রক মনু

বাংলা ভাষা: হাইকোর্টের কাছে আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে

[ফেসবুক নোটের আলোচনা]

হাইকোর্ট ১৬ ফেব্রুয়ারি জানাইছেন,

“আমরা আদেশ জারি করছি যে, বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করতে সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে। এই ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাতে না আসে সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে।”

হাইকোর্টের কাছে আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে:

-------------------------

১. আইনের বাইরে আদালতের কোন ‘জ্ঞান’ থাকা কি আইনানুগ?

২. বিচারকদের ব্যক্তিগত জ্ঞান আদালতের জ্ঞান হিসাবে প্রদর্শন করতে পারেন কি বিচারকগণ?

৩. আদালত ‘স্বয়ম্ভূ সত্তা’ নাকি আইনের অধীন ও আইনের বলে তৈরি একটা প্রতিষ্ঠান?

৪. আইনের সম্ভাব্য তৎপরতা বিষয়ে আইনে কি পরিষ্কার বিধি নাই?

৫. আইনের কর্ম আইনের মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিত হইলে আইনের কর্ম কী দাঁড়ায়—আইন/আদালতের দায়িত্ব নাগরিকদের আক্রমণ করা নাকি নাগরিকদের ডিফেন্স সিস্টেম হিসাবে কাজ করা?

প্রশ্নগুলি বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ পর্যালোচনা করে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ হাজির করা যায়, অন্তত আমি করছি।

১. শুরুতে উদ্ধৃত হাইকোর্টের আদেশ বাক্য দুটিতে বাংলাদেশের আইনে নির্ধারিত জ্ঞানসমষ্টির বাইরে জ্ঞান প্রদর্শন করছেন হাইকোর্ট। কোন আইন ভাষা হিসাবে ‘বাংলা’কে সংজ্ঞায়িত করে নাই; কিন্তু উদ্ধৃত বাক্যটি উৎপাদন করতে আদালতের ‘বাংলা’ ভাষার সংজ্ঞা জানা আবশ্যক।

‘বাংলা’ ভাষাকে ‘পবিত্র’ বলেও ঘোষণা করে নাই কোন আইন; ফলে ‘পবিত্রতা’ রক্ষার দায়-দায়িত্ব কাউকে দেবার প্রশ্নই আসে না।

ধর্ম ব্যতিরেকে ‘পবিত্রতা’র কোন ধারণা নাই। কোন ধর্মও ‘বাংলা’কে পবিত্র বলে ঘোষণা করে নাই। যদি করতো, তাতেও বাংলাদেশের আইন আদালতকে ধর্মাচরণ করতে বলে নাই। এ বাদে, সব ধর্মই ধর্মাচারের নির্দেশ দিছে ব্যক্তি মানুষকে, প্রতিষ্ঠানের কোন ধর্মাচার নাই। অধিকন্তু, সব ধর্মের মধ্যে কোন অভিন্ন ‘পবিত্রতা’র ধারণাও নাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে ‘ইসলাম’ ঘোষণা করলেও যাবতীয় বাধ্যকরণকে নিষিদ্ধ করেছে। সেই নিষিদ্ধকরণের বলেই কিছুদিন আগে আদালত জোর করে বোরখা পরানো যাবে না বলে আদেশ জারি করেছিলো।

অতএব দেখা যাইতেছে, আদালত ‘বাংলা’ ভাষা বিষয়ক আদেশে আইন নির্ধারিত জ্ঞানের বাইরে জ্ঞান প্রদর্শন করছে।

২. আইন নির্ধারিত জ্ঞানের বাইরে জ্ঞান দুইভাবে প্রদর্শন করতে পারে আদালত।

প্রথমতঃ বিচারকদের ব্যক্তিগত জ্ঞান। কোন আইনেই বিচারকদের ব্যক্তিগত জ্ঞান বা বিবেচনা দিয়া বিচার করতে বলা হয় নাই। ইন ফ্যাক্ট, বিচারকদের ব্যক্তিগত জ্ঞান বা বিবেচনারে বিচারের বেলায় স্পেস দিলে আইনের কোন দরকার থাকে না। এবং বিচার প্রক্রিয়ায় আপিলের ধারনাই তৈরি হইতে পারে না।

 

সংবিধানে প্রধান বিচারপতি বা সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের ‘শপথ (বা ঘোষণা)-পাঠ’ পরিচালনার জন্য ফরম নির্দিষ্ট করা আছে। এই ফরমের শেষ প্যারাটা নিচে:

“এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন-অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।”

হাইকোর্টের বিচারকদের কি এমন কোন অঙ্গীকারনামায় সই করতে হয় না? আমি জানি না। ওনারা ‘অনুরাগ বা বিরাগের’ মাধ্যমে বিচার করতে পারেন হয়তো বা ‘অনুরাগ বা বিরাগের’ থেকে দূরে একটা নিরপেক্ষ আইন-বহির্ভূত ব্যক্তিগত জ্ঞান থাকা সম্ভব। বিষয়টা হাইকোর্ট পরিষ্কার করতে পারবেন।

দ্বিতীয়তঃ আরেক রকম জ্ঞান আদালত প্রদর্শন করতে পারেন, যেটা আপাতভাবে আইন-বহির্ভূত মনে হতে পারে সাধারণের। এইটা হলো—আইনের ব্যাখ্যা। আমার পর্যবেক্ষণে কোন আইনের ব্যাখ্যায় ‘পবিত্রতা’র ধারণা পাওয়া যায় না। কেউ জানলে জানাইয়েন—কোথায় এবং সেইটা আসলে কী? আইনের ব্যাখ্যায় ‘বাংলা’ ভাষার একটা সংজ্ঞা পাওয়া যাইতে পারে বটে। সেক্ষেত্রে সেইটা হবে—‘সংবিধানে ব্যবহৃত বাংলা’।

লক্ষনীয় হইলো, হাইকোর্টের আদেশটাই সংবিধানে ব্যবহৃত বাংলায় দেওয়া হয় নাই। ‘সংবিধানে ব্যবহৃত বাংলা’ অনুযায়ী আদেশটি হবার কথা:

    “আমরা আদেশ জারি করিতেছি যে, বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করিতে সর্বোতভাবে চেষ্টা করিতে হইবে। এই ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাহাতে না আসে সেই বিষয়ে সচেষ্ট হইতে হইবে।”

তাইলে, খোদ হাইকোর্টের আদেশটি ‘বাংলা’ ভাষার উপর একটা ‘আঘাত’ নাকি ‘আঘাত’ থেকে রক্ষায় ‘সচেষ্ট’ হওয়া?

‘সংবিধানে ব্যবহৃত বাংলা’ নিয়ে আরো কিছু পর্যবেক্ষণ হাজির করা যাইতে পারে।

 

হাইকোর্ট আদেশে আরো বলছেন,

“যারা ভিউয়ার, লিসেনার বলে, তাদেরকে এই আদালতে এসে প্রমাণ করতে হবে- এই শব্দের যথাযথ বাংলা নেই।”

কিন্তু সংবিধানেই ‘সুপ্রীম কোর্ট’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হইছে। অর্থাৎ ‘সুপ্রীম কোর্ট’-এর ‘যাথাযথ’ বাংলা হিসাবে ‘সর্বোচ্চ আদালত’ ব্যবহার করা হয় নাই। ইংরাজি ব্যবহার করা হইছে। ‘সর্বোচ্চ আদালত’ শব্দবন্ধে ‘আদালত’ শব্দটা ফার্সি অরিজেনের, তাই কি এইটা যথাযথ বাংলা নয়? ‘হাইকোর্ট’ ব্যবহার করা হইছে, “উচ্চ আদালত” নয়। কিন্তু, অন্যক্ষেত্রে আবার ‘অধঃস্তন আদালত’ ব্যবহার করা হইছে। যেইখানে ‘বাংলা’ ভাষার কোন সংজ্ঞা নির্ধারিত নাই এবং সংবিধানে ব্যবহৃত বাংলাতেই ‘যথাযথ বাংলা প্রতিশব্দ’ ব্যবহার না করার নজির পাওয়া যাইতেছে, সেইখানে নাগরিকরা ‘যথাযথ বাংলা প্রতিশব্দ’ ব্যবহার না করলে কোন ক্রাইম সংগঠিত হইতে পারে না।

তারপরও, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম গং-কে হাইকোর্টে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে নাকি যে এগুলির (‘সুপ্রীম কোর্ট’, ‘হাইকোর্ট’) ‘যথাযথ বাংলা’ নাই? যদি তা না হয় তাইলে “যারা ভিউয়ার, লিসেনার বলে” তাদের কেন প্রমাণ করতে হবে? কোন আইনের বলে ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম গং এবং ‘ভিউয়ার, লিসেনার’ ব্যবহারকারীরা অসমান হইয়া উঠলেন? তাইলে আইনে ঘোষিত ‘সমতা’র অর্থ কী?

৩. হাইকোর্ট সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা করেন কিভাবে? ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান’ করা হইছে। ‘প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার’ অধিকার দেওয়া হয়েছে।

সংবিধান আদালতকে দায়িত্ব দিয়েছে সংবিধান রক্ষার, অর্থাৎ নাগরিকদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব আদালতের। ‘নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার’ অধিকার ভোগ করায় নাগরিকদের আদালতে জবাবদিহির জন্য যাইতে বাধ্য করা হইলে সেইটা কি কোনভাবে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা বলা যাইতে পারে? নাকি এইটা নাগরিকদের তথা সংবিধানকেই আদালতের দিক থেকে আক্রমণ? আদালত সংবিধানকে আক্রমণ করলে নাগরিকদের কী করণীয়? এই ব্যাপারে আইন কিছুই বলে নাই? আমার কাছে থাকা সংবিধানের কপির ৯৬ অনুচ্ছেদে মোতাবেক সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব দিছে ‘সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’-এর তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বীয় পদ থেকে বিচারকদের অপসারণের। ১৯৯৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংশোধিত এই কপিটা। ৯৬ অনুচ্ছেদের কোন পরিবর্তন কি হইছে পরে?