রক মনু

তলস্তয় আর রঠার পাতলা কবিতা ‘সোনার তরী’

তলস্তয়ের ‘how much land does a man need?’ গল্পের তরজমা হিসাবে ‘রাশি রাশি ভারা ভারা, ধান কাটা হলো সারা… ‘, মানে রঠা’র ‘সোনার তরী’ কেমন? কনটেক্সুয়ালাইজেশন ভালোই হইছে বলা যায়; মানে আমাদের তো অত জমি নাই লোকের তুলনায়, ওদিকে নাও লোকে বেশ চেনে–আওয়ামী লীগের নৌকার আগে থেকেই তো! তলস্তয়রে রঠা চিনতেন না আদৌ–এমন একটা বেনিফিট অব ডাউট দিয়া ‘…থিঙ্ক এলাইক’ ভাবতে আরাম পাইবেন অবশ্য অনেকেই।

এনিওয়ে, ওইটা আমার ইস্যু না, আমার ইস্যু হইলো, অমন একটা পাতলা নীতিপদ্যের একটা ভালো কবিতা হইয়া পড়াটা। অনুপ্রাস আর অন্ত্যমিল কেমনে ওই কবিতার পাতলা ভাব লুকাইয়া ফেললো–সেইটাই বুঝতে চাইছি। কবিতাটা কইতাছে, ‘অনেক সোনার ধান কাইটা নাও ভইরা ফেললাম, এত্ত ভরলাম, এত্ত ভরলাম, এত্ত ভরলাম যে নিজে ওঠার জায়গা নাই আর!’

-------------------------

ক্যাপিটালিজমের আলগা ক্রিটিক–রোমান্টিক; কিছু ধান তো তখন ফালাইয়াই দেবে ক্যাপিটালিস্ট, তার নাই রঠার মতো রোমান্টিকতা। এই দিক থেকে তলস্তয় অত পাতলা না; কেননা, সেইখানে টাইমের ভিতরেই ফিরে আসতে পারবে ভাবা গেছিল, হিসাবটা একটু ভুল হইছিলো লোভের কারণে; রঠা’র কবিতায় ভুলটা মেক-আপের সুযোগ আছিলো; বোকা পাঠকের মনে বেদনা ঢালতে চাইছেন বলেই মে বি কবিতার কর্তারে আরেকটু চালাক হইতে দেন নাই রঠা! ভাবেন, সেই কর্তা যদি কিছু ধান ফালাইয়া দিয়া বাঁইচা যায় তাইলে কেমন ফানি হইয় পড়ে পদ্যখান!

তা বাদে, এই কবিতা যদি গদ্যে লেখা হয় তাইলে তো রিডার সহজেই ভিতরে তলস্তয় দেইখা ফালাইতো! রুশ বুলিতে এই কবিতা তরজমা কইরা তলস্তয়ের রিডারদের কাছে রঠারে পরিচয় করাইয়া দিলে মজাই হবে বটে!

তো, এই রঠা তো ধ্বনির মিলের ভিতরেই কবি হইতে পারলেন, ফলে বঙ্কিমের গদ্য কবিতা মনে লইলে রঠা’র বিপদ, বিহারিলালই নিরাপদ! এমনিতেও বঙ্কিমে বিপদ আছে রঠার; বঙ্কিমের হিন্দুধর্ম বাপ দেবেন্দ্র আর রঠা’র ব্রাহ্মধর্মরে খেদাইয়া দেবার ভয় আছে, পরে দিছেও! রঠা নিজেও বঙ্কিমের হিন্দুও হইছেন, বিশ্বভারতীতে মহাত্মা গান্ধীর চান্দা লইয়া কংগ্রেসের কাছে নিজেরে বেইচা বা বঙ্গভঙ্গে বেদনা পাইয়া–উপনিষদ অত কাম করতে পারে নাই রঠা’র মনে!

আর কবিতায় বেকুব রিডারেরে ধ্বনিমিলের পাতলা রোমান্স দিয়া বঙ্কিমেরে ভুলাইলেন, বাংলা কবিতার ইতিহাসে বঙ্কিম নাই হবার পরে গদ্য কবিতা লেখার ট্রাই করলেন রঠা; ততদিনে বঙ্কিমেরে কতক কম্যুনাল বলেও চিনতাছে গোপন কালচারাল ব্রাহ্ম রঠা’র রিডাররা, নোবেলের ভাপও তো আছিল! আমাদের ত্রিশের কবিরাও গদ্য কবিতা যেন নয়া আনলেন ইউরোপ থেকে, বঙ্কিম হইয়া ইউরোপে না যাইয়া ইনভেনশন দেখাইলেন একেক জন! আর কবিতায় বঙ্কিমের গদ্য কবিতার প্রস্তাব না লইয়া ৫০ বছর যাবত কত কত ধ্বনিমিলের আবর্জনা গিলাইলো রিডারেরে–কত কত কবি, মিলের ভিতর কত কত পাতলাভাব গোপন কইরা কবিও হইয়া পড়লেন, এখনো স্ট্রাগল করে যাইতাছেন কত কত কত…/মনু

বঙ্কিমের প্রস্তাব:: ভরসা করি অনেকেই জানেন যে কেবল পদ্যই কবিতা নহে। আমার বিশ্বাস আছে, যে অনেক স্থানে পদ্যের অপেক্ষা গদ্য কবিতার উপযোগী। বিষয় বিশেষে পদ্য, কবিতার উপযোগী হইতে পারে, কিন্তু অনেকস্থানে গদ্যের ব্যবহারই ভাল। যে স্থানে ভাষা ভাবের গৌরবে আপনা আপনি ছন্দে বিন্যস্থ হইতে চাহে, কেবল সেই স্থানেই পদ্য ব্যবহার্য্য। নহিলে কেবল কবিনাম কিনিবার জন্য ছন্দ মিলাইত বসা এক প্রকার সং সাজিত বসা। কবিতার গদ্যের উপযোগিতার উদাহারণ স্বরূপ তিনটি গদ্য কবিতা এই পুস্তকে সন্নিবেশিত করিলাম। (১৮৭৮)

আগস্ট ৬, ২০১৬

—-

একটা শর্টফিল্মের কেচ্ছা ভাবছি। এনিমেশন হইলে ভালো হয় মনে হইতেছে। নাম ‘সোনার নাও’। গল্পটা এই রকম:

এক লোক নাও চইড়া খালের ঐ পাড়ে গেল। নাওটা খালি। ঐ পাড়ে ধানখেত। লোকটা যাইয়া ধান কাইটা নাও ভরলো। এতো ভরলো, এতো ভরলো যে, পরে দ্যাখে নিজেই উঠতে পারে না। উঠলে নাও ডুইবা যাইতে পারে।

লোকটা তখন নাও’র এক মাথা থিকা কিছু ধান নামাইয়া রাখলো। তারপর নাও চইড়া বৈঠা বাইয়া খাল পার হইতেছে। আস্তে কইরা বৈঠা বায় আর গান গায়–আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার বারিস্টার…

এডিশন: শুরুতে ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকবে সৌমিত্রের নাটুকে গলায় ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে নাও (তরী)…।

_—-+++++++

কেচ্ছা ঐখানেই খতম। বানাইতে পারেন চাইলে কেউ। অনুমান করি, বানাইয়া কোলকাতা পাঠাইলে প্রাইজ পাইতে পারেন।

২৭ জানুয়ারি, ২০১৭