রক মনু

ভূঁইফোড় হইয়া উঠতে হবে আমাদের

বাংলাদেশের পলিটিক্যাল চিন্তা, আর্ট-এসথেটিক্স ১৯৭১ সালের আগের লিগেসি থেকে আজাদ করা দরকার। কেন?

১. বঙ্কিম–দীনেশচন্দ্র বাঙালির ইতিহাস লইয়া ভাবছেন, দুইজনার ভাবনার একটা মিলের জায়গা হইলো, বাঙালিও যে একসময় ইম্পেরিয়াল পাওয়ার আছিল সেই গর্ব; ওনারা গর্ব কইরা কইছেন, আজকের শ্রীলংকা থিকা জাভা-সুমাত্রা বাঙালির উপনিবেশ আছিল। কলোনিয়াল রিয়ালিটিতে কলোনিয়াল মাস্টার হইতে পারাই সিধা গর্ব, ওনারা সেই সিধা গর্ব করতে যাইয়া ইম্পেরিয়ালিস্ট চিন্তা করছেন; দীনেশ এমনকি আসামী ভাষারে বাংলা বইলা অস্বীকার করারেও দেখছেন ষড়যন্ত্র হিসাবে।

-------------------------

এই চিন্তার লিগেসির ভিতর আমরা আছি বইলাই হিল ট্রাক্টস-এর জাতিগুলি বা মান্দি-রাজবংশী-সাঁওতালরে আজকে আমরা বাঙালির অধীন হিসাবে দেখি, তাগো জাতি হিসাবে মানতেই নারাজ আমরা। নিজেদের পুরা বাংলাদেশটার মালিক ভাবতেছি আমরা, বঙ্কিম-দীনেশের কলোনিয়াল রিঅ্যাকশনারি মনের লিগেসি দিয়া ইম্পেরিয়ালিস্ট হইয়া থাকতেছি।

২. তো, এই আমরা কারা? বাঙালি হিন্দু নাকি কেবল বাঙালি নাকি বাঙালি মোসলমান? কোলকাতায় বইসা বিদ্যাসাগর বাংলা হরফ পরিচয় করাইয়া দিতে বাচ্চাদের জন্য বই লিখছেন; সেইটা যেনবা বাঙালির বই, কিন্তু সেইখানে থাকা নামগুলি সবই হিন্দুদের–রাম, সুরবালা, শ্যাম এইসব। কোলকাতায় পয়দা হওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ অমনই, উপরে বাঙালি হইলেও ভিতরে বইসা রইছে বাঙালি হিন্দু! বঙ্কিম ‘বাঙালি মোসলমান’, ‘অনার্য হিন্দু’, ‘আর্য হিন্দু’– বাঙালির এইসব ভাগের কথা কইলেও, বাংলার কৃষক হিসাবে রহিম শেখ আর রানা কৈবর্ত (মাইয়া কৃষক নাই কিন্তু) দেখাইলেও তার থেকে যেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ নেয় কংগ্রেস বা কোলকাতা সেইটাও সমান হিন্দু, আসলে আর্য হিন্দু (তাই রেসিস্ট), বিদ্যাসাগরের মতোই, বড়জোর ব্রাহ্ম!

পরে আমরা পাইলাম বাঙালি মোসলমানের নাক বা গলা, মীর মশাররফ-নজরুল থিকা মুসলীম লীগ, আশরাফ মোসলমান বাঙালি হিসাবে নিশান উড়াইলেন, পার্সি অরিজিনের আর্য হইলেন, ১০০০ বছর আগের বখতিয়ার খিলজির জয়ে ফূর্তি করলো বাঙালি মোসলমান। হিন্দুরা বাংলারে কইছিল সংস্কৃতের মাইয়া, আমরা সেইখানে ফার্সি-আরবি ঢুকাইয়া প্রতিশোধ নিলাম। কোন পক্ষই একবারো চাইলেন না অনার্য দেশী হিন্দু-মোসলমানের দিকে, তাগো বুলির দিকে। আর্য হিন্দু-মোসলমানের গর্ব হইয়া উঠলো এই যে, তারা কেউ দেশী না! এই গর্ব এতোই পোক্ত যে, কোলকাতার সাব-অল্টার্ণ স্টাডিসও নিজেদের অনুবাদ করে ‘নিম্নবর্গ’ হিসাবে, যেইটা সংস্কৃত কারখানায় বানানো শব্দ, দেশী বাংলার ভিতরে থাকলেন না! আমাদের মার্ক্সবাদীরাো পিরিত করে শ্রমিক, সংহতি–এইসবের লগে, যখন সারা বাংলাদেশ কইতেছে ‘লেবার’! এমনকি দেশের সমাজে ‘বাম’ কইলে কুফা বুঝলেও, ওনারা বাম পরিচয়ে জনতার লগে বিদেশি বাংলায় পিরিত করতে যান! এর ফল কি? সোজা হিসাবে, আমরা আর গণতান্ত্রিক হইতে পারি না, আমরা যে গণতান্ত্রিক না, সেইটাও বুঝতে পারি না, আমাদের মাঝে গোপনে খেলা করতে থাকে রেসিজম!

৩. রেসিজম আমাদের এমনভাবেই দখল কইরা রাখছে যে, আমরা এমনকি এইটারে পজিটিভও ভাবতে থাকি! কইতেছি, শিকড় বা রুট লইয়া একটা যে আলাপ আছে সেইটার কথা। শিকড় বা রুটের এই ভাবনা আমাদের বেদের আর্য বা পার্সি/ইরানি আর্য হবার দিকে লইয়া যায়, খাড়া নাক আর গায়ের রঙের দিকে খেয়াল করি আমরা, পোলা-মাইয়া হইলে নাক টাইনা লম্বা করতে চাই, গায়ের রঙ আরেকটু সাদা কেমনে করা যায় সেই তালাশে থাকি। সমাজে মাইয়ারা দুর্বল বইলা এর পয়লা ভিকটিমও হইতে হয় তাদেরি! বংশের বনেদিয়ানা প্রুভ করার ধান্দা করি, আমাদের গরিব ঘেন্নার ভিতর ঢুইকা থাকে রেশিয়াল ঘেন্নাও!

আমরা ইতিহাস কইলে প্রায়ই বুঝতে থাকি শিকড় বা রুটের তালাশ, আবিষ্কার! ১৪ পুরুষ খুঁজি, মায়ের হিসাব বাদ, ১৪ পুরুষ আগের কেউ আর আমি যেন একই লোক, দুনিয়াদারি লইয়া তার হিসাবে যেন আমারো চলবে! ফলে, আজকে আমি যাগো লগে থাকি, যেমনে থাকি সেইসব পাত্তা দেই না, পূর্বপুরুষের ইজ্জতের জন্য নিজেরে কোরবানি দেই, অন্যদেরো; আবারো, আমরা আর গণতান্ত্রিক হইতে পারি না!

৪. গণতান্ত্রিক হবার জন্য আমাদের ভূঁইফোড় হইয়া উঠতে হবে, ইতিহাস আমাদের জন্য টিউটোরিয়াল, কি করলে কি হইতে পারে, কোন রাস্তায় রক্ত বেশি সেই হদিস দেবে ইতিহাস, শিকড়ের না। শিকড়ের হদিস দিলেও আমি আর আমার শিকড় দুই মাল, শিকড়ের খাসলত যেন আমারে দখল করতে না পারে!

সকল লিগেসি থেকে আজাদ হইতে পারলে আমরা সাফ সাফ দেখতে পারবো আজকের বাংলাদেশে আমরা থাকি, আরো অনেকেই থাকে–জাতি আছে বহু, ধর্মও, এমনকি লিঙ্গও। আর আর জাতির লোকেরা তার তার কথা কইবে, আমি যেহেতু বাংলায় কই, ভাবি, লিখি তাই বাংলার কথাই কই আমি।

ঐসব লিগেসির বাইরে যাইয়া/থাইকা, গণতান্ত্রিক হইয়া বাংলাদেশী গান শুনি, খেয়াল কইরা দেখি,

‘ভ্রমর কইও গিয়া…, বা ‘বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা…’ বা ‘ আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার বারিস্টার…’ বা ‘হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস…’– সবই বাংলাদেশী বাংলা গান, কোনটায় হিন্দুয়ানি, কোনটায় মোসলমানি–কম্যুনিটির এইসব দস্তখত এগুলিরে বাংলাদেশী হইতে আটকায় না, এগুলি নিজ নিজ ইতিহাসের ছবক মাত্র, আমার ইতিহাস দিয়াও আমার মতো পইড়া নিতে পারতেছি, মুশকিল হইতেছে না কোনই…

৩০ অক্টোবর ২০১৬