রক মনু

‘দেশী বিপ্লবী’ বলতেই মনে তাহেরের মুখ ভাসলে বিপ্লবের সম্ভাবনা কমে

১.

তাহের জবানবন্দীতে বলছেন জিয়া তারে ফোন দিছিলেন, বাঁচাবার জন্য। এই বাঁচানো প্রাণে বাঁচানোও হইতে পারে। জিয়া তেমন কিছু ভাবলে ভুল ভাবছেন। জিয়া নিতান্ত বন্দী ছিলেন। হত্যা করলে ৩ নভেম্বরই করার কথা। কিন্তু ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ছিলো হত্যাবর্জিত। খালেদ মোশাররফ খুন করেন নাই। সম্ভবতঃ সেই কারণে তাঁর অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়।

-------------------------

খালেদ মোশাররফ খুন না করার আন্তর্জাতিক অর্থ আছে। খুন না করা গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। ১৫আগস্ট খুনের বিপরীতে এই খুনবিহীন অভ্যুত্থান। এতে করে ভারত আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন প্রকাশ্য হবার সুযোগ ছিলো। পাকিস্তান আর যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তো। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ায় এরা আর স্বীকার করে নাই। খালেদ মুজিবপন্থিদের ক্ষমতায় আনবে সন্দেহ হওয়ায় জেলখানায় আওয়ামী লীগ নেতাদের খুন করা হয়। এই প্রেসক্রিপসন সিআইএ’র হবার সম্ভাবনা আছে।
জিয়া তাহেরকে ফোন করুক বা না করুক, তাহের অ্যাকটিভ হন। তাহের আখেরে সিআইএ’র এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। শুরুতে জিয়া ভাবছিলেন তাকে মুক্ত করছেন তাহের। কিন্তু জিয়া মুক্ত হন নাই। খালেদের বন্দীকে তাহের নিজের এখতিয়ারে নেন মাত্র। তাহেরের জবানবন্দীতে তাহের নিজেই এগুলি বলছেন। তাহের জিয়ারে যা যা করতে বলেন তা জিয়ার এজেন্ডা ছিলো না কোন কালেই। জিয়া তাহের বা জাসদের সাথে পলিটিক্যালি ইনভলভড আছিলেন না। ফলে জাসদের/তাহেরের ইশতেহার মুক্ত জিয়া কেন বাস্তবায়ন করবে? জিয়া যতক্ষণ জাসদের বা তাহেরের দাবি মানছেন ততক্ষণ তিনি বন্দী।প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাহের বা জাসদ সেনাবাহিনীর কেউ না। সেনাবাহিনীতে তাহের উটকো। সেনাপ্রধান এদের কথা মানবেন কেন! মানছেন, কেননা তিনি বন্দী। বন্দীর সাথে কোন বিশ্বাসের সম্পর্ক নাই। ফলে বিশ্বাসঘাতকতাও নাই। বন্দীর সাথে চুক্তি হয় না, চুক্তি মুক্তের প্রতিষ্ঠান, পরাধীন ব্যক্তির চুক্তি করার যোগ্যতা নাই।

জিয়ার রাজি হওয়া পুলিশ রিম্যান্ডে জজ মিয়ার গ্রেনেড মারার কথা স্বীকার করার মতো। খালেদের চাইতে তাহেরের বন্দিত্ব বেশি বিপদের। কেননা তাহের খুনী। ৭/৮ নভেম্বর খালেদসহ বহু খুন হইছে তাহের/জাসদ বাহিনীর হাতে। বন্দী প্রথম সুযোগেই মুক্ত হবেন–এমনই হবার কথা। সেভাবেই জিয়া মুক্ত হইছেন।

কিন্তু এই খুনরে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা বলা যায় না কেবল। রব, ইনু বহাল তবিয়্যতে বেঁচে আছেন। এদেরকে জিয়া খুন করেন নাই। আদতে ক্যান্টনমেন্টে তাহের একটা ফেনোমেনন ছিলো, রব, ইনু’র ক্যান্টনমেন্টে কিচু ঘটাবার ক্ষমতা আছিলো না। তাহের খুন সম্ভবতঃ জেলহত্যা’র প্রেসক্রিপসনের ফলো থ্রু। তাহের যা করছেন তাতে বেসামরিক আদালতেও তাঁর ফাঁসি হবার সম্ভবনা ছিলো। কিন্তু তাতে সময় বেশি লাগবে। তাহেরকে ততদিন বাঁচাইয়া রাখা জিয়ার জন্য, ক্যান্টনমেন্টের শৃংখলার জন্য বিপদজনক। জিয়া বা প্রেসক্রিপসন দেনেওয়ালারা সেইটা ভালোই বুঝবার কথা। তাহেরকে তাই খুন করেন জিয়া।

২.

বলছিলাম, জাসদ আর তাহেরের অ্যাক্ট আখেরে যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু এনাদের বিপ্লবী কিছু আকাংখা আছিলো। তাহের ইতিহাসের ঘোর বেকুব হবার কারণে তিনি খুনী’র বেশি কিছু হইতে পারলেন না।

খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান করলেন। সেনাপ্রধান বন্দী। কিন্তু সরকার বহাল। সরকারের সাথে খালেদের টানাপোড়েন চলতেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচে নাজুক দশায় আছে সেনাবাহিনী, সরকার। সেনাবাহিনীতে তাহেরের অনুসারী আছেন ব্যাপক। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে পলাতক। জাসদ একমাত্র সক্রিয় রাজনৈতিক দল, বা আরো কিছু বাম। বিপ্লবী সরকারের বৈদেশিক মিত্র (সো.ই.) সহজে পাওয়া যাইবে বইলা অনুমান করা যায়। তাহের আর জাসদ গণবিপ্লবের বাইরে খাটো রাস্তায় বিপ্লব করতে চাইতেছেন, এনজিও’র উন্নয়ন এজেন্ডার মতো কইরা। মাথায় দুধ ঢালতে থাকলে পায়ের দিকে যাইতে থাকবে সেই দুধ। আলুর বস্তা কৃষক জনগণ, শ্রেণীচৈতন্য নাই। এদের মগজ ধোলাই করবে সফল বিপ্লব। বিপ্লবী রাষ্ট্রের দরকারি নাগরিক গইড়া নেওয়া যাবে পরে। শর্টকাট বিপ্লবের রূপরেখাটা এই রকম।

ওকে, বিপ্লব হউক। তাহের-জাসদ বিপ্লব করতে নামলেন ৭ নভেম্বর ১৯৭৫। বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দুর্বলতম দশায় আছে; কেননা কোন বৈধ সেনাপ্রধান নাই, বুর্জোয়া সেনাবাহিনী আর সরকার মুখোমুখী প্রায়। বুর্জোয়া সরকার যেই সেনাপ্রধান নিয়া আরামে ক্ষমতায় ছিলো, বুর্জোয়া বিধান মোতাবেক বৈধ সেই সেনাপ্রধানকে ফিরাইয়া আনলো বেকুব বিপ্লবীরা, যেই সেনাপ্রধান বন্দী আছিল অভ্যুত্থানকারী বুর্জোয়া মেজরের হাতে। বেঁচে থাকা বেকুব বিপ্লবীরা বলেন, সেনাপ্রধানকে ফিরাইয়া আনা হইছে নাকি বিপ্লব সফল করার উদ্দেশ্যে! হা হা। ইনি সেই সেনাপ্রধান যার কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপ্লবী রাজনীতির প্রচার গোপনে করতে হইতো। ধরা পড়লে বাঁচবার আশা কম। ইনি সেই সেনাপ্রধান, যিনি শেখ মুজিবের বিশ্বস্ত আছিলেন, তাঁর খুনীদের কাছে আরো বিশ্বস্ত এখন। হা হা।

তাহের তাঁর জবানবন্দীতে বলতেছেন, মেজর খালেদ মোশাররফকে যখন জেনারেলের ব্যাজ পরাইয়া দেন বিমানবাহিনীপ্রধান–সেই দৃশ্য জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। তাহেরমর্মীরা বলেন, এই তাহের নাকি সেনাবাহিনীর বিদ্যমান বুর্জোয়া স্তরগুলারে ভাঙবেন! মেজর থেকে জেনারেল-এর মধ্যের বুর্জোয়া ধাপে যার এত শ্রদ্ধা, সেই তাহের! তাহেরের বেকুব শ্রদ্ধা জিয়ার পায়ে নিবেদিত হইলো; জাতির জন্য সৌভাগ্যের দৃশ্য তৈরি করলেন তাহের।

তাহের সেনাপ্রধানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন বলে ভাবলেন সম্ভবতঃ। বন্দী সেনাপ্রধানের প্রতিশ্রুতি নিলেন, বিপ্লবের পক্ষে। সিপাহীরা বৈধ সেনাপ্রধানের কর্তৃত্ব না মাইনা তাহেরকেই মানবে বলে আশা করতে থাকলেন তাহের। সেই সিপাহীদের উপর আস্থা রাখলেন যারা অশিক্ষিত, মূলতঃ কৃষক পরিবার থেকে আসা। অথচ এই অশিক্ষিত কৃষকদের প্রতি তাহের আর জাসদের রাজনৈতিক আস্থা নাই/ছিলোও না কোন দিন। যেই কৃষককে জাসদ মনে করে আধা বা পুরা সামন্ততান্ত্রিক মনের, বুর্জোয়া ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যপ্রবণ। অশিক্ষিত, শ্রেণীচৈতন্য নাই। এই হইলো তাহের আর জাসদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মার্ক্সবাদ আর বিপ্লব বিষয়ে বোঝাপড়া।

ইতিহাসের এই অতুলনীয় বেকুবির জন্য জিয়া মুক্ত হইয়া সেনাবাহিনী’র বুর্জোয়া স্তরগুলি আবার পোক্ত কইরা তোলেন। চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। বুর্জোয়া রাষ্ট্র ক্ষমতার বিভাজিত দশা কাটাইয়া কেন্দ্রীভুত হইয়া ওঠে। বিপ্লবের সম্ভাবনা নাই হইয়া যায়।

বিপ্লবী প্লানে জিয়ারে রাখা তাহেরের প্রথম বেকুবি। কিন্তু এই বেকুবির সাথে আরো কিছু বিষয় অবশ্যই যুক্ত। জিয়ারে রাখা বিপ্লবের সম্ভাবনা কমায়–এইটা প্রাথমিক চিন্তা, এইটুক তাহেরের করতে পারবার কথা, যদি তাহেরের আদৌ কোন বিপ্লবী উদ্দেশ্য থাকে। জিয়াকে সিআইএ অবশ্যই চিনতো, সেনাপ্রধান হিসাবে জিয়ারে ফিরাইয়া আনা কোন বিপ্লবী পদক্ষেপ হইতে পারে না। এইটা জাসদের মধ্যে থাকা সিআইএ’র এজেন্ট ইনসিস্ট করছিলো বইলা আমার অনুমান। এইটা সরল গণিত যে, জিয়া সেনাপ্রধান হইলে বিপ্লব ব্যর্থ হইবে। তাহেরের দ্বিতীয় বেকুবি–জাসদের মধ্যের সিআইএ এজেন্ট চিনতে না পারা, এমনকি এজেন্টের পরামর্শ মোতাবেক চলা। অথবা তাহের নিজেই সেই এজেন্ট আছিলো।

পরিশিষ্ট:

ফারুক ওয়াসিফ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিছিলেন (http://www.facebook.com/faruk.wasif/posts/10150318005921079): বিপ্লবী আবু তাহের হত্যার সামরিক বিচার খণ্ডন আমি সমর্থন করি। কিন্তু একইসঙ্গে সতর্ক এই রায় ব্যবহার করে রাজনৈতিক কেরামতি বিষয়েও। জরুরি অবস্থার সময় কেরামতির নায়ক টুল ছিল দুদক, এখন কি উচ্চ আদালতের ভূমিকা তেমনই?

আমি মন্তব্য করি: তাহেরকে বিপ্লবী বললে বিপ্লবের সম্ভাবনা কমে। জিয়ারে মুক্ত কইরা তো তিনি প্রাতিষ্ঠানিক স্তরায়নকে আরো পোক্তই করলেন, ভাঙার পরিবর্তে; এইটার মধ্যে বিপ্লবের কি আছে! এই রকম ভুল লোককে ‘আদর্শ’ বানাইলে রাজনৈতিক বিলুপ্তি ঘটবে (অলরেডি কি ঘটে নাই?)। বিপ্লবাকাঙ্খীরা তাহেরের কাছে কেবল শিখতে পারে যে–কী কী করলে বিপ্লব করা যায় না।

তিনি জবাব দেন: Rejaul karim> তাহের সেই বিপ্লবের বিপ্লবী, জিয়া যার প্রতিকোণে দাঁড়িয়ে প্রতিবিপ্লব করেছিলেন। তাহেরকে নিরাকরণ না করে জিয়ার ’স্ট্যাটাস ক্যু’ বজায় রাখার ক্রিয়াকরণ সফল হতে পারতো না। জিয়াকে মুক্ত করার উদ্দেশ্য ছিল তাকে বাধ্য করে সেনাবাহিনীর বিষম স্তরায়ন ভাঙ্গা। জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতার দায় তাহেরকে দেওয়া যায় তার অপরিণামদর্শিতায়, বিপ্লবী-আকাংখা-রহিত করার মাধ্যমে নয়। জিয়ার সাপেে তাহলে তাহের কী? বলশেভিক, মাওবাদী, ক্যাস্ত্রো-শ্যাভেজপন্থী; কোন বিপ্লবী ‘আদর্শের’ চিন্তা নিরিখে তাহেরকে ‘ভুল’ লোক? তাহের বিপ্লবী না হলে শ্যাভেজকেও একজন মতালিপ্সু কর্নেল ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। আর যে ‘বিপ্লবী রাজনীতি’ ভবিষ্যতে ‘নাই’ হয়ে যাবে, তার জন্য তাহেরকে দায়ি করা যায় কি? তাতে কি অন্য দায়ীদের দায়মুক্তি ঘটে না? তাহের এবং সিরাজ শিকদার সেকালে বিপ্লবের প্রধান অভিমুখ হিসেবে বলপ্রয়োগের পথে রাষ্ট্রমতা দখলের প্রশ্নটিকে সামনে এনেছিলেন, অন্য অনেক কিছুর পাশে সেটা তাদের কর্মকাণ্ডের প্রধান বিপ্লবী লণ। তাহের সেই বিপ্লবের শেষ বিপ্লবী প্রতিনিধি যা একাত্তরে শুরু হয়েছিল। তাহের ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বের সেই বাম জাতীয়তাবাদী ধারা যারা আমৃত্যু স্বাধীনতা যুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আপসকামিতা ও বেইমানির বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন। একাত্তরে তাঁদের ভূমিকা ভারতপন্থী বেহাত বিপ্লবের নায়কদের বিপরীতেই ছিল। তাঁর সিপাহি-জনতার মৈত্রীর ধ্বনি এখনো কম প্রাসঙ্গিক নয়। জাসদ রাজনীতির কাঠামোয় তাকে বোঝা যাবে না। ইতিহাসের ওই জটিল সন্ধিণে বিপ্লব আর প্রতিবিপ্লব দুটোই অস্পষ্ট ও অপরিণত ছিল।

তাই খতিয়ে না দেখলে বিপ্লবীকে খল আর খলকে বিপ্লবী মনে হতে পারে এবং সেটাই হয়েছে। তাহেরদের পথ ও কৌশল ’অকার্যকর’ প্রমাণিত হতে পারে, কিন্তু সেটা ব্যক্তির একার ব্যর্থতা নয়, সেই পরিস্থিতিরই ব্যর্থতা। তাঁরা বাংলাদেশের বিপ্লবী সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ট্র্যাজিক নায়ক। এ বিষয়টি স্বীকার না করা উন্নাসিকতা হবে, হবে হঠকারি। তাহেরসহ অজস্র তরুণ বিপ্লবী কর্মী এবং সেনার হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একাত্তরের গর্ভে জন্ম নেওয়া বিপ্লবী ধারা তার অন্তিমে পৌঁছেছিল আর শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতার দ্বিতীয় পর্ব।

তাঁকে ‘বিপ্লবী’ বলার উদ্দেশ্য তাঁর ভূমিকাতে অতীতে ও বর্তমানে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে বিপ্লবী স্পিরিটকে জায়মান রাখা।

———————————-

এই উপলক্ষে এইটা লেখা গেলো।–মনু  

  • Moon

    valoita