রক মনু

আমজনতার লগে বাঙালি মিডল ক্লাসের পিরিতি আর বেঈমানি

ভারত আর পাকিস্তানের বাঙালি মিডল ক্লাসের ইতিহাস খুব মজার। আমার সবচে মজা লাগে ছোটলোকদের লগে এই মিডল ক্লাসের খাতির আর বেঈমানির ঘটনাগুলি।

১৯৫২ সালের পাকিস্তানের কথা ভাবেন; বাংলাদেশের বাঙালি মিডল ক্লাস তখন কইলো, বরিশাইল্যা, নোয়াখাইল্লা, বগুড়া, সিলেট, চিটাগাং–সবাই বাংলায় কথা কয়, তখন যদি কইতো ‘প্রমীত’টাই বাংলা তাইলে তো বাংলারে স্টেট ল্যাংগুয়েজ হিসাবে দাবি করা যায় না! খুব খাতির তখন ছোটলোকদের লগে, ছোটলোকরা প্রমীত বাংলার বাইরে যেই কমন বাংলায় (মীনা কার্টুনে বা গোলাপী এখন ট্রেনে বা সুজন-সখী ইত্যাদি বহু সিনেমায় কমন ঐ বাংলাটা পাইবেন) কথা কয় সেইটাও বাংলাই।

-------------------------

১৯৫২ সালে জেতার পরেই কমন সেই বাংলাটারে ছোটলোকের বাংলা কইয়া মশকরা করলো, বেঈমানি করলো! মুখ ও মুখোশ সিনেমা বানাইলো ঢাকাই বাঙালি, সেই সিনেমায় ঘোর অশিক্ষিত ডাকাইতেও সহি প্রমীত বাংলায় কথা কইলো!

সেইটাই নাকি বাংলা সিনেমা, খুব প্রাইড, বাংলা সিনেমা বানাইছে একখান; পরে আরো বানাইতে থাকলো; ১০ বছরের মধ্যেই পুঞ্জি খুয়াইয়া মরে মরে দশা; অনেকেই উর্দু সিনেমা বানাইতে শুরু করলেন। তখন আবার ছোটলোকের লগে খাতির পাতাইতে বাধ্য হইলো! ১৯৬৬ (!) সালে ইবনে মিজান ছোটলোকের কাহিনি লইয়া সিনেমা বানাইলে রূপবান, আগে কয়েকটা মহা ফ্লপ বাংলা-উর্দু বানাইয়া জহির রায়হান ছোটলোকের কাছে হাত পাতলেন, বানাইলেন বেহুলা। কিন্তু প্রমীত বাংলার ব্যাপারে ছাড় দিলেন না! ধোকা দিলেন, সিনেমায় গান রাখলেন কমন বাংলায়, ডায়লগ প্রমীত বাংলায়। তবু বাঁচলো ঢাকাই বাংলা সিনেমা।

বাংলাদেশ হইলো, অমনি সেই বেঈমানি! কোলকাতার লিটারেচার লইয়া প্রমীত বাংলায় অনেক সিনেমা হইতে থাকলো; তবে পাশাপাশি কমন বাংলার ধারাটা পুরা মরলো না! গ্রামের মানুষ লইয়া বানানো সিনেমাগুলি হইলো ঐ কমন বাংলায়, ব্যবসার জন্য প্রমীতঅলারাও অমন সিনেমা বানাইলো। বহু হিট গান/ সিনেমাও হইলো কমন বাংলায়; তবু বাজ্জাক-বুলবুল-ববিতা-কবরী’র প্রমীত সিনেমাগুলিই আপহোল্ড করলো ঢাকাই মিডল ক্লাস!

১৯৮০ দশকে ঢাকাই সিনেমা আবার মরার দশায় যাইতে থাকলো; আগে তো হিন্দি-উর্দু-কোলকাতার বাংলা সিনেমা আছিল না বাংলাদেশে, ১৯৮০ দশকে ভিসিআর/ভিডিও ক্যাসেট আইলো দেশে! বাংলাদেশের স্টারডম খেদাইয়া টিভিতে ঢুকাইয়া দিতে থাকলো ঐ ভিডিও ক্যাসেট।

কী আর করা, আবার ছোটলোকের লগে খাতির! ঢালিউডে আইলেন তোজাম্মেল হক বকুল, ইবনে মিজান এইবার বানাইলেন রঙিন রূপবান! আরো কত কত সিনেমা হইলো এইসময়, ছোটলোকের কাহিনি লইয়া, কমন বাংলায় গান গাইলেও ডায়লগ বেশিরভাগেই প্রমীত বাংলা! কিন্তু বেঈমানি করতে খুব একটা টাইম নিলো না এবারো! সালমান শাহ্ আইলো এইবার, আশা পাইলো ঢাকাই মিডল ক্লাস! সালমান শাহ মরলেন অকালে, তবু খুব আশা আছিল না! এইবার স্যাটেলাইট টিভি আইছে, প্রাইভেট টেলিভিশন আইছে! হুমায়ুন আহমেদ আগেই বাংলা নাটকের ডায়লগ একটু সরাইয়া দিছিলেন, সিনেমায় কাম করছিলেন আমজাদ হোসেন-মাসুদ পারভেজ। সেই রাস্তায় ধীরে ধীরে আজকের টেলিভিশন পুরাই কমন বাংলার দখলে! লাভলু থেকে ফারুকী—যে যেই কারণেই করুক, কমন বাংলা ছাড়া নাটক বানানো যাইতেছে না!

আবার বেঈমানি করার টাইম হইছে, বাট পারতেছে না ঠিক! যৌথ প্রযোজনা দিয়া ট্রাই করতেছে, কাম হইতেছে না খুব! ঢাকাই মিডল ক্লাসের পোলা মাইয়া কমন বাংলার লগেই পিরিত করতেছে এখন!

ওদিকে ভারতের কি দশা? ভারতের বাঙালি মিডল ক্লাস কোলকাতা লইয়া আরামেই থাকতে পারবে ভাবছিল; তাগো আছে রঠা, সত্যজিৎ, উত্তম-সুচিত্রা-সৌমিত্র! ভারতে পয়লা ইংরাজি শিখছে তারা, বৃটিশ রাজধানী কোলকাতা! বলিউড/হিন্দি/হলিউড কিছু করতে পারবে না তাগো! 🙂!

তবু একসময় মরতেই হইলো প্রায়! কোলকাতা তখন হাত পাতলো ঢাকার কাছে, আরো সিধা কইলে বাংলাদেশের ছোটলোকের কাছে! বেদের মেয়ে জোস্না থেকে ঝিনুকমালা—ঢালিউডের কমন বাংলার বহু সিনেমা নকল কইরা বাঁচার ট্রাই করলো।

মাজা একটু সোজা হইতেই বেইমানি! একটু বলিউড মাসালা, একটু হলিউডি টেকনোলজি, তামিল-তেলেগু হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতেছে এখন, আর আছে ইনসেস্ট-ওরাল সেক্স-মাস্টারবেশন। সার্ভাইভালের কত কসরত, তবু জনতার কাছে যাইতে নারাজ, কমন বাংলায় কইবে না কথা, গাইবে না গান!

তো, যৌথ প্রযোজনার নামে চেনা এই দুই বেঈমানের দোস্তি কতটা সুবিধা করতে পারে দেখা যাক।

১২/১৩ আগস্ট ২০১৬

পি/এস: কারেকশন: ১৯৬৫ সালের রূপবান-এর পরিচালক ছিলেন সালাহউদ্দিন, ইবনে মিজান নন (ক্রেডিট গোজ টু Fahmidul Haq)।

আগস্ট ১৩, ২০১৬



১৯৭৮ থেকে ২০১০, ৩২ বছরের মাথায় আমজাদ হোসেনের দুই সিনেমা, গোলাপী এখন ট্রেনে আর গোলাপী এখন বিলেতে; আমজাদ হোসেনের এই ৩২ বছরের জীবনে যা কিছু ঘটলো সেইখানেই লেখা আছে ঢালিউডের হারের ইতিহাস!

এই গানটা লিখছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আমজাদের গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮) সিনেমায়; এই লিরিকস আর সিনেমায় ঢালিউডের সিগনেচার পাই আমি আমি, হিন্দি-উর্দু-কোলকাতার বাংলা সিনেমার থেকে ঢালিউড কোথায় কোথায় যুদা সেই পয়েন্টগুলি পাওয়া যাইতে পারে এইখানে।

এই গান বুলিতে কোলকাতা থেকে সইরা গেল–ক্রিয়ার এই প্লুরালিটি (দেইখা, হবে), ইংরাজি, ফার্সি আর সংস্কৃতের এই মিশেলই সহি ঢালিউড, এই ভাব ইসলামী, তবু মারেফতি, এই আধ্যাত্মিকতা বাংলাদেশের এবং অবিজ্ঞানে ভরা, আমজনতার লগে এই আর্টিস্টিক আলাপ–একই লগে আধ্যাত্মিক এবং এন্টারটেইনিং…যে যে কারণে আমজাদের নিজের সিগনেচার ছাড়তে হইলো অনেকটাই, ২০১০ সালে আইসা, সেগুলির তালাশেই মিলবে আমাদের সিনেমার ইতিহাস

“আছেন আমার মোক্তার
আছেন আমার ব্যারিস্টার।।

শেষ বিচারের হাইকোর্টেতে
তিনিই আমায় করবেন পার
আমি পাপী তিনি জামিনদার।।

মনের ঘরে তালা দিয়া
চাবি লইয়া আছেন সাঁই
আমি অধম সাধ্য কি তার
হুকুম ছাড়া বাইরে যাই ।।
মনরে………ওহো মনরে……।।

দুই কান্দে দুই মুহূরি
লিখতে আছেন ডাইরি।।
দলিল দেইখা রায় দিবেন
টাকা পয়সার নাই কারবার
সময় থাকতে মনা হুশিয়ার
আমি পাপী তিনি জামিনদার

সেদিনের সেই ইস্টিশনে
থাকবে নানান প্যাসেন্জার
দ্রুতযানে পাড় হবে সে
টিকিট কাটা আছে যার।।
মনরে………ওহো মনরে……।।

পারাপারের থাকলে তাড়া
সঙ্গে নিও গাড়ি ভাড়া।।
জবাবদিহি করতে হবে
ধরলে টিকিট কালেক্টার
সময় থাকতে মনা হুশিয়ার
আমি পাপি তিনি জামিনদার”

আগস্ট ৩, ২০১৬


সেইরকম ভাড়াটে ঝগরাটে মহিলার ভূমিকায় ববিতা ও বিখ্যাত সংলাপ

পুরাই পাঙ্খা !!! “সুন্দরী” চলচ্চিত্রে সেইরকম ভাড়াটে ঝগড়াটে মহিলার ভূমিকায় ববিতা এবং তার সেই বিখ্যাত সংলাপ “আমার নাম সুন্দরী, কন্ট্রাক নিয়া ঝগড়া করি”। প্রখ্যাত বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন পরিচালিত “সুন্দরী” (১৯৭৯) নামক অসাধারন কাহিনী ও চিত্রনাট্যের চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করেছেন ববিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা এবং জসিম। চলচ্চিত্রটি ৭টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। সুন্দরী চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরচালনা করেছেন আলাউদ্দিন আলী এবং গানের কথা লিখেছেন আমজাদ হোসেন। ফকির লালন সাঁইয়ের "সবলোকে কয় লালন কি জাত সংসারে" লালন গীতিটিও এ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এ চলচ্চিত্রের "আমি আছি থাকব" এবং "কেউ কোন দিন আমারে তো কথা দিল না" (কণ্ঠশিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন) গান দুটি বেশ জনপ্রিয় হয়।

Posted by Shyamal Kanti Biswas on Friday, April 1, 2016

1. “MD Osman Goni: এখন আর এমন ছবি হয়নাগো।
এমন আভিনয় ও কে করবে?”

2. “Abdul Kader: এসব ছবি এখন আর কেউ প্রচার করেনা । সেদিন দেখলাম ছবির নাম, “ ভাইজান, আইতাছি।””

(আমজাদ হোসেনের সুন্দরী সিনেমার ব্যাপারে ফেসবুক আলাপ)
——————————–
উপরের কমেন্ট দুইটা ইন্টারেস্টিং–আমার অনুমান, একই দুঃখ দুইজনের; এমন দুঃখ চারপাশে হামেশাই দেখি।

বাট যদি জিগাই, কেমন ছবি? মানে এমন ছবির আসল গুরুত্বটা কোনখানে? এর জবাব খুব দেখি না।

এই সিনেমা বা এমন সিনেমা যদি খেয়াল করেন আবারো, দুই তিনটা জিনিসে নজর দেন প্লিজ। প্রাইমারিলি, এগুলি খুবই পূবের বাংলার, মানে এখনকার বাংলাদেশের। কোলকাতার মৃদুমন্দ ভঙ্গিমা নাই এগুলিতে, কোলকাতা এগুলিরে কইবে চাঁড়ালের আর্ট। এই সিনেমাগুলি ঢোল পিটাইয়াই, হিউজ প্রাইড লইয়াই ‘চাঁড়ালের আর্ট’ আপহোল্ড করতাছে। উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্রদের ভদ্রতারে ডিনাই কইরাই এমন আর্টের পসিবিলিটি পয়দা হইছে।

ওদিকে চাঁড়াল কথাটা খেয়াল করেন; এইটা কিন্তু রেসিস্ট–ব্রাহ্মণ এবং শূদ্রের ইন্টারকোর্সের ফল; কোলকাতার আর্ট-কালচারের আইডিয়ায় অমন ইন্টারকোর্স হয় না, অমন ইন্টারকোর্স ভাড়ামির কামে লাগে বড়োজোর। ছোটলোক লইয়া সিনেমা বানাইতে পারে কোলকাতা, বাট তাতে ছোটলোকের লাইফস্টাইলের সেলিব্রেশন নাই, ছোটলোকের জীবনের পেইন ভদ্রলোকের দেখবার জিনিস কইরা তোলাই সেইসব সিনেমার কাম–ওইটা আর্টকালচার ম্যানুফ্যাকচারার বা কনজ্যুমারদের লাইফ না, অন্যদের জীবন দেখা মাত্র–প্যারিসে যেমন আফ্রিকানদের দিয়া ‘Zoo’ বানানো হইছিলো তেমন, সেই চিড়িয়াখানায়ও সিনেমার মতোই টিকেট কাইটা সাদারা দেখতে যাইতো। আইকনিক ‘পথের পাঁচালি’ মনে কইরা দ্যাখেন; করুণ ওই সিনেমা আরো করুণ হইয়া ওঠে কারণ ব্রাহ্মণ গরীব হইয়া পড়ছে, ইটের দালান ভাইঙ্গা পড়ছে, এক সময়কার বনেদি ড্রয়িং রুমে এখন সাপেরা থাকে (ওয়াইল্ডলাইফ কিসের সিম্বল এইখানে খেয়াল করেন)। সো, রায়বাহাদুর দেখাইয়া দিতাছেন–ছোটলোকের জীবন তো পেইনের, বনেদি ব্রাহ্মণ যদি সেই ছোটলোকের জীবনে পইড়া যায় তাইলে সেই পেইন আরো কতো বেশি বেশি ফিল করা যায়!

তাইলে সুন্দরী’র মতো সিনেমা না হওয়াটা আসলে কোলকাতারে আর ডিনাই না কইরা থাকার ডিসশন। কী অর্থ এর? ডিনাই করার ঘোষণাটাই বা কেমন আছিল আমজাদ হোসেনদের? ছোটলোক দেখাবার বেলায় কোলকাতার অমন ভঙ্গিমারে ডিনাই করাটা সবচে ভিজিবল হইয়া উঠছিল সিনেমার বুলিতে–ল্যাঙ্গুয়েজ-এ, ছোটলোকের লগে ইন্টারকোর্সটা ববিতার ডায়লগেই পাইবেন; এইটা কেবল ছোটলোকের বুলি/বাংলা না তো, এই বাংলাটা আরবান ঢাকার–সারা বাংলাদেশের মানুষেরা ঢাকায় আইসা যেমন বাংলা কওয়া শুরু করে, বিভিন্ন এলাকার লগে লগে ইংরাজি অরিজিনের শব্দেরা মিলছে এই বাংলায়। কোন এক বিশেষ এলাকার (নোয়াখালি বা বরিশাল) বাংলা সালাউদ্দিন লাভলুদের নাটকের মতো ফান করার ইনটেনশন লইয়া ঢুকানো হয় নাই এই সিনেমাগুলিতে–সব এলাকা এবং ক্লাসের ভিতর যোগাযোগ করার ইনটেনশনে এইটারে অনুমিত ‘কমন’ বাংলা হিসাবে ইউজ করা হইছে। ১৯৭০ দশকে এই ‘কমন’ বাংলা ডায়লগে বহু হিট সিনেমা হইছে, ৮০’র শুরুতেও মে বি। পরে আমরা সইরা গেছি; কখন, কিভাবে সেগুলি বলার জন্য বিস্তর তালাশ দরকার, কেউ না কেউ করবেন আলবত! আমার ধারনা, সামরিক এরশাদের টাইমেই প্রমীত বাংলার কোলকাতাইয়া দেশি ফিউডাল লর্ডরা বাংলাদেশের আর্ট-কালচারের জগতটা দখল করে আবার, ডেমোক্রেটিক বাংলাটারে দখল করে। যেই সালমান শাহ্’কে লইয়া কতগুলি লোক দুঃখ করে সেই সালমান শাহ্’র ভিতর দিয়াই ঢালিউডে ঐ কোলকাতাইয়া বাংলাটা পার্পেচুয়েটেড হয়।

মজার ব্যাপার হইলো, ২ নম্বর কমেন্টে যিনি দুঃখ করলেন সেইটা কিন্তু আসলে আবার একটা ডিনায়্যালের সম্ভাবনা দেখাইতেছে, ঢালিউড পইচা যাবার যেই দাগ দেখাইতেছেন উনি সেইটাই আবার ওই রকম সিনেমা হবার সম্ভাবনা আসলে। “ভাইজান আইতাছি”–ঢালিউডের সিনেমার এমন নাম আসলে আবার আশা জাগায়, যেমন জাগায় “খাইছি তোরে”। প্রোবলেম হইলো ক্ষমতা যেহেতু প্রমীত বাংলার দখলে তাই অমন নাম দেওয়া ফিল্মমেকারদের নলেজের ঘাটতি আছে, স্ক্রিপ্ট রাইটার নাই, ডিরেক্টর নাই ভালো, সরকারি টাকাও নাই।

মোটের উপর আরো টাইম লাগবে অনেক; সম্ভাবনা জাগানিয়া ফারুকী মনে হইতাছে রিকগনিশনের দিকে গেছেন অলরেডি–“যৌথ প্রযোজনা” আর ইরফান খানের কাস্টিং আলামত হিসাবে বেশ খারাপই যদি না ফারুকী এগুলি ম্যানিপুলেশনের ধান্দা থেকে কইরা থাকেন। “ম্যানিপুলেশনের ধান্দা” মানে কোলকাতারে সাচ্চা বাংলাদেশি সিনেমা খাওয়ানো, চাঁড়ালের আর্টের দখলের দুঃসাহস। ফারুকীর নতুন সিনেমার স্ক্রিপ্ট দেখলে আরো ফর্সা কইরা কইতে/ভাবতে পারতাম।

এপ্রিল ২০১৬


মিরপুর পুরবীতে চলতাছে ‘ঘাড়তেড়া’। ঢাকাই বাংলা সিনেমার নাম হিসাবে ঘাড়তেড়া পছন্দ করতে পারবেন না অনেকেই, বা আরেকটা সিনেমার নাম যেমন দেখছিলাম ‘খাইছি তোরে’। পছন্দ করতে না পারা এই লোকগুলি কারা? কেন পছন্দ করতে পারেন না তারা?

ঢাকাই সিনেমা লইয়া অশ্লীলতার একটা ডিসকোর্স আছে, জানি আমরা। লোকে হরদম ভাবে, অশ্লীলতা এমন কিছু যেইখানে সেক্সের কোন ব্যাপার থাকবে! তা তো না। আসলে অশ্লীলতা মানে হইলো ‘ভালগার’, বা ‘আনকালচার্ড’; অর্থটা অমন ঝপসা হবার একটা কারণ হইতে পারে ‘অশ্লীলতা’ শব্দটা কোন এক অসামাজিক মগজের আকাম, অসামাজিক মানে হইলো, বাংলায় কথা কওয়া কম্যুনিটির শব্দের জগতের কোন আইডিয়া নাই সেই মগজে, বা খুব সম্ভব ঐ কম্যুনিটির বেশিরভাগ যেসব শব্দ বোঝে সেগুলিরে ঘেন্না করেন সেই মগজের মালিক! ভালগার অর্থ আসলে ‘খ্যাত’, আরো পপুলার খুব সম্ভব ‘ছোটলোকি’, কুরুচিকরও হইতে পারে; আর কোন শব্দও হইতে পারে, মনে আসতাছে না আর, কইতে পারেন আপনেরা কেউ।

তো, ঐ ‘ঘাড়তেড়া’ বা ‘খাইছি তোরে’ সেই লোকগুলির কাছে ‘অশ্লীল’ বা ভালগার বা খ্যাত বা ছোটলোকি বা কুরুচির পরিচয়। ‘শ্লীল’ বা ভাল রুচি কেমন, বা কি? ঘাড়তেড়া না রাইখা সিনেমাটার নাম যদি ‘বীর্যবান’ রাখলে ওনারা ভাল রুচির খবর পাইতেন; ‘খাইছি তোরে’ না রাইখা ঐ অসামাজিক মগজ নাম রাখবেন ‘হুংকার’, বা ‘গর্জন’ বা ‘জিঘাংসা’ও হইতে পারে!

এখন, রুচির তফাত জগতের সব সমাজেই হয়তো আছে; কিন্তু এইখানে খেয়াল করলে দেখবেন, এইটা স্রেফ রুচির তফাত না, এইটা আসলে সমাজের বেশিরভাগ লোকের ভাষার ভঙ্গিমার প্রতি ঘেন্না, সমাজকে ডিকশনারিতে ঢুকাবার মতলব।

কিন্তু সমাজ ডিকশনারিতে ঢুকতে রাজি হয় না প্রায়ই, ডিকশনারি বাতিল হয় বটে!

ধরেন, বীর্যবান শব্দটা বেশির ভাগ লোকের বাংলায় এখন বড় আইড়াঅলা পোলার বেশি কিছু মিন করে না! হুংকার বা গর্জন একটু থাকলেও ‘জিঘাংসা’ তো নাই-ই!

তাইলে, ঢাকাই সিনেমার অমন নাম আসলে একটা তফাতের ঘোষণা, সংস্কৃতের মাইয়া হিসাবে বাংলা ভাষারে দেখতে নারাজ হওয়া। এই নামগুলির প্রতি ঘেন্না তাইলে দাবাইয়া রাখার ফন্দি!

এই ঘোষণাটা বিরাট কাম, বাংলায় পয়লা লিটারেচার হবার ঠিক আগের পর্ব যেন, তফাতে যাবার/থাকার ডিসিশন; দিন যাইতে থাকলে ভালো ভালো আর্টিস্ট পয়দা হবে, ভাল মুভি হবে তখন! সংসারের শুরুটা তো একটু ছ্যাড়াব্যাড়া থাকেই জালিম মুরুব্বিদের অমতে বিয়া করলে…

১৮জুন,২০১৬


আজকে দেখলাম কুমার বিশ্বজিৎ নামের এক সিঙ্গার মমতাজরে কিছু গালাগালি করলেন, সেইটা আসমান-জমিনে ছড়াইয়া দিছে ‘প্রথম আলো’ নামের ডেইলি পেপার। উনি কইছেন,

“এ ধরনের গান মমতাজের না গাওয়াই ভালো কুমার বিশ্বজিৎ, সংগীতশিল্পী
‘লোকাল বাস’ গান শুনে মনে হয়েছে এসব হালকা বিনোদনের জন্য। একজন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে দায়িত্ববোধ থাকা উচিত। লোকাল বাস কি কোনো সংস্কৃতি, কোনো গান? এসব গান নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। একজন সংস্কৃতিসেবী হিসেবে যার যার দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। গানে কাব্য, সাহিত্য, অন্তমিল থাকতে হবে। সংগীত এত সস্তা বিষয় না যে যা খুশি তা-ই করে গেলাম। আর মমতাজের মতো শিল্পীর এ ধরনের গান না গাওয়াই ভালো। তাঁর এ রকম অনেক গান আছে, যেগুলি গাওয়াই উচিত না। মমতাজের এখন অর্থবিত্ত বা নামের প্রয়োজন নেই। ওনার প্রয়োজন গভীরতা। এটাই আমার অনুরোধ।”

কুমার বিশ্বজিৎ-এর মতো আরো অনেকে ‘সংস্কৃতি সেবন’ কইরা থাকেন রেগুলার, তাদেরো এমনটা ভাবতে দেখছি বহুত। আপত্তিটা কই এনাদের? আমার অবজার্ভেশন হইলো, আপত্তির এই ভাজ থিকাই ‘খাইছি তোরে’ বা ‘ঘাড়তেড়া’ নামে বাংলা সিনেমায় আপত্তি করেন ‘সংস্কৃতি সেবন’ করা এই লোকজন। এই গান বা ঐ সিনেমার নামের কমন ব্যাপার হইলো– এগুলি বাংলাদেশের আম-জনতার বাংলা ভাষা, সব ক্লাসের লোকে বোঝে তেমন ভাব এবং বুলি।

এইটারে যদি আমরা ‘হালকা বিনোদন’ কই তাইলে আসলে কি বোঝাই– আম বাঙালি বুইঝা ফেলায় কি হালকা হইয়া গেল, এমন নাকি? গানে একটা ফূর্তির ভাব আছে, তাতে কি হালকা হইয়া পড়লো?

আমার কাছে সিম্বল হিসাবে কুমার বিশ্বজিৎ-এর ‘ওপেন হার্ট সার্জারি’র চাইতে ‘লোকাল বাস’ ওজনদার মনে হইছে, ‘লোকাল বাস’-এ যেই সোশিও-কালচারাল-সাইকোলজিক্যাল কনোটেশন আছে বা পাই তার ধারে কাছেও দেখি না ‘ওপেন হার্ট সার্জারি’কে; ‘লোকাল বাস’ এমনকি খুবই চিকনভাবে জেন্ডার ইস্যুও অ্যাড্রেস করে।

‘ওপেন হার্ট সার্জারি’ই বরং আমার কাছে চিপ ভাড়ামি, ‘Vodafone’ কইতে যাইয়া কতক বাঙালি যেমন আগলি হাসি দেন, তেমন একটা ভাড়ামি, শব্দ/ভাবের একটু টুইস্ট করা, নাথিং এলস্!

আমার কাছে যে অমন লাগলো সেইটা আমার কম বোঝার কারণে হইতেই পারে; কিন্তু তাইলে ১৫ বছর আগে আমি বেশি বুঝতাম মনে হয়! তখন আমি কোলকাতার বাংলায় লেখা বইপত্র পড়ি, কবিতা পড়ি, আর এখন বাংলাদেশের আমজনতার ভাব আর বুলির কবলে পইড়া, ডেমোক্রেটিক অর্থে দেশি হবার পরে নিজের ভিতর থাকা রেসিজম ইরেজ করতে পারার পরে যখন আর ‘বাঙালি একটি সংকর জাতি’, ‘মাগনা আলকাতরা পাইলেও খায় বাঙাল’–এইসব ভাবতে পারতেছি না বিদেশি বাংলার নাগরদের মতো, তখন কম বোঝা শুরু করছি, তখন আমজনতার ভাব/বুলি/মিউজিকের মাঝে ব্যাপক মজা পাইতে পারতেছি, ‘নতুন ছামায় বাল জালাইলে আরশি দিয়া দ্যাখে’–এমন সব কথারে কয়েকটা বিশ্বজিৎ-এর মগজের মাপে উইটি আর পোয়েটিক ভাবতে পারতেছি… 🙂 !

১০ নভেম্বর ২০১৬


আমার দূরে সরে যাওয়াই ভালো: ববিতা

http://bangla.bdnews24.com/glitz/article1222440.bdnews

সিনেমা/আর্ট হইতে উন্নয়ন, বাংলাদেশের সবগুলি সেক্টরেই যা কিছু দেশি তারেই আমরা ফালাইয়া দিছি, ছোটলোকের কায়-কারবার ভাইবা সেই সব নিতে আর রাজি হই নাই।

আমাদের প্রাইম মিনিস্টার ক্লাস ফাইভের বাচ্চার লগে ওয়াদা করেন, পায়রায় ব্রিজ কইরা দেবেন; নদীতে মানুষ মরে। আমরা কি তুলনা কইরা দেখছি যে, নদী না রাস্তা–কোন পথে বেশি মানুষ মরে? না। ফেরি উঠাইয়া দিয়া পায়রায় ব্রিজ করতে হবে। এই চিন্তার গোড়া কই?

আমাদের নদী আর পানি আছে, আজকের হাতির ঝিলের হবার কথা একটা পার্ট, বালু নদী দিয়া ঢুইকা সোনারগাও হোটেলের পিছে দিয়া খালে খালে ধানমন্ডি লেক হইয়া রায়ের বাজার দিয়া তুরাগে যাইতে পারার কথা নায়ে চইড়া, আরেকটা লাইন হবার কথা কল্যাণপুর খালের লগে, মিরপুর দিয়া তুরাগে; এদিকে বাড্ডা-গুলশানের মাঝখানের লেক দিয়া টঙ্গি পয়েন্টে তুরাগে নামতে পারার কথা। আজকে ড্রিমের মতো লাগে, বাট আজকের রিয়েলিটি নদী নিতে রাজি না হবার ফল। নদীর এমন নেটওয়ার্ক সারা দেশেই; বাট আমরা বাস-ট্রাক আমদানি করি কেবল, ব্রিজ বানাই হরদম, নদী মাইরা ট্রেন চালাই, যেই দলের মার্কা নাও, সেই দল ভুল উন্নয়নের নেশায় নাও চলার পানি বন্ধ কইরা দেয়! নদী আমাদের আবর্জনা রাখার গুদাম, আবর্জনায় ভরবে নদী, বাড়ি বানাবো!

নাও বন্ধ করার লগে নদী খালের সব মাছ মারছি আমরা, পরে তেলাপিয়া-পাঙ্গাস চাষ কইরা খাইতেছি; আমাদের খেজুর-তালের মিঠা আছিল, সব কাইটা আমরা মেহগনি আর আকাশমনি লাগাইয়া চিনি ইম্পোর্ট করতেছি, ধানখেতে ইনসেক্ট কিলার দিয়া মাছ-ঘাস মারছি, গরু-ছাগল ফার্মে ঢুকাইয়া ট্রাক্টরে ছাইয়া ফেলছি দেশ, আজকে আমরা গরু আনতে যাইয়া বিএসএফের গুলি খাইয়া মরি! প্লাস্টিকের ভ্যাট কমাইয়া দিয়া পাট মারছি! এলুমিনিয়াম দিয়া মারছি মাটির হাড়ি-পাতিল; যা কিছু দেশি তাই ফালাইয়া দিছি।

আর্ট-কালচারে? ভাটিয়ালি, বাউল, মাজার, বোস্টমীর গানরে আমাদের ভাবি নাই, নাম দিছি ফোক আর আঞ্চলিক, বা বিয়ার গানও, বাঈজির মিউজিক-ডান্স ফালাইয়া দিছি আমরা; আমাদের হইলো রঠার গান, কোলকাতার গ্রামোফোন ঠিক কইরা দিছে আমাদের গান, আমাদের আরবান ভাষা বা ভাব আমাদের আরবান লাইফ থেকে আসে নাই, আমাদের গ্রামের লোকের ভাষারে কইছি অশ্লীল–হাগা বা গু কইতে শরম লাগে, আমাদের সেন্স অব ভালগার ঠিক কইরা দিছে কোলকাতা!

আমরা ভালো সিনেমা বানাইতে চাইয়া কোলকাতার নভেলিস্টদের নভেল কনটেক্সুয়ালাইজ না কইরাই সিনেমা বানাইছি, সেই বাংলারেই ভাবছি আমাদের বাংলা! আর আমাদের আসল কমন বাংলাটারে আমরা কেবল গরিবদের নিয়া কিছু সিনেমায় রাখছি, আমরা কথা কই নাই এই বাংলায়! দুয়েকজন যারা বানাইতে চাইছে, রিকগনাইজ করি নাই আমরা!

আমাদের মেইনস্ট্রিম লিটারেচার/আর্ট কোলকাতার নকল, তারে গালি দিয়া যেই লিটল ম্যাগ এবং বাম আর্টের ধারনা গজাইছে সেইটাও কোলকাতার নকল! দেশের জনতার ভাষার আরো দূরে সেইটা!

এইসবের ফল কি? যা বিদেশি, এই সমাজের লগে কানেকশন নাই, তা খায় নাই মানুষ, সো সেই আর্টের/আর্টিস্টের রিপ্রোডাকশন হইতে পারে নাই, ওদিকে যা দেশি তারে রিকগনাইজ না করায় প্রোডাকশন/রিপ্রোডাকশন কোনটাই হইতে পারে নাই! সো, আমরা বানাইতে পারি নাই কিছু আর, রিপ্রোডাকশনের অভাবে নকলও করতে পারি না আর, জনতা খায় না বইলা চালানও ওঠে না আর! আমাদের বই সমাজ পড়ে না আর, সিনেমা দেখে না। আমরা মেঘমল্লার বানাই, তিনটা টিকিট বেচি, বুদ্ধিজীবী দোস্ত রিভিউ লেখে, আরেক দোস্তের সুপারিশে সরকার চারটা প্রাইজ দেয়, জনতা বোঝে না বইলা তিনটা গালি দিয়া সরকারি ফান্ড জোগাড়ে সরকারি দলে পাওয়ারফুল কন্টাক্ট তালাশ করি, দরকারে বিশ্বভারতীর ট্রেনিং লওয়া লোকের মারফত স্ক্রিপ্ট লেখাই!

এরা সব দূরে সরার আগে দেশি জিনিস হবে না, দেখা যাক ববিতার পিছে পিছে আর কেডা কেডা দূরে সরে।

০৫ অক্টোবর ২০১৬