রক মনু

তাজউদ্দিন সিনড্রোম

১৬ জুলাই, ২০১৭

মুশতাক খানের সেমিনার/ওয়াজ শুরুর ঘন্টাখানেক পরে গেছিলাম আমি। বাংলা মোটরের গলির ভিতর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র নামের ইমারতের ৬ তলায় ১৫ জুলাই হইলো এইটা। দুই চার জন ভেন্যুটা চিনতেও পারেন। মুশতাক খানের এই ওয়াজটা আয়োজন করছিল সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিস বা সিবিএস। ভালো লাগলো, পুরাটা শুনতে না পারলেও আলাপটা ধরতে পারছিলাম মোটামুটি। মুশতাক খান তার ওয়াজের ৮০% কোলকাতাই বাংলায় করছিলেন, ১৯% দেশি কমন বাংলায়, বাকিটা ইংরাজিতে। তবু বুঝতে মুশকিল হয় নাই আমার, কোলকাতাই বাংলাটা আমি কইতে না পারলেও সংস্কৃত সন্ধি-সমাস-প্রত্যয় মোটামুটি জানা আছে আমার, ভোকাবুলারিও আছে–১৯ আর ২০ শতের শুরুর দিকের কোলকাতাই লিটারেচার ঘাটাঘাটি করছিলাম আগে, সেই কারণেই বুঝতে পারলাম আর কি! সেই কারণেই ‘প্রক্রিয়া’ বা ‘অধ্যয়ন’–একবার কইলেই বুঝি আমি, দেশের আমজনতার মাঝে এইসব শব্দ তেমন না থাকলেও! সব মানুষেরই দুয়েকটা ব্যাপারে মুন্সিয়ানা থাকে :)!

-------------------------

ইকোনমি, পলিটিক্স আর করাপশন লইয়া দামী সব কথা কইছেন প্রফেসর খান, পিসি-প্রজেক্টর ইউজ করায় বোঝার সুবিধা হইছে আরো। ওনার আলাপের দুইটা পয়েন্ট লইয়া কয়টা কথা কইতে চাই। এই পয়েন্ট দুইটায় আমার আপত্তি নাই আসলে, আমি স্রেফ আরেকটু কনটেক্সুয়ালাইজ করতে চাইতেছি।

ক. উনি কইতেছিলেন, মানে আমি যেমন অর্থ করলাম–বাংলাদেশের মতো দেশে কর্মীদের প্রোভাইড করার দায়িত্ব নিতে হয় পার্টির; কারণ, এসব দেশে মানুষ পলিটিক্স করে ক্লাসের সিড়ি বাইয়া উপ্রে ওঠার জন্য। তাই আমাদের বামপন্থিরা যেই ‘সততা’র পলিটিক্সে নিজেদের দেখাইতে চান সেইটা সাকসেসফুল হবে না। সাকসেসফুল হইতে কতগুলা করাপশনের দরকার আছে।

কথা ঠিকই। তাইলে অবশ্য ভারতের আম আদমী পার্টির সাকসেস বুঝতে একটু মুশকিল হইতে পারে! এইখানে কালচারাল স্টাডিজের কিছু ব্যাপার আইনা বোঝা যাইতে পারে। যেমন ধরেন আন্না হাজারের অনশন বা বলিউডের নায়ক বা রানঝানা বা রঙ দে বাসন্তি টাইপের কিছু সিনেমার লগে পলিটিক্যাল ভাইব্রেশনের রিলেশন লইয়া ভাবতে পারি আমরা…!

তা বাদে বাংলাদেশের কিছু নজির যদি উনি দেখাইতেন তাইলে মনে হয় আরো কনভিন্সিং হইতো ওনার কথা। আগেও এই ব্যাপারে লিখছিলাম আমি: ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ কিছু করাপশন করছিল, ভাসানি এইটাতে নিজেরে জড়ান নাই। তার ফল হইলো, পুরা আইউব রেজিমে সুবিধা পাওয়া সেই সব লোকের কারণেই আওয়ামী লীগ সার্ভাইভ করতে পারছিল। ভাসানি যে ন্যাপ বানাইছিলেন তারে হয়তো চীন প্রোভাইড করছিল, কিন্তু ইতিহাস কইতেছে, ভাসানি সাকসেসফুল হইতে পারেন নাই তার পলিটিক্সে!

ভাসানি লইয়া অবশ্য আরো কিছু ঝামেলা আছে! যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রাইম মিনিস্টার কেন সোহরাওয়ার্দী হইলেন? ভাসানি কি হইতে চাইছিলেন আদৌ? যদ্দূর জানি, সোহরাওয়ার্দীর নামটা ভাসানিই প্রস্তাব দিছিলেন। কেন?! আমার আন্দাজ, ভাসানি নিজেরে স্মার্ট ভাবতে পারেন নাই; এই স্মার্টনেস মানে আবার ইংরাজি জানা! ভাসানি কোলকাতাই বাংলাতেও কথা কইতেন না, এইটাও হয়তো তার কনফিডেন্স কমাইয়া দিছিল! আসামের বদলে কোলকাতায় পলিটিক্স করলে হয়তো আরেকটু কনফিডেন্ট হইতেন!

কিন্তু দেখেন, বামদের ভিতর জননেতা কেবল ভাসানিই হইতে পারছেন! এইটার লগে আমজনতার বাংলায় কথা কইবার একটা রিলেশন থাকতে পারে! আর কোন বাম নেতা আমজনতার বাংলায় কথা কন না! দেশের আমজনতার বাংলায় খেয়াল করলে দেখবেন, ‘বাম’ কথাটাই নেগেটিভ! ভাসানিও নিজেরে মনে হয় ‘বাম’ হিসাবে পরিচয় দিতেন না ঠিক! মুশতাক খান যেইটা কন নাই, দেশের বামেরা কেউই দেশের আমজনতার বাংলায় কথা কন না, এদের বাংলার তুলনায় লীগ-বিএনপির নেতারা বা ওয়াজ-মাহফিলের বাংলা লোকে বেশি বোঝে! আমার তাই ধারনা, দেশের বামেরা কর্মীদের প্রোভাইড করার দায়িত্ব নিতে রাজি হইলেও স্রেফ ওনাদের এই বাংলার কারণেই ওনারা আমজনতারে মার্ক্সবাদী পলিটিক্সে রিক্রুটই করতে পারবে না তেমন!

এনিওয়ে, উনি জিয়ার টাইমের কথাও টানতে পারতেন। জিয়ার পার্সোনাল করাপশনের কোন সাক্ষ্য-সাবুদ পাওয়া না গেলেও তার বিএনপি যেই পয়সা কামাই করছিল সেই কামাই দিয়াই তারা পরের এরশাদের লগে যায় নাই, বিএনপিরে টিকাইয়া রাখছিল এরাই!

খ. পলিসি আর করাপশনে লীগ আর বিএনপিরে ১৯/২০ তফাতের দল হিসাবে দাবি করলেন উনি। কে ১৯ আর কে ২০ সেই তর্কে না গেলেও দেখা গেল অডিয়েন্স প্রফেসর খানের এই দাবিকে মাইনা নিছে পুরা। আমিও মানি। কিন্তু আমাদের কিছু বাস্তব সওয়াল তুলতে হবে! বাম ঘরানার লোকেরা বা কোলকাতাই এলিটিস্ট কালচারাল মনের লোকেরা আওয়ামী লীগের লগে থাকতে/যাইতে পারলেও বিএনপির লগে কেন যাইতেই পারে না? কেন আওয়ামী লীগের লগে বড় জোর গোস্বা করে, আর বিএনপিতে নেসেসারি ঘেন্না?

মাঝে মাঝেই গোস্বা করা এই লোকগুলার রোগের একটা নাম দিছি আমি–তাজউদ্দিন সিনড্রোম! এইটার মানে হইলো, গোস্বা কইরা বইসা পড়া, চুপ মাইরা যাওয়া। লীগকে ছাড়তে রাজি না তারা, লীগের লোকসান হয় তেমন কিছুও করতে নারাজ! এদের সবচে বড়ো বিপ্লবী পজিশন হইলো, ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া! বদলে বিএনপিরে যদি ভোট দেয় তাইলেই কিন্তু আওয়ামী লীগ আর গদিতে থাকতে পারে না! তা কিন্তু করবেন না তারা! এমনকি ওয়েস্ট বেঙ্গলের মমতার মতো কংগ্রেস ছাইড়া তৃণমূলের মতো একটা দলও বানাইবেন না! তাইলে লীগ-বিএনপি যে ১৯/২০, সেইটা আদৌ কি মানেন তারা! তবু কেন কন মাঝেমাঝেই? আর কেউ কইলে কেন তর্কে নামেন না!

#রক_মনু