রক মনু

দুবার বামের কবলে আওয়ামী লীগ, দুবারই গণতন্ত্র উচ্ছেদ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হাস্যকর বিষয়গুলির একটা তালিকা প্রকাশিত হলে ভালো হবে। দেশের নাগরিকদের হাসির উপলক্ষ প্রায় নেই ইদানিং! তাঁরা হাসির কিছু বিষয় পাবে হয়তো; নাগরিকরা মনে এবং ভাবনায় প্রধানমন্ত্রীর মতো হয়ে উঠে হলেও হাসির কিছু উপলক্ষ পাবে। খুবই উপকার হবে নাগরিকদের; কেননা, প্রধানমন্ত্রীর থেকে ভিন্ন কিছু ভাবা, করা, হাসা দেশে আর বৈধ আছে কি? থাকলেও সেটি এখন উপলব্ধি করা খুবই কঠিন হয়ে গেছে।

পুরো তালিকা পাওয়া না গেলেও একটা অন্তত জানা গেলো সম্প্রতি। নাগরিকদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। জাসদের কাছে গণতন্ত্রের কথা শুনতে হওয়াটা হাস্যকর প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীর এই হাসিতে যোগ দিচ্ছি আমি। তাইতো, গণতন্ত্র উচ্ছেদের জন্যই জাসদের জন্ম, সেই অঙ্গীকার এখনো আছে জাসদের। এবং এখনকার বাংলাদেশকে জাসদের সাফল্যের চূড়ান্ত দশা বলতে হবে। গণতান্ত্রিক দল বলে দাবি করা, জনগণের ভোটের অধিকারের জন্য বহুবার আন্দোলন করা সেই আওয়ামী লীগের মাধ্যমেই গণতন্ত্র উচ্ছেদ করতে পারলো জাসদ। ইনুকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্রুপের হাসিতে যাঁরা ইনুর হেনস্থা দেখছেন আর মজা পাচ্ছেন তাঁরা জাসদের এই বিরাট সাফল্য খেয়াল করছেন না!

-------------------------

জাসদের এই সাফল্য প্রধানমন্ত্রীও দেখছেন না; যাঁরে বিদ্রুপ/উপহাস করছেন তাঁর মতো হয়ে পড়ার ঘটনা খুবই আয়রনিক্যল বটে। গণতন্ত্র উচ্ছেদ করার বিষয়টা প্রধানমন্ত্রী অবশ্য স্বীকার করেন না; কিন্তু অস্বীকার করতে হলে কিছু প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে।

‘গণতান্ত্রিক’ দল আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রবিরোধী জাসদের সাথে অ্যালায়েন্স করে কিভাবে? ‘পাকা পাকা’ কমিউনিস্টদের নিয়া নেবার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী; বিদ্যমান বুর্জোয়া সাংবিধানিক গণতন্ত্র উচ্ছেদ করতে কমিউনিস্টদের অঙ্গীকার আছে। এই কমিউনিস্টরা আওয়ামী লীগে কী করছে তাহলে? ইনুকে বিদ্রুপ করবার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবিও করলেন আসলে; সরকার গঠনে নির্বাচনের দরকার আর না থাকার ঘটনাকে গণতান্ত্রিক বলা যাবে না। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের মাধ্যমে গণতন্ত্রের উচ্ছেদের ঘটনা তাহলে প্রমাণ করে না যে ‘পাকা পাকা’ কমিউনিস্টদের নিয়ে নিয়েছেন শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ; বরং উল্টোটাই প্রমাণ করে: ঐ কমিউনিস্টরাই শেখ হাসিনাকে পুরাটা নিয়ে নিয়েছে!

এবারে অন্যভাবে বোঝার চেষ্টা করা যাক; শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রবিরোধী বাম শরীকদের দখলে যেতে থাকে ২০০৬ সালের পর থেকে। ২০০৬ সালে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের গণমুখিতা এবং নমনীয়তা দেখিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। দেশের মোসলমান ভোটারদের মাঝে আরো জনপ্রিয় হওয়ার দরকার দেখছিলেন শেখ হাসিনা; তিনি তখন খেলাফত মজলিসের সাথে নির্বাচনী চুক্তি করেন। এই চুক্তির কঠোর বিরোধিতা করে তখনকার ১৪ দলীয় জোটের বাম শরীকরা। ২০০৬ সালের ডিউ নির্বাচনটি হয়নি; যদিও শেখ হাসিনা সম্ভবত আনুষ্ঠানিকভাবে সেই চুক্তি বাতিল করেননি, কিন্তু সেটি আর কার্যকর থাকেনি; বরং বাম শরীকদের সাথে সম্পর্ক আরো পোক্ত হয়। পরের মহাজোট সরকারে একাধিক বাম মন্ত্রী পাই আমরা। আওয়ামী লীগ বামের দখলে যাবার বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় ইনু তথ্যমন্ত্রী হবার পরে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সংশোধনী আনার মাধ্যমে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা পাকা হয়। গণতন্ত্রবিরোধী বাম তথ্যমন্ত্রীর এখতিয়ারে থাকা তথ্যপ্রযুক্তি আইনে গণতন্ত্রবিরোধী একটি সংশোধনী পেলাম। তাইতো হবার কথা; কিন্তু গণতান্ত্রিক দল গণতন্ত্রবিরোধী শরীকদের দখলে না গেলে কেন গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি এই সংশোধনী পাবো আমরা? আরো কিছু লক্ষণ পাওয়া যাবে শেখ হাসিনার কিছু শব্দ ব্যবহারে; জঙ্গি, জঙ্গিবাদ—এগুলি বাম ইনু এবং মেননের শব্দ; ইদানিং শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে এই শব্দগুলি। বিভিন্ন দেশে ‘এক্সট্রিমিস্ট’ শব্দটি গণতান্ত্রিক দল বা সরকার করে থাকে প্রায়ই; কিন্তু বাংলাদেশে এটি বেশ সেনসিটিভ এবং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এটি একটি মার্কিন টার্ম; এক সময়ের বাম এক্সট্রিমিস্ট ইনুরা/জাসদ যুক্তরাষ্ট্রের মতো করে জঙ্গিবাদ শব্দটি যাদেরকে বোঝাতে ব্যবহার করেন তাঁরা বাংলাদেশের সমাজে আলাদা ইমেজ নিয়েও পরিচিত এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রদ্ধেয়। ফলে এদের সাথে সরাসরি বিরোধে গেলে ভোটে প্রভাব পড়তে পারে। সম্ভবত সে কারণেই শেখ হাসিনা ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন না। বাম প্রভাবে শেখ হাসিনার কাছে ভোটের গুরুত্ব আর না থাকায় তিনি অনায়াসেই শব্দটি ব্যবহার করতে পারছেন।

কিন্তু এই প্রথম নয়; এর আগেও আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রবিরোধী বাম কবলিত হয়েছিলো। এবং বামের আওয়ামী লীগ দখল করার চেষ্টাও এই প্রথম নয়। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পাকিস্তানি হামলার অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার চাপ ছিলো তখনকার আওয়ামী লীগ প্রধান, পরবর্তী বাংলাদেশে সাংবিধানিক জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। সেই চাপে কাবু হননি তিনি; সেই চাপের সবচে উচ্চপর্যায়ে ৭ মার্চের ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি তিনি। আওয়ামী লীগের ভিতরে থেকে শেখ মুজিবের মাধ্যমে দূরভিসন্ধি হাসিল করতে না পেরেই ৭২ সালে গণতন্ত্রবিরোধী জাসদের জন্ম। কিন্তু শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ বাম কবলিত হয়ে পড়ে মাত্র ৩ বছরেই! ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ আত্মহত্যা করে, গণতন্ত্র উচ্ছেদ করে বাকশাল তৈরি করেন গণতান্ত্রিক জাতির জনক, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নামেন; বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী বাম কবলিত হয়ে বিপ্লবী হয়ে গেলেন! এক সময়ে তুমুল জনপ্রিয় নেতা জনগণের ভালোবাসা পুরোটা হারিয়ে ফেলেন; যাকে মুক্ত করতে, বাংলাদেশ স্বাধীন করতে যাঁর নামে নিষ্ঠুর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলো কোটি কোটি মানুষ সেই আশ্চর্য নেতা খুন হলেও দেশের মানুষ মোটেই বিচলিত হলো না!

দেশের মানুষের কাছে শেখ মুজিবের রাজনীতি যাবতীয় গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে বাম কবলিত হয়ে; কিন্তু জাতির জনক খুন হবার পরে সেই সরকারি বিপ্লব রক্ষায় কোথাও দাঁড়ায়নি এই বামেরা; আওয়ামী লীগ এবারে বাম কবলিত হয়ে গ্রহণযোগ্যতায় দেশের মানুষের কাছে কোন পর্যায়ে আছে? শেখ হাসিনা মাত্র দুইদিন বামদের কাছ থেকে দূরে থাকলেই সেটি বুঝতে পারবেন আশা করা যায়; শেখ হাসিনার পিতৃভক্তি পিতার ভুলের নতুন সংস্করণ তৈরি পর্যন্ত না গেলেই ভালো।

৯ জানুয়ারি ২০১৪