রক মনু

বাংলার মডার্ন লিবারাল চিন্তার ফাউন্ডেশন

‘ধর্মভীরু’ শব্দটারে খেয়াল করেন। শব্দটা বাংলাদেশের সেক্যুলারদের খুব পছন্দ, এইটা দিয়া তারা জনতারে ডিফাইন করেন।
শব্দটার ভিতর কিছু অনুমান পাইবেন। পয়লা অনুমান হইলো, মানুষের বিশ্বাস জিনিসটা ভূয়া, মানুষ আসলে ডরায়। ডরায় কারণ, তারা অশিক্ষিত এবং এই ডরের কারণেই তারা অশিক্ষিত। তাগো শিক্ষিত করা গেলে আর ডরাইবে না, তাইলে বিশ্বাস জিনিসটা অটো নাই হইয়া যাবে। এইভাবে বিশ্বাস এবং এলেম বা জ্ঞানের একটা ঝগড়া দেখাইতে চায় তারা। ধার্মিক কইলে এমনটা দেখানো মুশকিল হইয়া ওঠে, কেউ একজন তখন ধার্মিক বা বিশ্বাসী হইয়াও এলেমদার বা জ্ঞানী হইতে পারেন।
বাংলার ইতিহাসের ছোট্ট একটা ব্যাপার খেয়াল করলে এই সেক্যুলারদের চিন্তাটারে খুবই ফানি লাগবে আপনাদের, ভালো একটা আয়রনিও পাইবেন :)!
এইসব সেক্যুলারের এখনকার চিন্তার ফাউন্ডেশনগুলা খেয়াল করেন। দেখবেন, নাইন্টিনথ সেঞ্চুরির যেই লোকের চিন্তা এই সেক্যুলারদের প্রায় সব চিন্তার গোড়ায় আছে তিনি একজন ধার্মিক লোক আছিলেন! কইতেছি নাইন্টিনথ সেঞ্চুরির সবচে এলেমদার লোক, সবচে ধুরন্ধর, এবং সবচে ধার্মিক বঙ্কিমচন্দ্রের কথা। মানে হইলো, ধর্মকর্ম করতে করতেই বঙ্কিম সবচে এলেমদার হইতে পারলেন, কিন্তু ধর্ম ছাইড়া যাইয়া, ইমানসিপেটেড হইয়া তখনকার কত কত ফাটকা বিপ্লবী গরু বা শুকর দিয়া পাবলিকলি মদ খাওয়া ছাড়া বেশি কিছু  করতে পারে নাই! বঙ্কিমের কামের একটা লিস্ট বানাইয়া দেখি এই সেক্যুলাররা একটু শরমায় কিনা।
ক. ইতিহাস এবং রাজনীতি। আজকের সেক্যুলার বাঙালির ইতিহাসের গোড়া বঙ্কিম। এমনকি ‘বাঙালি মুসলমান’ টার্মটাও বঙ্কিম পয়দা করছেন। বঙ্কিমের ইতিহাস থিকা মডার্ন ভারত-বাংলা রাজনীতির শুরু। মডার্ন  হিন্দু-মোসলমান বাঙালি/ইন্ডিয়ানদের ভিতর ইংরাজ শাসন থিকা মুক্তির পয়লা খোয়াব দেখছেন বঙ্কিম, কেচ্ছা/ফিকশন/নভেল লেইখা পলিটিক্যাল টিউটোরিয়াল বানাইয়া গেছেন পরের কংগ্রেসের জন্য। আসলে পলিটিক্যাল পার্টির পয়লা খোয়াব দেখেন বঙ্কিম, প্রীতিলতা বা সূর্যসেন বঙ্কিমের বাছুর।
খ. কম্পারেটিভ লিটারেচার। মুক্তির খোয়াব বঙ্কিম দেখতে পারছিলেন বইলাই ইউরোপের লিটারেচারের লগে ভারতের লিটারেচারের এসথেটিক তুলনা করতে পারছেন। তুলনা কইরা দেখাইছেন ডেসটিমনার চাইতে শকুন্তলা বেটার। (এইখানে রেসিজম লইয়া একটু ভাবার আছে, কিন্তু সেইটা আরেক আলাপ।)।
গ. মার্ক্সিজম। বঙ্কিমের লগে মার্ক্সের পরিচয় আছিল না মনে হয়। ইউরোপে কার্ল মার্ক্স যখন সম্পদের মালিকানা এবং ক্লাস এনালিসিস লইয়া ভাবতেছেন-লিখতেছেন, বঙ্কিম সেই টাইমেই এইসব ইস্যু লইয়া ভাবতেছেন-লিখতেছেন। মার্ক্সের ভারত ভাবনার যতোটুকু এখন রিভাইস করার দরকার দেখে লোকে সেইটা বঙ্কিম তখনই কইছেন। মার্ক্স চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বোঝেন নাই, বঙ্কিম বুঝছেন বিদ্যাসাগর এবং আর সব কোলকাতাই ভাবুক-লেখকদের উল্টা খাড়াইয়া। ইউরো-সেন্ট্রিক চিন্তা মার্ক্সের উপর যেমনে আছর করতে পারছে সেইটা বঙ্কিমে পারে নাই, অথচ দুইজনেই ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের ভিত্রেই পয়দা হইছেন! চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত লইয়া আলাপে বঙ্কিম এখনো সমান ভ্যালিড।
ঘ. পোস্ট-কলোনিয়ালিজম। বাংলার চাষাদের লইয়া বঙ্কিমের আলাপের ভিতর কলোনাইজড মগজের বাইরের ইশারা আছে, কলোনাইজেশনের ভিত্রে পয়দা হইয়াই কলোনাইজেশনকে বিচার করার হিম্মত দেখাইছেন বঙ্কিম। এই হিম্মত উনি ধর্ম লইয়া আলাপেও দেখাইছেন। বঙ্কিমের কৃষ্ণতত্ত্বে  কান্টের চিন্তা এবং সেক্যুলারিজমকে একটা ধর্ম হিসাবে বিচার করছেন, তারপর তুলনা করছেন গীতার কৃষ্ণের লগে, এইভাবে বঙ্কিম ব্রাহ্মধর্মের মতো চোরাপথে ইউরোপকে হজম নাই, বাংলায় তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব লইয়া আলাপ শুরু কইরা বঙ্কিম ইউরোপকে বিচার করতে করতে নিছেন!
ঙ. ফেমিনিজম। বাংলায় আদি ফেমিনিজম করছেন বঙ্কিম। জেন্ডার, কালচার, নজরের হেরফের কেমনে রিলেটেড সেই আলাপ করছেন উনি। কালচার কেমনে ফিজিক্যাল চেঞ্জ ঘটাইতে পারে সেই আলাপও শুরু করছেন বঙ্কিম। মিসিস্ আর এস হোসাইনের (বেগম রোকেয়া) আসল মা বঙ্কিম।
চ. সেক্যুলার মিডল ক্লাস বুদ্ধিজীবী। বিদ্যাসাগরেরা যখন শাস্ত্রের ভিত্রে জায়েজ কিনা সেই আলাপ করতেছেন বেদ-মনুসংহিতা ঘাইটা বঙ্কিম তখন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ভিন্ন রাস্তা তালাশ করছেন। বিদ্যার শাস্ত্রের আলাপ কম্যুনাল। কারণ দেখাইছেন বঙ্কিম, হিন্দুশাস্ত্রের ঠিক-ভুল দিয়া আইন হইলে সেইটা মোসলমানের জন্য কেমনে চলতে পারে? নাকি বহু বিয়া হিন্দুর জন্য খারাপ, মোসলমানের জন্য ভালো?
এইখানে খেয়াল করার ব্যাপার হইলো, বিদ্যা কলোনিয়াল ভাড়াটে, ইংরাজের ইন্টারেস্ট সার্ভ করেন, ইংরাজের সিভিলাইজিং প্রজেক্টের দেশি এজেন্ট, বঙ্কিম গণমুখী, বিদ্যা বড়জোর জনদরদী ফিউডাল বুদ্ধিজীবী (জমিদাররা তার কাছে ইংরাজের রহমত!), বঙ্কিম ডেমোক্রেটিক।
চ. চলিত বাংলা। বাংলা ভাষার ইস্যুতে পয়লা লিবারাল বঙ্কিম। আলালের ঘরের দুলালকে বাংলা সাহিত্যের জন্য রহমত হিসাবে দেখছেন বঙ্কিম, কিন্তু গোড়া হইয়া সংস্কৃতঅলা বাংলার উল্টা বাংলা গায়ের জোরে চালাইতে রাজি হন নাই। এই ব্যাপারে উনি ডেমোক্রেটিক–আরবি, ফার্সি, ইংরাজি বা সংস্কৃত–কোনটারেই না ফালাইয়া রিডারকে বুঝাবার দরকারে সবচে চালু শব্দ ইউজ করার পক্ষে উনি। ওনার রুচি এবং লিটারেচার খুবই সংস্কৃতঅলা হইলেও পরের চলিত বাংলার আদি গুরু বঙ্কিম, ইন ফ্যাক্ট আরো কম লিবারাল! কারণ, এই চলিত বাংলা ইজ্জতের মামলা, মিডল ক্লাস, প্রমীত, গরীব-অশিক্ষিতের ভোকাবুলারিকে ভালগার হিসাবে দেখে, বঙ্কিম ভিক্টোরিয় অশ্লীলতার আইডিয়ার বাইরে কোন ক্লাসকে বিশেষ ইজ্জত দেন নাই, বঙ্কিম প্রমীত না, উনি ইউটিলিটারিয়ান। বাংলায় পয়লা গদ্য কবিতার নাম লইছেন, লিখছেনও!
ছ. বিজ্ঞানের লেখা। এই ব্যাপারে বঙ্কিম মা না, বাট বড় বইন তো বটেই :)! স্পেস থিকা এটম এবং প্লেন লইয়াও লিখছেন উনি। বঙ্গদর্শনে বিজ্ঞানের বিরাট স্পেস রাখছেন, ইউরোপের লিটারেচারের তুলনায় বিজ্ঞানে বেশি ইন্টারেস্ট দেখাইছেন।
আমাদের বেকুব সেক্যুলাররা বঙ্কিমের কোনটা ফালাইবেন?