চ্যারিটি বনাম বিজনেস

দান-খয়রাতি বা চ্যারিটি টাইপের কামগুলারে বিজনেস বানাইয়া দিছে ডেভলাপমেন্ট ডিসকোর্স আর ক্যাপিটালিজম। এনজিওগুলার কথা ভাবেন। নন-প্রোফিট চ্যারিটি যেন, কিন্তু খুবই ভালো বিজনেস আসলে! এখন যদিও একটু পড়তির দিকে, কিন্তু অনেক ব্যবসাই তো করা হইছে। ডেভলাপমেন্ট ডিসকোর্সের লগে এনজিও বুম করার ডাইরেক্ট খাতির থাকলেও দুনিয়ার এই দিকে আদি এনজিও’র একটা মনে হয় বানাইছিলেন বেগম রোকেয়া! রঠার বিশ্বভারতীর নেচারও এনজিও টাইপ। অন্তত ডোনেশন নেবার বেলায় রোকেয়া এবং রঠা এখনকার এনজিওর মতোই কায়কারবার চালাইছে। মহাত্মা গান্ধী যেমন রঠারে চান্দা/ডোনেশন জোগাড় কইরা দিতেন, রোকেয়া বেশির ভাগ ডোনেশন পাইতেন ইংরাজ সরকার তরফে।

এদিকে, ক্যাপিটালিজমে ব্রান্ড ভ্যালুর আইডিয়া কাম করতেছে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলির (সিএসআর) কায়দায়। যেন চ্যারিটি, কিন্তু পয়সা নেবেন, প্লাকার্ড-ফেস্টুন রাখার জাগা দেবেন, নাম লইবেন, তাতে ব্রান্ডের সুনাম হবে, লোকে ভরসা পাইবে, কোম্পানির মাল কিনবে।

-------------------------

এইগুলারে শয়তানি কায়কারবার হিসাবে না দেইখা সিস্টেম হিসাবে বোঝা ভালো, এইগুলা হইলো সিস্টেমটা চালু থাকার মেকানিজম। এই আইডিয়াগুলা যদি আপনে ঠিকঠাক হজম করতে পারেন এবং যদি মানতে পারেন যে, সিস্টেমটা উল্টাইয়া ফেলতে পারতেছেন না কালকেই…তাইলে এইগুলারে ম্যানিপুলেট করারও কিছু রাস্তা পাইবেন, কিছু চিপাচাপা– সেই সব রাস্তায় আপনেও ভালো কিছু করতে পারবেন মনে হয়! ভালো কইলাম কোনটারে? হিসাব সোজাই আসলে; মানুষ বাঁচাইয়া রাখা, মানুষের মনে ফূর্তি পয়দা করা, আগের দিনের চাইতে দুইটা হাসি বেশি ফুটাইতে পারা মানুষের মুখে–এমন দুয়েকটা জিনিস যদি ভালোর বেসিস ধরেন তাইলে ভালো যে কোনটা বুঝবেন পানির মতোই!

যেমন ধরেন, চ্যারিটি যে বিজনেস, এই আইডিয়া লইয়া আপনে এতিমখানারে একটা বিজনেস ভেঞ্চার হিসাবে খাড়া করাইতে পারেন! মীনাবাজার টাইপের সুপার শপের মতো চেইন এতিমখানা বানাইতে পারেন, আস্ত একটা কর্পোরেট হইয়া উঠতে পারেন এতিমখানার বিজনেস কইরা!

একবার একজনের লগে কথা হইতেছিল; লগে আরো দুয়েকজন আছিল। উনি কইলেন তার ইন্সটিট্যুশনের কথা, সাবসিডি দিতে হইতেছে, পয়সা-স্পেস খরচ হইতেছে দেদার, উইঠা আসে না পয়সা! কইলাম, কর্পোরেটের সিএসআর থাকে না! আপনে সিএসআরটা আগে বানাইতেছেন, পরে কর্পোরেট হবে…চিন্তা কইরেন না! বাকিরা হাইসা দিলো, কিন্তু উনি মনে হয় ব্যথা পাইছিলেন মনে! মাফ চাইতে ইচ্ছা করতেছে এইখানে লিখতে লিখতে!

যাই হৌক, এইটা কইয়া বুঝাইতে চাইলাম–আপনের আগামী কর্পোরেটের সিএসআর হিসাবেও ভাবতে পারেন এতিমখানারে; তবে আমার আন্দাজ কয়, এতিমখানাই বিজনেস হিসাবে কামিয়াব হইতে পারে, এতিমখানার বিজনেস কইরাই কর্পোরেট হইয়া ওঠা!

ভাইঙ্গা কইতেছি। আপনে একটা এতিমখানা দেবেন, বাচ্চাদের রাখবেন, পড়াইবেন। পয়সা কই পাইবেন? এতিমখানার লগেই একটা ওল্ড হোম বানাইবেন, লাক্সারিয়াস ওল্ড হোম। টিভিতে অ্যাড দেবেন, এমন ফিচার থাকতে হবে যাতে বুড়া মানুষেরা পোলামাইয়ার বাসার বাজার করার বদলে ওল্ড হোমে থাকতেই চাইবে বেশি। নিজেদের পেনশনের পয়সাতেই তো থাকতে পারতেছে, সার্ভিস পাইতেছে, সিঙ্গেলরা প্রেমপিরিতের পসিবিলিটি দেখবে, মাইয়া বুড়া যারা থাকবে তাগো মেনোপজ হইয়া যাওয়ায় কোলেটারাল ড্যামেজের সম্ভাবনাও নাই! ইয়ার-দোস্ত পাবে, ফূর্তিতে কাটবে! হেলথ ইন্সুরেন্স করা থাকলে তো ফূর্তি আনলিমিটেড!

এই বুড়া লোকেরা এতিমখানায় কামের বদলে পয়সা কম দিয়া পারবে। এনারা বেসিক্যালি এতিমখানায় টিউশন দেবে, আর সব কামের কথা কইলে কিন্তু খবর আছে! মানে এতিমখানার মক্তবে মাস্টার রাইখা কোন খরচ করবেন না আপনে।

এইভাবে এনাফ পয়সা হবে না, লাভে যাইতে পারবেন না। এইভাবে লাভের চিন্তাও করবেন না, তাইলে ধরা খাইবেন পুরা। লাভ করতে হবে কর্পোরেটের পয়সায় এবং কর্পোরেটের লগে চুক্তি কইরা ক্রাউড ফান্ডিং-এর একটা সিস্টেমের ভিতর দিয়া।
এই যে আপনে সমাজের জন্য খুবই দরকারি দুইটা কাম করতেছেন, এইটারে হাইলাইট করবেন। ধরেন, বাংলালিংকের পর্দা থাকবে আপনের দুয়ারে-জানলায়, গেটের সাইনবোর্ডে নাম থাকবে, বাংলালিংক তাই পয়সা দেবে আপনারে। জেলায় জেলায় আপনের ব্রাঞ্চ থাকবে, সারা দেশেই বাংলা লিংকের সুনামের ঘ্রাণ ছড়াইয়া পড়বে আতরের মতো। গ্রামীণ আর রবি আপনের লগে চুক্তি করবে; পোলা-মাইয়া বাপ-মার লগে কথা কইলে পেরতেক মিনিটে ২ পয়সা পাইবে আপনের এতিমখানা, শ্বশুর-শ্বাশুরির লগে কথা কইলে পাইবে ৩ পয়সা! ধারের টাকা শোধ করেন বা শেয়ার বাজারে বাড়তি রিস্ক লইবেন না–এই কিসিমের নীতিকথা বেক্সিমকো লেইখা দিলো আপনের চারপাশের বেড়ায়, তার বদলে পয়সা দিলো। তারপর এই মহৎ আর দরদী কামে যাকাত-ফেতরা-উৎসর্গ-বলির পয়সা দিয়া সওয়াব কামাইয়ের মওকা কইরা দেবেন ধার্মিক মানুষদের। পয়সা দেবে মানুষ।

আপনে ভালো বেতন নেবেন, এমপ্লয়িদের ভালো পয়সা দেবেন, দেশ বিদেশে ঘুরতে যাইবেন এতিম-বুড়াদের লইয়া। পয়সা মারবেন না; তাইলে কিন্তু আখেরে কর্পোরেট হইতে পারবেন না আর! ট্রান্সপারেন্সি ছাড়া এই ব্যবসা খাড়াইবে না। নাহ্, ‘খাড়াইবে’ কমু না আর, কেমন একটা পোলা পোলা ব্যাপার! ট্রান্সপারেন্সি ছাড়া ফুলের মতো ফুটবে না এমন ব্যবসা।

#রক_মনু/ ১৮ জুন ২০১৭