রক মনু

গান লইয়া

আমার বাপে আছিলেন নজরুলের গানের নাগর। এমন নাগর আর কোন মিউজিসিয়ান কোনদিন পাইছেন বলে মনে হয় না আমার!

উনি যখন মরলেন আমার বয়স তখন ১৬, ৬/৭ বছরের মেমোরি আছে টুকরাটাকরা! উনি এতোটাই নজরুলের নাগর আছিলেন যে, নজরুল ছাড়া আর কারো গান গাইতে শুনি নাই কোন দিন, শুনতেন না কোনটাই। গাইতেন খারাপ, গলা ধইরা–মানে প্রায় গুনগুনাইয়া; খুব বেশি অবশ্য গাইতেন না, একটা গান গাইতেন, পয়লা দুই লাইন– ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে, আমি বনফুল, এতটাই।

-------------------------

নজরুলের এই রেয়ার ফ্যান আর একেবারেই গান না শোনা/গাওয়া সাহেরা বেগমের পোলা হইছি বলে গান পিরিতির মতোই খুব দূরে আছিল আমার! নো টিভি, নো রেডিও, নো গান। ঢাবির এমএসসি, অংকের মাস্টার আমার বাপের কোন কবিতা, গপ্পো বা নভের বইও আছিল না–উনি আমার জন্য জিওমেট্রি থেকে টপোলজি তক অনেক বই রাইখা গেলেও :)!

আমি গান শুনছি ১৩/১৪ বছরের দিকে, কচি আফু যখন একটা ক্যাসেট প্লেয়ার জোগাড় করলো, আরলি নাইন্টিজে–হেমন্ত, লতা, আশা, তপন/সেলিম চৌধুরী, ডলি–এগো গান শুনতো, ব্যান্ড ততো না! আরো পরে রেডিওতে সিনেমার গান, আধুনিক গান বলেও একটা ক্যাটেগরি আছিল। অনুরোধের আসর একটা খায়েশ আছিল, পরে নিশুতি বলে রাইত ১২-৩টা সেশন, মিডল ইস্টের লিসনারদের জন্য!

সো, মিউজিক নাই আমার ভিতর :)! শুনিও না আমি! একেবারেই! আমার পিসিতে নাই, ফোনে নাই! বাট অনলাইনে গান দেখি মাঝে মাঝে। পুরানা-নতুন হিন্দি সিনেমার গানই বেশি দেখছি, দুয়েকটা ইংরাজি।

এখন মনে হইতেছে, ব্যাপারটা ভালো হইছে। বেশি জিনিস আনলার্ন করতে হবে না! মানে, এখন খায়েশ হইছে, বাংলা সিনেমার পপুলার ঘরানার গানের ভাবে ডুব দিবো, অমন গান, ঐ গানের পোয়েট্রি কেমনে পয়দা করা যায় সেই ধান্দায় আছি এখন! ১৯৭০-১৯৯০, এই ২০ বছরের গান দেখি/শুনি, তাও খুবই আম বাংলার গানগুলি, কোলকাতাইয়া বাংলায় ঢাকাই সিনেমার গান ততো না! দুয়েকটার কথা কইলে বুঝবেন: ধরেন, বিমূর্ত এই রাত্রি না শুইনা শুনলাম, আমার কাঙ্খের কলসি, পিচঢালা এই পথটারে না শুইনা শুনলাম আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার বারিস্টার…

তবে, একটা জিনিস মনে হইলো। দিন যায়, কথা থাকে–এইটাই মে বি কোলকাতাইয়া বাংলায় সবচে সাকসেসফুল গান। কেন? ভাবতে হবে। গানটা ঐ বাংলায় হইলেও কোথায় যেন বাইরাইয়া গেছে, ভাব বা সুর কোথায় যেন অমন না ঠিক… বোঝা দরকার। ও আচ্ছা, আরেকটা এমন গানের কথাও কইতে হয়–আমার সারা দেহ খেও গো মাটি…! এইটা অবশ্য কবরের রেফারেন্স দিয়াই বাইরাইছে বলে মালুম হয়…দেখি, কদ্দূর বুঝতে পারি।

৬/৭ আগস্ট ২০১৬

গানটান আসলে বুঝি না আমি, যারা বোঝেন তাগো ভাবনার খোরাক হিসাবে দুইটা কথা কইতে চাই। আমি যদিও বিদেশেও না, দেশেই জুতাপালিশ করা কিসিমের লোক, তবু কইয়া ফেলতেছি দুইটা কথা, নাজায়েজ হিম্মত আমার!

আমার হিসাবে বাংলাদেশের আধুনিক গান হইলো দুনিয়ার সবচে সোজা মিউজিক! লালন থিকা কলিকাতার ‘জীবনমুখী (মরণপাছাই কইতেও পারেন)’ গানেরা সব কবিতা মাত্র, একটু সুরে সুরে কইতেছে আর কি, মিউজিকটা ‘সুগার কোট’ মাত্র! লালন ছাড়া বাকিদের কবিতাগুলা কবিতা হিসাবেও পাতলা! মিউজিকের ব্যাপারেও লালনের মাঝে কতগুলা ডাইমেনশন আছে। কিন্তু বাংলাদেশের আধুনিক গান এতোই চিপ নকল যে, অন্ত্যমিলের কিছু লাইন টাইনা টাইনা কইতে হয় মাত্র!

এই দিক থিকা আমাদের ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়া বা রাধারমণ বা মমতাজদের গান বরং মিউজিকের দিক দিয়া জটিল মনে হয়! এই হিসাবে মাহফুজুর রহমানের আধুনিক গান লইয়া ভাবা যায় নাকি?

আরেক দিক দিয়া কই। আমারে যাতে গালি দিতে সুবিধা হয়, সেই চিন্তা কইরা পাকিস্তানের আবিদা পারভীনের গানের লগে তুলনা করি একটু। আবারো, মিউজিক কিন্তু আমার ফ্যাকাল্টি না একেবারেই, আবিদার গান পয়লা শুনছি পরশু, ফ্রেন্ড Kungo Thang’র স্ট্যাটাস থিকা! তবু কইতেছি!

আবিদার গানে ধরেন ‘ইশক’ লইয়া জিকির করতেছে সে, ১৫টা ভঙ্গিমায় ‘ইশক’ উচ্চারণ করতেছে, ইমোশন গজাইতেছে তার যুদা যুদা ভঙ্গিমায়–মিউজিকের সেন্সে রাগের খেলা। এদিকে আমাদের আধুনিক গান? একটানে কতগুলা শব্দ কইয়া যাইতেছে! শচীন দেবের লগেও তুলনা করা যায়; শচীনের কইবার ভঙ্গির ভিতরেও আবিদার মতো আদর, গোস্বা, রাগ, বিরহ, সুখ, ভক্তি, ক্যাথারসিস, শান্তি, ফানা হওয়া–বহু ডাইমেনশন পাইবেন।

আমরা নকল করতে চাইছি কোলকাতার, মিউজিকের লোকেরা অনেকেই হিন্দু আছিল, খেদাইয়া দিছি সবাইরে, মোঘল খেদাইছি মোসলমানির কারণে, বাঈজী খেদাইছি ভালগার হিসাবে আপত্তিতে, মিউজিকের দেশী ঢঙগুলারে তোশকের তলায় ঢুকাইয়া রাখছি, তাইলে নকলের উপায় কি? মিউজিক জিনিসটারেই আমরা সোজা বানাইয়া তুলছি, আধুনিক গান জিনিসটারেই এমন সিম্পল বানাইয়া তুলছি যে, মাহফুজুর রহমানও গাইতে পারে, দুয়েকবার একটু ছুইটা যায় মাত্র। ওদিকে, গান মানে কথা পাচার করা অডিয়েন্সের কানে, তা তো উনি পারলেনই, এটিএন বাংলার অডিয়েন্স আধুনিক গানের কাছে মিউজিকের জটিল কিছু তো আশাই করে না যে মাহফুজুর রহমান দিতে পারবে না! কেননা, আমাদের আধুনিক গানে তো মিউজিক জিনিসটাই প্রায় নাই!

৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭