রক মনু

হিম্মত

এক মাইয়ার গায়ে চাপড় মাইরা রাস্তা পার হইয়া গেল এক পোলা লোক, ধরার জন্য মাইয়া পিছে দৌড় দিল, দেইখা পোলাও দৌড় দিল।! দুইজনকে দৌড়াইতে দেইখা পোলারে ধইরা ফেললো কিছু পোলা লোক। মাইয়া যাইয়া কইলো, আমার গায়ে হাত দিছে এই লোক। পোলা লোকগুলা তখন কইলো, ‘ও আচ্ছা, মোবাইল লইয়া দৌড় দেয় নাই!’ গায়ে হাত দেওয়ারে পাত্তাই দিলো না লোকগুলা। মাইয়া তখন ‘পিপার স্প্রে’ কইরা দিলো ঐ লোকটার চোখে।

পোলা লোকগুলা তখন ধরলো মাইয়ারে, মারলো, বুকে-পাছায় হাতাইলো, গ্যাঙ রেপের হুমকি দিলো, ভিডিও করতে থাকলো কেউ কেউ। তখন পুলিশ আইসা মাইয়ারে মলম পার্টি হিসাবে ধইরা থানায় লইয়া গেল, মাইয়ার কথা বিশ্বাস করে না, ফোন করতে দেয় না। আখেরে এক পুলিশ ফোন করতে দিল, তখন মাইয়ার ফেমিলির লোক আইলো, মুক্তি পাইলো মাইয়া।

-------------------------

ঘটনা বনানী এয়ারপোর্ট রোডের। ফেসবুকে মাইয়া নিজেই জানাইছে এইটা। কেমনে বিচার করবেন এই ঘটনারে?

পুলিশ হেনস্তা করার পরেও মাইয়া শুকরিয়া জানাইছে। মাইয়া যে আখেরে মরে নাই বা রেপড হয় নাই, এইটা খুশির খবর। তবু আমাদের বিচারের কতগুলা ব্যাপার আছে।

মাইয়ার হিম্মত আছে, এইটা শুরুতেই কইতে পারি। কেউ হামলা করলে নিজেরে ডিফেন্ড করতে হবে, ডিফেন্সের প্রিপারেশন থাকা দরকার, ডরাইলে হামলাকারীর মজা বাড়ে। ডিফেন্সের হিম্মত খুবই দরকারি জিনিস।

একটা মব এই মাইয়ারে হেল্প করলো, সেই একই মব মাইয়ার লগে যা করলো, তাতে মবের ব্যাপারে কি ভাববেন? কোন একটা মব কোন ব্যাপারে আপনের পক্ষ লইতে পারে, কিন্তু মব কখনোই পজিটিভ ব্যাপার না। মবের আলটিমেট মঞ্জিল হইলো ডিজায়্যার ফুলফিল করা, জাস্টিস বা ইনসাফ লইয়া মাথা ঘামায় না মব। বরং ইনসাফ আর মবের ডিজায়্যার যদি এক পক্ষে পড়ে তাইলে ডিজায়্যার ফুলফিল করাটা আরো ভায়োলেন্ট হইয়া ওঠে, ইনসাফ যদি মবের ডিফেন্স হয় তার চাইতে ডেঞ্জারাস কিছু হইতে পারে না। পকেটমার/চোর/ডাকাত পিটানির ভিতর এই ডেঞ্জারটা পাইবেন। আমীনবাজারে ৬ ছাত্র পিটাইয়া মারার ঘটনায় ঐ মবের ডিফেন্স আছিল ইনসাফ! ফ্রেন্স রেভল্যুশনের মব ইনসাফের ডিফেন্স লইয়া পাবলিক লিঞ্চিং করছিল, ২ বছরের বাচ্চারেও রাস্তার মাঝে গিলোটিনে দিছে, একেকটা পাবলিক লিঞ্চিং তাগো একেকটা ক্রিসমাস যেন!

আইনের কাম হইলো, মবের এই ইনসাফের ডিফেন্স কাইড়া লওয়া! আমাদের প্রোবলেমের গোড়াটা এইখানেই। আমাদের আইন ইনসাফের ধারে কাছে থাকে না, তাতে মব ইনসাফের ডিফেন্স পাইতে থাকে! আমীনবাজারের ঘটনায় আমরা এমনকি দেখলাম, পুলিশ (আইন) মবের হাতে ইনসাফ নিশান তুইলা দিছে!

ওদিকে, মবের ডিজায়্যার তো সমাজেরই কালেকটিভ কন্সাইন্স! আমাদের সমাজ মাইয়াদের উপর হামলার ব্যাপারেই সবে বেশি একাট্টা! মা-বাপ-ভাই-বোনও টর্চার করা, এব্যুসিভ ভাতারের ঘরে ঠেইলা পাঠায় মাইয়াদের! একটা ফেমিলি পাই নাই যারা আপত্তি ছাড়া বইনের প্রোপার্টি বুঝাইয়া দিছে, আমাদের কামের মাইয়ারা ১৬ ঘন্টা কাম কইরাও গোস্তের একটা টুকরা পাবার বদলে মাইর খায়। অপরিচিত ১০টা পোলার সামনে একটা একটা মাইয়া পড়লে ১০ পোলা পরিচয় ছাড়াই দোস্ত হইয়া যাইয়া গ্যাঙ রেপ করে, প্রেমিক প্রেমিকারে লইয়া যায় নিজের সার্কেলে, তারপর দোস্তরা ভাগ কইরা খায় ‘মাল’! ভাতারকে বউ হেল্প করে নিজের আগের ঘরের মাইয়ারে রেপ করায়, মাইয়ারে রেপ করাইয়া আগের ভাতারের উপর প্রতিশোধ লয়! আইনের লোকেরা ভাড়াটে খুনী হয়, ক্রসফায়ারে খুন করাইয়া গর্ব করে সরকারি এমপি। এই সমাজের মব কেমন হবে?

এদিকে, আইনের লোকেরা যদি এমন হয়, আইনের একেকটা ক্লজ/ধারা যদি হয় ঘুষের একেকটা ধারা, একটা মামলায় যদি লাগে ১৫ বছর, মামলার সাক্ষী হইতে যদি ডরাইতে হয় তাইলে মানুষ কি যাইতে সাহস পাইবে এই আইনের কাছে যাইতে? ঘটনার ঐ মাইয়া এই পয়েন্টেই ধরা খাইছে!

খেয়াল করেন, মামলা করলে ঐ লোকের জেল হবে আইন মোতাবেক, সেক্সুয়াল অফেন্স তার ক্রাইম। মবের হাতে ধরা পড়ার পরে ঐ লোক বন্দী, তার চোখে পিপার স্প্রে কইরা মাইয়া আসলে একটা ক্রাইম করলো! কেউ আপনারে হামলা করলো, আপনে তখন পিপার স্প্রে করলেন–সেল্ফ ডিফেন্স, কিন্তু তারে ধইরা বানলেন, তারপর স্প্রে করলেন, সেইটা ক্রিমিনাল অফেন্স! কিন্তু আপনে পাকড়াও কইরা পুলিশের কাছে দিয়া মামলা করলেন, লোকটার সাজা হবে।

আগেই কইছি, এই মাইয়ার হিম্মত আছে। কিন্তু পাকড়াও করা লোকটার চোখে স্প্রে কইরা মাইয়া বেজায়গায় খরচ করলো তার হিম্মত! কিন্তু ঐ মব যেহেতু গায়ে হাত দেওয়ারে পাত্তাই দেয় নাই, কি করতে পারতো মাইয়া?

আমার মত হইলো, আপনের ঐ হিম্মত জায়গা মতো খরচ করেন! পয়লা কাম হইলো, মবকে আপনে কইবেন, এইটা ক্রাইম, আপনারা পুলিশের হাতে দেন, আমি মামলা করবো। এবং যতগুলা পারেন ছবি তোলেন, লোকটার দৌড়ের, মুখের, মবের। মব যদি পুলিশের হাতে না দিয়া ছাইড়া দেয় হতাশ হইয়েন না। বরং আপনের হিম্মতের আসল পরীক্ষা মাত্র শুরু! আপনের ফেমিলিকে রাজি করাইতে হবে, আমাদের এই নষ্ট আইনকে ঠিক করার জন্যই আপনাকে থানায় যাইতে হবে, মামলা করতে হবে! ঠিকভাবে খাড়াইতে পারলে সাপোর্ট পাইবেন, এই আইনের ভিতর দিয়াই আপনে হিম্মত এবং বুদ্ধি দিয়া আগাইলে ফল পাইবেন; আপনে একা না, পুরা সমাজ ফল পাবে।

এই হিম্মত খব কম মাইয়ার আছে আমাদের সমাজে, একটু দায়িত্ব নেন প্লিজ, নিজে ক্রাইম কইরা ফালাইয়েন না! হিম্মত পজিটিভ, কিন্তু বুদ্ধি ছাড়া হিম্মত সুইসাইডাল, সুইসাইড করাও হিম্মতেরই ব্যাপার!

এই ঘটনার মাঝে আরেকটা ছবকও আছে। খেয়াল করেন, খুবই দরকারি একটা ব্যাপারে খুবই ভালো একটা কামের পরেও এই মাইয়া ধরা খাইলো! ঐ লোকের চোখে স্প্রে করতে পারলেও মবের যারা মারলো, আরো বেশি গায়ে হাত দিলো, তাগো কিন্তু কিছুই করা গেল না! বরং আরো টর্চারের মাঝে না পড়ায় শুকরিয়া আদায় করতে হইলো!

এই একটুখানি ভেজালের কারণে কত বড়ো বিপদে পড়তে হইলো! ঠিক এইখানেই তসলিমা নাসরিনের কথা ভাবতে পারেন। তসলিমার ফাইটের প্রায় পুরাটাই পজিটিভ, তসলিমার হিম্মতও এস্ট্রাঅর্ডিনারি, স্রেফ একটু বেতাল করছেন, অতি ইউরো-সেন্ট্রিক হবার কারণে এই সমাজ তারে হারাইলো! আরেকটু ধুরন্ধর যদি হইতেন, তার হিম্মত এই সমাজের অনেক কামে লাগতো!

সো স্যাড।