রক মনু

ইন্ডিয়া আর মায়ানমার: কী করতে পারে বাংলাদেশ?

বিএসএফ যেইভাবে বাংলাদেশি খুন করে, বিবিজিও (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) কি সেইভাবে রোহিঙ্গাদের মারে? মারতে পারে, রোহিঙ্গাদের নিয়া এই বিষয়ক নিউজ বাংলাদেশের মিডিয়ায় খুব হয় না। বেশিরভাগ নিউজ ফেরত পাঠানো নিয়া; আবার ঘটনা না ঘটলে নিউজ হবে কেমনে? কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া পরিষ্কারভাবেই রোহিঙ্গাদের নেগেটিভভাবে আনে; জনসংখ্যা সমস্যা নিয়া মিডিয়া যেমনে চিন্তিত, তাতে এইরকম বেআইনী অনুপ্রবেশকারী, চাকরির প্রতিযোগী রোহিঙ্গাদের দুই-একজন মারলে বিবিজি’র উপর মিডিয়া খুশিও হইতে পারে, এমনকি সেইটা দেশপ্রেম হিসাবেও দেখা হইতে পারে–কিছুই কওয়া যায় না। একদম না মারলে বিবিজিকে পুলিশ/র‍্যাবের চাইতে ভালো বলতেই হবে; ওনারা চোরাকারবারীর বা আদম দালালের সাথে লাভ ভাগাভাগি করুক, কিন্তু খুন না করুক।

কিন্তু রোহিঙ্গা একটা সমস্যা বটে বাংলাদেশের; যেমনি বিএসএফ-এর হত্যাকর্ম–এ ব্যাপারে সরকারকে বেশ বিমূঢ় লাগে। এমন তো হইতে পারে না যে, ফেলানীরে সীমান্তের কাটাতাঁরে মাইরা ঝুলাইয়া রাখলো বিএসএফ, আর সেটা দেইখা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আনন্দিত হইলেন, বা শেখ হাসিনা মনমোহনরে ফোন কইরা ধন্যবাদ জানাইলেন…

-------------------------

কিন্তু একইসাথে ওনারা যে অখুশি সেইটাও তো জানান না বিশেষ, অখুশিমূলক একটা কথা কন না মিডিয়ায়! ওনারা কী ভয় পান? ইন্ডিয়ারে চটাইলে পাওয়ারে আসা বা থাকা যায় না–তাইলে এইটাই কি সত্য?

ইন্ডিয়ারে সাইজ করতে বাংলাদেশ কী কী করতে পারে?

 বাংলাদেশ কয়েকটা কাজ করতে পারে, নদী ও সীমান্তহত্যা দুই ব্যাপারেই:

১. জাতিসংঘে নালিশ করতে পারে;

২. আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করতে পারে;

এই দুইটা সংঘাতমূলক কাজ। এই দুইটার যেকোন একটা করলে ইন্ডিয়া খেইপা যাবে; বাংলাদেশ সম্ভবতঃ ভাবে ইন্ডিয়ারে খেপানো ঠিক হবে না, এইটা ঝুঁকিপূর্ণ। আর দলীয়/ক্ষমতাগত নিরাপত্তার দিকটা তো আছেই। এদিকে বাংলাদেশের নাগরিকদের কেউ কেউ অরাষ্ট্রীয়ভাবে ইন্ডিয়ার পণ্যবর্জনের কথা বলছেন। পণ্যবর্জনের রাষ্ট্রীয় রূপ হইতে পারে–ইন্ডিয়ার পণ্যে ট্যাক্স কয়েকগুণ কইরা দেওয়া। তাতে অবস্থা আরো খারাপ হবে। পিয়াজ, ডাল বা রসুন আর খাইতে হবে না; চালেরও দশা খারাপ হবে। গরুর মাংস খাওয়া যাবে না, কোরবানী প্রায় বন্ধ হইয়া যাইতে পারে। রাজস্থান থেকে উটও আসবে না; আমার আর উটের মাংস খাওয়া হবে না।

যুক্তরাষ্ট্ররেও মুরুব্বি ধরতে পারে বাংলাদেশ; এইটা পুরাই বেকুবি হবে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইন্ডিয়ার লগে প্রেম করতেছে। এইগুলার কোন একটা করার ভিন্ন একটা তাৎপর্য আছে। এইগুলা সবই পলিটিক্যাল উইজডমের অভাবের পরের ঘটনা। পলিটিক্যাল উইজডমের অভাব সরকারে দেখতেছি, সরকারের পরামর্শকদের মধ্যে বা বিরোধী দলের মধ্যেও। এই লেখা পলিটিশিয়ান বা পলিটিক্স আগ্রহীদের কিছু উইজডম দেবার জন্য লিখতেছি!

দুইটা চুক্তির তুলনা করি। চীন-মায়ানমার আন্তঃদেশীয় ট্রেন যোগাযোগ এবং বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ট্রানজিট চুক্তি। এই তুলনায় বাংলাদেশের সরকারের অযোগ্যতা খোলাসা হবে। ইন্ডিয়া তার দুই অংশের সাথে যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করবে, কিন্তু রাস্তা তৈরি কইরা দেবে বাংলাদেশ। আর মায়ানমার-চীন ট্রেন যোগাযোগ স্থাপন করবে–মায়ানমারের ভিতর দিয়া ৮০০ কিলোমিটার রেলরোড হবে, পুরা টাকাই দেবে চীন। এইটা বহাল আছে; যদিও মায়ানমারে ৩.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ কইরা বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য চীন যেই ড্যাম তৈরি করছিলো–সেইটা বন্ধ কইরা দিছে মায়ানমার সরকার, চীনের সাথে কোন আলোচনা ছাড়াই! মায়ানমার সরকার বলছে–দেশের জনগণ চায় না! মনে রাখা দরকার যে, মায়ানমারে সামরিক শাসন। দেখা যাইতেছে, মায়ানমারের সামরিক সরকার বাংলাদেশের পলিটিশিয়ানদের চাইতে পররাষ্ট্রনীতিতে দক্ষ এবং জনগণের কথা বেশি শোনে!

ওদিকে মায়ানমারও বাংলাদেশের একটা সমস্যা। রোহিঙ্গা, বঙ্গোপসাগরের সীমানা, নতুন দ্বীপ ইত্যাদি নিয়া সমস্যা আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সমস্যা দুইটা–ইন্ডিয়া আর মায়ানমার। পলিটিক্যালি চীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশও চীনের জন্য। চীনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার; চীন ভারত মহাসাগরে (বঙ্গোপসাগর দিয়া) নামতে চায়। এইটা ইন্ডিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ হবে না। মায়ানমারের ভিতর দিয়া রেলরোড ধইরা চীন বঙ্গোপসাগরে নামতে পারতেছে, এই চুক্তি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ঠেকাইতে পারে নাই।

এইখানে বাংলাদেশের রোল প্লে করার একটা জটিল এবং বিরাট স্পেস আছে। চীন থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত রেল লাইন খুব দীর্ঘ হয় না: কোলকাতা থেকে হায়দ্রাবাদের দূরত্বের চাইতেও কম! বাংলাদেশ চীনের সাথে আলাপ করতে পারে। বড়জোর আর একশো কিলোমিটার রেলরোড যুক্ত করলেই চট্টগ্রাম দিয়া এইটা বাংলাদেশের উপর দিয়া বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত আসবে। তাতে বাংলাদেশের ২৫/৩০ কিলোমিটার রাস্তা ব্যবহৃত হবে। বহু কারণেই চীন এতে আগ্রহী হবে:

১. ভারতের মিত্র ভাগাইয়া নেওয়া হিসাবে এইটারে দেখবে চীন।

২. বঙ্গোপসাগরে নামার আরেকটা মুখ পাবে চীন, ভারত থ্রেটেন্ড হবে এতে।

৩. যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থহানি ঘটবে।

৪. বাংলাদেশের হিউজ ইলেকট্রনিক্স/মেশিনারিজ মার্কেটে চীনের ব্যবসা দ্রুততম এবং একক হইয়া উঠবে।

অতি অল্প খরচে চীন এমন বিশাল স্বার্থ হাসিল করতে পারবে যে চীন নিজেই মায়ানমারকে রাজি করাবে এবং মায়ানমারের সাথে বাংলাদেশের মিটমাট করাইয়া দেবে। এতে রোহিঙ্গা সমস্যারও সমাধান হবে।

বাংলাদেশের লাভ ইন ফ্যাক্ট হিউজ। চাল, গম, ডাল, পিয়াজ, গরু–ইত্যাদি অল্প খরচে চীন থেকে পাওয়া যাবে; চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে সারাদেশে পৌঁছানো যাবে। ইলেকট্রনিক্স ও মেশিনারিজের দাম আরো কমবে। এমনকি রড/সিমেন্টের দামও কমে যাবে। চীনের ইউনান প্রদেশে জমি লীজ নিয়া ফার্মিং করা যায়; বা বসুন্ধরা একটা হাউজিং কইরা ইউনানের কোন নদীতে বালু ফেলা শুরু করলো!

সবচে বড় লাভ হইলো–ইন্ডিয়া পুরাই সাইজ হইয়া যাবে; ইন্ডিয়া বাংলাদেশরে তেল মারা শুরু করবে যাতে চীনরে এইটা বাংলাদেশ না দেয়। ওদিকে বিএসএফ একজন বাংলাদেশি খুন করলে চীন নিজে নিজেই নিন্দা জানাবে। ইন ফ্যাক্ট খুন বন্ধ হইয়া যাবে; বাংলাদেশি খুন করার জন্য ইন্ডিয়া এখন বাংলাদেশ সীমান্তে অবাঙালি বিএসএফ রাখে; এইটা নিশ্চয়ই ইন্ডিয়ার বাঙালিদের উপর ভরসা করতে না পারা–বাংলাদেশি খুন করতে যদি  ইন্ডিয়ার বাঙালিদের হাত কাঁপে! এই বৈরিতা প্রদর্শন করবে না আর; ইন্ডিয়া বাঙালি বিএসএফ মোতায়েন করবে বাংলাদেশ সীমান্তে।

আমি পরিষ্কার জানি– শেখ হাসিনা যদি বলে যে, মায়ানমারের উপর দিয়া চীনের সাথে ট্রেন যোগাযোগ বিষয়ে মায়ানমার-চীনের সাথে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় আগ্রহী বাংলাদেশ, সাথে সাথে ইন্ডিয়ার অ্যাটিচ্যুড পাল্টাইয়া যাবে।

একটা নাগরিক ডাক-হাক তোলা যাইতে পারে এই ব্যাপারে: বিএনপি যদি এইটা করতে রাজি হয়, নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার করে, তাইলে আগামী নির্বাচনে বিএনপিরে ভোট দিবো। এই হাক যত লোক দিবেন, শেখ হাসিনার পলিটিক্যাল উইজডম বৃদ্ধি ও ব্যবহারের সম্ভাবনা তত বাড়বে।