রক মনু

মাহফুজুর রহমান: আমাদের গানের (আর্ট-কালচার) লগে বুর্জোয়ার রিশতা

#১৯ জানুয়ারি ২০১৮

শাহরুখ বা সৌরভ বা দীপিকার টিভিসি ডাবিং করা লোকজন হাসে, কারে কারে লইয়া হাসে?
১. অনন্ত জলিল

-------------------------

২. হিরো আলম

৩. মাহফুজুর রহমান

যারা হাসে, হাসি আর হাসলাম তারা কি করি বা করলাম ওনাদের তুলনায়?

সহি কোলকাতাই বাংলায় ডাবিং করি, আমাদের যে স্টার নাই সেইটা ইগোতে লাগে না আমাদের। আমরা ইন্ডিয়ার বিস্কিট আইনা বেচি, কাপড় আনি, কসমেটিকস্ আইনা প্যাকেজিং করি, পয়সা কামাই। মটরসাইকেলও আনি। সিএনজি আর ট্রাক। আরো কতো কি! কোলকাতার গান নকল করি, গাই, সৌমিত্র আসে, আমাদের মন্ত্রী আর কালচারাল মোড়লরা মোমের মতো গলে!

আমরা একটা সুঁই বানাইতে পারি না, একটা পেনড্রাইভ, একটা গাড়ি, একটা হেয়ারড্রায়ার, টিভি, ফ্রিজ…

আমাদের দেশে পোরতিটা সেক্টরে যারা পাইওনিয়ার তাগো পরিচয়গুলা খেয়াল করেন; আমাদের হিসাবে তারা ক্ষ্যাত, আনস্মার্ট। সেক্টরগুলা হিসাব করেন:

বাংলাদেশ যে স্যাটেলাইট টিভি চালু করতে পারে সেইটা আমরা জানলাম মাহফুজুর রহমানের হিম্মতের জোরে।

সিনেমায় অনন্ত জলিল দেখাইলেন, ইন্ডিয়া নামের মহল্লার বড় ভাই এড়াইয়া গ্লোবাল সেন্টারে নজর দিতে পারি আমরা।

আজকে ইউটিউবে যেই হাজার হাজার চ্যানেল, কন্টেন্ট প্রোডাকশনের জোয়ার, এই ঘটনার একজন পাইওনিয়ার হিরো আলম।

ওয়ালটন আমাদের কাছে স্মার্ট না, কিন্তু যেমনেই হৌক ফ্রিজ, মটরসাইকেল, স্মার্টফোনের গায়ে মেইড ইন বাংলাদেশ পাইতে পারতেছেন ওয়ালটনের কারণে।

প্রাণ-আরএফএল স্মার্ট? কিন্তু দেখেন, আপনে যখন Lays খাইতেছেন নবাব সাইফ আলী খানের লগে প্রাণ তখন চানাচুর-চিপস্-বাদাম বেচে ইন্ডিয়ায়। বা প্লাস্টিক। গ্লোবাল ব্রান্ডের লগে কুস্তির হিম্মত দেখাইয়া প্রাণ-আপ বানায়!

এমনকি প্লাস্টিক রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রির খবর লইয়া দেখেন, কতগুলা আনস্মার্ট লোক কেমনে হাতুড়ে বিদ্যায় করতেছে ঐগুলা!

দেশের ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট এই লোকগুলাই, এর বাইরে নাই।

আমাদের বড় বড় ক্যাপিটালিস্ট শেয়ারবাজার দিয়া জনতার পয়সা মারার ধান্দা করে, ব্যাংক বানাইয়া হাজার হাজার কোটি টাকা মারে। আমাদের এলিট ট্রান্সকম দুইটা জিনিস বানাইয়া বেচতে পারে নাই ইন্ডিয়ায়। আমরা যারা হাসি তারা হইলাম এইসব ফাটকাবাজ এবং তার দালালেরা। আমরা যদি না হাসি, তাইলে তো নিজেদের পুটকির গুয়ের গন্ধ পাইয়া যাবো, হাসি দিয়া নিজের গুয়ের গন্ধ খেদাই…

***

#১৭ ডিসেম্বর ২০১৬

এটিএন বাংলার মালিক মাহফুজুর রহমান গান গায়। জেমকনের মালিক কাজী শাহেদ আহমেদ নভেল লিখতেছেন। তার পোলাও রাইটার। বসুন্ধরার মালিকদের আর্ট-ফার্ট এখনো দেখি নাই আমরা, প্রাণ-আরএফএলের মালিকও আর্টে হাজির নাই, ওয়ালটনের মালিকরেও পাই নাই আমরা। কিন্তু এটিএন বা জেমকনের মালিকদের দেইখা আমরা বুঝি, আমাদের বুর্জোয়ারা আর্ট-কালচারে পরান ঢালছেন, ভালো।

আর্ট-কালচারে খরচ করতে যেই হিম্মত লাগে সেইটা পয়লা জেনারেশন বুর্জোয়া, মানে যে কামাই করছে টাকা, তার থাকে না প্রায়ই! ২ বা ৩ নম্বর জেনারেশন লাগে হয়তো। পয়লা জেনারেশনের অনেক পয়সা হইলেও ভিত্রে ধনী হইতে চাওয়া লেবারই থাইকা যায় মনে হয়। আর্ট-কালচার পয়দা করে তারা, বেইচা আরো দুই পয়সা কামাই করতে চায়। ২/৩ নম্বর জেনারেশনের মালুম হয় যে, আর্ট-কালচার পয়দা করা, অন্যরে এন্টারটেইন করা আসলে তো লেবারের কাম, তারা তখন কেনে, খায়, কনজ্যুম করে, পালে আর্টিস্ট। মিউজিশিয়ান বা পেইন্টার পালে, ডান্সার বা জোকার।

তো, দেশি বুর্জোয়াদের পয়লা জেনারেশনই এখনো তাগো পয়সা কন্ট্রোল করতেছে, ২/৩ নম্বর জেনারেশনের হাতে এখনো যায় নাই কন্ট্রোল। কিন্তু যাইতে আর মাত্র কয়টা বছর। খুবই ক্রিটিক্যাল টাইম এখন।

দেশের আর্টিস্টদের জন্য ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট। ২/৩ নম্বর জেনারেশন যখন আর্ট-কালচার খাওয়া শুরু করবে, সেই পয়সা কি দেশি আর্টিস্টরা খাইতে পারবে? আমাদের ভিজ্যুয়াল কালচার, মিউজিক বা লিটারেচারের হাল-হকিকত দেইখা সাহস পাওয়া মুশকিল! আমাদের আর্টের নিজের যোগ্যতা হইছে কি? মনে হয়, আর্ট দিয়া বেচা যাইতেছে না আর্ট, গতর দিয়া বেচতে হইতেছে বা হবে!

একটা বড় কারণ, আমরা নিজেদের কোন ব্রান্ড বানাইতে পারি নাই। আমরা লেজুড় হইয়াই থাকতেছি–কোলকাতার বা কোরিয়ার বা ইরানের বা আমেরিকার বা ল্যাটিনোর বা মুম্বাই/তামিলের বা পাকিস্তানের বা ইউরোপের। তো, এনারা যখন পয়সা দিয়া কেনা শুরু করবে, তখন লেজুড় কেন কিনবে? আর্ট-কালচার তো বোয়াল মাছ না যে লেজুড় ভালো লাগবে! দেশি ব্রান্ড হিসাবে দুনিয়ায় নাক জাগাইতে না পারলে গেস্টদের কাছে শরম পাইতে হবে না দেশি বুর্জোয়ার?

মাহফুজুর রহমানরে লইয়া হাসাহাসি না কইরা ওনার পোলা-মাইয়ার কাছে আপনের আর্ট কেমনে বেচবেন, আপনের আর্ট লইয়া তাগো যাতে শরম পাইতে না হয় সেইটা লইয়া ভাবেন।

***

৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গানটান আসলে বুঝি না আমি, যারা বোঝেন তাগো ভাবনার খোরাক হিসাবে দুইটা কথা কইতে চাই। আমি যদিও বিদেশেও না, দেশেই জুতাপালিশ করা কিসিমের লোক, তবু কইয়া ফেলতেছি দুইটা কথা, নাজায়েজ হিম্মত আমার!

আমার হিসাবে বাংলাদেশের আধুনিক গান হইলো দুনিয়ার সবচে সোজা মিউজিক! লালন থিকা কলিকাতার ‘জীবনমুখী (মরণপাছাই কইতেও পারেন)’ গানেরা সব কবিতা মাত্র, একটু সুরে সুরে কইতেছে আর কি, মিউজিকটা ‘সুগার কোট’ মাত্র! লালন ছাড়া বাকিদের কবিতাগুলা কবিতা হিসাবেও পাতলা! মিউজিকের ব্যাপারেও লালনের মাঝে কতগুলা ডাইমেনশন আছে। কিন্তু বাংলাদেশের আধুনিক গান এতোই চিপ নকল যে, অন্ত্যমিলের কিছু লাইন টাইনা টাইনা কইতে হয় মাত্র!

এই দিক থিকা আমাদের ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়া বা রাধারমণ বা মমতাজদের গান বরং মিউজিকের দিক দিয়া জটিল মনে হয়! এই হিসাবে মাহফুজুর রহমানের আধুনিক গান লইয়া ভাবা যায় নাকি?

আরেক দিক দিয়া কই। আমারে যাতে গালি দিতে সুবিধা হয়, সেই চিন্তা কইরা পাকিস্তানের আবিদা পারভীনের গানের লগে তুলনা করি একটু। আবারো, মিউজিক কিন্তু আমার ফ্যাকাল্টি না একেবারেই, আবিদার গান পয়লা শুনছি পরশু, ফ্রেন্ড Kungo Thang’র স্ট্যাটাস থিকা! তবু কইতেছি!

আবিদার গানে ধরেন ‘ইশক’ লইয়া জিকির করতেছে সে, ১৫টা ভঙ্গিমায় ‘ইশক’ উচ্চারণ করতেছে, ইমোশন গজাইতেছে তার যুদা যুদা ভঙ্গিমায়–মিউজিকের সেন্সে রাগের খেলা। এদিকে আমাদের আধুনিক গান? একটানে কতগুলা শব্দ কইয়া যাইতেছে! শচীন দেবের লগেও তুলনা করা যায়; শচীনের কইবার ভঙ্গির ভিতরেও আবিদার মতো আদর, গোস্বা, রাগ, বিরহ, সুখ, ভক্তি, ক্যাথারসিস, শান্তি, ফানা হওয়া–বহু ডাইমেনশন পাইবেন।

আমরা নকল করতে চাইছি কোলকাতার, মিউজিকের লোকেরা অনেকেই হিন্দু আছিল, খেদাইয়া দিছি সবাইরে, মোঘল খেদাইছি মোসলমানির কারণে, বাঈজী খেদাইছি ভালগার হিসাবে আপত্তিতে, মিউজিকের দেশী ঢঙগুলারে তোশকের তলায় ঢুকাইয়া রাখছি, তাইলে নকলের উপায় কি? মিউজিক জিনিসটারেই আমরা সোজা বানাইয়া তুলছি, আধুনিক গান জিনিসটারেই এমন সিম্পল বানাইয়া তুলছি যে, মাহফুজুর রহমানও গাইতে পারে, দুয়েকবার একটু ছুইটা যায় মাত্র। ওদিকে, গান মানে কথা পাচার করা অডিয়েন্সের কানে, তা তো উনি পারলেনই, এটিএন বাংলার অডিয়েন্স আধুনিক গানের কাছে মিউজিকের জটিল কিছু তো আশাই করে না যে মাহফুজুর রহমান দিতে পারবে না! কেননা, আমাদের আধুনিক গানে তো মিউজিক জিনিসটাই প্রায় নাই!