রক মনু

ফেক নিউজ/গুজব/মিডিয়ার ইনফর্মাল সেক্টরের ফর্মালাইজেশন

বিহার থিকা যারা পাকিস্তানে আসছিল, তাগো ভিতর যারা পাকিস্তানের পূবের ভাগে আছিল, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হবার পরে তাগো নাম হয় ‘আটকে পড়া পাকিস্তানী’। পাকিস্তান তাগো লয় নাই, অল্প কিছু নিছে, নেবার চুক্তি হইছে দুই দেশের, কিন্তু তারা ঢাকা-সৈয়দপুরের জেনেভা ক্যাম্পেই থাকছে এখনো।

কয় বছর আগে সেইসব বিহারী-পাকিস্তানীর বাচ্চা-কাচ্চাদের, বাংলাদেশ হবার পরে যাদের জনম, তাগো সিটিজেন বানাইছে বাংলাদেশ।

-------------------------

তো, এই ‘বিহারী-পাকিস্তানী’রা কি কাম করতো, করে? বাংলাদেশের সিটিজেন না বইলা তারা বাংলাদেশের ইকোনমির ফর্মাল সেক্টরে ঢুকতে পারে নাই। অবশ্য ভারত বা পাকিস্তান বা ইউরো-আমেরিকান অনেকে বাংলাদেশের ফর্মাল সেক্টরে কাম করে; নিজ নিজ দেশের পাসপোর্ট দিয়া সেই মওকা পাইছেন, কিন্তু ঐ ‘বিহারী-পাকিস্তানী’দের তো কোন দেশেরই পাসপোর্ট নাই!

রক মনু

বাংলাদেশের ইকোনমির ফর্মাল সেক্টরের বাইরে ঐ ‘বিহারী-পাকিস্তানী’ অনেকে কাম করেন; কেউ হইছেন নাপিত, কেউ ফেরিঅলা, কেউ রাস্তায় চায়ের দোকান দিছেন, কেউ বা দাড়োয়ান। কেউ হয়তো ড্রাগ নেটওয়ার্কে কাম করতেছেন।

এমন ইনফর্মাল সেক্টর লইয়া রাষ্ট্রগুলার মাথা ব্যথা থাকে, সেই মাথাগুলা ঘামতে থাকে–এইগুলা ফর্মাল সেক্টরে ঢুকাইতে না পারলে তো কামাই করতে পারতেছে না রাষ্ট্র! পয়সা ঘুরতেছে, বাট রাষ্ট্র ভাগ পাইতেছে না! ঘটনা প্রায় হুন্ডির মতো! তবে, রাষ্ট্রের বাহিনীগুলা কামাই করতে পারে এই সব সেক্টর থিকা; বাংলাদেশের সরকারগুলা যেহেতু জনতার এক্সট্রিম দুশমনই হইয়া থাকে, তাই রাষ্ট্রের বাহিনীগুলারে বাড়তি খাতির করে সরকার; জনতারে ঠেকাইতে বাহিনিগুলার লগে এই খাতির দরকারি। সেই খাতিরেরই আরেকটা নিশানা তাগো কামাইয়ের এমনসব বন্দোবস্ত।

আরো আগে রায়তি গ্রাম হইতো; জালেম জমিদারদের জমি ছাইড়া কিষাণরা পালাইয়া চরে যাইতো, যাইয়া জঙ্গল সাফ কইরা চাষ করতো। এইটাও তখনকার হিসাবে ইনফর্মাল সেক্টর। এমন কোন একটা চরে যখন ভালো ফলন হইতেছে, অনেক জমি হইছে চাষের, তখন ইংরাজ সরকার কোন জমিদারের কাছে ঐ চর বেচতো। জমিদার তখন লাঠিয়াল পাঠাইয়া খাজনা আদায় করতো। লালনের লগে জমিদারের লাঠিয়ালদের মারামারি মনে হয় এই কিসিমের! রাষ্ট্র এবং তার এজেন্টরা কামাই করতে মরিয়া, তাই কোন একটা ইনফর্মাল সেক্টরের হায়াত খুবই কম হয়।

মডেল হিসাবে উপরের দুইটা ব্যাপার মাথায় লইয়া এখনকার ফেক নিউজ/গুজবের ইস্যুটা ভাবেন। খবর/মিডিয়া আর জার্নালিজমের ফর্মাল সেক্টর আছে ২/৩’শ বছর। রাষ্ট্রের আইন-কানুনের আওতার ভিতরে মিডিয়া ব্যবসা চলে, এই ব্যবসার কামাইতে রাষ্ট্র তার ভাগ লয়।

মিডিয়া ব্যবসার এই ফর্মাল সেক্টরের উল্টাদিকে ‘ফেক নিউজ/গুজব’ হইলো, কইতে পারেন ইনফর্মাল সেক্টর, মিডিয়ার মতো একই কাম করতেছে। ইতিহাস একটু ঘাটলে আপনের নজরে পড়বে, ইনফর্মাল মিডিয়া হিসাবে গুজব ফর্মাল মিডিয়ার তুলনায় বহু গুণে পাওয়ারফুল; ১৮৫৭ সাল ধরেন। তখন ইংরাজের শাসনে ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট। কোলকাতা-মাদ্রাজে ফর্মাল মিডিয়া চালু হইছে অন্তত ৫০ বছর। কিন্তু সেইসব মিডিয়া খুবই পুচকে মনে হইতে থাকে হিন্দু-মোসলমান সিপাইদের ভিতরে ছড়াইতে থাকা গুজবের ইনফর্মাল মিডিয়ার তুলনায়। আমরা সেইসব গুজবের ফল হিসাবে দেখলাম সিপাই-রিভল্টের ধুন্দুমার ছড়াইয়া পড়া!

যুদ্ধের ময়দান যদি খেয়াল করেন, দেখবেন, সেনাপতি বা রাজার মরার গুজব ছড়াইয়া যুদ্ধ জেতার কত কত ঘটনা!

মডার্ন দুনিয়ায় গুজব নামে ঐ ইনফর্মাল মিডিয়া সমান বা আরো বেশি চলতেছে; বাংলাদেশের গার্মেন্টস্ সেক্টরেও এমন গুজবের কথা শোনা যায় মাঝে মাঝে–গুজব দিয়া স্যাবোটাজ ঘটাবার দাবি দেখি আমরা ফর্মাল মিডিয়ায়।

সারা দুনিয়াতেই গুজব চলতেছে, ইনফর্মাল মিডিয়ার পাওয়ারও মালুম হয়। তো, এই ইনফর্মাল সেক্টর লইয়া কি মাথা ঘামাবে না রাষ্ট্র? এইখানে যেই পয়সা আর পাওয়ার পয়দা হয়, ভাগ লইতে চাইবে না রাষ্ট্র?

গুজবকে ফর্মাল সেক্টরের দখলে নেবার পয়লা নজির মনে হয় ‘ট্যাবলয়েড ম্যাগাজিন’। ১৯৫০/৬০ দশে বহু ‘ট্যাবলয়েড ম্যাগাজিন’ গজাইতে থাকে, পপুলারও হইতে থাকে খুব। হলিউড আছিল এইসব ট্যাবলয়েডের মশলা। চলতেছিল, চলতেছে ট্যাবলয়েড।

কিন্তু কিছু মুশকিল হইতে থাকলো পরে। হলিউডি গুজবের তুলনায় আরো জোরালো পলিটিক্যাল গুজব পয়দা করতে থাকলো জনতা, ছড়াইতে থাকলো। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, উইকিলিকস্ গুজবকে নয়া ডাইমেনশন দিতে থাকলো; গুজব এখন আর লোকাল থাকতেছে না, গ্লোবাল হইয়া উঠতে পারতেছে প্রায়ই। এইবার গুজবকে ফর্মাল করার আরেকটা এটেম্পট হয়তো আমরা পাইলাম ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ হিসাবে। কিন্তু এইটা আসলে ঠিক গুজবের ফর্মালাইজেশন হইয়া উঠতে পারে নাই মনে হয়!

ট্যাবলয়েড জার্নালিজম গুজব লইয়াই কাম করতো, সেইটা ফর্মালাইজেশন হইলেও এই জার্নালিজমের ইজ্জত কম। কিন্তু সিটিজেন জার্নালিজম অনেক সময়েই গুজবের বদলে ফর্মাল মিডিয়ার চাইপা যাওয়া সাচ্চা খবর দিয়া ফর্মাল জার্নালিজমকে চ্যালেঞ্জ করতেছে!

ইতিহাসের এই নয়া যুগে আইসা আমরা পাইতেছি ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ নামে ফর্মাল মিডিয়ার নয়া ডাল/ব্রাঞ্চ। এর ভিতর দিয়া সত্যের অথরিটি দখলে নিল মিডিয়ার ফর্মাল সেক্টর, জনতার গুজব এবং সিটিজেন জার্নালিজমকে লাগাম পরানো গেল।

কিন্তু আসল কামটা তো বাকি রইলো! ট্যাবলয়েড যুগ পার হইয়া নিউ/অনলাইন মিডিয়া গুজবকে যেই নয়া ডাইমেনশন দিছে, সেইটারে তো ফর্মালাইজ করতে হবে!

ফেক নিউজ পয়দা করা এবং ছড়ানো রাষ্ট্রের কতটা দরকার সেইটা আমাদের মালুম হবে যদি আমরা ইরাকে হামলার ঘটনা হিসাবে লই। ইরাকের কেমিক্যাল উইপন আছে–এই ফেক নিউজ পয়দা কইরা হামলাকে জায়েজ করা হইছিল। মুশকিল হইলো, আখেরে তাতে ফর্মাল মিডিয়ার উপর দুনিয়ার জনতার ভরসা কমছে, রাষ্ট্রের মিছা কথা কইবার খাসলত জনতার কাছে আরো ক্লিয়ার হইছে। রাষ্ট্র এবং পাওয়ারফুলদের ব্যাপারে যেকোন গুজব জনতা এখন শুরুতেই বিশ্বাস করে। জনতার জানবার হক আছে, এমন এত কিছু রাষ্ট্র গোপন করে যে, জনতার মাঝে গুজব পয়দা হবার রেশনেল হিসাবে কাম করে ঐ গোপনীয়তা। বাংলাদেশে পুলিশ রিম্যান্ডের ব্যাপারে কোন একটা গুজব জনতার বিশ্বাস না করার উপায় আছে? ক্রসফায়ার কি রাষ্ট্রের বানানো ফেক নিউজ না? হরলিক্সে লম্বা হয় বা ক্রিম মাখায় ধলা হয় গায়ের চামড়া, শ্যাম্পুতে চুল গজায় বা পড়া বন্ধ হয়–এগুলা কি গুজব/ফেক নিউজ না?

গুজবকে ফর্মালাইজ করবার তাই একটা নয়া ফন্দি দরকার। ধরেন, সত্যকে ম্যাগনিফাই করা যায় কি? যায়। সত্যকে ম্যাগনিফাই করলে সেইটা যেমন সত্য, একই লগে সেইটা তখন গুজবের কাম করে, ফেক নিউজ হইয়া ওঠে আলগোছে। ওদিকে, ব্যাপারটার নাটের গুরু পর্দার ঐপারে থাকে বইলা ঐ গুজবে জনতাও পার্টিসিপেট করে। এই ব্যাপারে ভালো মওকা বানাইয়া দেয় মার্কেটে একটা কর্পোরেট গ্রুপের কয়েকটা পরিচয়ে বা প্লুরাল আইডেন্টিটির সুরতে হাজির থাকা।

পসিবল একটা নজির দেখাই। গত কয়দিনে ‘অরু আদার লাভ’ নামের মালয়লাম সিনেমার একটা ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হইছে। এক মাইয়া চোখের ইশারায় কাইত কইরা ফালাইতেছে পোলারে। এই ভিডিও ক্লিপ সত্য, ঐ সিনেমা বা ঐ মাইয়া সত্য। কিন্তু এইটা যেই মাত্রায় সাড়া তুললো দুনিয়ায়, জনতা যেমনে ক্লিপটাকে দেখাইলো, তুইলা ধরলো সেইটা কি সত্য?

আমি এইটারে কইতেছি, সত্যরে ম্যাগনিফাই করা। কেন? খেয়াল করেন, এইটা ফেসবুকে পোস্ট করা একটা ভিডিও। এইটা ভাইরাল হইতেছে হোয়াটসঅ্যাপে, পরে ফেসবুক মেসেঞ্জারের ‘মাই ডে’ হিসাবে। আরো হয়তো ছড়াইছে ইন্সটাগ্রামে। হোয়াটসঅ্যাপ আর ইন্সটাগ্রামের মালিক এখন ফেসবুক, কিন্তু যুদা যুদা ব্রান্ড নামে এইগুলা মার্কেটে আছে। এখন ফেসবুকের একটা ভিডিও যদি ইন্সটাগ্রাম-হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারে প্রমোট করে ফেসবুক নিজে, তাইলে কিছু মানুষ/ইউজার দেখবে, পসিবলি ভালো লাগবে, তারপর নিজের ‘মাই ডে’তে রাখলো, আরেকজন দেখলো, আপনে হয়তো এই আরেকজনকে ‘আনকালচার্ড’ ধইরা হিসাবের বাইরেই রাখছিলেন; কিন্তু ইনিও ঐটা তার ‘মাই ডে’তে রাখলো। ফেসবুক যে নিজের ব্রাঞ্চগুলারে এস্তেমাল কইরা সিন্ডিকেটেড প্রমোটিং চালাইলো, সাজেস্ট করলো ‘মাই ডে’ করার, এইটারে কইতেছি–সত্যরে ম্যাগনিফাই করা।

আমরা কি জানলাম? একটা ভিডিও ক্লিপ হোয়াটসঅ্যাপ আর ইন্সটাগ্রামে ভাইরাল, মেসেঞ্জারেও। আলাদা নাম, গোড়া কিন্তু সেই একটাই–ফেসবুক। ফেসবুকের পসিবল প্রমোটিং এইটারে পুশ/ ম্যাগনিফাই করলো; তাইলে এই ক্লিপ, মাইয়ার চোখের ইশারার যেই ইম্প্রেশন পয়দা হইলো, সেইটা ফেক (সিন্ডিকেটেড ম্যাগনিফিকেশন)।

ওদিকে, আমজনতা যেসব গুজব/ফেক নিউজ পয়দা করতো, পাওয়ারকে রিডিক্যুল করার দরকারে নিজেরা আরো বেশি শরিক হইয়া ছড়াইয়া দিতো সেইগুলা ঠেকাইতে ফেসবুক এআই/আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কামে লাগাইতেছে। ওয়েব রোবট দিয়া আটকাইয়া দিতেছে। রাষ্ট্রগুলা আর রাষ্ট্রের বাহিনিগুলার লগে খাতির জমাইয়া জেলে ঢুকাইতে মদদ দিতেছে ফেসবুক। কর্পোরেট-রাষ্ট্র দোস্তি ফেক নিউজ নামে মিডিয়ার ইনফর্মাল সেক্টর ফর্মালাইজ কইরা গদি মজবুত করতেছে জনতার দুশমনেরা, জনতা আর তার এজেন্সিরে কন্ট্রোল আর রেগুলেট করার আরেকটা হাতিয়ার হইয়া উঠতে পারলো ঐ সিন্ডিকেটেড, ফর্মাল ফেক নিউজ/গুজবের কর্পোরেট প্রোডাকশন।

তবে কর্পোরেটগুলাও একটা আরেকটার লগে পাল্লা দেয়। ঐ ভিডিও সেই পাল্লার হিসাবেও ফেসবুককে কিছু সুবিধা দেয়। ফেসবুকের ডাইরেক্ট কিছু লাভ আর কি কি? ভিডিও প্ল্যাটফর্ম হিসাবে ইউটিউবের কোন রাইভাল/পাল্টা প্লাটফর্ম খাড়াইতে পারতেছে না! ফেসবুক খাড়াইতে চায়। কিন্তু ফেসবুকে যত ভিডিও শেয়ার হয়, তার প্রায় পুরাটা ইউটিউব ভিডিও! একটা ফেসবুক ভিডিও’র এমন ভাইরাল হওয়া পসিবল জনতারে অটো-সাজেশন দিতে থাকে –আপলোড ইয়োর ভিডিও টু ফেসবুক!

তাই পসিবল এই গুজব/ফেক নিউজের দরকারটা ক্লিয়ার হয়; গুজব/ফেক নিউজ এইভাবে আরেকবার মিডিয়ার ফর্মাল সেক্টরে অ্যাকোমোডেট করা হইলো। এইবার জনতার এজেন্সিও ম্যানিপুলেট করা যাইতেছে, ভালো না?

ভালো তো!

রক মনু/১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮