ছোট্ট একটা মোম জ্বলতেছে

৭ বছর আগে আমার লেখা ৩টা লাইন,

“একটা ছোট মোম জ্বলতেছে
দেখে ফেলবে, দেখে ফেলবে সবাই
তাঁর গায়ে আলো ঢালো…”।

-------------------------

এখন হইলে লিখতাম,

“ছোট্ট একটা মোম জ্বলতেছে
দেইখা ফেলবে, দেইখা ফেলবে সবাই
তার গায়ে আলো ঢালো…”।

কেন এমনে এডিট করতাম? আগের ভার্সনের পয়লা লাইনটা ইংরাজি করেন, “a small candle is shining”, আরো ভালো তরজমা পারবেন আর কেউ, কিন্তু আমার বুঝানির দরকারটা এই তরজমায় চলবে। ইংরাজি বাক্যের এই ফর্মেশনে আমার বাংলা বাক্যটা লেখা, ইংরাজি বাক্যে শব্দগুলার সিরিয়াল বহাল রাইখা লিখছি আমি। কিন্তু বাংলার রেয়াজ যদি খেয়াল করেন, বাক্যে শব্দের সিরিয়াল ভাবের হেরফের ঘটায়। ইংরাজিতেও ঘটায়। কিন্তু এইখানে ইংরাজি বাক্যের ভাব এমনই–স্মলের ভাবে জোর পড়তেছে। কিন্তু বাংলা তরজমা হিসাবে “একটা ছোট মোম…” বাক্যে ছোট্ট’র চাইতে মোম যে একটাই, এই ব্যাপারটাই বড়ো হইয়া উঠছে!

বাংলার রেয়াজে তাই শব্দেরা দরকার মতো সরতে পারে, আলগা বা ফ্লেক্সিবল। ‘ছোট্ট একটা’ কইলে মোম যে একটা সেই ব্যাপারটা আর বড়ো হইয়া উঠতে পারে না। ইংরাজির নকল চিন্তা আমারে বাংলা থিকা দূরে লইয়া যাইতেছে। ওদিকে, কলোনিয়াল জোরে আমার ক্লাসেরই দখলে বাংলা, তাই বাংলার দফারফা কইরা ফেলতেছে আমাদের নকলবাজি!

এই নকলের কারণে কতগুলা বাংলা বাক্য আমরা আর কই না, লিখতেও পারি না! চলেন দেখি:

ক. খাইয়া যাবা কিন্তু।
খ. তোমারেই চাই যদিও।
গ. তোমারে লইয়াই যামু আমি।
ঘ…. ছাইড়া যাবা যদি।

এমন সব বাক্যে কিন্তু-যদি-আমি’র ইউজ করা যাইতেছে হরদম, কিন্তুর অর্থ ‘বাট’ থাকতেছে না তখন। ইংরাজি ‘though’ বাক্যের জাগা বদলাইতে পারলেও আমাদের ইংরাজি এলেম পুচকে, আমরা বেসিক গ্রামারেরই নকল করতে থাকি, বাংলার রেয়াজে নজর না দিয়া!

এই ৭ বছরে এমন কতগুলা জিনিস আনলার্ন করতে পারছি আমি। আরো কিছু আছে।

দেখে না কইয়া দেইখা কই বা লিখতেছি। এইটা ডেমোক্রেটিক বাংলার ইস্যু। আমার হিসাবে ‘দেইখা’র ইমোশন বা ভাব ‘দেখে’ ধরতে পারে না না। আমজনতার ইমোশনকে ভালগার হিসাবে দেইখা কলোনিয়াল সায়েন্টিফিক মন ইমোশনে লাগাম পরাইতে চায়। ওয়েস্ট বেঙ্গলের কোথাও কোথাও ‘দেখে’ আছে, বাংলাদেশের বাংলায় নজর দিলে কমন হিসাবে দেইখা পাইতেছি আমি। কলিকাতার প্রেসক্রিপশনে কেন লিখবো আমি বাংলা, আমাদের আমজনতার ভাবে নজর না দিয়া?

খেয়াল কইরা দেখছি আমি, ঢালিউডের বাংলা সিনেমায় ফারুক বা আলমগীর বা ববিতা যখন কলিকাতার প্রেসক্রিপশনে বাংলা উচ্চারণ করে তখন হাসি পায় আমার, সুবর্ণার বাংলাও তেমন। কিন্তু এই ববিতারাই যখন বাংলাদেশের আমজনতার বাংলায় সুন্দরী বা সুজনসখীর ডায়লগ মারে তখন একদম অন্তরের কথা মনে হয়। সমাজে পাওয়া ইমোশন যদি বিদেশের নকল কইরা কাইটা ফেলতে চায় কেউ সেইটা এমনই হয় প্রায়ই। শান্তিনিকেতনে ট্রেনিং-এর এতো দাম তাই বাংলাদেশে!

তা আলী যাকেররা বিদেশী হইয়া থাক, নো প্রোবলেম। কিন্তু তারা জনতার মনে ঢুকতে পারবে না, জনতার বুলি-ভাব-ভঙ্গি মনে না লইয়া। খেয়াল করলে দেখবেন, আ.যা’র পোলা ইরেশই বেশির ভাগ কামে বাপ-মায়রে লয় নাই, ডিনাই কইরা জনতার ভাব আর বুলির লগে দোস্তি করছে।

জনতা এইভাবে জেতে।

১২ অক্টোবর ২০১৭