‘জাতিস্মর’র দুয়েন্দে এবং রোমান্টিক কবিদের সেক্যুলার ত্রিশূল

রোমান্টিক কবিরা কতগুলা আইডিয়ার ব্যাপারে খুব দুর্বল হন; যেমন ধরেন, মানুষের অনেকগুলা জনম আছে–আগেও অনেকবার হইছিলেন আপনে, মরছেন, আবার হইছেন, আবার মরছেন, মরবেন, আবার হইবেন–এমন এক সাইকেলে চলতেছেন আপনে। রোমান্টিক আর্টিস্টের তাই ভাবতে ভালো লাগে, এই জনমের না পাওয়া সামনের জনমে পুরাইবেন বা প্রোপোজ করতে যাইয়া ধানাইপানাই বুঝাইয়া সিডিউস করতে চাইলেন–গত জনমে আমরা শুইয়া থাকতাম এক লগে খাইয়া না খাইয়া, খাওয়া আমাদের লাগতোই না তো, তুমি আমারে দেইখা ভরাইয়া ফেলতা পেট, আমি তোমারে!

আমারে তুমি ছানতে ছানতে দুধের ভিতর দিয়া মাখন আর ছানা যুদা করার মতো চুরমার কইরা দিতা, তারপর আরো আগের কোন জনমের শেখা যাদু বলে আবার বানাইয়া ফেলতা সহি দুধ! সে এক পিরিতি আছিল আমাদের…; সব মনে পড়ে আমার, কিছুই কি নাই তোমার মনে, আমি কি নাই ঐখানে! আহা, বুঝি শত জনমের খরায় দুনিয়ায় হইছিল কত ধুলা, সব ঢুইকা পড়ছে তোমার মনে, তোমার মনের সেইসব ধুলার নিচে আমি আছি! চলো দুইজনে এক লগে দেই ফু, উড়াইয়া দেই সেইসব ধুলা…তাইলেই তুমি দেখবা, তোমার এই জনমের মনে গত জনমের আমি ঘুমাইয়া আছি–মনের ভিতর মুখ ঢুকাইয়া একখান চুমা দিয়া আমারে জাগাও!

-------------------------

হিন্দু ধর্মের কাছে রোমান্টিক কবিদের তাই দেনা আছে; জনম আর মরণের এমন সাইকেল দিয়া স্পিরিচুয়ালও হওয়া যাইতেছে একটু, মজাই তো কবিদের! এদের মাঝে রিলিজিয়াস কবিরা স্পিরিচুয়াল হন, ধর্মই করেন তারা; যেমন ধরেন, ‘বনমালি তুমি পর জনমে হইও রাধা…’। এই গানের পিরিতি আর স্পিরিচুয়ালিটি ভালো লাগে আমার, ধর্মরে লুকাবারও কোন চেষ্টা পাইতেছি না এইখানে, তাতে পিরিতির কমতি হইতেছে না কোনভাবেই।

কিন্তু কতক রোমান্টিক কবি যেন তুমুল সেক্যুলার, কেউ বা এথেইস্ট; তারা আরবান ক্রাইসিস থিকা মানবতাবাদ এইসব নামের হাওয়াই মাল লইয়া কবিতা লেখেন, খুব যেন সেক্যুলার, তাগো যেন আটকানো যায় না কোন ধর্মে, গ্লোবাল সিটিজেন তারা–ফ্রি হিউম্যান বিইং; এমন সব কবিরা জনম-মরণের এই সাইকেল দিয়া খুব রোমান্টিক হইয়া ওঠেন, আবার লুকাইয়াও রাখেন তাগো রিলিজিয়াস মন!

ধর্ম লুকাইয়া ধার্মিক হিসাবে বাঁচার এই ব্যাপারটার ওস্তাদ মনে হয় আছিলেন রঠা; উনি ব্রাহ্মধর্মের গান লিখলেন সারা জীবন, সেইগুলা ঢাকা-কলিকাতার সেক্যুলার-বাম-এথেইস্টদের পেয়ারের গান, ধর্মের কোন গন্ধ না পাইয়াই ওনারা ধর্মে ব্রাহ্ম হইয়া বাঁচতেছেন। এই ওস্তাদের সাগরেদ আছে দুনিয়ায়, কয়েকজনরে চিনি আমি। এনাদের কাছে জনম-মরণের সাইকেলটা পেয়ারের মাল, কবিতা-গান লেখেন। এনারা আবার আমজনতার বাংলার থিকা দূরের, বড় জোর ১১% ‘শিক্ষিত’ বাঙালির কাছে চেনা এক শব্দে ডাকেন এই সাইকেলটারে–জাতিস্মর।

কবির সুমন যেমন, জাতিস্মর নামে এক গান লিখলেন, তুমুল পিরিতের গান, ঢাকা-কলিকাতার সেক্যুলার-বাম-এথেইস্টদের মজাইয়া ফেললেন তখনকার চট্টোপাধ্যায়। ১৯৯৫ সালে বলিউডে শাহরুখ-সালমান খানের এক সিনেমা হইছিল, নাম ‘করণ অর্জুন’, এই সিনেমায় জনম-মরণের সাইকেলটা আছিল সেন্ট্রাল থিম। তার দুই বছর পরে সুমনের ‘জাতিস্মর’ গান বাইর হয়; বলিউডের বানাইয়া দেওয়া এই ভাইব্রেশনেই হয়তো সুমন থিকা ঢাকা-কলিকাতার এখনকার রোমান্টিক কবিরাও দুলতেছেন! মাঝখানে অবশ্য আরেকবার ভাইব্রেশন রিনিউ কইরা গেছে ২০০৭ সালের ওম শান্তি ওম, দীপিকা পাডুকোন। রোমান্টিক কবিরা দুলুনি থামাইতে জানেন না ভালো, দুলতেই থাকেন।

কিছুদিন আগে কলিকাতার শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় দেখছিলাম এক কবিতা লিখছিলেন, এই কবিতার দুই লাইন পড়েন,

‘যখনই সন্ধ্যের ডাক, আলো ভেঙে পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে –

কেবল অতীত লিখবে, সে এই কৌশলে জাতিস্মর।’

 

ঢাকার ব্রাত্য রাইসুর দুই লাইন পড়েন,

যেন কোন জাতিস্মর অহেতুক

শৈশব নিয়ে শুয়ে আছে আকাশের তারাদের নিচে।’

‘জাতিস্মর’ দিয়া এনারা কবিতায় ‘দুয়েন্দে’ পয়দা কইরা ফেলছেন; ধর্ম করতেছেন না এনারা, কিন্তু তুমুল রিলিজিয়াস এই শব্দে রোমান্টিক হইয়া উঠতেছেন।

কিন্তু এমন তো করতেই পারেন কবি, অসুবিধা কি? এই ব্যাপারে আসলেই একটু ঝামেলা আছে! শ্রীজাত ঐ কবিতা লিখছিলেন মানবতাবাদী হিসাবে ধর্মের বিচার করতে যাইয়া, কবর থিকা উঠাইয়া মোসলমান মাইয়াদের রেপ করার কথা কইছিলেন ভারতের শিবসেনাদের একজন, শ্রীজাত তখন ত্রিশূলে কনডম পড়াইতে চাইয়া এই কবিতা লিখছিলেন।

খেয়াল করেন, এই শ্রীজাত বার বার জনমের আইডিয়া আবার ফলাইতেছেন এই কবিতায়, ত্রিশূলঅলা সেই ধর্মেরই আইডিয়া কিন্তু। যত নিরিহ ভাবেন এইটারে ততো নিরিহ কিন্তু না এইটা; হিসাব করলে পাইবেন, এই আইডিয়া কেমনে আরেকবার জাস্টিফাই করে শিবসেনাদের।

ধরেন, গোমাতার আইডিয়া বাদেও দেখেন, জাতিস্মর শ্রীজাতের মনে পইড়া গেল গত জনমের কথা, মনে পড়লো যে, উনি আছিলেন সেই বলদটা যেইটারে জবাই কইরা খাইছেন আপনের বাপে! বা ধরেন জাতিস্মর শ্রীজাত হিসাব কইরা দেখলো, ওনার ব্রাহ্মণ বাপে এমন আকাম-কুকাম করছিল যে সে মইরা এখন বাংলাদেশে একটা গরু হিসাবে ঘাস খাইতেছে! সেই গরুটারে যদি আপনে জবাই কইরা খান তার শোধ নেবে না শ্রীজাত? ত্রিশূল শ্রীজাত কবরে যাইয়া হইলেও আপনারে ধরবে। কারণ আপনে তার বাপের গোশত খাইছেন।

সেক্যুলার পরিচয়ে শ্রীজাত এইভাবে ধর্মকে নিজ কম্যুনিটির বাইরে লইয়া আসেন, গোপনে ঢুইকা পড়ার ধান্দা করেন রঠার মতোই। অন্য কম্যুনিটিরে পলিটিক্যাল দখলে নেবার কবিতা লিখতে থাকেন। শ্রীজাতদের মতো রোমান্টিক কবিদের হাতেই কম্যুনিটির বিশ্বাস কম্যুনিটি ছাড়াইয়া উঠে অন্য কম্যুনিটির উপর সেক্যুলার হামলার পায়তারা করতে থাকে। পরিচয় গোপন রাইখা অন্য সব কম্যুনিটির মনে এসথেটিক ঢুকতে চাওয়া সন্দেহ ছাড়া কি আর বাড়াইতে পারে!

আমি তবু হোপফুল; শ্রীজাতের বাংলাটা সমাজের আম বাঙালির, মানে ইংরাজের কলোনিয়াল ফেনা না খাওয়া বাঙালিরা বোঝে না ততো, বোঝার দরকারও নাই; শ্রীজাত ব্রাহ্মণ আম বাঙালিরে তার ত্রিশূল বানাইতে পারবে না এই অসামাজিক বাংলায় কবিতা লেইখা। এতে বড়জোর ঢাকা-কোলকাতার কলোনিয়াল ফেনাদের গা শিরশির করতে পারে, কিছু লোক মাছ-পশু-পাখি-গাছের ভিতর নিজের চৌদ্দগুষ্ঠির লিনিয়েজ তালাশে বাইরাইতে পারে, নাথিং এলস…।

১৫ ডিসেম্বর ২০১৭

 

লগে পড়েন:

ক. রিলিজিয়ন আর আর্টের দেনা-পাওনা

খ. ড. হুমায়ুন লইয়া ভাবনার কয়েক টুকরা

গ. শ্রীজাতের কবিতা লইয়াও আলাপ করি

 


Warning: Unknown: write failed: No space left on device (28) in Unknown on line 0

Warning: Unknown: Failed to write session data (files). Please verify that the current setting of session.save_path is correct (/var/cpanel/php/sessions/ea-php70) in Unknown on line 0