রক মনু

ক্লাসিক বাংলা লিটারেচারের মরণে আমরা যা হারাইলাম-১

১৯৩৫ সালে বৃটিশ ভারতের সরকারি ভাষা হয় ইংরাজি, তার আগে আছিল ফার্সি। ৩৫ সালে বাংলার যাগো বয়স ১০-১৫, তাগো মাঝে যারা বর্ণহিন্দু–বামুন বা ক্ষত্রিয় বা বৈশ্য, এনারা ফার্সি ভাষা জানতেন। বিদ্যাসাগর মনুসংহিতা পইড়া জানাইছেন, কায়স্থরা শূদ্র, কিন্তু বাংলার কায়স্থরাও ফার্সি শিখতেন। বর্ণের লগে রিলেশন খুব পোক্ত হয়তো আছিল না, যাগো পয়সা আছিল তাগো পোলারা ফার্সি শিখতো, সরকারি কাম পাবার আশায়। শূদ্রের পয়সা থাকার সম্ভাবনা কম, থাকলেও বর্ণহিন্দুরা সমাজের উঁচা পাটাতন থিকা শূদ্র খেদাইয়া দিতো; তাই ফার্সি জানলেও সরকারি কামে শূদ্রের ঢোকা কঠিন আছিল। আর কায়স্থরা বাংলায় বর্ণহিন্দুর স্ট্যাটাসেই আছিলেন।

কায়স্থ এবং অনার্য রঙের, কালা মধুসূদন সাগরদাঁড়ির বাড়ির কাছের মসজিদে ফার্সি শিখছেন মৌলভীর কাছে। দুনিয়ার পয়লা ফার্সি পত্রিকা আখবার পাবলিশ করছেন রামমোহন। রঠার বাপ দেবেন ঠাকুরও খুবই ভাল ফার্সি জানতেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত-মুন্সিরা বহু সংস্কৃত/ফার্সি বই বাংলায় তরজমা করছেন। খেয়াল করার ব্যাপার হইলো, এখন মুন্সি কইলে লোকে বোঝে মোসলমান, পণ্ডিত শব্দে ধর্ম অতোটা নাই। অথচ তখন পণ্ডিত মানেই বামুন হিন্দু বুঝাইতো, মুন্সি মানে হিন্দু বা মোসলমান, এমনকি যেকোন বর্ণের! কারণ, ফোর্ট উইলিয়ামে যারা সংস্কৃতের ওস্তাদ তাগো কইতো পণ্ডিত, আর যারা ফার্সির (বা আরবী) ওস্তাদ তারা হইলেন মুন্সি। বহু হিন্দুই ফার্সি জানতেন, আরবীও, তারা মুন্সি আছিলেন। যেমন, কোরান শরীফ বাংলায় তরজমা করা গিরিশ মশাই আছিলেন মুন্সি।

-------------------------

আমাদের ক্লাসিক বাংলা লিটারেচার মুন্সি শব্দটারে কম্যুনাল বানাইয়া তুলছে, পণ্ডিতকে কম্যুনিটির বাইরে আনছে। আমরা এইভাবে মিছা ইতিহাস জানছি।

ইতিহাস উল্টাইলো কেমনে? মধুসূদন বা বিদ্যাসাগরদের লিটারেচার পড়লে বোঝার উপায় নাই যে ফার্সি জানতেন তারা! ফার্সিরে ঘেন্না করতেন তারা, এইটারে মোসলমানি হিসাবে দেখতেন! অথচ মোঘল দরবারি আর্ট-কালচারে ইলাস্ট্রেটেড ফার্সি পর্নোও লেখা হইতো! মোঘল সরকারি ভাষা ফার্সি, মোঘলরা ধর্মে আছিলেন সুন্নি মোসলমান–এই কারণে ফার্সিরে মোসলমানি হিসাবে দেখলে ইংরাজি মানে খাড়ায় খৃস্টানি! সংস্কৃত যেমন দেবভাষা, তাতে সংস্কৃতরে হিন্দুয়ানি হিসাবে দেখার কারণ বেশি, অথচ তেমন কইরা মোঘলরা দ্যাখে নাই, জার্মান ম্যাক্সমুলার দেখে নাই, ইংরাজ দেখে নাই, মোসলমানরাও তেমনে দেখে নাই। কিন্তু ইসলামের বহু আগে থিকাই ফার্সি আছিল, জরথুস্ট্রও ফার্সি কইতেন, লিখছেন, ফার্সি লিটারেচারের লগে ইসলামের গোড়ার আরবী কোরায়শিদের ফ্যাসাদও আছিল, তবু ফার্সি নাকি মোসলমানি!

ফার্সির প্রতি ওনাদের এই ঘেন্নার ফলে মডার্ন বাংলা লিটারেচার কম্যুনাল এবং পুরাই আপার ক্লাস হইয়া পড়ে! সমাজে চালু বাংলারে ধোলাই করেন ওনারা, দেবভাষা ঢুকাইতে থাকেন হরদম। যেই দেবভাষারে ডিনাই কইরাই বাংলা ভাষার পয়দা! গৌতমবুদ্ধ, চর্যার বৌদ্ধরা বা বৈষ্ণব/বোস্টম বা ময়মনসিংহ গীতিকা বা মঙ্গলকাব্য, মোসলমান বাঙালিরাও বাংলা বানাইছিলেন আস্তে আস্তে, মডার্ন বাংলার বর্ণহিন্দুরা বাংলারে পুরা ঘুরাইয়া দিলেন, বাংলা লিটারেচারকে পুরা কম্যুনাল বানাইয়া ফেললেন! গরিব শূদ্র-মোসলমানের নাগালের বাইরে লইয়া গেলেন বাংলা লিটারেচার।

এই মরণে তাইলে কি হারাইলাম আমরা? কম্যুনাল মনের রিপ্রোডাকশন? মিছা ইতিহাস? ঘেন্নার চাষ? কোন এক বিষয়ে এলেম ইচ্ছা কইরা ভুইলা যাওয়া? ক্লাস এবং বর্ণের দেমাগ?

ক্লাসিক এই বাংলা লিটারেচারের মরণে আপনে কতটা দুঃখ পাইতে পারেন? অনেক দুঃখ পাইলে আপনের পরিচয় সাফ সাফ কন আমাদের।

 

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭