রক মনু

জাতি তো বানানো, তাই বানাইতে পারি তো আমরাও!

আজকের হোয়াইট সুপ্রিমেটিস্ট ট্রাম্পের দল কনজার্ভেটিভ রিপাবলিকান দলেরই প্রেসিডেন্ট আছিলেন আব্রাহাম লিংকন। লিংকনের হাতেই সিভিল ওয়ারের ভিতর দিয়া স্লেভারি বাতিল হয় আমেরিকায়। আজকের ডেমোক্রেট, যারা ব্ল্যাক ওবামারে প্রেসেডিন্ট বানাইছে, এরাই তখন স্লেভারি রাখার পক্ষে যুদ্ধ করছিল।

১৫০ বছর পরে দেখেন দুইটা দল ফান্ডামেন্টালি কেমন অদল-বদল করলো নিজেদের ভিতর :)! আমাদের এতো বছর লাগে নাই। আজকের আওয়ামী লীগ আর বিএনপিরে দেখেন। বিএনপির ব্যাপারে যেই যেই সেক্যুলার সন্দেহ চালু আছে, আওয়ামী লীগ ঠিক সেই সেই কামই করতেছে, বিপরীতে বিএনপির ব্যাপারে চালু সন্দেহগুলা আসলে ভূয়া! দুইটা দলই আসলে মিছা লেবাসে চলতেছিল এতোদিন।

-------------------------

ঘটনাগুলা খেয়াল কইরা দেখেন, মেলে কিনা।

এখনকার সোশ্যাল সায়েন্সে ‘ইমাজিনড কম্যুনিটি’ হিসাবে জাতি/নেশনের ভাবনা চলতেছে, সবাই মোটামুটি মাইনাও নিছে, ‘ইনভেনশন অব ট্রেডিশন’-এর আইডিয়া মোটামুটি মাইনা নিছে একাডেমির দুনিয়া। জিয়া কিন্তু ১৯৭৬/৭৭ সালেই এইসব ভাবনার প্রাকটিক্যাল ভার্সন বানাইয়া গেছে! ভাবেন, জিয়ার ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ শুরু হবার জন্য বাংলাদেশের পয়দা হওয়া লাগতেছে, বাংলাদেশও নাই, এমন কোন জাতীয়তাবাদও নাই। তাইলে কী খাড়াইলো? জিয়ার জাতীয়তাবাদ ম্যানুফ্যাকচার্ড, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর মতো কোন নেচারাল দাবি নাই এর। আপনে যদি বাংলাদেশী হইতে থাকেন, বাংলাদেশী ট্রেডিশন বানাইতে পারেন তাইলে এই জাতীয়তাবাদ খাড়াইয়া যাবে! নেশন যেহেতু ইমাজিনড, তাই তার আর কোন আসল গোড়া দরকার নাই, আজকে থিকাই এই ইমাজিনড কম্যুনিটি বানানো যাইতে পারে :)।

এইটা বিরাট চিন্তা। পয়লা বড় ব্যাপার হইলো, এইটা ইনহেরেন্টলি প্লুরালিস্ট। এইটার ভিতর আইডিয়ালি ‘বাঙালি সুপ্রিমেসি’ নাই, চাকমা বা মারমা বা মান্দি বা সাঁওতাল বা বাঙালি বা বিহারি–সবাই এখন সমান বাংলাদেশী। বাস্তবে তখনো দেশের ভিতর আমরা ‘বাঙালি সুপ্রিমেসি’ই পাইছি, পাহাড়ে বাঙালি প্লান্ট করা হইছে, প্লুরালিটির রিকগনিশন পাই নাই। এইটা আছিল জিয়ার আগের সরকার (৭১-৭৫) চাকমাদের বাঙালিত্বে প্রোমোশন দেবার যেই অফেন্সিভ প্লান নিছিল সেইটারই কন্টিন্যুশন। কিন্তু চিন্তার দিক থিকা এইটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতো বাঙালি সুপ্রিমেটিস্ট না, বাংলাদেশটা কেবল বাঙালির–এমন কোন ধারনা নেসেসারিলি নাই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিতর।

তাইলে এই অর্থে বিএনপির ভিতর দেশের নাগরিকদের ফ্রিডমের কসম পোক্ত, বিএনপি আইডিয়ালি ইনক্লুসিভ, আওয়ামী লীগ এক্সক্লুসিভ–বাঙালি সুপ্রিমেটিস্ট, তাই রেসিস্ট। কিন্তু আইডিয়ালি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আছিলো রেসিজমের বিরুদ্ধে দুর্বলের/মজলুমের হকের পক্ষের যুদ্ধ। তাইলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো রেসিস্ট বাঙালি সুপ্রিমেসির ভিতর নাই, বরং বিএনপির প্লুরালিটির ভিতর, ইনক্লুসিভ নেচারের ভিতর থাকার সম্ভাবনা বেশি!

এদিকে, বাঙালি সুপ্রিমেটিস্ট হিসাবে আওয়ামী লীগ পশ্চিমবঙ্গের লগে একটা গোড়ার রিলেশনের পক্ষে, বাঙালির রেঁনেসা হিসাবে যেই মিথ চালু আছে তার গোড়া যেহেতু কোলকাতায় তাই লীগাররা কোলকাতার ফ্যান, সো ভারতের। এইটা তাইলে স্টেট হিসাবে বাংলাদেশের সভ্রেইনটি, লিবার্টি রিস্কে ফালাইয়া দেয়! এইটাও মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়া ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেট হবার কসমের বিপরীত, বিপরীতে বিএনপির বাংলাদেশী হবার জিকিরের ভিতরই আছে দেশের বাইরের যেকোন গোড়ায় রাজি না হওয়া।

বিএনপির ব্যাপারে সবচে শক্ত নালিশ হিসাবে লোকে মনে করে ইসলামিস্টদের লগে বাড়তি পিরিতের রিলেশন। ফ্যাক্ট দেখলে সেইটা বলা মুশকিল হবে কিন্তু!

প্লুরালিস্ট হিসাবে জিয়া ইসলামিস্টদের কিছু স্পেস যেমন দিছেন, বামদেরো দিছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের দিছেন, হিন্দুদের দিছেন; বরং অবাঙালিদের কম দিছেন মনে হয়, বা পান নাই। তাছাড়া জিয়া গদিতে বইবার আগেই তো আওয়ামী সরকার হিসাবে মোশতাকের টাইমেই ইসলামিস্টরা বাইরে আসছে। বাস্তবে ইসলামিস্টদের বিশেষ কোন সমস্যা তো ৭১-৭৫ সালেও আছিল না, একটু সমস্যায় আছিলো পাকিস্তানপন্থিরা! ৭১-৭৫ সরকার বরং পুরা মোসলমানের সরকার আছিল, মদ-জুয়া ব্যান কইরা ইসলামী কানুন চাপাইয়া দিছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-নাস্তিকদের উপর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কইরা ওয়াহাবি ইসলাম প্রচার শুরু করছে, ইসলামের বাংলাদেশী প্রাকটিস উৎখাত কইরা আরবের ইসলাম ছড়াইয়া দিতে লালসালু টাইপের বই পড়াইছে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন, মাওলানা আকরম খাঁ ইসলামের বাংলাদেশী প্রাকটিসকে হিন্দুত্বের চাইতেও ইসলামের বড়ো দুশমন ভাবতেন, বাউল-পীরদের গালাগালি করছেন। ইনি তো মুসলীম লীগের লোক আছিলেন, আওয়ামী লীগ তো সেই মুসলীম লীগেরই খোলস থিকা বাইরাইছে, ইভলভড মুসলীম লীগ! ৭ মার্চের বক্তিমায় যখন কইলেন, “তোমরা আমাদের ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো…”, এই ভাই কেমনে হয়? দ্বীনের ভাই।

সংবিধানে বিসমিল্লাহ যোগ করাটারে গালিবাজরা জিয়ার সবচে বড়ো আকাম হিসাবে কইতে চায়, কয়। তো বিসমিল্লাহ লাগাইয়া জিয়া কি কোন ইসলামী আইন-কানুন বানাইছে? এমনকি, বিসমিল্লাহ যে সরকারি সব কামে কইতে হবে তেমনও কোন কানুন বানায় নাই! বরং ফিমেল পুলিশ বানাইছে, যেইটা ৭১-৭৫ সরকার বানায় নাই, তাগো ওয়াহাবি ইসলামী মনের কারণে হয়তো!

এখন কালচারালি ভাবেন ব্যাপারটারে; আপনে যদি গণতান্ত্রিক হন, প্লুরালিস্ট হন, তাইলে দেশের-সমাজের রেওয়াজের ভিতর যেইটা অন্যের উপর হামলা করে না, কিন্তু ৮০/৯০ ভাগ মানুষ করে, কয়, বোঝে–সেই রেওয়াজ নেবেনই তো! আপনে যদি অটোক্রেসি বা রাজতন্ত্রী হন তাইলে জনতার মনের তোয়াক্কা করবেন না। আমাদের পাশের দেশে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মোদীরে দেখেন, উনিও তো জনসভায় খাড়াইয়া সালাম দেন। এইটা রেওয়াজ মাত্র, সালাম দিলেই তো ওনার দলের লোকেরা গরু খাবার জন্য খুন করা কমাইয়া ফেলেন নাই, আমাদের বর্ডারেও কমান নাই!

এখন আমাদের এই দুই দলের খোলস পইড়া যাইতেছে; আমাদের টেক্সট বুকের ঘটনা দেখেন এইবার, হেফাজতে ইসলামের লগে পেয়ার দেখেন আওয়ামী লীগের, বাঙালি সুপ্রিমেসি দেখেন পাহাড়ে-সমতলে। এইগুলা এজেন্ডা মোতাবেক কায়কারবার। বিপরীতে প্লুরালিস্ট গণতান্ত্রিক হবার কারণে বিএনপিতে মোসলমান, বাংলাদেশী কালচার পাইবেন। এই দেশে মোসলমান যেহেতু আছে, তাই কালচারেও মোসলমানী থাকবে, অন্য সবাইও থাকবে। আওয়ামী লীগের মতো অন্য সবাইরে বাংলাদেশে রিফিউজি হিসাবে দেখতে পারে না বিএনপি, আওয়ামী লীগের মতো বাংলাদেশটা কেবল বাঙালিদের ভাবতে পারে না।

আমেরিকার দুই দলের মতোই ফান্ডামেন্টাল অদল-বদল হইয়া গেছে অলরেডি, হইয়াই আছে ইন ফ্যাক্ট। দেশের লেখাপড়া করা লোকেরা, বাম এস্টাবলিস্টমেন্ট তবু বিএনপিরে আওয়ামী লীগের চাইতে বেশি ঘেন্না করে! আমাদের দুর্দশার একটা গোড়া এই বাড়তি ঘেন্নার মাঝে, এতে আওয়ামী লীগ পাওনার চাইতে অনেক বেশি জাস্টিফিকেশন আর লেজিটিমেসি পাইতে থাকে, আমাদের বন্দী দশা পোক্ত হইতে থাকে।

১৪ মার্চ ২০১৭
#রক_মনু