গীতার কালা গতর আর কলা পাতা বিজেপির সরল হায়ারোগ্লিফিক

গীতা আর রাজু মহালি হইলেন নকশালবাড়ির এক ট্রাইবাল (শিডিউল কাস্ট) ফেমিলি। বিজেপির মোড়ল অমিত শাহ এই ফেমিলির বাড়ি বারান্দার ফ্লোরে যোগাসনে বইসা দুপুরে ভাত খাইছেন, কলা পাতায়। এই ঘটনার ৭ দিনের ভিতর গীতা আর রাজু মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতার বাড়িতে থাকা শুরু করছেন, বাচ্চারা আরেক আত্মীয়ের বাসায়। গীতা হিন্দিতে জানাইছেন, তাগো ভালো লাগছে, তাই তারা তৃণমূলে যোগ দিছেন; বিজেপির দাবি, গীতা-রাজুর বডি ল্যাংগুয়েজে কয়, তারা ডরাইছে, জোর কইরা তৃণমূলে নেওয়া হইছে তাগো। এই ঝগড়ায় সব পক্ষই একটা ব্যাপার চাইপা যাইতেছে, বা মিস করতেছে। আসেন ইমেজ পড়ি।

গীতার তুইলা দেওয়া ভাত কলা পাতায় খাইতেছেন অমিত শাহ, ছবিটারে ভারতের কনটেক্সটে বসাইয়া লন আগে। কনটেক্সটটা কেমন? উঁচা কাস্টের হিন্দু শূদ্রের হাতে খাইবেন না। এই কাস্টের আইডিয়ার ভিতর আবার খুবই নজরে পড়ার মতো, কিন্তু বলাকওয়ার বাইরে থাকা জিনিস হইলো রেস। ঐ উঁচা কাস্টের (ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়) লোকেরা আর্য, আমাদের দেশে যেমন ইরান-তুরান থিকা আসা মোসলমানরা আশরাফ মোসলমান–আর্যের আরেক ব্রাঞ্চ, আরেকটা ব্রাঞ্চ যেমন ইংরেজরা। রেস এবং কাস্ট সিস্টেমের এমন জটিল কনটেক্সটে পয়দা হইতেছে ঐ ছবি। গীতা আর রাজু হইলেন শূদ্র। ইন্টারেস্টিং হইলো, অমিত শাহ জৈন, হিন্দু না ঠিক। আবার, হিন্দু কইতে অনেকেই যেমন ধর্ম বোঝেন, বিজেপি বা রঠা হিন্দুরে দেখতেছে জিওগ্রাফি দিয়া, বিজেপির কাছে ধর্মটা হইলো ‘সনাতন ধর্ম’। জৈন সনাতন ধর্মেরই আরেকটা ব্রাঞ্চ বা ডাল–গোড়াটা একই ইন্ডিয়ান। তো, অমিত শাহ হইলেন, জৈন ক্ষত্রিয়। আর্য-শূদ্রের শরীলের ব্যাপারে যেমন কওয়া হয়, ছবিতে দেখেন, অমিত শাহ ফর্সা, গীতা কালা। যাই হৌক, বিজেপি হিন্দু ধর্মরে অমন কইরা ‘সনাতন ধর্ম’ হিসাবে দেখে বইলাই অমিত শাহ বিজেপির মোড়ল / প্রেসিডেন্ট হইতে পারছেন।

-------------------------

এই কনটেক্সটে তাইলে ছবিটা কি কইতেছে? উঁচা কাস্ট শূদ্রের হাতে খাইবেন না, এমন একটা কনটেক্সটে শূদ্রকে ইজ্জত দেবার রাস্তা বা তরিকাটা কেমন হবে– শূদ্রকে খয়রাত দেওয়া, নিজের ঘরে তুইলা লওয়া নাকি শূদ্রের হাতে খাওয়া? অমিত শাহ শূদ্রের হাতে খাইছেন, ছবি আছে, শূদ্রের বাড়ির ফ্লোরে আসন গাইড়া বইছেন, কলা পাতে ভাত খাইতেছেন, শূদ্র গীতা তুইলা দিতেছে ভাত-শালুন। ছবিটাই এমন স্টেটমেন্ট দিয়া দিলো যেইটা আর কইতে হয় না মুখে, এ এক এমনই স্টেটমেন্ট যার লগে গীতা-রাজুর ১৪ গোষ্ঠী তৃণমূলে যোগ দেবার লগে কোনই রিলেশন নাই। মেসেজটা হইলো, ওয়েস্ট বেঙ্গলের বাম বা তৃণমূল বা কংগ্রেসের যেই ব্রাহ্মণের দখলে সেই ব্রাহ্মণের দখলে নাই বিজেপি, বিজেপিরে হিন্দুত্ববাদী আর কম্যুনাল বইলা ঐ ৩ দল গালি দেয়, কিন্তু বিজেপির চাইতে ঐ ৩ দলই বেশি মানে কাস্ট সিস্টেম (এইখানে মনে একটা জানার খায়েশ হইলো, রঠার রান্নাঘরে ব্রাহ্মণ ছাড়া কোন শেফ/পাচক আছিলো?)।

ছবিটা লইয়া মজার সব কায়কারবার হইতেছে। এক জায়গায় দেখলাম, ছবির ফ্রেম থিকা গীতারে কাইটা দিছে। বিজেপির আগ্রহ হইলো, ছবিতে ৩/৪টা জিনিস এস্টাবলিশ করা।

১. আর্য-অনার্য ডিভিশনটা ক্লিয়ার করা/রাখা।

২. উঁচা কাস্ট শূদ্রের হাতে খাইতেছে।

৩. শূদ্রের ঘর ছবিতে ক্লিয়ার করতে হবে।

৪. শূদ্র যেমন গায়ের রঙে ক্লিয়ার করতে হবে তেমনি এই শূদ্রকে গরিবও হইতে হবে। সো, ছবির ফ্রেমে কলা পাতে ভাতটা থাকতে হবে। টেবিল নাই, ফ্লোরে আইডিয়াল গরিবের মতো বইসাই খাইতে হবে। গরিবানার লগে এমনে বসার একটা রিলেশন আছে; এমনে বইলে পেটে একটা চাপ পড়ে, চেয়ার টেবিলে যেই চাপটা থাকে না। তাই গরিবানার ভিতরে যেহেতু কম খাবার থাকার কথা, তাই গরিব ঐভাবে বইয়া খায় যাতে পেটে ঐ চাপের কারণে পাকস্থলি পুরা ভরার আগেই পেট ভইরা যাবার ফিলিং হয়। মানে হইলো, ঐ ভাবে বইসা আপনে কম খাইবেন।

সবগুলা ব্যাপারই অমিত শাহের ছবির ফ্রেমে রাখা হইছে। কিন্তু ঐ দল তিনটা এই ঘটনারে স্রেফ ধনী-গরিব, মানে ক্লাসের ইস্যুতে আটকাইয়া ফেলতে চায়, সেইটারই ভায়োলেন্ট এক্সপ্রেশন পাইতেছেন গীতারে কাইটা দেওয়া ফ্রেমে। বিজেপির কেবল ঐ ছবিটা দেখাইলেই হইতেছে, ছবিতেই স্টেটমেন্টটা ক্লিয়ার হইতেছে, আর ঐ ৩ দলের ডাইরেক্ট রিলিজিয়াস পলিটিক্স না করার কসম খাওয়া আছে। তাই তারা কইতেও পারতেছে না যে, অমিত শাহ জৈন, তার এই ভাত খাওয়ায় কাস্ট সিস্টেম লইয়া তেমন কোন স্টেটমেন্ট দেওয়া হইতেছে না! যদিও সেইটা কইলেও আসলে হবে না; কারণ, অমিত শাহের লগে ওয়েস্ট বেঙ্গল বিজেপির হিন্দু মোড়লও তো আছিল, এই মোড়ল দিলিপ ঘোষ অবশ্য কায়স্থ, ঠিক ফর্সাও না, কিন্তু কায়স্থরা এখন বেশ উপরেই, মধুসূদনের টাইমে না হইলেও! ওদিকে, অমিত শাহ যে হিন্দু না সেইটা কইলে বিজেপির ব্যাপারে ওদের সব নালিশই তো মিছা হইয়া যায় প্রায়! বা ঘোষ যে আর্য (বিদ্যাসাগর মনুর রেফারেন্স দিয়া কইছেন, কায়স্থরা শূদ্র।) না সেইটা কইলেও একই প্রোবলেম!  নালিশগুলা বরং নিজেদের ঘাড়েই আইসা পড়তেছে, কেননা ঐ ৩ দলের মাথারাই তো ফর্সা আর্য, শূদ্রই প্রায় নাই কোন :)!

ফর্সা-কালা বা আর্য-শূদ্রের ব্যাপারটা কোলকাতায় যে কত পাওয়ারফুল সেইটা মালুম হয় না এমনিতে। কারণ হইলো, কোলকাতার মেইনস্ট্রিম ইতিহাস লেখা লোকেরা ঐগুলা চাইপা গেছেন প্রায়ই! আমি ছোট একটা ঘটনা কই ১৫০ বছর আগের। ঘটনা মাইকেল মধুসূদনের। ভারতের টেনিস প্লেয়ার লিয়েন্ডার পেজকে অনেকে চেনেন মনে হয়; এই লিয়েন্ডার পেজ মধুসূদনের নাতি/নাতনির মাইয়ার পোলা। লিয়েন্ডার পেজ কালা, মধুসূদন হোয়াইট মাইয়া বিয়া কইরাও লিয়েন্ডার পেজকে ফর্সা রঙ দিয়া যাইতে পারেন নাই। মধুসূদন কালা আছিল। কোলকাতায় মধুসূদন জমিদারের পোলা, বাপে বড় উকিল; কিন্তু মধুসূদনকে আর্য হিসাবে মানে নাই কোলকাতা। গায়ের রঙের এই যে ব্যারিয়ার, সেই কারণে মধুসূদন হিন্দু হিসাবে কোলকাতার কোন আর্য ফর্সা মাইয়া বিয়া করতে পারতেন না, বড়জোর ফর্সা গৌরের লগে হোমোসেক্সুয়ালিটিতে যাইতে পারছেন, ইনফর্মালি।  সেইখান থিকাই মধুসূদন খৃস্টান হইছেন, কোলকাতার আর্য হিন্দুদের গায়ের রঙের দেমাগের প্রতিশোধ নিছেন মধুসূদন। খৃস্টান হইয়া একজন হোয়াইট মাইয়ার লগে পরকীয়া করছেন, আর দুই জন হোয়াইট মাইয়ারে বিয়া করছেন। এর কয়, দেখাইয়া দেওয়া :)!

কালা মধুসূদনের এই শূদ্র ট্রিটমেন্ট, কোলকাতার গায়ের রঙের দেমাগ, আর্যামীর এইসব কাহিনি যখন মধুসূদনের বায়োগ্রাফিতে চাইপা যাওয়া হয় তখন পরের মানুষের মনে হয়, রঙ বা আর্য বা কাস্টের এইসব কথা বানাইয়া কইতেছি আমি, অমিত শাহের ঐ ছবিতে ঐসব কোন স্টেটমেন্টই নাই! আসলে কিন্তু বাংলা না জানা জৈন অমিত শাহ ভারতের বাঙালি শূদ্রের মাঝে নিজের স্টেটমেন্ট দিতে খুবই সাকসেসফুল হইলেন!