উত্তরাধিকার প্রশ্নের সহজ সমাধান

আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীসভা ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ অনুমোদন করেছে গত ৭ মার্চ ২০১১। সাধারণভাবে এটি বাংলাদেশের নাগরিকদের লিঙ্গ ইস্যুটিকে রাষ্ট্র কীভাবে অ্যাড্রেস করবে—তার রূপরেখা; ফলে এটি লিঙ্গ নীতি হওয়াটাই ভালো ছিল। বাংলাভাষীদের কাছে লিঙ্গ শব্দটা সামাজিক যোগাযোগে কতকটা অস্বস্তি উৎপাদন করে বিধায় ‘জেন্ডার নীতি’ করা যায়। বাংলাদেশে এনজিওগুলির এখনকার ‘গণসচেতনতা প্রকল্প’-এ বড় জায়গা নিয়ে আছে ‘জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং’। ফলে ‘জেন্ডার’ শব্দটিকে এখন বাংলা ভাষার শব্দ হিসাবে ধরা যায়।

কিন্তু নাম যেটাই হোক, লিঙ্গ ইস্যুকে রাষ্ট্র কীভাবে অ্যাড্রেস করে সেটি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জেন্ডার শব্দটি নীতিমালায় ব্যবহৃত হয়েছে একাধিকবার; কিন্তু এই ব্যবহার নর-নারী’র বাইরে কোন লিঙ্গীয় পরিচয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে না। নীতিমালা থেকে এর প্রণেতাদের অন্তত দুটি অনুমান সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়:
১. বাংলাদেশের নাগরিকগণ হয় নর অথবা নারী।
২. লিঙ্গীয় পরিচয় প্রাকৃতিকভাবে প্রদত্ত, সেখানে মানুষের কোন ভূমিকা নাই, অর্থাৎ ‘লিঙ্গ’ মানুষের পরিচয়ের একটি অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য।
উপরের দুইটা অনুমান-ই ভুল। সামাজিকভাবে ‘হিজড়া’ বলে পরিচিত মানুষ আছেন, বাংলাদেশের নাগরিকদের একটা অংশ এই হিজড়াগণ। নর বা নারী হওয়া বাংলাদেশের নাগরিক হবার শর্ত নয়।

-------------------------

অন্যদিকে, পৃথিবীতে লিঙ্গ আর প্রাকৃতিক বা জন্মার্জিত ঘটনা নাই। মানুষ চাইলে লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারে। সেক্স্যুয়াল সার্জারি এখন সাধারণ ঘটনা। পুরুষ বা হিজড়াদের নারী হবার সার্জারিকে মেডিকেল পরিভাষায় বলা হয় ‘এসআরএস (SRS)’ অর্থাৎ সেক্স্যুয়াল রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি। এর দুটি ধাপ—প্রথমটি নর যৌনাঙ্গ অপসারণ, দ্বিতীয়টি Vaginoplasty বা নারী যৌনাঙ্গ নির্মাণ। আর নারী বা হিজড়াদের পুরুষ হওয়াসহ পুরো প্রক্রিয়াকে একসাথে বলা হয় ‘GRS’ বা জেন্ডার রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি। ১৯৫২-৫৩ সালে George William Jorgensen, Jr. ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে Dr. Christian Hamburger-এর তত্ত্বাবধানে সার্জারির প্রথম ধাপটি সম্পাদন করেন, কয়েক বছর পরে দ্বিতীয় ধাপটি সম্পাদিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মাঝখানে হরমোন থেরাপি চলতে থাকে। এভাবে তিনি হিজড়া থেকে নারীতে রূপান্তরিত হয়ে নাম নেন Christine Jorgensen। তাঁর জীবন নিয়ে ১৯৭০ সালে হলিউডে ‘The Christine Jorgensen Story’ নামে সিনেমা তৈরি করেন পরিচালক Irving Rapper।

উত্তরাধিকারের লিঙ্গভিত্তিক বন্টন সেক্স্যুয়াল সার্জারির এই জমানায় অপরাধের সম্ভাবনা বাড়াবে। আইন প্রণেতাদের দূরদর্শী হতে হবে। সেক্স্যুয়াল সার্জারির মাধ্যমে ভাই ভাইকে যদি বোন বানিয়ে দেয় বা হিজড়া করে দেয় তবে উত্তরাধিকরের বন্টন তো নতুন অর্জিত লিঙ্গের ভিত্তিতেই হবে, ঘটনাটি কেবল পিতা বা মাতার মৃত্যুর আগে ঘটতে হবে।

অবশ্য, গরিব মানুষ এই অপরাধ করতে পারবে না; ‘এসআরএস’ বেশ ব্যয়বহুল, তবে, বাংলাদেশে কয়েক হাজার কোটিপতি আছেন, তাদের সামর্থের মধ্যেই আছে। থাইল্যান্ডের এক ডাক্তার শুধু সার্জারির ফি হিসেবে নেন ৮০০০ইউএস ডলার, প্রায় ছয় লাখ টাকা।

এক্ষেত্রে গরিব-ধনীর ভেদাভেদ মুছে দিতে পারে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, এটি বাংলাদেশে বিনা মূল্যেই পাওয়া যায়। নারীর জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল তৈরি হয় ‘Estrogen’ এবং ‘Progesterone’ নামের দু’টি হরমোনের বিভিন্ন সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই হরমোন দু’টি তৈরি হয় প্রধানত নারীদেহে, নরদেহেও অল্প কিছু তৈরি হয়। পুরুষের শরীরে এই জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল প্রবেশ করার ফলাফল হলো—স্তন বড় হতে থাকা, দাড়ি-গোঁফ না গজানো বা কমতে থাকা, যৌনাঙ্গের উন্নয়ন না ঘটা, যৌনাবেগ হ্রাস পাওয়া, স্বর পরিবর্তিত হয়ে চিকন হতে থাকা, নিতম্ব ও তলপেট ভারি হতে থাকা ইত্যাদি। নারীর জন্য ব্যবহৃত জন্মনিয়ন্ত্রণ ইনজেকসন পুরুষের শরীরে প্রবেশ করালেও একই ধরনের ফলাফল হবে। ফলে বিনামূল্যে পাওয়া যায় এমন বিপুল বৈধ অস্ত্র আছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। হিজড়ায় রূপান্তর অত্যন্ত সহজ এবং ব্যয়বিহীন ঘটনা, এজন্য ব্যাপক সার্জারির দরকার নাই।

প্রস্তাবিত আইনের পক্ষে বা বিপক্ষে যত মুভমেন্ট চলতেছে বলে আমি জানি—সবগুলি মুভমেন্টই এই দুইটা ‘ভুল’কে ‘ঠিক’ বলে ধরে নিয়েছে। পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি সরকারের দেখানো এই নীতির ভালো দিকগুলির উপর আস্থা রাখছেন, কিন্তু এই আইনে নারীর জন্য এমন কিছু নাই যা এতদিন ছিলো না। অন্যদিকে, বিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির একটা অংশ এই আইনকে অপর্যাপ্ত ভাবছে, আর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তিত রাজনৈতিক শক্তি এই আইনকে ধর্মাচরণের উপর আক্রমণ বিবেচনা করছে, কিন্তু এই আইনে ধর্মের উপর নতুন কোন আক্রমণ ঘটে নাই।

তর্ক-বিতর্ক ও মুভমেন্টের কেন্দ্রে আছে ‘উত্তরাধিকারে নারীর প্রাপ্য অংশ’। বাংলাদেশে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার অনুদানে ‘নারী অধিকার’ প্রতিষ্ঠায় ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে বেশ কিছু এনজিও উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকারের দাবি করে আসছে। তাঁরা একদিকে মুসলিম বা হিন্দু সকল নাগরিকের স্বাধীনতা খর্ব করতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছে, অন্যদিকে বিদ্যমান যেকোন ব্যবস্থায় হিজড়া সন্তান যে একেবারেই সম্পত্তি পায় না–সেটি আবার বলেন না তাঁরা। কিন্তু ধর্মচর্চা ব্যক্তির অধিকার; ব্যক্তিরা নিজ নিজ ধর্মমতে তাঁর সম্পত্তি বন্টন করার অধিকার রাখে। ব্যক্তিকে এই অধিকার না দেওয়া ব্যক্তির/ নাগরিকের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। গণপ্রজাতন্ত্র হিসেবে বাংলাদেশ এই হস্তক্ষেপ করলে সেটি এই রাষ্ট্রের ঘোষিত অঙ্গীকারের (সংবিধান) পরিপন্থী।

ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তি যেভাবে ইচ্ছা বন্টন করে দিতে পারে। এটি আধুনিক ব্যক্তি স্বাধীনতার সাধারণ বিধি, যেটি সকল রাষ্ট্র আইনীভাবে স্বীকার করে। কোন রাষ্ট্র এটি স্বীকার না করার অর্থ সেই রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বন্দী করে রেখেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র নাগরিকদের বন্দী করে নাই। বাংলাদেশ সম্পত্তির উপরে ব্যক্তির অধিকার—বিক্রি বা দানকে স্বীকার করে। উত্তরাধিকার কথাটির সোজা এবং স্পষ্ট আইনী অর্থ পরিত্যক্ত সম্পত্তির বাটোয়ারা। কোন ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তাঁর সম্পত্তি বাটোয়ারা করে না গেলে তা পরিত্যক্ত হবে; রাষ্ট্র তখন উত্তরাধিকার আইনের মাধ্যমে সেটি বাটোয়ারা করে দেবে।

এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইন ধর্মীয় বিধানগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছে। কোন ধর্ম মতে ছেলে বা মেয়ে হয়তো সমান উত্তরাধিকার পায়, কোন ধর্ম মতে মেয়ে ছেলের অর্ধেক পায় আবার কোন ধর্ম মতে মেয়েরা উত্তরাধিকার পায় না। রাষ্ট্র কর্তৃক ধর্মকে স্বীকার করে নেওয়া ভালো, কিন্তু একই সাথে যে সকল নাগরিক ভিন্ন ব্যবস্থায় তাঁর সম্পত্তি বন্টন করতে চায়—তাঁর জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কোন একক ব্যবস্থায় সবাইকে নিয়ে আসার উপায় নাই, বরং নাগরিকদের ধর্মবিশ্বাস বা পছন্দমাফিক চলার মতো নমনীয় বহু ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে কম জানি, ইসলাম ধর্ম মতে ব্যক্তির সম্পত্তি বিভিন্ন জনকে দিয়ে যাওয়াকে (মৃত্যুর আগে) বলে ‘অছিহত’ বা ‘অছিয়্যত’। ব্যক্তির ‘অছিয়্যত’ করতে পারা তাঁর অধিকার। তিনি ছেলে-মেয়ে-পিতা-মাতা বা অন্য যে কাউকে দেবার অছিয়্যত করতে পারে। তাঁর হিজড়া সন্তানকেও দিতে পারে। উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে আল-কোরানে ছেলে এবং মেয়ের উল্লেখ আছে; ইসলাম ধর্ম মতে ছেলে বা মেয়ে না হলে তার/তাদের উত্তরাধিকার পাবার বিধান নাই। অর্থাৎ হিজড়া সন্তান উত্তরাধিকার পাবে না। কিন্তু একই সাথে হিজড়া সন্তানকে অছিয়্যতের মাধ্যেমে সম্পত্তি দিতে পারবে না – এমন কোন নিষেধাজ্ঞা নাই।

এদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র নাগরিক বলতে আনুষ্ঠানিকভাবে নর-নারী এই দুই লিঙ্গকেই স্বীকার করে। হিজড়া বলে কোন নাগরিক গোষ্ঠী এই রাষ্ট্র স্বীকার করে না। যাঁরা সমানাধিকার চান তাঁরা নারীর সমানাধিকার চাচ্ছেন—পুরুষের তুলনায়, হিজড়াগণের সমানাধিকার চাচ্ছেন না। অথচ উত্তরাধিকার দূরে কথা, বাংলাদেশে রাষ্ট্র বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ বা চাকরিদাতা) হিজড়া হিসেবে নিবন্ধিত হবারই কোন সুযোগ নাই। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক হবার জন্য মানুষের গর্ভ থেকে বাংলাদেশের মাটিতে নিপতিত হওয়াই পর্যাপ্ত, আসলে মানব জন্মই পর্যাপ্ত, সে জন্ম যে উপায়েই হোক না কেন। নর বা নারী হওয়া বাংলাদেশের নাগরিক হবার শর্ত নয়। এবং এই রাষ্ট্রের কাছে সকল নাগরিকের মান সমান–নর, নারী বা হিজড়া। ফলে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার মোতাবেক মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি (অছিয়্যতসমূহ পূরণের পরে) তাঁর সন্তানদের মাঝে সমান ভাগ করে দিতে হয়। মৃত ব্যক্তির পিতা, মাতা, স্বামী বা স্ত্রী সম্পত্তির অংশ পেতে পারে। সম্ভবতঃ যৌক্তিক বাটোয়ারা হবে—‘ব্যক্তির জীবিতকালে সন্তান ছাড়া আর যারা ঐ ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল বা গৃহস্থালির নিয়মিত সদস্য ছিল তাদেরকে একটি অংশ দিয়ে বাকিটা সন্তানদের মাঝে সমান ভাগ করে দেওয়া। এক্ষেত্রে ব্যক্তির জীবিতকালে তাঁর নিয়মিত চাকর-বাকরগণকে উত্তরাধিকারী হিসাবে গণ্য করাই ন্যায্য। বাকি অংশ লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল সন্তানদের মাঝে সমান বাটোয়ারা করা।

ইসলামে ভ্রমণের সময় নামাজের ‘কসর’-করার বিধান আছে, পানি না থাকলে তায়াম্মুম’ করে অজু করার বিধান আছে। এগুলো প্রমাণ করে ইসলামি বিধানসমূহ কঠোরভাবে অনমনীয় নয়; পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ইসলামে বিকল্প বিধানের নজির বা রেওয়াজ আছে। পৃথিবীর উত্তর বা দক্ষিণ মেরুতে ছয়মাস দিন, ছয়মাস রাত। সেখানকার কোন মুসলমান নামাজ বা রোজা পালন করতে চাইলে এই মেরু অঞ্চলে ধর্ম পালনের জন্য নিশ্চয়ই কোন বিকল্প বিধান থাকবে। কেননা, মেরু অঞ্চলে গমনে কোন নিষেধাজ্ঞা ইসলামে নাই। কী বিধান হবে তা নির্ধারণ করবেন ইসলামী চিন্তাবিদগণ, অন্য কেউ নয়। মেরু অঞ্চলে যাওয়া কোন ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান মনে করলে তিনি জেনে নেবেন তিনি কিভাবে সেখানে ধর্ম পালন করবেন। তিনি নিজেই কোরান-হাদিস বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা পেয়ে যেতে পারেন। এটি নির্ধারণের দায়িত্ব নাই কোন রাষ্ট্রের বা কোন এনজিওর বা জাতিসংঘের বা দাতা গোষ্ঠীর। ইসলামী চিন্তাবিদগণ মতামত দেবেন আর ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি গ্রহণ করবেন কিনা। ব্যক্তির সম্পত্তি বা অন্য কোন ধর্মীয় সীমানায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কোন অধিকার নাই।

বাংলাদেশে চলমান উত্তরাধিকার আলোচনায় অংশগ্রহণকারী পক্ষসমূহ উত্থাপিত ইস্যুগুলি আমলে নিচ্ছে না। সমানাধিকার চাওয়া গোষ্ঠীগুলি ব্যক্তির ইচ্ছা বা ধর্মবিশ্বাসকে খর্ব করতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ চাইছে। এই গোষ্ঠী ক্ষুদ্র, তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মবিশ্বাস আমলে না নেবার কারণে অগণতান্ত্রিক। ঘোষিত ‘নারী নীতি’র প্রাথমিক অঙ্গীকারসমূহ এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠির বক্তব্যের মতোই, কিন্তু বাস্তবে সেটি নারীর জন্য কোন নতুন সম্ভাবনা প্রস্তাব করে না, আর হিজড়াদের প্রসঙ্গে কিছুই বলে না।

জাতীয় নারী নীতি ২০১১-এর ৪.১ ধারাজাতীয় নারী নীতি ২০১১-এর ৪.১ ধারা

‘নারী নীতি’র ‘৪.১ নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ’ ধারায় জাতিসংঘের ‘সিডও’, ‘মিলেনিয়াম সামিট’সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমঝোতা দলিলে বাংলাদেশের স্বাক্ষর করা এবং সেই সূত্রে রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলির সর্বত্রই উত্তরাধিকারে ‘নারীর সমানাধিকার’ বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অথচ ‘নারী নীতি’ আইনের কোথাও তেমন কিছু বলা হয়নি। প্রতারণামূলক এই অবস্থান-এর কারণেই মুসলিমদের মাঝে সরকার বিশ্বাস উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা বা অধিকার নিয়ে চিন্তা করে এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এই প্রতিক্রিয়া সম্ভবতঃ ‘নারী নীতি’র বক্তব্যের ভঙ্গির কারণে হয়েছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া হবার কারণে এই মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির দায় অল্পই। এটি আসলে প্রতিরোধ।

প্রস্তাবিত নারী নীতি ধর্মীয় বিধান মোতাবেক নারী যেই সম্পত্তি পায় সেটি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে, নতুন, বিকল্প কোন বিধান দেয়নি। জাতিসংঘ এবং দাতাগোষ্ঠীর কাছে এটি গ্রহণযোগ্য হলে নতুন কিছু ‘প্রজেক্ট’ তৈরি হবে মাত্র: ‘সচেতনতা বৃদ্ধি’, ‘জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং’, ‘নারীর লিগাল এইড’ ইত্যাদি। ফলে নারীর সমানাধিকার চাওয়া গোষ্ঠী ও এনজিওগুলির নতুন ‘প্রজেক্ট প্রপোজাল’ জাতিসংঘ আর দাতাগোষ্ঠীর কাছে উত্থাপনের সুযোগ তৈরি ছাড়া আর কিছুই করার প্রস্তাব দেয় না এই নারী নীতি। বিপুল মুসলিম গোষ্ঠীর অবিশ্বাস উৎপাদনের বিনিময়ে এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মনস্তত্ত্বিক ও আর্থিক তুষ্টিবিধান সরকারের কোন গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। আর সেটি সরকারের দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে না।

সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো–তার অবস্থান পরিষ্কার করা। সরকারের অবস্থান পরিষ্কার রেখেই মুসলিম, হিন্দু, নর, নারী, জাতিসংঘসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেশার গ্রুপ—সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য উত্তরাধিকারের বিধান করা সম্ভব। অনুমোদিত নীতিমালার প্রণেতাগণ যদি দেশের নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধ হন তবেই সেটি সম্ভব। একটি সম্ভাব্য গ্রহণযোগ্য প্রস্তাবনা তুলে ধরা যেতে পারে:
ব্যক্তি মৃত্যুর আগে বলে যাবার অধিকার রাখেন, তাঁর অবর্তমানে তাঁর সম্পত্তি কিভাবে বাটোয়ারা করা হবে: সেটি ইসলামী আইনে হতে পারে, হিন্দু আইনে হতে পারে বা অন্য যেকোন ধর্মীয় বা জাতিসত্তার রীতি মোতাবেক হতে পারে। ব্যক্তির মৃত্যুপূর্ব কোন নির্দেশনা না থাকলেই কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রসঙ্গ আসতে পারে। মুসলমান বা হিন্দু হতে ব্যক্তিকে রাষ্ট্র যেমন বাধা দিতে পারে না তেমনি যেই ব্যক্তি নিজের সম্পত্তির বিষয়ে কোন ধর্মীয় সমাধানের কথা বলে মারা যাননি, তাঁর সম্পত্তি জোর করে কোন ধর্মের বিধান মোতাবেক বাটোয়ারা করতে পারে না। ধর্ম ব্যক্তির ইচ্ছা বা পছন্দ, জোরারোপের কোন বিষয় নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অঙ্গীকার আছে—ব্যক্তিকে ধর্ম পালন করতে দেবার, একই সাথে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে ব্যক্তিকে সমান হিসাবে দেখার। ফলে ব্যক্তিকে তাঁর বিশ্বাস বা ইচ্ছা মোতাবেক সম্পত্তি বন্টন করতে দিতে হবে, আবার, পরিত্যক্ত সম্পত্তি লিঙ্গ নির্বিশেষে বন্টন করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ডিফল্ট আইন হবে ব্যক্তির সন্তানদের লিঙ্গ নির্বিশেষে বিচার করার আইন; কিন্তু একই সাথে ব্যক্তির মৃত্যুপূর্ব ইচ্ছা মোতাবেক ধর্ম বা অন্য কোন ব্যবস্থায় তাঁর সম্পত্তি বন্টনের ব্যবস্থা থাকবে। রাষ্ট্রের ডিফল্ট আইনের বাইরের কোন ব্যবস্থায় সম্পত্তি বন্টনের বিষয়টি ব্যক্তির ‘অছিয়্যত’ হিসাবে গণ্য করা হবে।

নীতিমালার ওয়েব লিংক:

১. http://www.mowca.gov.bd/National_Women_Policy_2011.pdf
২. http://www.mspvaw.org.bd/newsfiles/National_Women_Policy_2011.pdf