তার গান শোনে তারই সুরে সুরে বানানো কান

রামকৃষ্ণ আর রঠা। দুই জনেই ভক্তি পাইতেছেন। কিন্তু ভক্তির কিসিম আছে নাকি! আমার মনে হইছে, ভক্তি প্লুরাল! শব্দটার চেহারা তো একটাই, আছে তবু অর্থের ফারাক, এবং ফারাকটা বড়োই!

ভক্তির আদতে নজর দিলে অন্তত দুইটা সুরতে পাইবেন তারে! একটা হইলো ধ্যান, আরেকটা জিকির! রামকৃষ্ণের ভক্তি আদতে জিকিরের, রঠার ভক্তি ধ্যানের। সৈয়দ শামসুল হক রঠারে কইছেন সুফি; ভক্তির বিবেচনায় সেইটা কইতেই পারেন, সুফিতে ধ্যানও আছে, কিন্তু জিকিরটাই আসল মনে হয় আমার!

-------------------------

রঠায় জিকির নাই। তাতে ভক্তির কমতি হয়, এইটা কইতেছি না আমি! বরং আমার পয়েন্ট আরেকটা; ধ্যান বানাম জিকির, ভক্তির আদতে এই ফারাকটার লগে ক্লাসের একটা রিশতা আছে!
জিকিরের ভিতর একটা হকের ব্যাপার আছে, এবং জিকিরের মঞ্জিল হইলো ফানা হওয়া! ওদিকে ধ্যানে আছে ত্যাগ, মন উইঠা যাওয়া, এবং ধ্যানের মঞ্জিল হইলো নিবেদন! গরিবের কিছু নাই, তারে যে বানাইছে তার কাছে আছে গরিবের হক, জিকিরের ভিতর দিয়া সে ঢুইকা যাইতে চায় সেই কারিগরের ভিতরে, ফানা হইতে চায়, রামকৃষ্ণ যারে কইছেন চিনির বস্তা পাইলো যেন দরিয়ার দিদার!

ধনীর তো আছে দৌলত, দৌলতের লোভ, হারাবার টেনশন! ধ্যানের ভিতর দিয়া ঐ লোভ আর টেনশন উতরাইয়া ভক্তিতে যাইতে পারলো সে; যাইয়া নিবেদন করলো, যেহেতু সে জানে–সে ধনী, তার আছে দেবার মতো মাল, সে নিজেই দামী মাল!

রঠার ধ্যান আর তার গান তাই গরিবের মরমে ঢোকে না! রঠায় লোভী ধনীর পাপের ডিপ্রেশন, গরিবের বিরহ! রঠা মোলায়েম শান্তি, গরিব দিওয়ানা ভালগার!

রামকৃষ্ণে এই বিরহ পাইবেন, তাই জিকিরে জিকিরে সে ফানা হইতে চায়। রামকৃষ্ণের এই জিকির আর বিরহ (বৈষ্ণব)বোস্টমের নদী বাইয়া বাইয়া নামছে, বোস্টমের সেই নদীতে জোয়ার আনছে সুফি!

কিন্তু রঠার গানে ধ্যান আর নিবেদনের লগে ধনীর কালচার্ড রুচির ঐ রিশতার বাইরে আরেকটা ব্যাপার আছিল! রঠার মিউজিক্যাল মঞ্জিল আছিল, হিন্দুস্তানী মিউজিকের বাইরে যাওয়া। এই হিন্দুস্তানী মানে হিন্দুর মিউজিক না, বরং রঠার আন্দাজে ঐটা মোসলমানী–মোগল! আজকের বলিউডে যেইটা পাইতেছেন! যেই মিউজিকে লতা আর নুরজাহানের হিন্দি/উর্দু গান একই জেনারের মালুম হয়! জগজিতের গজল থিকা সিলসিলার ‘নীল আসমা সো গ্যায়া’ বা উমরাও জানের রেখার নাচ-গান, নবাবী জলসা!

দিল্লি বা লাহোর বা বাংলার মাজারে তো একই জিকির; রঠার ব্রাহ্ম মনে ভালগার কোলকাতার বাঈজী আর তার গান, যেইটা নবাবী এবং মোগল, রঠার আন্দাজে মোসলমানী! এইগুলা এড়ানোই তো রঠার মিউজিক্যাল এজেন্ডা! রঠা তাই নজরুলের মতো গাইতে পারেন না, ‘আলগা করো গো খোপার বাঁধন…’, গগন-লালন লইতে যাইয়া বিরহ বাদ দিতে হয় রঠার, উদাস বিরহী দিওয়ানা গগন রঠায় যাইয়া হয় ডিপ্রেসড ধ্যান! লগে ইউরোপ থিকা কিছু লোনও লইয়া লন।

এইভাবে রঠা তার গান লইয়া আমজনতার থিকা দূরে যাইতে থাকেন, নিজের মিউজিক্যাল সম্ভাবনা কোরবানী দেন নিজেরই ক্লাস আর কমিউনের গিলোটিনে! তবে উনি কিছু ভেন্ডর বা এজেন্ট জোগাড় করতে পারেন নিজের ক্লাসের আশেপাশে–সত্যজিৎ বা ঋত্বিক যেমন; এই এজেন্টরা কতগুলা কানও বানাইয়া দিন, রঠার গানের কারখানাতেই। সেই কারখানায় পয়দা হওয়া কানেরা রঠা শোনে, সেইসব কানে তার গান ভালো তো লাগারই কথা!

৮/৯মে ২০১৮