আর্ট কালচারের দোস্ত-দুশমন

১৯৬০-৭০ পূব পাকিস্তানে কালচারাল মুভমেন্ট করছেন বহু আর্টিস্ট-কবি-লেখক। বাংলাদেশ তাগো ড্রিম প্রজেক্ট।

তাইলে পোস্ট ফ্রিডমওয়ার তাগো ভাবনা কেমন খাড়াইলো? বাংলাদেশের পয়দা হইলো তো, তাইলে স্টেট/সরকার তো আর দুশমন থাকলো না, নিজেরাই তো সরকার! তখন, তাগো আর্টে ভিলেন কে হবে?

-------------------------

বাংলাদেশের আর্ট-কালচার ভালো কইরা খেয়াল করলে দেখবেন, নতুন দুশমন হইলো সমাজ আর জনগণ! সমাজ-সচেতন আর্টে দেখানো হইতেছে, সমাজ কেমনে কেমনে মানুষের উপর টর্চার করে! সমাজ পিরিতের দুশমন, শিক্ষার দুশমন, চিন্তার দুশমন, গরিবের দুশমন, ফ্রিডমের দুশমন, সমাজ কম্যুনাল, মাইয়াদের দুশমন।

নতুন এই দুশমন আর্টিস্টের মাথায় থাকায় কি কি লেখা যায় না, কোন কোন ব্যাপারে সিনেমা বানানো যায় না, সেই হিসাব হইছে রাজনীতি/স্টেটের বাইরে এক সমাজের কল্পনা কইরা, স্টেট সেইখানে দোস্ত, বাইরের কেউ–ভালোর জন্য সমাজে ঢুকতে চাইতেছে, আর্টিস্ট সরকারের এজেন্ট!

দুশমনের এই আইডিয়া আসলে আরো পুরানা। ইংরাজ আমলের কথা। শিক্ষা থিকা স্যানিটেশন তক, জেন্ডার বা কম্যুনাল ফ্রিডম–এইসব ব্যাপারে ইংরাজরা বর্বর সোসাইটিরে সিভিলাইজ করতেছে, এই ভাবনা শিক্ষিত নেটিভদের মাঝে কমন পাইবেন; চাকরির দায়িত্ব হিসাবে বিদ্যাসাগরের স্কুল-একটিভিজম, সতীদাহ, বিধবাবিয়া বা রোকেয়ার মুভমেন্ট লইয়া ভাবলে সাফ সাফ বুঝবেন।

এই মন বা দুশমন চিনা লইয়া আপনে যখন লেখেন, বা সিনেমা বানাইবেন সেগুলির ইস্যু কেমন হইবে? হোপফুলি, আপনে ‘টেলিভিশন’ বানাইবেন একটা, বা ‘লালসালু’ বা ‘রানওয়ে’ হয়তো; মাটির পুতুল? আপনের আফসোসগুলা কেমন হবে?

সেক্স সিন রাখা যাইতেছে না আপনের সিনেমায়, ধর্ম লইয়া কিছু কইতে পারতেছেন না, সেক্সুয়াল ফ্রিডম দেখাইতে পারতেছেন না। এইসবই তো আপনের আফসোস!

কিন্তু খেয়াল করেন, স্টেট/সরকারকে আপনের আর্টে দুশমন হিসাবে ভাবতে না পারায়, নিজেরে স্টেটের এজেন্ট ভাবায় আপনের মালুমই হইতে পারলো না কত কি!

১. আপনে হিল ট্রাক্টস্-এর ইস্যু-দখল-রেপ-মরণ লইয়া একটা সিনেমা বানাইতে পারবেন না দেশে।
২. রোহিঙ্গা-ইয়াবা-ট্রলারে আদম পাচার-স্মাগলিং-মাইয়া বেচাকেনা লইয়া সিনেমা বানাইতে পারবেন না।
৩. সুন্দরবন বা শালবন-বনের আশপাশের জীবন, রামপাল, মান্দিদের লইয়া সিনেমা বানাইতে পারবেন না।
৪. গোবিন্দগঞ্জ-সাঁওতাল-প্রাইভেটাইজেশন-উচ্ছেদ লইয়া সিনেমা হইতে পারবে না দেশে।
৫. কুইক রেন্টাল, চীন/ইন্ডিয়ার গাড়ি/বগি কেনা, ট্রান্সপোর্ট সিন্ডিকেট, ট্রানজিট লইয়া পারবেন? না।
৬. দেশের পাওয়ারের লগে দেশি-বিদেশি শক্তির কন্সপিরেসি লইয়া পারবেন? না।
৭. আর্মি-সিভিল আমলা/পুলিশ লইয়া? নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন লইয়া? তনু লইয়া? পারবেন না।
৮. শেয়ার বাজার? না।
৯. বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি? না।
১০. বুড়িগঙ্গা বা তুরাগের পানি, পাড়ের কারখানা, লেদার ইন্ডাস্ট্রি, ওয়েস্টেজ লইয়া? না।
১১. সার-বীজ-ট্রাক্টর-ধান-কৃষক-বাজার-তেল-রোজার দাম বাড়ার সিন্ডিকেট? না।
১২. বিডিআর বিদ্রোহ? না।
১৩. বর্ডার কিলিং? না।
১৪. মেডিকেল সেক্টর লইয়া একটা থ্রিলার, হসপিটাল কিলিং, সিজার, অর্গান ব্যবসা, ওষুধ আমদানী, ডাক্তারদের কেনা, প্রেসক্রিপশনে যেসব ড্রাগ লেখা হইতেছে…? না।
১৫. গার্মেন্টস্? না।

নিজে যোগ করতে পারবেন আরো। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ লইয়াও চেনা প্রোপাগান্ডার বাইরে পারবেন না। এখন কন, ভালো সিনেমা হবার বাধা কি কি? কে কোনটা হইতে দেয় না? বাজেট, সমাজ নাকি এই স্টেট/রাস্ট্র/সরকার আপনারে আটকায়? ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশান কোনগুলারে কইতেছেন তাইলে? আর্টিস্ট আপনের মাথা ঘামানো কি দরকার দেশের পাওয়ার স্ট্রাকচার লইয়া? আমরা কি ফ্রেন্ডলি পলিটিক্যাল সিস্টেমে আছি? সমাজই আপনের দুশমন? সমাজ যদি আসল দুশমন আপনের আর্টে, কেমনে তাইলে টিকেট বেচার আশা করেন জনতার কাছে? জনতার দুশমনের এজেন্ট হইয়া!

২৯ নভেম্বর ২০১৬