দুনিয়ার দুয়ারগুলা

কয়েক মাস ধইরা আমি হালকা একটা নেশার ভিতর আছি। দুয়ারের নেশা! ১/২/৩ হাজার বছর আগের সব দালানের ছবি দেখি প্রায়ই, আর দুয়ার মিলাই! মেসোপটেমিয়া, ইজিপ্সিয়ান, গ্রীক, পার্সিয়ান, চাইনিজ, ওয়েস্ট আফ্রিকান, ইনকা, মায়া, পেত্রা, হরপ্পান, সাউথ ইন্ডিয়ান, কম্বোডিয়ান, বার্মিজ, রোমান, গোথিক, উজবেকিস্তানের, মুঘল–কত কত দালানের ছবি দেখলাম আর দুয়ার মিলাইলাম!

আমার নেশাটার শুরু মনে হয় কান্তজিউ’র মন্দির আর খাজুরাহোর দালানগুলার (মন্দির!) দুয়ার দেইখা।  খালি দুয়ার না, আর্কিটেকচারের দিক দিয়া (ভিতরের খুটিনাটি তো বুঝি না, ভিজ্যুয়ালি কইতেছি :)!) খাজুরাহোর দালানগুলির মিল পাইতেছি কম্বোডিয়ার আংকর ওয়াতের লগে। তামিলনাডুর পুরানা দালানও এই দলে পড়ে–অন্তত দুয়ারের হিসাবে। আর কান্তজিউর মন্দিরের দুয়ার পারশিয়ান-সেন্ট্রাল এশিয়ান মনে হইতেছিল তখন! মনে মনে নিজেরেই জিগাইলাম, হিন্দু-মোসলমান এতো এতো মারামারির ইতিহাস কয় লোকে, তার ভিতরেই কেন নিজের মনের ডিসিশনেই কেউ একজন হিন্দু মন্দিরের দুয়ার অমন বানাইবেন, যেইটা কিনা ‘ইসলামী’ কইয়া ফেলতে পারে কেউ কেউ! আজব ঠেকতেছিল ঘটনাটা! কান্তজিউর মন্দিরের বাকি গায়ের কারুকাজে খাজুরাহোর গায়ের কিসিমের খোদাই।

-------------------------

ও আচ্ছা, দুয়ার। মোটা দাগে দুই কিসিমের দুয়ার পাইলাম আমি; একটা ৪ কোণা–খাজুরাহো, কম্বোডিয়া-ইন্দোনেশিয়া, তামিলনাডু, মিশর, গ্রীক। আরেকটার উপরের দিকটা সার্কুলার বা ডিমের মাথার মতো–মোঘল, মেসোপটেমিয়ান, লেটার পারসিয়ান (আদি না), উজবেক, রোমান, কান্তজিউ’র মন্দির। ছবিতে দেখেন, বুঝতে সুবিধা হবে। ওয়েস্ট আফ্রিকা, চীন-জাপান আর মায়ানদের ভিতর পাশাপাশি দুইটাই আছে। থাইল্যান্ডের বেশি আগের দালানে ৪ কোণা দুয়ারই পাইলাম, কিন্তু মধ্যযুগ থিকাই মেসোপটেমিয়ান দিকে টার্ন নিছে, বার্মার বাগানেও এই টার্নটাই দেখা গেল, ওভারঅল স্ট্রাকচারে যদিও বার্মা-থাই-কম্বোডিয়া-ইন্দোনেশিয়া-খাজুরাহো ভিজ্যুয়ালি মিলতেছে! বার্মা-থাই বৌদ্ধ মন্দিরে অবশ্য গোল একটা চূড়া আছে যেইটা কম্বোডিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার শিবমন্দিরে পাই না। তবে গ্রীক দুয়ারের মাঝে মেসোপটেমিয়ান দুয়ারও আছে, কিন্তু আইকনিক গ্রীক দুয়ার মনে হইছে ৪ কোণাই!

আর্কিটেকচারে আমার অল্পবুদ্ধি লইয়া মনে হইলো, দুয়ারের উপরের দিকটা গোল করার আইডিয়াটা পয়দা হইছে মেসোপটেমিয়ায়; এইটার আর্কিটেকচারাল লজিক আছিল একটা, যেইটা বানাইতে হইছে বাবেলের টাওয়ার বানাইতে যাইয়া। মিথিক্যাল এই টাওয়ারের সহি কোন ছবি না থাকলেও ডেসক্রিপশন থিকা মধ্যযুগে যেই ছবি আকছেন … তাতে দেখা যায়, এই টাওয়ারে অনেক দুয়ার, প্রতিটা তলায়। ৪ কোণা দুয়ার হইলে এই টাওয়ার কলাপ্স করার কথা মনে হয়; কারণ, দুয়ারের উপরের দিকটা গোল হইলে উপরের ওজনটা যেমনে দুইপাশের খাম্বায় অনেকটা ট্রান্সফার করা যায়, চারকোণা দুয়ারে ততটা যায় না, দুয়ারের উপরের আড়াআড়ি ধারটার উপরেই বেশি ওজন পইড়া যায়। এখনকার রড-কংক্রিট টেকনোলজি পয়দা হবার আগে সেই যুগে ৪ কোণা দুয়ার দিয়া উঁচা উঁচা দালান বানানো কঠিন মনে হইলো, কলাপ্স করতে পারে।

আর ৪ কোণা দুয়ারের আদি মা মিশর। মিশর থিকা এইটা গেছে গ্রীক সিভিলাইজেশনে। তবে ৪ কোণা দুয়ার অবশ্য আরেকজনের কাছ থিকা নেবার ততো দরকারই নাই মনে হয়, দুয়ারের আইডিয়া থাকলেই হইলো, সেইটা এমনিতেই ৪ কোণা হবে মনে হয়, পাখি বা ইন্দুরের দুয়ার থিকাই দুয়ারের আইডিয়া পাইতে পারে মানুষ, ঐগুলা গোল হয় পুরা, আর মানুষ যেহেতু মাজা সোজা কইরা লম্বা হইয়া হাঁটে, ঢোকে বা বাইরায় তাই লম্বা ৪ কোণা। খোদা মালুম! তাই হয়তো অনেক যোগাযোগ ছাড়াই হরপ্পার দালানে ৪ কোণা দুয়ারই পাইতেছি আমরা। মুম্বাই’র মহেঞ্জোদারো সিনেমায় গোয়াড়িকর আউলাইয়া ফালাইছেন মনে হইলো, একটা আইকনিক দুয়ার দেখাইছে যেইটা মহেঞ্জোদারোর না মনে হইলো।

তবে মিশর থিকা নেওয়া কইলাম কারণ, গ্রীক তরবারি বা মূর্তিও মিশরের থিকা লওয়া। তরবারি অবশ্য মেসোপটেমিয়ারও হইতে পারে। দুই তরবারিই সোজা, ডাবল এজড; পরে আমরা যে আরব আর পারসিয়ান আর তুর্কি তরবারি পাইতেছি সেইটা বেসিক্যালি সিঙ্গেল এজড, বাঁকানো। জাপানি তরবারিও সোজা, তবে সিঙ্গেল এজড। চাইনিজ তরবারি বরং মেসোপটেমিয়ান বা ইজিপ্সিয়ান তরবারির লুক-এলাইক। ইজিপ্ট আর মেসোপটেমিয়া– দুই জায়গাতেই আছে এমন আরো একটা জিনিস হইলো, পিরামিড। পিরামিড অবশ্য চীন আর আমেরিকায়ও আছে। কিন্তু পিরামিডের ধরন দুইটা–মেসোপটেমিয়ান আর ইজিপ্সিয়ান। আমেরিকায় মায়ান সিভিলাইজেশন যেসব পিরামিড বানাইছে সেইগুলা ইজিপ্সিয়ান না, মেসোপটেমিয়ান। চাইনিজ পিরামিডে দুইটার ব্লেন্ডিং পাওয়া যায় মনে হয়।

যাই হৌক, দুয়ারে যাই আবার। ইজিপ্সিয়ান দুয়ার গেল গ্রীসে। কিন্তু ইউরোপের পাওয়ার সেন্টার গ্রীস থিকা রোমে ট্রান্সফার হবার পরে ইউরোপে যে দুয়ার পাওয়া যাইতেছে সেইগুলা আর ইজিপ্সিয়ান/গ্রীক নাই, সেইগুলা মেসোপটেমিয়ান ইনডাইরেক্টলি, ডাইরেক্টলি পারসিয়ান। ততদিনে মেসোপটেমিয়া ফল করছে, পারসিয়া হইলো নিউ সেন্টার। এদিকে, পারসিয়াও ইজিপ্সিয়ান থিকা মেসোপটেমিয়ান হইয়া উঠছিল মনে হয়; কারণ, আদিতে পারসিয়ান আর গ্রীক দুয়ার বেসিক্যালি একই ধরনের আছিল। গ্রীক টু রোমান দুয়ারের এই শিফট ভালো মালুম হয় জর্ডানের পেত্রায়। মোটের উপর, গ্রীক দুয়ার সার্ভাইভ করে নাই, ইউরোপের পরের সব দুয়ার মেসোপটেমিয়ান। তবে, ৪ কোণা দুয়ার সার্ভাইভ কইরা আছিল পূবের এশিয়ায়, দক্ষিণ ভারতে। কৈলাসের মন্দির থিকা খাজুরাহো তক, শ্রীলংকায়ও।

সাউথ ইন্ডিয়ার লগে কম্বোডিয়া-থাই রিলেশনটা ভাবা বেশ কঠিন। সাগরের মাঝখান দিয়া আন্দামান পার হইয়া সোজা কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডে যাইতো জাহাজ? হইতে পারে, তখন মাটির চাইতে সাগরে/পানিতে দূরে যাওয়া সোজা আছিল। তবে মজার ব্যাপার আছে একটা। আজকে নর্থ ইন্ডিয়াই যেন বেশি হিন্দু, সাউথ ততো না। কিন্তু সাউথের মন্দিরগুলা–খাজুরাহো বা কৈলাস বা তামিলনাডু বা কম্বোডিয়া-বার্মার শিবের মন্দিরের দুয়ারে ১-২ হাজার বছর আগের যেই ছাপটা আছে সেইটা উত্তর ভারতে নাই। এই ছাপটারে অবশ্য বেশি হিন্দু কইতে গেলে মুশকিল! প্রায় ২৫০০ বছর আগে গ্রীক আলেকজান্ডারের লগে যারা ভারতে আইছেন তারা ফেরেন নাই অনেকেই। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের লগে তাগো অনেক খাতির হয়, তাগো হেল্প মৌর্য এম্পায়ার বানাইতে কামে লাগান চন্দ্রগুপ্ত। পরে আমরা গ্রীক-বৌদ্ধ আর্ট পাইছি সেই রিলেশনের ফলেই। অশোকের বৌদ্ধ হইয়া পড়া সেই আর্টের জনমে বড় রহমত রাইখা গেছে।

তো, সেই মৌর্য আমলে পাটালিপুত্র থিকা দক্ষিণ ভারত আর কম্বোডিয়া তক একই কিসিমের ৪ কোণা দুয়ার গজাইছে, অনুমান করি গ্রীক মদদে। তবে এইগুলা বেশির ভাগই হিন্দুধর্মের দালান। তবে অশোকের খাম্বাগুলা যদিও শুরুতেই মনে করাইয়া দেয় যে, অশোক আসলে ‘পোলা’, লগে সাফ সাফ বোঝা যায়, এই পোলা খাম্বায় গ্রীক! ‘দেশি বয়েজ’ ইনফিরিয়রিটি আজকের হিন্দি সিনেমার মতো অশোকেরও কিছু আছিল মনে হয় :)!

খাম্বার চিন্তা কেমনে ছাড়ে পোলারা, মধ্যযুগে ফিরোজ শাহ যেমন ১০০ মাইল দূর থিকা সেই অশোকের এক খাম্বা উগলাইয়া লইয়া লাগাইয়া দিলেন নিজের প্যালেসের উপর, ফিরোজ শাহ্ ঘুমাইলেও সেই খাম্বা যেন খাড়াইয়াই থাকে!

কিন্তু অশোকের খাম্বা খাড়াইয়া থাকলেও দুয়ার কিন্তু থাকলো না ফিরোজে! মেসোপটেমিয়ার সেই দুয়ার পারসিয়া-সেন্ট্রাল এশিয়ায় ছড়াইয়া গেছে, তুরস্কে ছড়াইছে, সেইসবখান থিকা ভারতে, আলাউদ্দিন খিলজির লগে লগে। কালে কালে সেই দুয়ারের উপরের দিকে পান পাতার মতো একটা কোণাও গজাইছে।

ওদিকে রোমান আর্কিটেকচার যখন পারসিয়ান হাত ধরছে তখন ইজিপ্সিয়ান-গ্রীক থিকা বাইরাইয়া মেসোপটেমিয়ান দুয়ার বানাইছে। মধ্যযুগের স্পেনের ভিতর দিয়াও মেসোপটেমিয়ান দুয়ার ছড়াইতে পারে ইউরোপে। তবে কম্যুনাল ইউরোপের মন পারসিয়ান-সেন্ট্রাল এশিয়ানটার নাম দিছে ‘ইসলামী’, নিজেদের নাম রাখছে ‘ইউরোপীয়’! অথচ দুইটাই আসলে মেসোপটেমিয়ান!

কিন্তু পারসিয়ান-সেন্ট্রাল এশিয়ান এই দুয়ার উত্তর ভারত পুরা দখল করতে পারলেও দক্ষিণ ভারত পারে নাই। উত্তর ভারতে এই পারার কারণেই কান্তজিউর মন্দিরের দুয়ার অমন! এদিকে আগেই বৌদ্ধ সব খেদাইয়া হিন্দু-মোসলমান তুমুল মারামারির পরেও আসলে কালচারালি অনেকটাই হোমোজেনাস! আর সাউথ ইন্ডিয়ায় সেই না পারার ফলেই আজকেও আমরা একজন রজনীকান্ত পাইতে পারলাম, নো ওয়ান্ডার!

আজকে তাইলে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড কালচারালি যে অনেক দূরের মনে হয় তা আসলে ১০০০/১৫০০ বছর আগে এতো আছিল না! খাজুরাহো-আংকর ওয়াত মিলাইলে তাই মনে হয়। সেই কালের দালানের আরেকটা দিক হইলো, উপরটা পিরামিডের মতো উঠতে থাকা।

চীন-ভারত-কম্বোডিয়া/থাই-ইজিপ্সিয়ান/গ্রীক মিলাইয়া একটা ঢঙ খাড়াইছিল মনে হয়। কিন্তু কালচারাল মিলমিশের সেরা ঘটনা হইলো ইউরোপের গোথিক স্টাইল; গোথিকে এদিকের মিলের ঢঙের ভিতর ঢুকছে মেসোপটেমিয়ান দুয়ার!

তবে আর্কিটেকচারালি ইউনিক কিছুর নাম যদি করতে হয় সেইটা হবে ওয়েস্ট আফ্রিকার মাটি আর কাঠের স্ট্রাকচার। আরবি ভাষা নিছে, পারসি-গ্রীক নলেজ সেন্টার হইছে, কিন্তু দালান বানাইছে নিজেদের মতো–তাগো আর্কিটেকচারাল ডিসিশন তাগো দালানের মতোই চমকাইয়া দেয়!

  • Zahidul Islam

    ইন্টেরেস্টিং আর্টিক্যাল। তয় ফতেহপুর সিক্রি যেয়ে বুলন্দ দরওয়াজা দেখছিলাম। এমন পেল্লায় দরোজা আর কোথায় দেখলাম? চিতোর গড়, উদয় পুরে? তারপরেও বুলন্দ দরওয়াজার কথা ভোলা মুশকিল।

    বিলাতের কেল্লাগুলোর(ফোর্ট) দরোজাও মন্দ না।

    আমাগোর গ্রামের বাড়ির খিল আঁটা দরোজার কথাও মনে পড়ে। জোরে ঠাইস্যা ধরলে খুইল্যা যাইতো। ডাকাতির ভয় ছিল না।

    মধ্যপ্রদেশের দরিদ্র অঞ্চলে উষ্ণ অঞ্চলে দেখেছি অনেক ঘরের দরোজাই নাই। যা-ও আছে, সেটাও গরমকালে বন্ধ করা হয় না।