রক মনু

আমাদের ডিপ্লোমেসি

পাবলিক প্রেশার রাষ্ট্রের চরিত্র বানাইতে বা বদলাইতে পারে; তবে এইটা ওয়েস্টার্ন মডেলের গণতন্ত্রের বেলায় খাটে। খাটে না চীন বা নর্থ কোরিয়া বা কিউবার বেলায়। দুইয়ের মাঝামাঝি আরেকটা সিস্টেম আছে ইরানে।
পাবলিক প্রেশার পয়দা এবং দেখা যাইতে হইলে মিডিয়ার উপর রাষ্ট্রের কন্ট্রোল একটু আলগা থাকতে হয়। ফ্রি মিডিয়া বইলা কিছু নাই, সেইটা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বা স্নোডেন ইস্যু দেখাইয়া দিছে; ওয়েস্টার্ন গণতন্ত্র স্রেফ একটা জুয়া খেলে; জুয়াটা হইলো, কন্ট্রোল যদি রিলেটিভলি আলগা থাকে তবু মিডিয়া আখেরে স্টেটের স্বার্থই দেখবে। এবং তাতে পাবলিকের মাঝে ফ্রিডমের একটা ইল্যুশন পয়দা হবে, এই ইল্যুশনটা স্টেটের এক্সপ্লয়টেশনের একটা কাভার হিসাবে কাম করবে।
এর বাইরে দুই বা তার বেশি দল থাকলে তারা যাতে বাই রোটেশন বা পালা কইরা জনতারে এক্সপ্লয়েট করতে পারে সেইটা কনফার্ম করতেও মিডিয়ার উপর কন্ট্রোল আলগা রাখতে হয়। মিডিয়া হইলো ভোটের কারখানা, এই কারখানায় ভোটারদের মন বানাইয়া দেওয়া হয়।
কিন্তু এইটা ফ্রিডমের ইল্যুশন হইলেও মানুষ এতে যে সুখটা পায় তার দামও তো কম না! বাস্তবে পিরিতও তো কতকটা ইল্যুশনই, তবু তার দাম কম না!
এই আলাপটা করতেছি রোহিঙ্গাদের লইয়া মায়ানমার-বাংলাদেশ টেনশনে চীনের পক্ষ বাছাই বুঝতে। চীন মায়ানমারের পক্ষ লইছে এবং চীনা মিডিয়ার উপর রাষ্ট্রের কন্ট্রোল খুবই কড়া, একটা মাত্র দল। মিডিয়ার উপর কড়া কন্ট্রোলের কারণে পাবলিক প্রেশার বোঝা যাইতেছে না।
কিন্তু আমরা এই দোষটা মিডিয়ার উপর কন্ট্রোলের কান্ধে দিতে পারতাম যদি কম কন্ট্রোলের দেশের মিডিয়া আর পাবলিক প্রেশার মানুষের হক আর ইনসাফের পক্ষে খাড়াইতো সব সময়। আমরা ভারতের কম কন্ট্রোলের মিডিয়া দেখতেছি গড়পরতা রোহিঙ্গাদের খুন করার পক্ষেই, ভারতের মিডিয়া এবং পাবলিক প্রেশার বরং মায়ানমারকে জাস্টিফাই করতেছে, ভারতও মায়ানমারের পক্ষেই! বাংলাদেশ চীন-ভারত ইস্যুতে ভারতের পক্ষ লইবার পরেও! বাস্তবে আমরা হিসাব করলে দেখবো অন্যের উপর হামলা এবং খুন মিডিয়ার উপর কম কন্ট্রোলের দেশগুলাই বেশি করছে! রাজতন্ত্রী সৌদী আরব আমেরিকান বোমা মারে ইয়েমেনের বাচ্চাদের উপর, ওয়েস্টার্ন ফ্রি মিডিয়া সেইটা ফিরাইতে পারে না, ঠিকভাবে কয়ও না এমনকি!
মানুষের একটা কালেকটিভ যদি মতামত দিতে পারে, কন্ট্রোল যদি আলগা করা/রাখা হয় তাইলে ‘বিবেক’ নামের কোন বস্তু পয়দা হবে–এমন ভাবনা ভুল। এমন ভাবনা ঠিক হইলে আমেরিকায় কালাদের পাবলিক লিঞ্চিং দেখতাম না, ভারতে গরু রক্ষার মব বা গ্যাঙ রেপ, বা বাংলাদেশের গণধোলাই আর গ্যাঙ রেপ পাইতাম না। ঐ বিবেক ঠেকাইয়া রাখতো এই মবগুলারে।
জাত-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ উতরাইয়া মানুষ হবার ডাক শুনি আমরা মাঝে মাঝেই; কিন্তু দুনিয়ায় দেখা যাইতেছে, মানুষ সাড়া দিতেছে জাত-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের হিসাবে! খেয়াল করলে দেখবেন, মানুষ হিসাবে মানুষের দরকারে সাড়া দেবার ঘটনা বরং হিউম্যানিজমের শ্লোগান পয়দা হবার আগেই বেশি আছিল! বাস্তবে এখন হিউম্যানিস্টরা মানুষের নয়া একটা জাত মাত্র, খুনাখুনির নয়া এজেন্ট মাত্র, আরেকটা দল বাড়লো আর কি!
তাইলে কোন দেশ কোন পক্ষে খাড়াইবে তার হিসাবটা যুদা! জাত-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের বাইরেও পয়সার রিলেশনও আছে, পয়সার রিলেশন ঐগুলারে মাঝে মাঝে আন্ডারমাইন করতে পারে, ছাপাইয়া উঠতে পারে। কিন্তু সবচে দরকারি ব্যাপার হইলো, লিস্টে সকল ইস্যু রাখা, সবগুলা লইয়াই হরদম নেগোসিয়েশন চালাইতে থাকা! 
চীনের সাবমেরিন কিনলাম আমরা। এবারে রোহিঙ্গাদের পুশ করার আগে থিকাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ভিকটিম। কিন্তু আমরা চীনা সাবমেরিন কেনার টাইমে রোহিঙ্গা ইস্যু লিস্টে রাখি নাই। বাংলাদেশ চীনের বড় বাজার, এই রিলেশন লইয়া নেগোসিয়েশনের টাইমেও আমরা রোহিঙ্গা ভুইলা থাকি!
আমাদের ডিপ্লোমেসির তেমনি দশা ভারতের লগেও। আমরা ট্রানজিট দিয়া ভারতের স্ট্যাবিলিটি রাখতে হেল্প করলাম, আমরা সুন্দরবন খুন করতে রাজি হইলাম ভারতের কয়লা-আবর্জনা লইতে রাজি হইয়া। আমরা তখন মায়ানমার ইস্যুতে ভারতের পজিশন পারস্যু করি নাই। ডিপ্লোমেসির অনেক লেয়ার থাকে, অনেক অনেক চ্যানেল; সবগুলা চ্যানেল খোলা রাখতে হয়। রোহিঙ্গা ইস্যু ৪০-৫০ বছর যাবত আছে, নতুন না। কিন্তু আমাদের ডিপ্লোমেসির ভাব দেইখা মনে হয় এইটা কেবল ১/২ মাস আগের ঘটনা!
এই দুই দেশ আর জাতিসংঘের বাইরেও আমরা জাপানের লগে আলাপ করতে পারি, কোরিয়া বা ইউরোপের দেশগুলাতেও আলাপ করতে পারি। অন্তত সবগুলা দেশে বাংলাদেশ এম্বাসিতে একটা ব্যানার লাগাইতে পারতাম অনেক আগেই। আমরা এর কিছুই করি নাই, করা শুরুর কথা ভাবতেছিও না! আমরা কেবল ভারত-চীনের পজিশন দেইখা টাসকি খাইয়া বইসা আছি! আমাদের স্মার্ট ডিপ্লোমেসি থাকলে ওদের এই পজিশন আগেই বুঝতে পারার কথা আমাদের! বাট তেমন ডিপ্লোমেসি থাকলে ওদের এমন পজিশনেই হয়তো দেখতাম না আমরা।