কিম ততদিনে সাম্প্রদায়িক বর্জ্য। বঙ্কিমের নাম থাকে নাই, কিন্তু তাঁর বিশ্লেষণ রইয়া গেছে বেনামে—বাংলার মার্ক্সিস্টদের অস্বস্তি হইয়া। বাংলার বুদ্ধিজীবিতা মার্ক্সের সমালোচনা করতে পারলো সেইদিন, পোস্ট-কলোনিয়ালিজম থেকে নারীবাদ আর নিও-মার্ক্সিজম শিখতে পাইরা।

বঙ্কিমের সময়ে মার্ক্সের সাথে তাঁর ফাইট করতে হয় নাই, কিন্তু নিজের ভিতর প্রবল ইউরোসেন্ট্রিজম নিয়াও তিনি খোদ ইউরোসেন্ট্রিজমের বিরুদ্ধে ফাইট করছেন। তাঁর সময়ে এমন একজন খাড়াইয়া ছিলেন যিনি একাধারে তাঁর শিক্ষক, সবচেয়ে প্রগতিশীল বইলা এখনো পর্যন্ত পূজনীয়, নিঃস্বার্থ ভারতপ্রেমিক বইলা স্বীকৃত, নারীমুক্তির অগ্রদূত বইলা অবিসম্বাদিত—তিনি আর কেউ নন, তিনি বিদ্যাসাগর—ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর ১৮৪৮ সালে প্রকাশ করেন ‘বাঙ্গালার ইতিহাস [দ্বিতীয় ভাগ]। এইটা তাঁর নিজের লেখা নয়, অনুবাদ—বিদ্যাসাগর জানাইতেছেন ‘সঙ্কলন’, ‘অবিকল অনুবাদ নহে’। ইংরেজ মার্শম্যান রচিত বাংলার ইতিহাস অবলম্বনে রচিত। ১৮৪০ সালে এটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হয় বাংলায়। অনুবাদক গোবিন্দচন্দ্র সেন। এই বইয়ের চাইতে ইংরেজপ্রেমী, হীনমন্ম্য ভারত অংকনকারী এবং মুসলিম বিদ্বেষী বই কম হইতে পারে। এই বইয়ে শুরুর বিজ্ঞাপনে বিদ্যাসাগর জানাইতেছেন—

‘এই পুস্তকে, অতি দুরাচার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনারোহণ অবধি, চিরস্মরণীয় লার্ড উইলিয়ম বেন্টিক মহোদয়ের অধিকারসমাপ্তি পর্য্যন্ত, বৃত্তান্ত বর্ণিত আছে।’

–‘বাঙ্গালার ইতিহাস [দ্বিতীয় ভাগ], শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা, ১৮৪৮

এই বইতে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ বিষয়ে বিদ্যাসাগর বলছেন—

‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়াতে, বাঙ্গালা দেশের যে সবিশেষ উপকার দর্শিয়াছে, ইহাতে কোনও সন্দেহ নাই।

–ঐ

বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ বহুবারই আসবে পরে। এইখানে কেবল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিষয়ে দুইজনের অবস্থানের আলোচনা করবো। উদ্ধৃতিতেই অবস্থান পরিষ্কার। কিন্তু এইখানে আরো কিছু বিষয় বোঝাবুঝির আছে। প্রথম বিষয় আধুনিক (খ্রীস্টান ইংরেজ) বাংলার মধ্যবিত্ত, দ্বিতীয় বিষয় ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা। লক্ষণীয়, বঙ্কিম ও বিদ্যাসাগর দুইজনই ব্রাহ্মণ এবং কেউই জমিদার নন। কিন্তু ইতিহাস ভাবনায় বিদ্যাসাগর জমিদারপন্থি এবং রাজার গুণগান গাওয়া সাবেকি বুদ্ধিজীবী। বিপরীতে বঙ্কিমের মধ্যে গণতান্ত্রিক লক্ষণ পরিষ্কার। জমিদারের আনুগত্য স্বীকার না করা বাংলার প্রথম বুদ্ধিজীবীদের একজন বঙ্কিম; তাঁর সময়ে সম্ভবতঃ আরো কয়েকজন ছিলেন—তাঁর ভাই সঞ্জীবচন্দ্র (বাংলার রায়ত) এবং দীনবন্ধু মিত্র (নীলদর্পণ)। মুসলমানদের মধ্যে বঙ্কিমের আংশিক ভাবশিষ্য হইছিলেন সম্ভবতঃ মীর মশাররফ হোসেন (জমিদারদর্পণ)। যদিও বঙ্কিম জমিদারদর্পণ গ্রহণ করেন নাই। বঙ্কিমের মতে, ততদিনে নতুন আইন হইছে, জমিদাররা এখন অনেক নিয়ন্ত্রিত। তার চাইতেও বড় বিষয়, বঙ্কিম বিশ্বাস করতেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কৃষকের সর্বনাশ ঘটাইছে ঠিক, কিন্তু এইটা আর ফেরত নেবার উপায় নাই; আধুনিক বাঙালি সমাজ দাঁড়াইয়া আছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উপর। ভালো থাকার জন্য ইংরেজের প্রতি কৃতজ্ঞতা আছে কিছু, আর আছে ইংরাজি শিক্ষায় পাওয়া ইউরোসেন্ট্রিজম এবং বর্ণবাদ (বঙ্কিমে বর্ণবাদ গুরুতর বিষয়, যেইটা যথাস্থান মনে হবে সেইখানে আলোচনা করবো)। এইখানে আইসা মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর তাবৎ লক্ষণ প্রকাশ করেন বঙ্কিম। তাঁর লাভের ভাগ ঠিক রাইখা কৃষকদের যদ্দূর ভালো রাখা যায়—এইটাই বঙ্কিমের চিন্তা। কারণ বঙ্কিম জানাইছেন।–

‘তোমা হইতে আমা হইতে কোন্ কার্য্য হইতে পারে? কিন্তু সকল কৃষিজীবী ক্ষেপিলে কে কোথায় থাকিবে?’

–বঙ্গদেশের কৃষক।

ওদিকে, বিদ্যাসাগরের মধ্যে আনুগত্য ছাড়া কিছু নাই। যেই বিদ্যাসাগরকে রবীন্দ্রনাথ থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও আহমদ ছফা পর্যন্ত সবাই ‘পুরুষসিংহ’ এবং উনবিংশ শতাব্দীর একমাত্র শ্রদ্ধেয় চিন্তুক হিসাবে মাইনা নিছেন, বাঙালিদের মধ্যে সেই বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধেই বঙ্কিমকে প্রধান ফাইটটা করতে হইছে– হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাংলার কৃষকদের পক্ষে, এবং অবশ্যই ঔপনিবেশিকতা বিষয়ে। বঙ্কিমের ফাইটটা কঠিন; কেননা, বিদ্যাসাগরকে শত্রু হিসাবে তখন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় কেউই বিশ্বাস করে নাই।

আরেকটা বিষয় বলছিলাম—ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা। ইংরেজ কখনোই সেক্যুলার ছিলো না; মিশনারির মতো করে ধর্মপ্রচার ভারতে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ—কেউই করে নাই। ইংরেজের সাম্প্রদায়িক চতুরতার গুরুতম উদাহরণ সম্ভবতঃ ভারতে শিখানো তাদের ইতিহাসতত্ত্ব। ভারতের ইতিহাসের যুগবিভাগ লক্ষ্য করার মতো। বৈদিক যুগ, হিন্দুযুগ, বৌদ্ধযুগ, মুসলিমযুগ, এরপরে আধুনিক যুগ বা ইংরেজ আমল। আধুনিক যুগ খ্রীস্টানযুগ নয়। এই যুগবিভাগ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এখনো পর্যন্ত চালু আছে ভারত উপমহাদেশে। এই ইতিহাসতত্ত্ব বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকেই গ্রহণ করেছেন। কেবল বঙ্কিমচন্দ্রই প্রায়ই অনেকটা বাইরে যাইতে পারছেন। বঙ্কিমচন্দ্র পাঠান এবং মোগল আলাদা করছেন, আরব-পারস্য-তুর্কি আলাদা করছেন। স্বাধীন পাঠানদের সময়কে বাংলার প্রথম রেঁনেসাস বলছেন বঙ্কিম, বাংলার অধঃপতনের দায় দিছেন সম্রাট আকবরকে। বঙ্কিম বলছেন—

ক. ‘পরাধীন রাজ্যের যে দুর্দ্দশা ঘটে, স্বাধীন পাঠানদিগের রাজ্যে বাঙ্গালার সে দুর্দ্দশা ঘটে নাই।’

খ. ‘বাঙ্গালার ঐশ্বর্য্য দিল্লীর পথে গিয়াছে; সে পথে বাঙ্গালার ধন ইরান তুরান পর্য্যন্ত গিয়াছে। বাঙ্গালার সৌভাগ্য মোগল কর্ত্তৃক বিলুপ্ত হইয়াছে।’

গ. ‘…যে আকবর বাদশাহের আমরা শতমুখে প্রশংসা করিয়া থাকি, তিনিই বাঙ্গালার কাল।… মোগলই আমার শত্রু, পাঠান আমাদের মিত্র।’

বঙ্কিম ইংরেজদের ইতিহাসতত্ত্ব (মার্শম্যানের বইয়ের কথাও উল্লেখ করছেন বঙ্কিম) নেন নাই। কথাটা অবশ্য আংশিক সত্য। তিনি একদিকে বলছেন—

‘আমাদিগের বিবেচনায় একখানি ইংরেজি গ্রন্থেও বাঙ্গালার প্রকৃত ইতিহাস নাই।’

–বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা, বঙ্গদর্শন, ১২৮৭, অগ্রহায়ণ।

অন্যদিকে, ইউরোপের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যেই বাঙ্গালার ইতিহাস লিখছেন এবং ইংরাজের ইতিহাসতত্ত্বের সাম্প্রদায়িকতা অনেকখানি গ্রহণ করছেন, পুরাটা গ্রহণ করেন নাই। বাস্তবিক ‘সাম্প্রদায়িকতা’ কী, খোদ সেই বিষয়েই বেশ কিছু প্রস্তাব পাওয়া যায় বঙ্কিমে। বখতিয়ার খিলজি ১৭জন অশ্বারোহী নিয়া বাংলা জয় করছিলেন—এইটারে মিথ্যা বলছেন বঙ্কিম। এই কথাটা বঙ্কিমের জাতীয় অহমে লাগতো। এই অহম হিন্দু হিসাবে এবং বাঙালি হিসাবে, দুইভাবেই। বখতিয়ার খিলজিকে তিনি কখনো পাঠান বলছেন, আবার কখনো মুসলমান বলছেন। ইন ফ্যাক্ট, বখতিয়ার খিলজির সময়ে বাঙালি মানে কেবলই হিন্দু, মুসলমান নাই কোন। বখতিয়ার খিলজি বাংলার হিন্দু-মুসলমান বুঝবার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অন্তত আধুনিক কালের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক। বখতিয়ার খিলজি আধুনিক বাঙালি মুসলমানের জাতীয় বীর। এইটা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি। পাঠানের কাছে বাংলার পরাজয় বাঙালির জন্য আনন্দের ঘটনা হইতে পারে না। কিন্তু এই ঘটনারে বাঙালি মুসলমানের স্বাগত জানানো ছাড়া উপায় নাই। এই ঘটনাই যে বাঙালি মুসলমান নিজের জন্ম বইলা চেনে। আহমদ ছফা থেকে ড. খান পর্যন্ত বাংলা ভাগের জন্য বঙ্কিমচন্দ্রকে দায়ী করছেন। এই দায় প্রদান সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। পাঠান বা মুসলমান না হইলে বখতিয়ার খিলজি কোন আনন্দ উৎপাদন করতে পারে না। হিন্দু তো দূরের কথা, সম্পূর্ণ নাস্তিক বাঙালি বা হিন্দুনির্যাতিত বাঙালি বৌদ্ধের জন্যও খিলজির ঘটনায় কোন আনন্দের খবর নাই। ‘জাতি’ ধারনা যতই কাল্পনিক হৌক না কেন, একই ঘটনা অপরিবর্তিতভাবে, একই সাথে জাতীয় আনন্দ এবং জাতীয় দুঃখ হইতে পারে না। বখতিয়ার খিলজিরে জাতীয় শত্রু হিসাবে না মানলে বাংলা ভাগ হইয়াই আছে, বঙ্কিম কী বললো, আনন্দমঠে ইংরেজ রাখলো নাকি মুসলমান আনলো—তাতে কিছু আসে যায় না।

এদিকে, বখতিয়ার খিলজিকে জাতীয় শত্রু ভাবতে হিন্দু হইতে হয় না, হিন্দু-মুসলমান সেক্যুলার হইলেই খিলজি জাতীয় শত্রু হন। খ্রীস্টান ইংরেজের সাম্প্রদায়িক ইতিহাসতত্ত্ব অনেকখানি মাইনা নিলেও খিলজি বিষয়ে বঙ্কিমের জাতীয় অহমের সেক্যুলার আসপেক্ট আছে; বঙ্কিমের এই সেক্যুলার আসপেক্ট ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ থেকে বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার আন্দোলনের বিরোধিতা পর্যন্ত, আবার বাংলা ভাষা ভাবনা থেকে বাঙালির উৎপত্তি পর্যন্ত—বহুক্ষেত্রেই বঙ্কিম দেখাইছেন।

বঙ্কিম দেখাইছেন, কিন্তু কেউ বিশেষ দ্যাখেন নাই। এঁনাদের (বাঙালি মুসলমান দল) সবকিছু আমি পড়ি নাই; যা পড়ছি, পাই নাই কোথাও, শুনিও নাই কাউরে বলতে কোনদিন। হয়তো লিখছেন, বলছেন, আমি জানি না; তো ধইরা নিছি, অজ্ঞতা প্রকাশই জানার উপায়।

প্রায় সবাই-ই দেখছেন নিন্দার উপাদান; আগেই জানাইছি, ন্যায্যত বঙ্কিমের যা পাওনা তারে নিন্দা ধরি নাই আমি এই লেখায়। এমনি এক নিন্দা করতে গিয়া ড. খান জানাইছেন—

‘১৯৪৭ সনের দেশভাগ যাঁহাদের দাবি আকারে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডের জ্বালানি যোগাইয়াছিল, তাঁহাদের রণধ্বনি কি ‘বন্দে মাতরম’ ছিলো না? সুতরাং বঙ্কিম ব্যর্থ হইয়াছেন বলা কি ঠিক হইবে?’

–বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্কিমচন্দ্র, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী, ২০১০।

১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডে মুসলমানের রণধ্বনি ছিলো ‘আল্লাহু আকবর’, পাকিস্তানভুক্ত বাংলায়ও বা বাংলাদেশেও যেই হিন্দু হত্যা এখনো ঘটে, সেইখানেও রণধ্বনি থাকে ‘আল্লাহু আকবর’। ড. খান বলেন নাই, এইটা ইসলামের সাফল্য। যেমন কইরা মুসলমান খুনে বঙ্কিমের ব্যর্থতা পাইতেছেন না, তেমনি কইরা ‘আল্লাহু আকবর’ বইলা হিন্দু খুনে ইসলামের সাফল্য দেখতে ড. খান কি রাজি আছেন?

———-

ইতিহাস দুই: বিদ্যাসাগর বিচার

  • Fakrulchowdhury

    good piece.. congrats!

  • ইব্রাহীম খালিল ইবু

    খুভ ভাল লাগলো……
    অনেক কিছু জানত পারলাম

  • Zahidul Islam

    র‍্যাডিক্যাল ভিউ। খুবই ইন্টারেস্টিং।

    বঙ্কিমের মাঝে তার ঔপনিবেশিক শ্রেণীগত, ও ইতিহাসের ক্রান্তিকালের স্বাক্ষরবাহী বাঙালি-হিন্দু সম্প্রদায়ের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশজনিত কারণে উপস্থিত হওয়া, শ্রেণীগত দ্বন্দ্ব ছিল। এই দুটোর প্রকৃতি বিচার না করলে, তার সত্ত্বার খণ্ডিত বিচার হয়। এই দুই সত্ত্বার পুষ্টি যোগাইতে, তাঁকে অনেককিছুকেই শিকার করে করে আমিষ যোগাতে হয়েছে। কাজটা কঠিন।সেই শিকারি ও শিকারের ক্ষণগুলির অনবদ্য চিত্রায়নে উপাখ্যানটা উপভোগ্য হচ্ছে।

    আয়রনিক্যালি, বঙ্কিমের সমালোচনাকারীরাও প্রায় একই ভূমিকা নিচ্ছেন/নিয়েছেন। সময়ের আবর্তনে এই ঐতিহাসিক অবস্থানে, অন্য-ধর্ম পরিচয়ে আরেকদল আসীন হয়েছেন। শ্রেণী-পরিচয় প্রায় অভিন্ন।

    কিন্তু, সেই যে আমজনতা তথা কৃষকের কথা বঙ্কিম বলেছিলেন, তাদের কোন্ উপকারটা হইছে?

    অভিনন্দন।